আজীবন বিপ্লবী কমরেড বাদল কর

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আনোয়ার হোসেন সুমন: সিলেটের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রসৈনিক কমরেড হিমাংশু ভূষণ কর সকলের কাছে যিনি কমরেড বাদল কর নামেই পরিচিত, তাঁর জন্ম ৩০ ডিসেম্বর ১৯৪৩, সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণের নোয়াই গ্রামে, পিতা- গোপেশ চন্দ্র কর ও মাতা ক্ষীরোদবালা কর। ১৯৬৩ সনে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ‘দি এইডেড হাইস্কুল’ থেকে মেট্রিকুলেশন ও ১৯৬৫ সনে মদন মোহন কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাস করেন। হাইস্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় ছাত্র ইউনিয়নের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা গড়ে উঠে। অতঃপর মদন মোহন কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি সক্রিয় ভাবে ছাত্র ইউনিয়নের কাজের সাথে যুক্ত হন। সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় সকলের কাছে তিনি একজন লড়াকু ও সাহসী যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন সময় ছাত্রলীগের সাথে নানা পরিস্থিতিতে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব-সংঘাতে তিনি সামনে থেকে সবাইকে সাহস যোগাতেন। তখনই সিলেটে শহীদ মিনার নির্মাণকল্পে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের জন্য কমরেড বাদল কর সহ প্রগতিশীল ছাত্র নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত গ্রহণপূর্বক সিলেটের ঐতিহাসিক রেজিষ্টারি মাঠে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশ তা ভেঙে ফেললে, একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরে তা পুননির্মাণ ক্রমে সেখানে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করা হয়। এরপরই অনুষ্ঠিত মদন মোহন কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের আলফাজ আহমদ (ভি,পি) সামছুল হাছান চুনু (জি,এস) প্যানেল জয়লাভ করে। তৎকালীন ছাত্রনেতা কমরেড বাদল কর সহ অন্যান্যদের দাবির প্রেক্ষিতে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ কল্পে ও তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রমোদ গোস্বামী সহ শিক্ষকমণ্ডলীর সমর্থনে মদন মোহন কলেজে সিলেটের প্রথম স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। তিনি এইচ.এস.সি পাসের পর কে.ডি.এইচ. ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড কোম্পানিতে চাকুরি করা স্বত্ত্বেও গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পৃক্ত থেকে কমরেডদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান সহ বিশ্বস্তভাবে নানা দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে জননেতা পীর হাবিবুর রহমান তাঁর বাসায় রাত যাপন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে তিনি পার্টির সদস্য পদ প্রাপ্ত হন। এ বছরই তিনি অনিতা কর সেবার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঘর আলোকিত করে জন্ম গ্রহণ করে এক কন্যা ও দুই পুত্র সন্তান। মার্কসীয় দর্শনে দীক্ষিত কমরেড বাদল কর আগাগোড়াই একজন সাচ্চা কমিউনিস্ট ছিলেন। একজন দুদক্ষ সংগঠক হিসেবে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। সিলেট সাংস্কৃতিক গণসংগঠন উদীচী’র কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তিনি ১৯৭৪ সালে সিলেটে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর শাখা সংসদ গঠনে গুরুত্বপূণ ভূমিকা রাখেন। তখন গড়ে উঠা উদীচীর প্রথম আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। অতঃপর প্রথম জেলা সম্মেলনে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমানুষের কবি দিলওয়ার সভাপতি ও কমরেড বাদল কর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালনের পর চাকুরির বদলিজনিত কারণে ১৯৭৯ সালে তিনি চট্টগ্রাম চলে যান। অতঃপর ১৯৮৮ সাথে তিনি সিলেটে প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর পর্যায়ক্রমে সিলেটের বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি তিনি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হতে থাকেন। বিলোপবাদীদের কবল থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ঝান্ডা নিয়ে এগিয়ে চলতে জুলাই ১৯৯৩ থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে পার্টির কাজের সাথে যুক্ত হন। ১৯৯৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সম্মেলন পরবর্তী সময়ে তিনি সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। ১৯৯৯ সালে পার্টির জেলা সভাপতি ও ২০০৩ সালে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শেষে শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০০৮ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির মূল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। পার্টির মূল নেতৃত্বে না থেকেও সকল প্রগতিশীল আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে পার্টি কর্তৃক তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে তিনি সচেষ্ট ছিলেন আমৃত্যু। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত পার্টির একাদশ কংগ্রেসে ভেটারেন কমরেড হিসেবে তাকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। বিগত ৪/৫টি বছর নিয়মিত উদীচীর কাজের সাথে যুক্ত থেকে সিলেট উদীচীকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে তিনি এক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে গেছেন। ২০১৪ সালে উদীচী সিলেট জেলা সম্মেলনে তাকে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মনোনীত করা হয়। শুধু কমিউনিস্ট পার্টি বা উদীচীর কাজে নয় বরং সিলেটের প্রায় সকল আন্দোলন সংগ্রামে কমরেড বাদল কর ছিলেন প্রথম সারির নেতা ও দক্ষ সংগঠক। তাঁর এই ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ ভূমিকার জন্য সিলেটের প্রগতিশীল কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন চেতনার বাতিঘর। চিরসবুজ ও চিরযুবার মত তিনি জীবনের শেষ দিনটিতেও পার্টি ও গণসংগঠনের কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট রবিবার সকাল ১১ টায় আকস্মিক এক বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর মৃত্যুতে সিলেটের প্রগতিশীল কর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো- খুব সহজেই তিনি নানা বয়সী সবার সাথে মিশতে পারতেন, সবার সাথে বন্ধু বৎসল, হাস্যজ্জ্বল সম্পর্ক গড়ে তুলতেন, যা আনন্দঘন কাজের পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক হতো। তিনি তরুণ কর্মীদের কাজের সাথে যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে চমৎকার কার্যকৌশল নির্ধারণ করতেন, যার ফলে তারা উৎসাহের সাথে কাজে যুক্ত থাকতো। তিনি নিজের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী পার্টি ও গণসংগঠনের কাজে সার্বক্ষণিকভাবে যুক্ত থাকার চেষ্টা করতেন। পার্টি কর্তৃক প্রদত্ত যে কোনও দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করতেন ও সে অনুযায়ী কাজের উদ্যোগ নিতেন। তিনি যে কোনও সংকটজনক ও কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের মেজাজ ঠিক রেখে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারতেন। তিনি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতির একজন আদর্শ সৈনিক ছিলেন। গণতান্ত্রিকভাবে গৃহীত বিরুদ্ধ মতকে তিনি ধারণ করে তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন এবং ঊর্ধ্বতন কমিটির সিদ্ধান্ত পরিপূর্ণ ভাবে মেনে চলতেন। সে কারণেই সকল পরিস্থিতিতে পার্টির কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখতেন। তিনি গোটা পরিবারকে পার্টি বা গণসংগঠনের সাথে যুক্ত রাখতে সর্বদা চেষ্টা করতেন এবং এক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছেন। তরুণ প্রজন্ম তথা সবার কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয়ভাজন, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বস্ত এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রসৈনিক। আজীবন কমিউনিস্ট কমরেড বাদল কর এর মৃত্যু আমাদের জন্য বিশাল এক আঘাত। তাঁর মৃত্যুতে সিলেটের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে ক্ষতি ও শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা কোনোভাবেই পূরণ হবার নয়। তাঁর বিপ্লবী জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে বাম প্রগতিশীল আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার মাধ্যমেই কেবল আমরা তরুণ প্রজন্ম আজীবন বিপ্লবী, চেতনার বাতিঘর কমরেড বাদল কর এর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারি। লেখক : সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..