বিপদ মোকাবিলায় সাধারণেই আস্থা

মীর মোশাররফ হোসেন :

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
গত কয়েকবছরের মধ্যে এবারের বন্যার ছোবল মানুষের অনেকদিন মনে থাকার কথা, যদি না আগামী বছর এর চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির দেখা মেলে। দেড় মাসের বন্যায় এবার অন্তত ১৬টি জেলা পানিতে ডুবে ছিল, সরকারি হিসেবেই দুর্গত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ৩৪ লাখ মানুষ। উত্তর আর মধ্যাঞ্চলে পানি হু হু করে ঢুকে ধ্বংস করে দিয়েছে কৃষকের ফসলি জমি, ঘর, স্বপ্ন। মাছ, গৃহপালিত প্রাণী, গাছ নষ্ট হয়েছে; ভেঙে গেছে অসংখ্য বাঁধ, বন্ধ হয়ে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের সঙ্গে অবকাঠামো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ছাপিয়ে যাবে কয়েকশ কোটি টাকা। এবারই কি এই পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটবে? বন্যার ঝুঁকি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বাংলাদেশ? মনে হয় না। প্রায় প্রতিবছরই বন্যা দেখতে হয় বাংলাদেশকে; কখনো কম, কখনো বেশি। বন্যা মোকাবেলায় আমাদের সরকারগুলোর পরিকল্পনা যে কতটা অপরিপক্ক তখন তার প্রমাণ মেলে। নদীপথের গতিবিধি, পানির হিসাব নিকাশ আর বন্যা ঠেকাতে কোথায়, কী কী সুরক্ষা নেওয়া প্রয়োজন সেদিকে নজর নেই ক্ষমতাসীনদের। বরং বন্যা হলে যেন পোয়াবারো। আবার ১০ কোটি টাকার বাঁধের টেন্ডার নিয়ে এক কোটি টাকায় কোনোমতে ঢাকনা দিয়ে ৯০ শতাংশ পেটে পোরার এই সুযোগ বন্যা ছাড়া মিলবে কোথায়। নতুন করে ভেঙে যাওয়া সড়ক নির্মাণ হবে, হবে আশ্রয়কেন্দ্র, মিলবে কিয়দংশ যে ত্রাণ সরকারপ্রধানদের ছবি তুলতে দিতেই হয় তা লুটপাটের সুযোগ। চিত্রের এই অবস্থা বদলায়নি এত এত বছরেও। এখনো যে পরিমাণ দরকার তার ধারেকাছেও ত্রাণ পৌঁছায় না। দুর্গম এলাকায় পড়ে না ত্রাণদাতাদের পদচিহ্ন। কোনোমতে দায়সারা একবেলা খাবার, কয়েক বান্ডিল টিন আর শাড়িতেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে দাবি করেন বন্যা মোকাবেলার সফলতা। সেই সফলতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় তো আজকের নয়; অনেকদিনের। এইসব ‘সফলতা’র কারণেই বছর না ঘুরতেই শহরগুলো ভরে ওঠে নিরন্ন, ভুখা ও সবহারা মানুষের হাহাকারে। বন্যার সময়ে কেবল তাৎক্ষণিক ত্রাণ নয়, ক্ষতিগ্রস্তদের কী করে পুনর্বাসিত করতে হবে তার কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না সরকারগুলোকে; থাকে না বন্যা পরবর্তী স্বাস্থ্য ও খাদ্য সংকট মোকাবেলার কোনো উদ্যোগ। সরকারি এই অবহেলা ঢেকে দেয় সাধারণ মানুষ। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যারাই ত্রাণ তুলতে হাত পেতেছে তাদেরই চাদর ভরে গেছে মানুষের ভালোবাসায়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতাকর্মীরা সারাদেশ থেকে ত্রাণ তুলে পৌঁছে দিয়েছে বন্যার্তদের হাতে। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে সবহারার দুঃখ ঘোচাতে পাশে দাঁড়িয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন। গান গেয়ে সাহায্য তুলেছে উদীচী। গণমানুষের সংগঠনগুলো বসে ছিল না, ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে নানা ধরনের সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। সাধারণ মানুষ আর গণসংগঠনগুলোর কারণেই প্রতি দুর্যোগেই মহাসংকটের হাত থেকে রক্ষা পায় অসহায়রা। বন্যা কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টিতে মানুষের দায়ের কথা ভুললেও চলবে না। কেবল বাংলাদেশেই নয় প্রায় একইসময়ে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে ভারতে, পশ্চিমবঙ্গেই ছয়শ’র উপর লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। বন্যা হয়েছে পাকিস্তানে; হয়েছে থাইল্যান্ডসহ মধ্যএশিয়ার অনেক দেশেও। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে নদীগুলোর উপচে পড়া পানি সরিয়ে নিতে ভারত বাঁধ খুলে দেয়ায় আমরা যেমন বিপদে পড়েছি, তেমন সমস্যায় পড়েছে জাপানও। গত অর্ধশতকের মধ্যে এইবছরই দেশটিতে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নদীর পানি বেড়ে গিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে দেশটির অনেক নিম্নভূমি, হয়েছে বড় ধরণের ভূমিধ্বস। আমাদের এখানে বন্যা যখন খানিকটা থিতিয়ে এসেছে তখন চার মাত্রার শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হার্ভির কারণে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার ফাঁদে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস। এত বাতাস আর টানা বৃষ্টি শেষ কবে হয়েছিল তা স্মরণ করতে পারছেন না সেখানকার ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরাও। হিউস্টনে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাসায়নিক প্ল্যান্ট, ঝামেলায় পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও। বন্যার পানি আর ঝড়ের কারণে টেক্সাসের সঙ্গে সঙ্গে লুইজিয়ানা, মন্টানা, নর্থ ও সাউথ ক্যারোলাইনার অনেক শহরে জারি করতে হয়েছে জরুরি অবস্থা। টেক্সাসের গভর্নর জানিয়েছেন, হার্ভি ও তারপর সৃষ্ট বন্যার কারণে কেবল তার অঙ্গরাজ্যেই ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে দেড়শ কোটি ডলার। হার্ভির ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এসে পড়েছে ইরমা। আটলান্টিক মহাসাগরে এক শতাব্দীর মধ্যে সৃষ্ট সবচেয়ে শক্তিশালী এই ঝড়ে লণ্ডভ- হয়ে গেছে পুরো ক্যারিবীয় অঞ্চল। একের পর এক দ্বীপকে ধ্বংস্তুপে পরিণত করেছে পাঁচ মাত্রার এই ঝড়; বিদ্যুৎ, পানি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেছে। এই ঝড়ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপদ হয়ে আসছে বলে ধারণা করছেন আবহাওয়াবিদরা। এখানেই শেষ নয়। ইরমার তা-বের মধ্যেই খবর এসেছে আটলান্টিক মহাসাগর আর মেক্সিকো উপকূলে সৃষ্টি হচ্ছে আরও দুটি ঝড়। কেন একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কেন প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ? বিশ্বজুড়ে বদলে যাওয়া এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী যে জলবায়ু পরিবর্তন, তাতে কি মানুষেরও দায় অনেকখানি নয়? গাছ কেটে, বনজঙ্গল উজাড় করে, জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে, একের পর এক যুদ্ধবিগ্রহে পরিবেশের তেরটা বাজিয়ে, বাস্তুসংস্থান নষ্ট করে উষ্ণায়ন বৃদ্ধি ও পরিবেশের শৃঙ্খলা ধ্বংসে মানুষের দায়টাই সবচেয়ে বেশি। আরও স্পষ্ট করে পরিবেশ হন্তারক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোকে। তাদের লোভের সুদূরপ্রসারী ক্ষতিতে ভোগান্তি বেড়েছে সমগ্র পৃথিবীর। বাড়ছে বন্যা, খরা, ঝড় জলোচ্ছ্বাস। বাড়ছে পরিবেশ অভিবাসীর সংখ্যা, যেই চাপে একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে বিশ্বের মানচিত্রও। অথচ এই দায় তারা নিতে চায় না। চলতি বছরের জুলাই মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন প্যারিস অ্যাকর্ড থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়, যাতে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রির নিচে রাখার প্রতিশ্রুতি ছিল। সেখান থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের সদম্ভ চিৎকার- মানুষ নয় পুঁজির প্রসার আর অর্থনৈতিক লাভই তাদের ধ্যানজ্ঞান, একমাত্র চিন্তা। কী দেশীয় প্রেক্ষাপট কী আন্তর্জাতিক, লুটপাটের লোভের আকরে এভাবেই বন্দি হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা। সবখানেই অল্প কিছু মানুষ তার লাভ বাড়ানোর ধান্ধায় পরিবেশের উপর ভয়াবহ নির্যাতন করে চলছে। আমাদের এখানেও নদীদখল করে, নির্বিচারে গাছ কেটে পকেট ভরেই যাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। বন ধ্বংস করার চিন্তায় তো খোদ সরকারই বিভোর। অথচ সিডর আর আইলার ভয়াবহ বিপদ থেকে সুন্দরবনই আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল। পরিবেশ বিপর্যয় এখন বিশ্ব বাস্তবতা। মনোযোগ এবং দ্রুত ও টেকসই ব্যবস্থা না নিলে এই বিপর্যয় ধারণার চেয়েও দ্রুতগতিতে মহামারি হয়ে আবির্ভূত হবে। লুটপাটের অংশীদার সরকারগুলো ভয়াবহ এই সংকট মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা নেবে সেই আশা বাতুলতা, তারা ব্যস্ত থাকবে কিভাবে এটাকে ‘ক্যাশ’ করা যায় সেই ক্রিয়াতে। দায় কাঁধে তুলে নিতে হবে তাই সাধারণ মানুষকেই। দুর্যোগ মোকাবেলায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তার সপক্ষে প্রমাণও দিয়েছে। ধাবমান মহাবিপর্যয় রুখতে ক্ষমতাকাঠামোর বদলে কীভাবে তারা অংশ নেবে তাই এখন দেখার অপেক্ষা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..