‘স্ফুলিঙ্গ থেকেই আগুন জ্বলবে’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

অভিনু কিবরিয়া ইসলাম : উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ। রাশিয়ায় তখনো চলছে জারের শাসন। শিল্প শ্রমিক বাড়ছে সেখানে। শ্রমিকদের লড়াই সংগ্রাম ও ধর্মঘটও বাড়ছে। মার্কসবাদের সাথে রাশিয়ার কতক মানুষের পরিচয় হয়েছে। মার্কসিস্ট পাঠচক্র, ছোট ছোট সার্কেল তৈরি হয়েছে। নারদনিকদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের বিপরীতে লেখনী ধরেছেন প্লেখানভ। তার নেতৃত্বে ‘শ্রমিক মুক্তি সংঘ’ তৈরি হয়েছে। সেই সাথে গোটা রুশ দেশে একটা ঐক্যবদ্ধ মার্কসবাদী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল গড়ে তোলার ঐতিহাসিক প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। লেনিন সেন্টপিটার্সবুর্গের মার্কসবাদী সার্কেলগুলোকে একত্রিত করে গড়ে তুললেন ‘শ্রমিকশ্রেণির মুক্তি সংগ্রাম সংঘ’। একপর্যায়ে গ্রেপ্তার হলেন লেনিন। সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হলো তাকে। নির্বাসিত অবস্থাতেই লেনিন চিন্তা করছেন কীভাবে গোটা রাশিয়ায় একটা ঐক্যবদ্ধ পার্টি গড়ে তোলা যায়। এইসময় লেনিনের অনুপস্থিতিতে তার দলে ‘অর্থনীতিবাদী’ মতবাদ চাঙা হয়ে উঠলো। ‘অর্থনীতিবাদী’রা বলতো, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মাধ্যমে মজুরি বাড়ানোর দাবি দাওয়া আদায়ের বাইরে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজন নাই। লেনিন একদিকে ভাবছেন কীভাবে এই অর্থনীতিবাদীদের ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়, আবার ভাবছেন কীভাবে একটা শক্তিশালী মার্কসবাদী পার্টি গঠন করা যায়। একটা পত্রিকা বের করা ছাড়া রুশ দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মার্কসবাদী সংঘ ও সার্কেলগুলোকে এক করা সম্ভব নয়, লেনিন বুঝতে পারলেন। এই ধরনের পত্রিকা আইনসংগতভাবে ছাপানো সম্ভব নয়, সুতরাং প্রকাশ করতে হবে গোপনে। লেনিন আলাপ করলেন প্লেখানভ, আক্সেলরভ ও ডি জাসুলিচের সঙ্গে। সিদ্ধান্ত হলো প্রকাশ হবে ‘ইস্ক্রা’, যার অর্থ স্ফুলিঙ্গ। নির্বাসন থেকে ফিরে লেনিন এই পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তুতি নিতে চলে গেলেন জার্মানির মিউনিখে। পত্রিকা বের করার সমস্ত আয়োজন চলতে থাকলো। লেনিন লিখলেন, ‘কোথা থেকে শুরু করতে হবে’ শীর্ষক প্রবন্ধ। (পরে যা ‘কী করিতে হইবে’ বইয়ে স্থান পায়)। সে প্রবন্ধে পার্টি গড়ে তোলার জন্য লেনিন যে সংবাদপত্রকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা বোঝা যায়, ‘আমাদের মতে গোটা রুশ দেশের উপযোগী রাজনৈতিক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করাই হবে আমাদের কাজের আরম্ভ; আমাদের আকাঙ্ক্ষিত সংগঠন সৃষ্টির প্রথম ধাপ; সর্বোপরি এই সংবাদপত্রই হইবে প্রধান সূত্র যাহা অবলম্বন করিয়া আমরা আমাদের সংগঠনকে বাড়াইতে পারিব, গভীরতর করিতে পারিব এবং অবিচলিতভাবে বিস্তৃত করিতে পারিব...। নীতির দিক হইতে সুসঙ্গত সর্বব্যাপক প্রচার ও আন্দোলন চালাইয়া যাওয়া সাধারণভাবে সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য; জনসংখ্যার ব্যাপকতম অংশের মধ্যে রাজনীতি ও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ঔৎসুক্য জাগিবার ফলে আজ তাহা হইতেছে বিশেষভাবে জরুরি অথচ এই প্রচার ও আন্দোলন পরিচালনাও সম্ভব নয় যদি একখানি সংবাদপত্র না থাকে।’ লেনিন ‘ইস্ক্রা’কে নিছক সংবাদপত্র নয়, একটি সংগঠনে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘সংবাদপত্র কেবল যৌথ প্রচারক ও আন্দোলনকারীই নয়, সংবাদপত্র যৌথ সংগঠকও বটে।’ লেনিন চেয়েছিলেন ইস্ক্রা শুধু পার্টির মতাদর্শগত ভিতকেই সংহত করবে না, বরং ইস্ক্রা পার্টিও সাংগঠনিক ভিতকেও মজবুত করবে। ইস্ক্রার সংবাদদাতা ও এজেন্ট মিলে যে সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড়াবে, তার আশেপাশেই গড়ে উঠবে পার্টি। লেনিন লেখেন, ‘জালবুনানির মতো এই এজেন্টদের দল এমনই একটা সংগঠনের কাঠামো তৈয়ার করবে যা আমরা চাই। সে-সংগঠন হইবে গোটা দেশব্যাপী বিরাট সংগঠন- কড়াকড়িভাবে ও পুঙ্খানুপুঙ্খ কর্মবিভাগের উপযোগী যথেষ্ট ব্যাপক ও বহুমুখি...’ ইস্ক্রা প্রকাশের জন্য লেনিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলেন। প্রথম সংখ্যা প্রকাশের মাস তিনেক আগে তিনি ন্যুরেমবার্গে এক সহযোদ্ধাকে চিঠিতে ইস্ক্রা সম্পর্কে লেখেন, ‘আমাদের সমস্ত জীবন রস ঢালা চাই আসন্ন প্রসব বাচ্চাটির পুষ্টির জন্য।’ অবশেষে ১৯০০ সালের ডিসেম্বরে জার্মানি থেকে প্রকাশিত হয় ইস্ক্রা। ইস্ক্রার প্রথম পাতায় লেখা হয়, ‘স্ফুলিঙ্গ থেকেই আগুন জ্বলবে।’ রাশিয়ার বাইরে থেকে গোপনে সীমান্ত পার হয়ে আসতো ইস্ক্রা। কোটের হাতায় সেলাই করে, কিংবা সুটকেসে গোপন প্রকোষ্ঠ তৈরি করে ইস্ক্রা বহন করতো ইস্ক্রার এজেন্টরা। ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিক মেহনতি মানুষ ও মার্কসিস্ট বিভিন্ন সার্কেলে পৌঁছে দেওয়া হতো ইস্ক্রাকে। লেনিন যেভাবে ভেবেছিলেন, ঠিক সেভাবেই রাশিয়ায় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভিত তৈরি করে দিলো ইস্ক্রা। লেনিন ইস্ক্রাকে পরিণত করলেন পার্টির ভেতরে সুবিধাবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের অস্ত্রে। অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে ইস্ক্রার সক্রিয় অবস্থান তো ছিলোই, তার পাশাপাশি এর মাধ্যমে পার্টির ভেতরে মেনশেভিকদের সুবিধাবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানোর চেষ্টা করেন লেনিন। এর ফলাফল দেখা যায় রুশ সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে। বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মতাদর্শিক পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়। লেনিনের পার্টি সদস্য হওয়ার বিধিমালা সংক্রান্ত প্রস্তাবটি কংগ্রেসে পাশ না হলেও ইস্ক্রার সম্পাদকমণ্ডলী নির্বাচনে লেনিনের প্রস্তাবই গৃহীত হয়। সম্পাদকমণ্ডলীতে ঠাঁই পান প্লেখানভ, লেনিন ও মেনশেভিক মারটভ। মারটভ সিদ্ধান্ত না মেনে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে পার্টিতে প্লেখানভ বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মধ্যে আপোসের প্রস্তাব আনেন। ইস্ক্রার পুরাতন সম্পাদকমণ্ডলী, যাতে ছিলো মেনশেভিকদের সংখ্যাধিক্য, সেটা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়। লেনিন কংগ্রেসের নির্বাচিত সম্পাদকমণ্ডলীর বাইরে অন্য কাউকে নিতে রাজি হলেন না। ফলশ্রুতিতে, আপসহীন লেনিনকেই পদত্যাগ করতে হলো ইস্ক্রার সম্পাদকমণ্ডলী থেকে। ৫২তম সংখ্যার পর ইস্ক্রা চলে গেলো মেনশেভিকদের দখলে। মেনশেভিকেরা ইস্ক্রাকে ব্যবহার করে লেনিনের পার্টি নীতির বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে থাকলো। বলশেভিক ও পার্টি সমর্থক সচেতন ও অগ্রসর অংশের কাছে মেনশেভিক ইস্ক্রার নাম হলো ‘নতুন ইস্ক্রা’, আর লেনিনের ইস্ক্রা পরিচিত হলো ‘পুরাতন ইস্ক্রা’ নামে। ইস্ক্রা হাতছাড়া হওয়ার পরও লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা বিভিন্ন ধরনের সংবাদপত্র বের করতো অনিয়মিত ভাবে। ১৯০৪-৫ সালে তারা বের করেছিলো ‘ভপারওদ’ (অগ্রগামী)। লেলিনের সম্পাদনায় ২১ আগস্ট (নতুন পঞ্জিকায় ৩ সেপ্টেম্বর), ১৯০৬ থেকে ১৯০৯ সালের ২৮ নভেম্বর (১১ ডিসেম্বর) পর্যন্ত ‘প্রলেতারি’ নামক পত্রিকার ৫০টি সংখ্যা বের হয়, যেখানে নামে বেনামে লেনিনের ১০০-এরও বেশি লেখা প্রকাশিত হয়। প্রাভদা প্রকাশের আগে অগ্রসর শ্রমিকদের জন্য ১৯১০ সাল থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত বের হয়েছিলো ‘জভেজদা’ (তারকা) নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। সে পত্রিকায় নিয়মিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখতেন লেনিন ও স্টালিন। শ্রমিকদের সংগঠিত করতে এবং শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে এই পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু শ্রমিকদের মধ্যে বিপ্লবী জোয়ার বাড়তে থাকার সাথে সাথে একটা দৈনিক রাজনৈতিক গণপত্রিকা প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলো। অবশেষে লেনিনের পরামর্শে স্টালিন, অলমিন্সকি ও পলেতাইভ প্রাভদা (সত্য) নামের দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। ১৯১২ সালের ২২ এপ্রিল (নতুন পঞ্জিকা অনুযায়ী ৫ মে) বের হলো প্রাভদার প্রথম সংখ্যা। শ্রমিকদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকলো এই পত্রিকা। অথচ, প্রকাশনার প্রথম বছরেই প্রাভদা ৪১ বার বাজেয়াপ্ত হয়েছে, এর সম্পাদকেরা ৩৬ বার সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে, এবং তাদের লেখার জন্য জেল জুলুমের শিকার হয়েছে। জার আমলে প্রাভদাকে কমপক্ষে ৮বার নাম পরিবর্তন করতে হয়েছে। রাবোচেয়ে প্রাভদা (শ্রমিকদের সত্য), সেভেরনায়া প্রাভদা (উত্তরের সত্য), প্রাভদা ত্রুদা (শ্রমের সত্য), জা প্রাভদু (সত্যের জন্য), প্রলেতারিস্কিয়া প্রাভদা (প্রলেতারিয়ান সত্য), পুৎ প্রাভদি (সত্যের পথ), রাবোচি (শ্রমিক), ত্রুদোভায়া প্রাভদা (শ্রম ও সত্য) নামে প্রাভদা প্রকাশিত হয়েছে ও পৌঁছেছে শ্রমিকদের কাছে। কী থাকতো প্রাভদাতে? বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিকেরা কোন দাবি দাওয়া নিয়ে লড়ছে, কোথায় কীভাবে লড়াই সংগ্রাম হচ্ছে, কোথায় ধর্মঘট হচ্ছে, প্রাভদা শুধু তাই প্রকাশ করতো না, ধর্মঘটী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য অর্থসংগ্রহের ব্যবস্থা করতো। প্রাভদা খোলাখুলিভাবে জারতন্ত্র উচ্ছেদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের রাজনীতি সচেতন করে তুলতো। কখন ধর্মঘট করতে হবে, কখন অর্থনৈতিক দাবি দাওয়ার চাইতে রাজনৈতিক সংগ্রামকে প্রাধান্য দিতে হবে, প্রাভদা সেই দিকনির্দেশনা দিতো। এখানেই