গণহত্যার মুখে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ অভিমুখে ঢল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সেনাবাহিনীর হামলা-নির্যাতন-ধর্ষণ সর্বোপরি গণহত্যার মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল নেমেছে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে। গত ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। যদিও স্থানীয় মানুষের ধারণা, এ সংখ্যা আরো বেশি। জাতিসংঘ ধারণা করছে, এবার তিন লাখ শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এসব ‘দেশহীন’ জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য উখিয়া উপকূলের জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। এসব মানুষ বিপদসঙ্কুল পাহাড়-জঙ্গল-নদী-সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্তের পথে অগ্রসর হচ্ছে। সবচেয়ে অমানবিক বিষয় হচ্ছে, বাড়িঘর ছেড়ে আসা এসব রোহিঙ্গা যাতে আর স্বদেশে ফিরতে না পারে সেজন্য তাদের চলাচলের পথে স্থলমাইন পুঁতে রাখা হচ্ছে। বন্দুকের গুলির মুখ থেকে বেঁচে অনেকেই এসে পা রাখছেন সেনাবাহিনীর পুঁতে রাখা মাইনে। অর্থাৎ মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের হত্যার জন্য সব ধরনের পন্থাই কাজে লাগাচ্ছে। তার মধ্যেও মানুষ বাঁচার আশায় বাংলাদেশে আসছেন। অনেকেই আগে থেকে থাকা শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। তাঁরা সেখানে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। ক্ষুধা-দারিদ্র্য-রোগ-সংক্রামক ব্যাধি তাদের নিত্যসঙ্গী। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের দুর্দশা কোনো ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। মিয়ানমারের এ ধরনের বর্বরোচিত হামলার নিন্দায় মুখর হয়েছে বিশ্ববাসী। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে গত কয়েক দশকে মিয়ানমার থেকে আগেই প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের অনেকেই নিবন্ধিত বা অনিবন্ধিত অবস্থায় শরণার্থী ক্যাম্প, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। গত বছরের অক্টোবরে রাখাইন রাজ্যে আবার সহিংসতা দেখা দিলে তখন প্রায় আরো এক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এবার যদি আরো প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা আসে, তাহলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা কত হবে বাংলাদেশের মতো একটি ছোট্ট জনবহুল দেশের পক্ষে এই বিশাল শরণার্থীর চাপ সামলানো খুবই কঠিন। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে সে কথা। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য অবশ্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। কূটনীতিক তৎপরতা চালিয়ে মিয়ানমারের উপর চাপ তৈরি করতে হবে যেন, তারা এই ধরনের গণহত্যা বন্ধ করে এবং শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়। এর কোনো বিকল্প নেই। রাখাইন রাজ্য থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলা-নির্যাতনের মুখে জীবন নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে গত সপ্তাহে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন রোহিঙ্গা মুসলিম নারী হামিদা বেগম। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞে’র শিকার হওয়া হাজার হাজার নর-নারীর মধ্যে হামিদাও একটি মুখ। সহায়-সম্বলহীন এই নারী আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের একটি কক্ষে। এখানে তিনি অনিবন্ধিত, শরণার্থীর মর্যাদাও নেই তার। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে হামিদা বলেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের পেটাচ্ছে, গুলি করছে এবং গলা কেটে হত্যা করছে। সেনা সদস্যরা অনেক রোহিঙ্গা নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। আমরা এখন অসহায়। হামিদা বেগম আরো বলেন, ‘আমাদেরকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসতে হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আমাদেরকে স্বাধীনভাবে চলতে দেয় না। আমরা সেখানে সবকিছু থেকে বঞ্চিত। সামরিক বাহিনী আমাদের লোকজনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে এবং মুক্তিপণ দাবি করছে। না দিতে পারলে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে তাদেরকে। হামিদার প্রতিবেশী রাবেয়া। তারা একদিনে বাড়ি ছেড়েছিলেন। কিন্তু পরে পথে হামিদা রাবেয়াকে হারিয়ে ফেলেন। রাবেয়া আট দিন পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি বলছিলেন, আমাদেরকে দীর্ঘ পথ হেঁটে আসতে হয়েছে। পাহাড়, জলাভূমি, ধানক্ষেত পার হয়ে আমরা বাংলাদেশে এসেছি। আমি আটদিন আগে বাড়ি ছেড়েছি। আজ ক্যাম্পে এসে পৌঁছেছি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..