পাটের লাভজনক মূল্য এখনও ঘোষণা হয়নি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মোর্শেদ আলী : শ্রাবণ মাস প্রায় শেষ হতে চলল। ইতোমধ্যেই পাট কাটা ও শুকানো আরম্ভ হয়েছে। কিছু কিছু পাট বাজারে উঠছে। কিন্তু ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা হা-হুতাশ করছে। পাট ও পাটের দাম এ দুই বিষয়ই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। ষাটের দশকে ছাত্র রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের দাবি ছিল পাটের দাম মণ প্রতি ৫০ টাকা দিতে হবে। ছাত্রদের ১১ দফার অন্যতম দফা ছিল মনপ্রতি পাঠের দাম ৫০ টাকা করতে হবে। পাট ব্যবসা ও পাট কলগুলোকে জাতীয়করণ করতে হবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কৃষকদের আশা পূরণ হবে সেটাই ধারণা ছিল। সেই লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রগতির ধারায় অর্থনীতিকে ও রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাঁর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ও কর্মী এর বিরুদ্ধে ছিল এবং ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীন বাংলার প্রগতির ধারাকে আর বাস্তবায়িত করতে দেয়নি। দেশের অর্থনীতিকে আবার পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়। ১৫ আগস্টের পর যতগুলো সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা সকলেই পাকিস্তানি ও বিশ্বব্যাংক, আই.এম.এফ এর নির্ধারিত পথেই চলেছে। তারা সংবিধানকে অমান্য ও কাঁটাছেড়া করেছে। বেশ কিছুকাল অর্থাৎ ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকার অনেক সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ের পরও স্বাধীনতা ও প্রগতির ধারা অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করে যায়। ’৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার গঠন হলেও স্বাধীনতা উত্তর সংবিধান ও তিন দলীয় জোটের রূপরেখার অঙ্গিকার পূরণ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয় নাই। বরং ঐ সময় আওয়ামী লীগ জামাতের সাথে হাত মিলিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পদক্ষেপ নেয়। ২০০১ নির্বাচনে আবার বিএনপি-জামাতের ৪ দলীয় জোট সরকার। তাদের ৫ বছরের দেশ শাসনে কৃষক সারের দাবিতে আন্দোলন করে পুলিশের গুলিতে জীবন দিয়েছে। আমজী জুট মিল বন্ধ করা হয়েছে এবং মোটামুটি সবজুট মিলগুলো ব্যক্তি-মালিকানায় তুলে দেয়। সবে ’৮১ সালের পর এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর শর্ত মেনে জাতীয়করণ নীতি বাতিল করে সমস্ত রাষ্ট্রীয় খাতের কলকারখানা ব্যক্তিগত মালিকানায় ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপক তোড়জোড় চলে। এর বিরুদ্ধে ১১ দলীয় জোট এর ব্যাপক ৫ দফা ভিত্তিক আন্দোলন গড়ে উঠে। চারজন ছাত্রনেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যা করা হয় শ্রমিক নেতা কমরেড তাজুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজ উদ্দিনকে। এই আন্দোলনের ধাক্কায় এরশাদের পতন হয়। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ঐ সময় থেকে আদমজীসহ জুটমিলগুলো ব্যক্তি মালিকদের কাছে ছেড়ে দিয়ে বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়। মোটের উপর কথা হলো কোন সরকারই পাটকলগুলো ব্যক্তি মালিকদের কাছে ছেড়ে দেয়ার যে প্রক্রিয়া এরশাদ আমল থেকে শুরু হয় সেটা বন্ধ করার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বর্তমান সরকার পাটকল ও পাটের ব্যবসা নিয়ে অনেক বড় কথা বলছে। কিন্তু পাটকল ও পাট ব্যবসার কিভাবে উন্নতি হবে সেটা সম্পর্কে কোনো পদক্ষেপ নেই। সারাদেশের কৃষক অতি বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেদিকে চিন্তা করে পাটের লাভজনক দাম ইতোমধ্যে ঘোষণা করা উচিত ছিল। কিন্তু পাট চাষিরা বাজারে পাটের দাম পাচ্ছে না- যা পাচ্ছে তাতে ক্ষতিই হচ্ছে। বিষয়টা ঠেকাতে হলে পাট মন্ত্রণালয় ও বিজিএমসিকে পাট ক্রয় করতে হবে। এর জন্য তাদেরকে তহবিল দিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের কোন বরাদ্দ আছে কি না জনগণ জানে না। লাভের মধ্যে যা হবে তা হল পার্শ্ববর্তী দেশে পাট পাচার হয়ে যাবে। বিগত বছরগুলোতে তাই হয়েছে। অর্থনীতির নিয়ম হচ্ছে পণ্যের যেখানে বেশি দাম সেখানেই চলে যাবে। আমাদের বিজ্ঞ মন্ত্রী মহাশয়রা নিশ্চয় তা জানেন। কৃষিমন্ত্রী পাটের জিন আবিষ্কার হওয়ায় বিজ্ঞানীদের অনেক অভিনন্দন জানিয়েছে। কিন্তু কৃষক যে পাট চাষ করে তার জন্যই বা তাকে রক্ষা করতে কি ব্যবস্থা করেছেন! প্রধানমন্ত্রী, পাটমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী পাট সম্পর্কে অনেক উপদেশ দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। পাট দিয়ে বস্তা, কার্পেট, ব্যাগ ছাড়াও নানান জিনিস তৈরি করা সম্ভব এটা সত্য। কিন্তু এটা কার্যকরী করতে হলে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার পাটের বহুমুখী ব্যবহারের জন্য একটি প্রকল্প চালু রেখেছে। সেখানেও ব্যক্তি মালিকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায়ই পাটকল, পাট চাষিদের কোনো অগ্রগতি নেই। এহেন পরিস্থিতিতে পাটকলের শ্রমিক, কৃষকদের আন্দোলন এবং সাথে বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন চলতে চলতে ২০০৭ সালে বেশ শক্তিশালী হয়। এর প্রেক্ষিতে বিচারক মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী ও শ্রমিকনেতা শাহ আলমকে দিয়ে পাট, পাট শিল্প কমিশন গঠন করা হয়। তারা বিস্তারিত চিন্তা-ভাবনা ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সাথে মতবিনিময় করে কিছু প্রাথমিক অভিমত স্থির করেন। সেই অভিমতের বিষয়গুলো সরকারকে জানানোর জন্য সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রচার করা হয়। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয় নাই। তবে সেই অভিমতগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে সকলকে তা জানানো এবং এ থেকে একটা সর্বজনীন অভিমত তৈরি করা সময়ের কাজ ছিল। এছাড়া কোনো লুটেরা সরকার পাটের বর্তমান যে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তা উপলব্ধি করতে পারবে না। শুধু বক্তৃতা দিবে কিন্তু এ লক্ষ্যে কোনো কাজ বা পদক্ষেপ নেয়া হবে না। তবে বর্তমান সরকার একটা বিষয় পরিষ্কার করছে যে বিশ্বব্যাংক ও আই.এম.এফ আমাদের অর্থনীতিতে তেমন কোনো সহযোগিতা করছে না– ঋণও দিচ্ছে না। এই কথা সত্য- সেজন্য বিশ্বব্যাংক অতীতে বিশেষ করে ’৭৫ এর পর থেকে যে সব পরামর্শ দিয়েছিল তা বাতিল করার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। তাই পাটকলসহ সকল রাষ্ট্রীয় শিল্প বিক্রি বা ইজারা দেয়া বন্ধ করতে হবে। ইজারানীতি বাতিল করতে হবে। প্রথম অবস্থায় রাষ্ট্রায়ত্ব কওমি জুট মিলস, কর্ণফুলী কার্পেট ফ্যাক্টরি, খুলনার পিপলস জুট মিলস লি., এস.এম জুট মিলস, আর.আর জুট মিলস ও বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি ইজারা দেয়ার জন্য ২০০৭ সালে ১ নভেম্বর দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে ৮টি পাটকল ইজারা প্রদান ও পাটখাত সংস্কার কর্মসূচি আত্মঘাতি-আত্মবিনাশী ও জাতীয় অর্থনীতি বিপর্যয়কারী সিদ্ধান্ত ছিল। এটা অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক ছিল। পাট ও পাট শিল্প কমিশন এর মতামত ও অভিমত হুবহু এখানে তুলে দেয়া হল। মতামতদানকারীগণের মতামতের সঙ্গে সমমত পোষণ করে গণকমিশনের প্রাথমিক অভিমত এই যে, প্রতিবেশ-পরিবেশ বান্ধব প্রাকৃতিক আঁশ পাট হতে পারে বাংলাদেশের- ‘ডায়মন্ড’। প্রয়োজন উপযুক্ত নীতি ও কার্যকর কৌশল গ্রহণ। সুদূর প্রাচীনকাল হতে বাঙালির কৃষ্টি-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ পাট। পাটের আয়ে প্রবঞ্চনার শিকার হওয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কারণ ও অনুঘটক। পরিত্যক্ত বা অনিবাসী সম্পত্তি বলে নয়, “বাংলাদেশের মানুষের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা” নিশ্চিকরণার্থে ১০ এপ্রিল-১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা লগ্নেই রাষ্ট্রপতি আদেশ নং- ২৭ দ্বারা তৎকালীন ৭৮টি পাটকল রাষ্ট্রায়ত্ব করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে গণদখলি স্বত্ত্ব ও জনকর্তৃত্ব কায়েম না করে বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব সহ কর্মবিভাগ সহযোগে পূর্বাপর অনিয়ম-দুর্নীতি ইত্যাদিসহ পাট শিল্প নিঃষ্করণের প্রক্রিয়া শুরু করা হয় বহুজাতিক পুঁজির স্বার্থবাহী আই.