সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং বামপন্থার লড়াই

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

অনিন্দ্য আরিফ : সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ এক বিপজ্জনক মোড়ের দিকে হাঁটছে। জামায়াতে ইসলামীর বিকল্প হিসেবে আরেক ধরনের ধর্মান্ধ মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির আস্ফালন পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামে এই শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করছে বর্তমান সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগকে অনেকেই ধর্মনিরেপক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা যে কত ভুল তা সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে। প্রথমে ‘হেফাজতে’র দাবির মুখে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বিতর্কিত সংশোধন করা শুরু হয়। পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক এবং যুক্তিবাদী রচনার স্থলে সাম্প্রদায়িক কুপমণ্ডুক রচনা প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্য অপসারণের জন্য হেফাজতের কর্মসূচি ঘোষণা, বাংলা নববর্ষ পয়েলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি, চট্টগ্রামে দেয়ালের আলপনা পোড়া মবিল দিয়ে ঢেকে দেওয়া এবং হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে শর্তহীনভাবে কওমি মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি দেওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অশনিসংকেত সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির দলগুলো বরাবরই ধর্মীয় রাজনীতিকে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। কখনো কখনো তাদের কেউ কেউ এমন পদক্ষেপ নিয়েছে যা কেবলমাত্র মৌলবাদী শক্তিগুলোর পক্ষেই সম্ভব। এদের শ্রেণিচরিত্রের কারণেই এটা হয়েছে। তাই দেখা যায় স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় যারাই আসীন হয়েছে, তারাই সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে আপস করেছে। কেউ কেউ আবার এই অপশক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, লালন পালন করেছে। ১৯৮০ এর দশক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে নব্য উদারতাবাদ জাকিয়ে বসে। শাসক শ্রেণির দলগুলো এই সুযোগে সীমাহীন লুণ্ঠনে জড়িয়ে পড়ে। নব্য উদারতারতাবাদের অন্যতম ভয়ঙ্কর প্রবণতা দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে। এসব ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি আর জামায়েতে ইসলামীর মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। উভয়েই শ্রেণিগত অবস্থানে লুটেরা বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি। যেহেতু বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির দল তাই ঐতিহাসিকভাবেই তার পক্ষে কোনভাবেই ধর্মনিরেপক্ষ শক্তি হওয়া সম্ভব নয়। একথা বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টিসহ শাসকশ্রেণির সবগুলো দলের জন্যই প্রযোজ্য। একসময় ইউরোপীয় রেনেসাঁসের সময় পুঁজিবাদ সামন্ততান্ত্রিক ধর্মীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তারা বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের সপক্ষে দাঁড়িয়ে চার্চের বিরুদ্ধে লড়াই করে ধর্মনিরেপক্ষ বুর্জোয়া রাষ্ট্র কায়েম করেছিল। ফরাসী বিপ্লব, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ, ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব সবটারই মূল নির্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ধর্মনিরেপক্ষতা। কিন্তু যখন পুঁজিবাদের নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণি লড়াই শুরু করল, ইংল্যান্ডের চার্টিস্ট আন্দোলনের মত শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম দানা বেঁধে উঠতে লাগল তখন পুঁজিবাদী শক্তি আতঙ্কিত হয়ে ধর্মাশ্রয়ীদের সঙ্গে আপস করল। একে কমরেড লেনিন আখ্যা দিয়েছেন বুর্জোদের অসমাপ্ত কাজ। আর তিনি এও বলেছেন এই অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব আজকের যুগে এসে বর্তেছে শ্রমিকশ্রেণির ওপর। আজ পুঁজিবাদ একচেটিয়া হয়ে সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে ফিনান্স পুঁজির দৌরাত্ম্য। সাম্রাজ্যবাদ আজ টিকে থাকার জন্য নিয়েছে নানা গতিমুখ। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন, নব্য উদারতাবাদ নানা ধরনের গতিমুখে সে চলছে। আর এর অনিবার্য ফল হিসেবে জাতিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। আমরা দেখি কিভাবে সাম্রাজ্যবাদ ধর্মনিরেপক্ষ আরব জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করেছিল। এর পিছনে ছিল সেখানকার তেলের উপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের অভিলিপ্সা। ইরানে ১৯৫১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন মহম্মদ মোসাদেক। তাঁর তৈলখনি জাতীয়করণের নীতিতে ক্ষুব্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে অপসারণ করে। ঠান্ডাযুদ্ধের সময এই প্রথম দেশের বাইরে কোনো সরকারের পতনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করল। এরপর সেখানে রেজা শাহকে সরিয়ে খোমেনীর ’৭৮ এর ইসলামী বিপ্লবেও সহায়তা করেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। মিসরের নাসের কমিউনিস্ট নিধনযজ্ঞে নেতৃত্ব দিলেও তার ধর্মনিরেপক্ষ চরিত্র ছিল। তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসে মার্কিন আজ্ঞাবাহী আনোয়ার সাদাত। ধীরে ধীরে কবর রচিত হতে থাকে ধর্মনিরেপক্ষতার। আফগানিস্তানে সেকুলার সোভিয়েতপন্থি সরকারকে হটিয়ে তালিবানকে প্রতিষ্ঠা করে মার্কিনীরা। তারা শুধু সেকুলারইজম প্রতিষ্ঠা নয়, ভূমিসংস্কার, নারী অধিকার, শিক্ষা ও চিকিৎসা সংস্কারে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছিল। ইরাক ও লিবিয়াতেও ধর্মনিরেপক্ষ সরকার ছিল। ইরাকের সাদ্দাম কিংবা লিবিয়ার গাদ্দাফী শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানিসহ জনঅধিকারের ক্ষেত্রেও অনেক সাফল্য অর্জন করেছিল। কিন্তু সেগুলো এখন তছনছ হয়ে গেছে। আমরা জানি কিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আল কায়েদাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, বর্তমানের আইসিস সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে তা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আর এর জমিন আরো পাকাপোক্ত করেছে হান্টিংটনের ‘ক্লাশ অফ সিভিলাইজেশনে’র মত সাম্রাজ্যবাদী হাতুড়ে তত্ত্ব। সারা বিশ্বে আজ উগ্র দক্ষিণপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ফ্যাসিবাদের জমিন তৈরী হচ্ছে। এর দু’টি কারণ রয়েছে। এক. নব্য উদারতাবাদে ফ্যাসিবাদের ভিত্তি তৈরী হয়। দুই. বিশ্বে চলছে অর্থনৈতিক মন্দা। এক জার্মানী ছাড়া কারো অর্থনীতি ভালো নয়। এরকম মন্দা দেখা দিয়েছিল ১৯২৯-৩০ এ। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাকার্থিজম এসেছিল। যার প্রতিবাদ পরিস্ফূটিত হয়েছিল চার্লি চ্যাপলিনের ‘দি কিডস’ , ‘মসিয়ে ভের্দু’র মতো চলচ্চিত্রগুলোতে। ইতালি, জার্মানী এবং স্পেনে মুসোলিনী, হিটলার এবং ফ্রাঙ্কোর মত ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসকদের উত্থান ঘটেছিল। আজকের বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প, ফ্রান্সের লা পেন, ব্রাজিলের তেমের. ভারতের মোদী সেই সময়কেই ফিরিয়ে আনছে কিনা তা ভেবে দেখবার বিষয়। বর্তমানে যে ইসলামী মৌলবাদের উত্থান ঘটছে তাকে অনেক বামপন্থিই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হিসেবে ভেবে থাকেন। তারা মারাত্মক ভুল করছেন। কেননা এটা শুধু সাম্রাজ্যবাদকে কবরে পাঠাতে চায় না, সঙ্গে কবরে পাঠাতে চায় ইউরোপীয় আধুনিকতাকেও। আর এই আধুনিকতার শ্রেষ্ঠতম অবদান মার্কসবাদ। আজকের দুনিয়াতে প্রকৃত ধর্মনিরেপক্ষ রাষ্ট্রের অভ্যূদয় ঘটাতে পারে বামপন্থিরা। তবে মার্কসবাদীরা ধর্মবিদ্বেষী নয়। তারা শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে ধর্মকে পৃথক করতে চায়। নিজের পছন্দমতো বিশ্বাস পালনের অধিকার রাখতে চায়। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সহাবস্থান নিশ্চিত ছিল এবং আছে। আর লাতিন আমেরিকায় বামপন্থিরা মুক্তিকামী ধর্মতাত্ত্বিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। এল সালভাদর, নিকারাগুয়ায় এই ঘরানার ধর্মতাত্ত্বিকরা সাম্রাজ্যবাদের হাতে শহিদী আত্মদান বরণ করেছেন। এদের মতে, ইশ্বর হচ্ছেন জনগণের প্রভু, তাই তিনি শোষণ, বৈষম্য এবং নিপীড়নের শত্রু। সেকারণে তিনি পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের শত্রু। কেউ যদি ইশ্বরকে পেতে চান তাহলে তাকে সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। আমাদের দেশেও মাওলানা ভাসানী ইসলামের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। সে ব্যাখ্যা ছিল শোষণের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু সে ধারা বেশী দুর যেতে পারেনি। এর পেছনে বামপন্থি শক্তির দুর্বলতা এবং দৈন্যদশাও দায়ী। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি তা খুবই আশঙ্কাজনক। এ থেকে পরিত্রান ঘটাতে পারে একমাত্র বামপন্থি, কমিউনিস্টরাই। যেসব লেজুড় বামপন্থিরা ক্ষমতার অংশীদার রয়েছে তাদের বাদ দিয়ে যেসব বামপন্থিরা রয়েছে তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে তাদেরকেও আরো শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। কর্মসূচিকে সময়পোযোগী করে জনগণের মধ্যে বিস্তৃত সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এই শক্তিকে মোকাবিলা করা সম্ভব। এই আপসকে বানচাল করা সম্ভব। না হলে এই আপস বাংলাদেশকে ভয়ঙ্কর পথে নিয়ে যেতে পারে। লেখক : রাজনৈতিক কর্মী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..