ঘুষ-দুর্নীতি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সারা দেশে ঘুষ-দুর্নীতি একটি সাধারণ ও মামুলি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকটা বাতাসের মতোই এটি সর্বব্যাপী হয়ে উঠেছে। সবাই সবাইকে ঠকানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এ দূষিত পরিস্থিতিতে কিছু ‘রাঘব বোয়াল’ ছাড়া কেউই লাভবান হতে পারছে না। এদেরকে আবার আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে রাষ্ট্র। দেশে কোনো ঘুষ-দুর্নীতি নেই, যা আছে তা হলো ‘স্পিড মানি’– অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্যই এর প্রমাণ। ঘুষ-দুর্নীতির উদ্ভব প্রাচীন যুগে; আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে উত্তরণের কালে। এ কারণে অনেকে সমাজে এর অস্তিত্বকে অবধারিত বিবেচনা করে দুর্নীতিমুক্ত সমাজকে ‘ইউটোপিয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এ ক্ষেত্রে তারা দুর্নীতির ‘অপসারণ’ নয়, বরং তাকে ‘সহনীয়’ পর্যায়ে রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু এ বক্তব্য সারহীন। যৌথ স্বার্থ ও যৌথতার বোধ হলো ‘সমাজ’ গঠনের মৌলিক ও প্রাথমিক ভিত্তি। জন্মলগ্ন থেকে এ সমাজের রূপ ও বৈশিষ্ট্যে পর্যায়ক্রমিক নানা রূপান্তর ঘটেছে। আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে পর্যায়ক্রমে দাস সমাজ, সামন্তবাদী সমাজ, পুঁজিবাদী সমাজ ইত্যাদি হিসাবে তা রূপ লাভ করেছে। দাস সমাজে যে শ্রেণি বিভাজনের শুরু, তা আজও অক্ষুণ্ন। আর এ শ্রেণি বিভক্ত কাঠামো ‘সামাজিক স্বার্থ-সত্ত্বার’ সাথে ‘ব্যক্তি স্বার্থ-সত্ত্বার’ সামঞ্জস্য নষ্ট করেছে। ফলে, এই দু’য়ের মধ্যে আজ দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যের উপাদান জন্ম নিয়েছে। তাই, শ্রেণি বিভাজন ও ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থাকে অপসারণ করতে পারলে, ‘যৌথ’ ও ‘ব্যক্তির’ মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব নিরসনের ভিত্তি রচিত হবে। বাস্তব জীবনে আমরা দুই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হই। কিছু সমস্যা বিদ্যমান ব্যবস্থার অদক্ষতার কারণে সৃষ্ট। ব্যবস্থাকে গতিশীল করে তাকে দক্ষভাবে পরিচালনা করতে পারলেই এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আরেক ধরনের সমস্যা রয়েছে, যা ‘ব্যবস্থাগত’ (ংুংঃবসরপ) সমস্যা। এসব সমস্যা বা রোগের উদ্ভব হয় ‘ব্যবস্থার’ মৌলিক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের কারণে। এগুলো নিরসনের জন্য ‘ব্যবস্থা’রই মৌলিক রূপান্তর অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ঘুষ-দুর্নীতি বহু পুরানো হলেও বৃটিশ শাসনামলে তা নতুন মাত্রা পায়। সে সময় ঘুষ-দুর্নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। অবশ্য চরম নৈরাজ্যকর অবস্থা থেকে বাঁচতে বৃটিশরাই আবার ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন, বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থাও করেছিল। আর এতেই তারা বিত্তবানদের জন্য রেখেছিল বিশেষ দায়মুক্তির মতো ব্যবস্থা। বৃটিশ শাসকদের প্রবর্তিত ঘুষ-দুর্নীতির সেই ধারা আমাদের দেশে অব্যাহত থেকেছে, যা বর্তমানে পেয়েছে উচ্চ মাত্রা। এ অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে ঘুষ-দুর্নীতির বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলি ও এর উৎসকে দূর করলেই চলবে না। এ জন্য এর উৎস উৎপাটন করে এমন একটি বিকল্প আর্থ-সামাজিক ভিত্তি সৃষ্টি করতে হবে, যা সহজাতভাবে ঘুষ-দুর্নীতির লালনকারী নয়। সে ব্যবস্থা হলো ‘সমাজতন্ত্র’। সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ প্রভৃতি সংস্থা দ্বারা আমাদের দেশ আজ বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত। তাদের নির্দেশিত অর্থনৈতিক-সামাজিক দর্শনই অনেকাংশে জন্ম দিয়েছে লুটেরা ও পরগাছাপরায়ণ অর্থনীতির। এই নীতি-দর্শন অনুযায়ী দেশের অগ্রগতির (?) জন্য ব্যক্তিগত মালিকানায় দ্রুত গতিতে বিপুল পুঁজি সঞ্চয় হওয়াটা জরুরি। এ জন্য আইনি পথের বাইরে গিয়ে অর্থ উপার্জনের বাস্তবতা তৈরি করা হয়। আর এ প্রক্রিয়াতেই এ দেশে গড়ে উঠেছে একশ্রেণির লুটেরা বিত্তবান। তারাই এখন হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। তাদের লুটপাট নিরাপদ রাখার জন্যই তারা আমলাতন্ত্র, একশ্রেণির রাজনীতিবিদ, মাস্তান বাহিনি, প্রভৃতিকে লুটপাটের ভাগিদার বানিয়ে দেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশের উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা হলো প্রচলিত ‘সাম্রাজ্যবাদ-বিশ্বব্যাংক নির্ভর লুটেরা ধনবাদী’ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা। উন্নয়নের বিকল্প ধারা গ্রহণ করতে হলে প্রচলিত ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন নীতি-দর্শন গ্রহণ করতে হবে। ঘুষ-দুর্নীতির ভয়াবহতার অবসানের জন্য সেই ব্যবস্থার আমূল উচ্ছেদ একান্ত অপরিহার্য। এ জন্য উপযুক্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আরও কঠোরভাবে ঘুষ-দুর্নীতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন। এ লক্ষ্যে সব সরকারের আমলেই ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক হয়ে বসে থাকা ‘মাফিয়া সিন্ডিকেট’র বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রামের নবধারা বেগবান করতে হবে। সেই সুস্পষ্ট লক্ষ্যে গড়ে তুলতে হবে জাতীয় জাগরণ।
সম্পাদকীয়
ঘুষ-দুর্নীতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..