এম.এফ-বিশ্বব্যাংকসহ বিদেশি কারবারদীদের পরামর্শ, শর্ত ও নির্দেশনায় এবং তার ভিত্তিতে প্রণীত জাতীয় স্বার্থবিরোধী নয়া শিল্পনীতি ১৯৮২ সহ নানা ধরনের পলিসি, আইন ও চুক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ও অর্জন “জাতীয়করণ”কে অস্বীকার ও ভ্রান্ত বলে চিহ্নিত ও নির্ণিত করে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সেবক আইএমএফের “ডিসইনভেষ্টমেন্ট” ও “বিজাতীয়করণ” এর সর্বনাশা প্রেসক্রিপশনে ’৭০ এর দশকে ৬টি জুট স্পিনার্স মিলস এবং ১৯৮২-৮৩ অর্থবর্ষে মোট ১০৫০০ তাঁতের ৩৬টি পাটকল বেসরকারিখাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে বিশ্বব্যাংকের সাথে সম্পাদিত পাটখাত সংস্কার ঋণচুক্তির আওতায় মাত্র ২টি পাটকল রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে রেখে অবশিষ্ট সকল রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারিকরণ ও ক্রমে বন্ধ, সংকোচন ও বিলোপকরণ এবং সর্বশেষ ২০০৭ সালের পাটখাত সংস্কার কর্মসূজির অধীনে হালের ইজারানীতি গৃহীত হয়। আই.এম.এফের শর্তে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের যৌথ সম্পত্তি যে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত তা বিলীন করে ব্যক্তিখাতকে সকল প্রতিবন্ধকতা হতে মুক্ত করার হীন উদ্দেশ্য বিজাতীয়করণ ও বেসরকারিকরণের ধারাবাহিকতায় ইজারানীতি চালু করা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ফটকাবাজ-ব্যবসাদার, মুনাফাখোর, পুঁজিওয়ালারা নামেমাত্র অর্থে ও সুবিধানজক শর্তে জনগণের মৌলিক অধিকারভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণভার কার্যত মালিকানা লাভ করবে। ইজারা গ্রহীতাগণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি দখল ও ব্যবহার করার সুবাদে অবাধে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করে বেসরকারিখাতের ঋণ খেলাপি তথা ব্যাংক ডাকাতি, ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের অবাধ সুযোগ লাভ করা ও হুন্ডি ব্যবসাসহ ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়তে পারবে ও অন্যদিকে পাটশিল্প চিরতরে বন্ধ ও ধ্বংস করার লাইসেন্স পাবে। শিল্প শ্রমিকসহ গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ ব্যাপক হারে বেকার হবে। দেশের স্বাধীন মানুষ পুঁজির শোষণ শৃঙ্খলে বন্দি ও পরাধীন হবে। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ সহ নীতি নির্ধারকদের “ডিসইনভেস্টমেন্ট”, “বিজাতীয়করণ” ও “বেসরকারিকরণ” যুগপৎ ব্যর্থ ও ক্ষতিকর প্রমাণিত হওয়ার পরও রাষ্ট্রায়ত্তখাতসহ পাট শিল্পের মহাসঙ্কট উত্তরণে সঠিক পন্থা গ্রহণ না করে তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পরিত্যজ্য ও মুক্তিযুদ্ধে পরিত্যক্ত ইজারাপ্রথা চালু করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ইজারা নীতি চালু হলে– কতিপয় মুনাফালোভী ব্যক্তির অধীনে পাট অর্থনীতি জিম্মি হবে, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটশিল্প বিলীন হবে, জাতীয় উৎপাদন হ্রাস পাবে, বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পাবে, পুঞ্জিভূত ও খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্রে ব্যাংকিং সংকট বাড়বে, পাটকলের শ্রমিকগণ মুনাফায় বন্দি হয়ে আধুনিক দাসে পরিণত হবে এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির শোষণে আরো অধিক মাত্রায় শোষিত হবে দেশের মানুষ। তদুপরি ক্রমবর্ধিত ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ে স্বাধীন জাতীয় নীতি নির্ধারণে ক্রমাগতভাবে ক্ষীণবল হয়ে পড়বে সরকার ও বিপন্ন হবে জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব। এভাবে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের নীল নকশার অংশ- পণ্যমূল্য বৃদ্ধির “মুক্তবাজার অর্থনীতি”, তথা গণক্ষতির সকল