স্বাধীনতার প্যারাডকস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শহিদুল ইসলাম : স্বাধীনতার প্যারাডকস স্যার কার্ল রায়মন্ড পপার (১৯০২-১৯৯৪) একজন বিখ্যাত মানুষ। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানের দার্শনিক হিসেবে খ্যাত। তার ‘জ্ঞানতত্ত্ব’ ও ‘বিজ্ঞানের দর্শন’ এক কথায় বলা যায় নৈরাজ্যবাদী। আজ এ বিষয়ে কিছু লিখতে বসিনি। তিনি ঘোষণা দিয়ে মার্কসবাদ বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়ে হাজার পৃষ্ঠার একখানা বই লিখেছিলেন ১৯৪৫ সালে। ‘মুক্ত সমাজ ও তার শত্রু’। সমাজ বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি উদারতাবাদী গণতন্ত্রের পূজারি। তিনি মনে করেন গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজে স্বাধীনতা ও সমতাবাদ (Egalitarianism) প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। মার্কসের তত্ত্বে বলে ‘অর্থনীতিই’ হলো সমাজের মূল কাঠামো। তার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে রাজনীতি, রাষ্ট্র, সংসদ, আইনি কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানসমূহ। পপার এ মত খণ্ডন করেন এবং সিদ্ধান্ত জানান যে ‘রাজনীতিই মুখ্য। অর্থনীতি তার অধীন। সুষ্ঠু রাজনীতির মাধ্যমে আমরা সমাজের আবর্জনা, দুর্নীতি, শোষণ-বঞ্চনা-নির্যাতন দূর করতে পারি। ‘রাষ্ট্র’ সেই রাজনীতির একটি ‘মূর্ত’ প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমেই আমরা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে পারি। সেজন্য আমাদের প্রয়োজন একটি ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা।’ তিনি বলেন, ‘প্রকৃতিগতভাবে সব মানুষ সমান নয়।’ তিনি কন্টেকে সাক্ষী মেনে বলেন যে, ‘সব মানুষকে সমান করার চেষ্টা করা উচিত নয়, কারণ তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে নৈতিক ও বস্তগত উন্নয়নের চাবিকাঠি।’ ‘মানুষে মানুষে অসাম্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আশীর্বাদ-অভিশাপ নয়।’ তবে আমরা ‘তাত্ত্বিকভাবে’ সব মানুষকে সমান করার চেষ্টা করতে পারি এবং তার জন্য ‘মার্কসবাদ’ নয়-‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা দরকার। কারণ ‘গণতন্ত্র’ আমাদের ‘মুক্ত’ সমাজে বসবাসের সুযোগ দান করে। আমরা স্বাধীনভাবে আমাদের চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করতে পারি। পপার মাত্র দু’ রকমের রাষ্ট্রে বিশ্বাস করেন। এক, গণতান্ত্রিক এবং দুই, স্বৈরতান্ত্রিক। মার্কসের ‘সাম্যবাদী’ সমাজ স্বৈরতান্ত্রিক। মার্কসবাদ ‘মুক্ত’ সমাজের শত্রু। তবে তিনি এটাও বিশ্বাস করেন যে যারা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা করেন (সরকার) এবং আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখেন তারা অনেক সময় ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ হয়ে উঠতে পারেন। দুর্বলদের ওপর নির্যাতন চালাতে পারেন। তারা যেন তা না করতে পারেন, তার জন্য আমরা আইন তৈরি করে তাদের ক্ষমতার রাশ টেনে ধরতে পারি সীমাবদ্ধ করতে পারি। তার জন্য দরকার এক নির্ভেজাল ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা এবং সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত একটি ‘প্রতিনিধিত্বমূলক’ জাতীয় সংসদ গঠন করা। সেখানে ‘দুর্বল মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা’ আইন প্রণয়ন করে ‘দুর্বল শ্রেণিকে’ রক্ষা করতে পারেন। নির্বাচনের মাধ্যমে ঘোষিত শ্রেণির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও শাসক শ্রেণির ক্ষমতা হ্রাস করা যায়। শ্রমিক শ্রেণির কষ্ট লাঘব করার জন্য আমরা শ্রম দিবস কমিয়ে আনতে পারি। আইনের মাধ্যমে শ্রমিক তথা সব নাগরিকের অর্থনৈতিক অনিশ্চিত স্বাধীনতার প্যারাডকস ভবিষ্যতের অন্ধকার দূর করে আলো জ্বালাতে পারি। এভাবে আমরা শোষণের হাত থেকে দুর্বলদের রক্ষা করতে পারি। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলতার কারণে কেউ যেন আর তাদের শোষণ করতে না পারে, তাদের যেন আর না খেয়ে থাকতে না হয়, আইনের মাধ্যমে আমরা তা নিশ্চিত করতে পারি। তার জন্য দরকার একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন। তার নাম রাষ্ট্র। মার্কস রাজনীতি ও ‘অর্থনীতির’ পার্থক্য বুঝতে ভুল করেছিলেন। মার্কস মানুষের স্বাধীনতা চান ঠিকই, কিন্তু তিনি ‘স্বাধীনতার প্যারাডকস’ বুঝতে পারেননি। পপার বারবার ‘প্যারাডকস অব ফ্রিডমের’ কথা বলেন। কেন? তিনি মনে করেন স্বাধীনতার একটা সীমা থাকতে হবে। কারণ ‘সীমাহীন স্বাধীনতা’ স্বাধীনতাকেই হরণ করে। দুই. এবারে আমি আসল কথায় প্রবেশ করবো। পপার গণতন্ত্রের সঙ্গে স্বাধীনতা ও সমতাবাদকে একই পাল্লায় তুলেছেন। অর্থাৎ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো ‘স্বাধীনতা’ ও ‘সমতাবাদের’ প্রতিষ্ঠা। তাই আজকের লেখায় ‘প্যারাডকস অব ফ্রিডম’ সম্পর্কে কিছু কথা তুলে ধরবো। কারণ ‘গণতন্ত্রের প্যারাডকস’ গভীর অর্থ বহন করে। ২০০৮ সালে প্রকাশিত ক্লাইভ হেমিলটনের ‘দি প্যারাডকস অব ফ্রিডম: টুওয়ার্ডস আ পোস্ট সেকিউলার এথিকস (The Paradox of Freedom: Towards A Post-Secular Ethics) বইতে বিষয়টির ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। আধুনিক বুর্জোয়া বিশ্বের স্বাধীনতা ও নৈতিকতার এক বৈপ্লবিক পুনর্বিবেচনার পর হেমিলটন একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, ‘বিশ্বের সমস্ত সম্পদ ও বিলাসিতা ভোগ করেও আমরা কেন ‘তৃপ্ত’ হতে পারি না? কেন আমাদের লোভ-লালসা তৃপ্ত হয় না?’ তিনি বলেন, ‘বিগত দুইশ বছর আমাদের জন্য যে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সম্পদ বহন করে এনেছে, তা আমাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের অভাবনীয় সুযোগের সৃষ্টি করেছে। সম্পদের বন্যায় পশ্চিমা সভ্যতা ভেসে গেছে। ‘কারো কোনো চাহিদা আজ আর অপূর্ণ নেই।’ তবুও কেন সম্পদশালী বিশ্বের বিলাসিতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে না? উন্নত বিশ্বের সম্পদশালী মানুষ আরো সম্পদ, আরো বিলাসিতার পেছনে ছুটছে। হেমিলটন প্রশ্ন তোলেন, ‘সম্পদ-বিলাসিতায় ডুবে থাকা মানুষ কি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে?’ (YET CITIZENS OF AFFUUENT COUNTRIES ARE ENCOURAGED TO PERSUIT LIVES OF CONSOMMERISM, ENDLESS CHOICHES AND THE PLEASURE OF THE BODY.) এটাই ‘স্বাধীনতার প্যারাডকস।’ পপার এটা বুঝতে ভুল করেছিলেন। সম্পদও যে মানুষের ‘স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে কেড়ে নিয়েছে; মানসিক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতে পারে, হেমিলটন সেদিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।’ সম্পদের এই প্রাচুর্য আমাদের ‘স্বাধীনতা’ কেড়ে নিয়েছে। আমরা আজ ‘অভাবনীয়’ প্রাচুর্যের ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছি। তিনি সিদ্ধান্ত জানান যে, ‘সত্যিকার অর্থে আমরা ততদিন স্বাধীনতা ভোগ করতে পারব না, যতদিন না আমরা আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি আস্থা স্থাপন করব।’ (a ÔPost-Secular EthicsÕ that will serve as a challenge to the Ômoral malaiseÕ occassioned by the Ôfreedom of the market place.’ মুক্তবাজার অর্থনীতি আমাদের চরিত্র হনন করেছে। বাজারের স্বাধীনতা মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। বর্তমানের প্রযুক্তির সভ্যতা সম্পর্কে তার একটি রসালো উক্তি হলো ‘চাহিদা, বৈষম্য ও নির্যাতন থেকে ‘মুক্ত’ আমরা মুক্ত ভেড়ার পালের মতো গৃহপালিত জীবে পরিণত হয়েছি এবং ভবিষ্যতের গহ্বরে কি লুকিয়ে আছে, তা ভেবে আমরা আতঙ্কিত।’ অর্থাৎ বর্তমানের বিলাসবহুল জীবন আমাদের জন্য এক গতানুগতিক জীবন উপহার দিয়েছে এবং স্বাধীনতা হারানোর ভয়ে আমরা সব সময় আতঙ্কে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকি। তার অর্থ আমরা ইতোমধ্যেই আমাদের স্বাধীনতা হারিয়েছি। এক কথায় পুঁজিবাদী সভ্যতা আমাদের জীবন থেকে সমস্ত বৈচিত্র্য কেড়ে নিয়েছে এবং একটি একঘেয়েমি, অপরিচ্ছন্ন ও নির্লজ্জ ‘কুনো ব্যাঙের’ জীবন উপহার দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে সমস্ত সৃজনশীল ও প্রগতিশীল সংস্কৃতির আকক্সক্ষা। তাই আমরা সব সময় বিপ্লবের ভয়ে সিটকে থাকি। পশ্চিমা উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্ব সম্পর্কে তার এ বিশ্লেষণ। তিন. ১৯৩৪ সালে আইনস্টাইনও প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সভ্যতার বিপদ সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন তার প্রবন্ধে ‘দি ওয়ার্ল্ড অ্যাজ আই সি ইট (The World As I See It)’। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি ও শিল্পের উন্নয়ন মানবজাতির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন করেছে। স্বাধীনভাবে ব্যক্তির বিকাশের পথ বন্ধ করে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আজকের ইউরোপ একশ’ বছর আগের চেয়ে তিন গুণ বেশি মানুষ ধারণ করছে, কিন্তু বড় মানুষের সংখ্যা সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। প্রতিষ্ঠান আজ মানুষের জায়গা দখল করেছে।’ চার. একই রকম মত প্রকাশ করেছিলেন ফ্রান্সের প্রখ্যাত উপন্যাসিক ও দার্শনিক আঁদ্রে জিদ। ১৯০২ সালে প্রকাশিত তাঁর ছোট ‘Immoralist’ উপন্যাসে মেনাল্ক (Menalque) নামের এক চরিত্রের মুখ দিয়ে তিনি আমাদের এক বিরাট দর্শন উপহার দিয়েছেন। উপন্যাসের নায়ক মাইকেলের উদ্দেশ্যে মেনাল্ক বলেন ‘WE IMAGINE WE POSSESS. BUT IN TRUTH WE ARE POSSESSED.’ ‘আমরা মনে করি আমরা সব কিছু দখল করেছি, কিন্তু সত্যি হলো আমরা নিজেরাই সব কিছু দ্বারা অধিকৃত হয়ে গেছি। আমরা তা বুঝতে পারি না। সম্পদের চোখ ঝলসানো আলোয় আমরা অন্ধ।’ মাইকেলকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরো বলেন, ‘জীবন ধারণের হাজার হাজার পথ আছে, কিন্তু আমরা মাত্র একটা পথই জানি।’ তিনি বলেন, ‘আজকের কবিতা, বিশেষ করে আজকের দর্শন মৃত। কারণ তা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন।’ গ্রিক কবিতা ও দর্শন আজো এত জীবন্ত কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে মেনাল্ক বলেন, ‘গ্রিকরা সরাসরি তাদের জীবন থেকে তাদের আদর্শ নির্মাণ করেছিল। একজন শিল্পীর জীবনই তার কবিতার প্রতিফলন, একজন দার্শনিকের জীবন তার দর্শনের প্রতিফলন। তাদের শিল্পকর্ম ও দর্শন ছিল জীবনের সঙ্গে বাঁধা। কিন্তু আজকের কাজের মধ্যে কোনো সৌন্দর্য নেই। কোনো কাজই আজ সুন্দর হওয়ার স্বপ্ন দেখে না। পাণ্ডিত্য আজ অন্য কোনোখানে অবস্থান করে। অন্য কোনো গ্রহে। মানুষের সঙ্গে আজ পাণ্ডিত্যের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অন্তহীন চাহিদার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি আমাদের পাণ্ডিত্যের ভাণ্ডার শূন্য করে চলেছে।’ পাঁচ. পগার গণতন্ত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতা সমতা, পাণ্ডিত্য, মুক্ত সমাজ, মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা ইত্যাদি অর্জন সম্ভব দাবি করে এক হাজার পৃষ্ঠার বইটা লিখেছিলেন। হেমিলটন, আইনস্টাইন ও আঁদ্রে জিদের বক্তব্যে তাঁর সে সিদ্ধান্ত ভুল বলে প্রমাণিত হয়। আইনের দ্বারা দৈহিক নির্যাতন বন্ধ করা যায়; চোখ ঝলসানো শহর তৈরি করা যায় কিন্তু আইন করে মানুষের মনের অন্ধকার দূর করা যায় না। অর্থনৈতিক শোষণ-নির্যাতন বন্ধ করা যায় না। কাজেই বুর্জোয়া গণতন্ত্র দ্বারা স্বাধীনতা ও সমতাবাদী সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়। লেখক : শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞান দর্শনের গবেষক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..