কাতালোনিয়ার ‘স্বাধীনতা গণভোটে’ আদালতের বাধা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : স্পেন থেকে স্বাধীনতার বিষয়ে আগামী মাসে কাতালোনিয়ায় যে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা তাতে বাধ সেধেছে দেশটির সাংবিধানিক আদালত। গণভোট আয়োজনে কাতালান পার্লামেন্ট যে আইন করেছে গত ৭ সেপ্টেম্বর সাংবিধানিক আদালত তা স্থগিত ঘোষণা করে বলে বিবিসি জানিয়েছে। আদালতের এই স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও ১ অক্টোবর যথাসময়ে গণভোট করার কথা বলেছেন কাতালান নেতারা। স্পেনিশ প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয় জানান, তার সরকার কাতালোনিয়ার গণভোট বাতিলে আদালতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল। গণভোট অনুষ্ঠানে কাতালান পার্লামেন্টের করা আইনকে ‘মেনে নেওয়া যায় না এমন অবাধ্য কাজ’ হিসেবেও অভিহিত করেন তিনি। সম্পদশালী কাতালোনিয়ার স্বায়ত্বশাসন আছে; যদিও এর সরকার বলছে, জনগণ স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা চায়। গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় এলে কোন আইনি প্রক্রিয়ায় সেটি বাস্তবায়ন করা যায় এ সংক্রান্ত একটি লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অনুমোদন করে কাতালান পার্লামেন্ট। সাংবিধানিক আদালত কাতালান পার্লামেন্টের গণভোট সংক্রান্ত আইনের কার্যকারিতা স্থগিত করার কয়েক ঘণ্টা পর এই ফ্রেমওয়ার্ক অনুমোদিত হয় বলে বিবিসি জানিয়েছে। টুগেদার ফর ইয়েস এবং বাম ঘরানার সিইউপি পার্টির সমর্থনে গত ৬ সেপ্টেম্বর কাতালোনিয়ার পার্লামেন্টে গণভোট সংক্রান্ত আইনটি পাস হয়। এর পরপরই স্পেনের প্রধানমন্ত্রী রাজয় কাতালোনিয়ার সব স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে গণভোট আয়োজনে সহায়তার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করেন। ‘যা বৈধ নয়, তা গণতান্ত্রিকও নয়’, বলেন তিনি। চিফ প্রসিকিউটর হোসে ম্যানুয়েল মাজা সাংবাদিকদের বলেন, গণভোট ঠেকাতে রুখতে নিরাপত্তা বাহিনীকে কী ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে তা জানাতে বলা হয়েছে। কাতালান পার্লামেন্টে যারা স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি। উল্লেখ্য, স্পেনের অন্যতম অঙ্গরাজ্য ক্যাতালানিয়া। যার আদিবাসীরা নিজেদের স্প্যানিশ নয় বরং কাতালান হিসেবেই পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। স্পেনের অন্যতম বাণিজ্যিক ও বিনোদন কেন্দ্র কাতালোনিয়ার শহর বার্সেলোনা। স্পেন থেকে বেরিয়ে যেতে চায় কাতালানিয়া। ১১৬৪ সাল পর্যন্ত খুবই শক্তিশালী একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল কাতালোনিয়া। তারপর এটি যুক্ত হয় অ্যারাগনের সঙ্গে। আর ১৪৬৯ সালে অ্যারাগনের রাজা ফার্দিনান্দ ও স্পেনের রানী ইসাবেলার বিবাহবন্ধনের মধ্য দিয়ে স্পেনের সঙ্গে মিলন ঘটে অ্যারাগন ও কাতালোনিয়ার। তখন থেকেই ধীরে ধীরে স্পেনের কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে থাকে কাতালানরা। ১৭১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয় কাতালান রাষ্ট্র। তারপর থেকেই নিজেদের স্বকীয় সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ভাষা চর্চার স্বাধীনতা হারাতে হয়েছে বলে অভিযোগ কাতালোনিয়ার মানুষদের। যে নিপীড়ণের চরম রূপ দেখা গিয়েছে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সামরিক শাসনের (১৯৩৯-১৯৭৫) সময়। ১৯৭০ এর দশকের শেষে স্পেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর কাতালোনিয়াকে দেওয়া হয় স্পেনের ১৭টি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা। তবে ভেতরে ভেতরে স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনাটাও সবসময় লালন করে গেছে কাতালানরা। সেই দাবি আরও জোরালো হয়েছে ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক ধ্বসের পর। নানাবিধ কৃচ্ছ্রতানীতি যারপরনাই অসন্তোষ তৈরি করেছে কাতালোনিয়ায়। ২০১৪ সালের নভেম্বরে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল এক অনানুষ্ঠানিক গণভোটের। স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার অনেক চেষ্টা করেছিল সেটা রুখে দিতে। কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা সফল হয়নি। ২.২ মিলিয়ন ভোটারের ভোটে বিপুলভাবে জয়ী হয়েছিল স্বাধীনতার দাবি। ৮০ দশমিক ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে। ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কাতালোনিয়ার জাতীয় দিবসে বার্সেলোনার রাজপথ আবার মুখরিত হয়েছিল স্বাধীনতার দাবিতে। প্রায় ১.৪ মিলিয়ন মানুষ কাতালোনিয়ার পতাকা নিয়ে বর্ণিল র্যা লি করেছিলেন বার্সেলোনার রাজপথে। তরুণ তরুণীরা নেচে গেয়ে উদযাপন করেছিলেন কাতালানদের স্বকীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। স্বাধীনতার দাবিতে গলা চড়িয়েছেন অনেক প্রবীণও। ফ্রাঙ্কোর একনায়ক শাসনামলে স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে দীর্ঘদিন জেল খাটতে হয়েছিল ৯১ বছর বয়সী জোয়াকিম ব্যাটলকে। তিনি হাঁটেন ক্রাচে ভর দিয়ে। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্রও কমেনি তাঁর স্বাধীনতার স্পৃহা। ব্যাটল বলেছেন, ‘আমি প্রবল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার দিকে। আমরা এ জন্য অনেক শতক ধরে অপেক্ষা করছি। আর আমার বিশ্বাস এখন সেই সময় চলে এসেছে।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..