পাপাচার পাকাপোক্ত হবে। সর্বোপরি, সরকার কাঁচাপাট ক্রয় করবে না বলে উপযুক্ত ও ন্যায্য দাম তো নয়ই, এমনকি মোট চাহিদার নিরিখে মোট উৎপাদিত ও মজুতকৃত পাটের পরিমাণ অধিকতর হওয়ায় পাট বিক্রি করতে পারবে না বানভাসা-ঋণগ্রস্ত পাটচাষি। পরিণতিতে পাটচাষ নিজ জন্মভূমি থেকে নির্বাসিত হবে। অথচ, সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৮ হতে ২৫ এর সম্মিলিত পাঠের নির্গলিতার্থ হচ্ছে– শোষনহীন-বৈষম্যমুক্ত, গ্রাম-শহর ও ধনী-গরিবের বৈরিতা ও ব্যবধান বিলোপকারী একটি অসাম্প্রদায়িক-আধুনিক ও একমুখী সার্বজনীন শিক্ষায় শিক্ষিত দক্ষ জনসমষ্টির সমকাজে সমমজুরির ভিত্তিতে কর্মময় জীবন ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থার মানবিক সমাজ তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজ নিবির্মাণ; পরিকল্পিত অর্থনীতির মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সাংস্কৃতিকমানের দৃঢ় উন্নতি সাধন; জনগণের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন যাত্রার বস্তুগত ও সাংস্কৃতিকমানের দৃঢ় উন্নতি সাধন জনগণের মৌলিক দায়িত্ব। শোষণ-লুণ্ঠনের হাতিয়ার ব্যক্তিমালিকানাকে আইন দ্বারা সীমিত ও তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত মালিকানা গণ্যে “উৎপাদন যন্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টন প্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ এবং এই উদ্দেশ্যে মালিকানা ব্যবস্থা নিম্নরূপ হইবে: ক) রাষ্ট্রীয় মালিকানা অর্থাৎ অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র লইয়া সুষ্ঠু ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি খাত সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা” প্রথম শ্রেণিভুক্ত মালিকানা। (সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)। অধিকন্তু, মৌলিক অধিকার অনুচ্ছে– ২৭ ও ৩২ মতে প্রজাতন্ত্রের সকলে আেিনর দৃষ্টিতে সমান ও আইনানুগ ব্যবহার লাভের অবিচ্ছেদ্য অধিকারী মর্মে ‘ইজারাদার’ ও ‘আধুনিক দাস’ সৃষ্টির মতো নীতি গ্রহণ করার সুযোগ বাংলাদেশে নাই। সম্পত্তি প্রসঙ্গে নির্বাহী কর্তৃত্ব বিষয়ক সংবিধানের অনুচ্ছেদ - ১৪৪ এ “ইজারা” নামক শব্দ যৌক্তিক কারণেই নাই এবং জাতীয়করণ বিষয়ক আইনসমূহ সংবিধানের মৌলিক অধিকার অনুচ্ছেদ-৪৭ দ্বারা হেফাজতকৃত। সুতরাং রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ইজারাদান প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি এবং জাতীয় জনস্বার্থের প্রতি বৈরিতাপূর্ণ ও মারাত্মক হুমকি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ মোতাবেক সংবিধান মান্য করা ও জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা এবং অনুচ্ছেদ- ২৫ মোতাবেক জাতীয় স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ এর বিরুদ্ধে নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সংগত সংগ্রামকে সমর্থন করা দেশের প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য বিবেচনায় আমাদের পাট ও পাটশিল্প রক্ষায় বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের প্রেসক্রিপশন ও শর্তে প্রণীত বেসরকারিকরণ নীতি বাতিল ও সম্প্রতি গৃহীত ইজারা নীতি বাতিলের লক্ষ্যে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা করতে হবে, যা সংবিধান সম্মত। অনুরূপ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা তথা গণতান্ত্রিক পন্থায় পরিচালিত আন্দোলনে গণকমিশন সক্রিয় সমর্থন ও সার্বিক সহযোগিতা করবে। সে রকম ব্যবস্থা গ্রহণসহ কমিশনের রিপোর্ট চূড়ান্তকরণে দেশের গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, শ্রমিক ও কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগঠন, অর্থনীতিবিদ-শিক্ষক-সাংবাদিকসহ পেশাজীবী ও শিল্পী-সাহিত্যক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ছাত্র-যুব সংগঠন ও পরিবেশবাদী সংস্থা-গোষ্ঠীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সহিত পর্যায়ক্রমে মতবিনিময় করবে। সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..