লেনিন লেখেন, ‘শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের বিভিন্ন রূপ’ প্রসঙ্গে। শ্রমিকরাও প্রাভদাতে মনখুলে লিখতো তাদের কথা। প্রথম বছরেই প্রাভদায় প্রায় এগারো হাজার শ্রমিকের চিঠি ছাপা হয়। শ্রমিকেরা শুধু চিঠিই লিখতো না, চলে আসতো প্রাভদার কার্যালয়ে, তাদের কথা বলতে। এভাবেই শ্রমিকদের সাথে প্রাভদার এক জীবন্ত যোগাযোগ তৈরি হয়েছিলো। প্রাভদায় শুধুমাত্র যে শ্রমিকদের নিয়েই লেখা থাকতো তাই না, দরিদ্র কৃষকদের নিয়েও প্রাভদাতে লেখা ছাপা হতো। কীভাবে কুলাক অর্থাৎ ধনী কৃষকেরা গরিব কৃষকদের জমি কেড়ে নিতো, প্রাভদায় থাকতো সেই বর্ণনা। দরিদ্র কৃষকদের শ্রেণি সচেতন করে, শ্রমিক-কৃষকের ঐক্য কেন জরুরি, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক লেখা থাকতো প্রাভদাতে। ‘কৃষক জীবন’ নামে একটি কলাম থাকতো প্রাভদাতে, যেখানে প্রান্তিক চাষিরা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চিঠিতে জানাতো তাদের দুঃখ-দুর্দশা ও লড়াই সংগ্রামের কথা। প্রাভদা হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক-কৃষকের কাছে জনপ্রিয় পত্রিকায় পরিণত হয়েছিলো। কঠোর নজরদারির মধ্যেও এর সার্কুলেশন বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো ৬০ হাজারে। প্রাভদার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতো ৫৬০০টি শ্রমিক গ্রুপ। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলো প্রাভদা। পার্টির অভ্যন্তরে ‘বিলোপবাদী’ (লিকুইডেটর)দের বিরুদ্ধেও লাগাতার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলো প্রাভদা এবং যুক্তিনির্ভর লেখা প্রকাশের মাধ্যমে বিলোপবাদীদের ভিতকে নড়বড়ে করে দিয়েছিলো। পত্রিকাটি বিপ্লবী আন্দোলনে এমন গতিবেগ সৃষ্টি করেছিলো যে জার সরকার ১৯১৪ সালের ৮ (২১) জুলাই প্রাভদাকে জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয়। তবে এর মধ্যেই পত্রিকাটি বিপ্লবী পরিবর্তনের ভিত তৈরি করতে পেরেছিলো। প্রাভদার কারনেই জার সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সর্বশক্তি নিয়োগ করেও বলশেভিক পার্টির গণভিত্তিকে নষ্ট করতে পারেনি। স্টালিন যথার্থই বলেছিলেন, ‘১৯১২ সালের প্রাভদা হলো ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিজয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন।’ একথা সত্যি যে, ১৯১২-১৪ সময়পর্বে লেনিন দেশের বাইরে আত্মগোপনে থাকার কারনে প্রাভদার উপর তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিলো না, তবে নিয়মিত তিনি দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। মলোটভ, স্ট্যালিন সেসময় প্রাভদা বের করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এসময় প্রাভদার সম্পাদকদের মধ্যে মিরন চেরনোমানজোভ-ও ছিলেন, পরে জানা যায় সে ছিলো পুলিশের একজন এজেন্ট। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ৫ দিন পর থেকেই প্রাভদা আবার বের হতে থাকে। সেসময় মলোটভ ও আলেক্সান্ডার সিলাপনিকভ প্রাভদার দায়িত্বে ছিলেন, এবং সাময়িক সরকারের বিরুদ্ধে সেসময় অবস্থান নেয় প্রাভদা। মার্চের ৫ তারিখে প্রাভদা বলশেভিক পার্টির অফিসিয়াল মুখপত্রে পরিণত হয়। কিন্তু মার্চের ১২ তারিখে, সাইবেরিয়ার নির্বাসন থেকে ফেরার পর কামেনেভ, স্টালিন ও মুরানভ প্রাভদার সম্পাদনা পরিষদের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। প্রাভদা তখন সাময়িক সরকার এবং সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের পক্ষালম্বন করতে থাকে। মার্চের ১৪ তারিখে, কামেনেভ সম্পাদকীয়তে সাময়িক সরকারের পক্ষে লেখেন, ‘যখন সবকিছু দ্রুতগতিতেই এগুচ্ছে, তখন আরো দ্রুতগতিতে আগানো হলে তা কোন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে?’ মার্চের ১৫ তারিখে, কামেনেভ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে সমর্থন করে লেখেন, সৈন্যদের অস্ত্র সংবরণ করতে বলা হলে তা শান্তি নয়, দাসত্ব ডেকে আনবে। কিন্তু সব বদলে যায় এপ্রিলের তিন তারিখে লেনিনের রাশিয়ায় ফেরত আসার পর। লেনিন এসেই প্রাভদার দায়িত্ব নেন, হয়ে ওঠেন প্রাভদার প্রধান সম্পাদক। লেনিন তার বিখ্যাত এপ্রিল থিসিসে বুর্জোয়া সাময়িক সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন। সেই সাথে প্রাভদাও সঠিক লাইনে ফিরে আসে এবং সাময়িক সরকারকে প্রতিবিপ্লবী হিসেবে চিহ্নিত করে। আমরা জানি, অক্টোবর বিপ্লব সংগঠন ও বিপ্লব-পরবর্তী নির্দেশনা প্রচারের ক্ষেত্রেও প্রাভদা রাখে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা। বিপ্লবের পরপরই প্রাভদার প্রচারসংখ্যা ১ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়, জনগনের কাছে প্রাভদা নিয়ে যায় বিপ্লবের বার্তা। বিপ্লবপূর্ব রাশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখি, সংবাদপত্র কীভাবে একটি পার্টি গঠন থেকে শুরু করে, পার্টির ভেতরকার বিপ্লবী অন্তঃসংগ্রামকে বিকশিত করতে, সুবিধাবাদকে পরাস্ত করতে এবং সর্বোপরি জনগণের আশা-আকাঙক্ষাকে ধারণ করে বিপ্লবের পক্ষে জনভিত্তি তৈরি করতে পারে। আবার এটাও দেখি, জনগণের প্রতি বিশ্বস্ত ও বিপ্লবী সংগ্রামে পরীক্ষিতদের হাতে পত্রিকা পরিচালিত না হলে, তা কীভাবে গোটা পার্টির ভেতরে সুবিধাবাদের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়। পার্টির পত্রিকার দিকে তাই সবসময় চোখ রাখতে হয়, পার্টি মুখপত্রকে পরিণত করতে হয় এক বিপ্লবী সংগঠনে। পার্টি পত্রিকাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নিপীড়িত শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনতার সাথে এক নিবিড় আন্তঃযোগাযোগ তৈরি করতে হয়। পার্টির বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ ও সদস্যদের সর্বক্ষণ খেয়াল রাখতে হয় পত্রিকায় কী প্রচার হচ্ছে; বিলোপবাদ, সুবিধাবাদ, ডান-বাম বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তা যথেষ্ট সংগ্রাম করছে কীনা। সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী সংগ্রামে সংগঠিত পার্টি পত্রিকার কোনো বিকল্প নেই। তথ্যসূত্র- ১। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট (বলশেভিক) পার্টির ইতিহাস- ন্যাশনাল বুক এজেন্সি ২। লেনিন, সংক্ষিপ্ত জীবনী, প্রগতি প্রকাশনী ৩। www.nwweorldencyclopedia.org/ entry/Pravda#cite_note-3 ৪। www.prismm.net/2017/02/23/ on-pravda ৫। www.leftvoice.org/Lenin-and-the-newspaper-I-The-Iskra-period লেখক : শিক্ষক, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..