বেহাল দেশের প্রথম রেল স্টেশন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা : দেশের সর্বপ্রথম রেলওয়ে স্টেশন অবস্থিত কুষ্টিয়ার জগতি এলাকায়। স্টেশনটির নাম ‘জগতি স্টেশন’। ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর কলকাতার রাণাঘাট থেকে জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কি. মি. ব্রডগেজ রেলপথ চালু হয়। ফলে এই রেলপথটি চালু হওয়ার পর রেলওয়ের যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি আভ্যন্তরীণ নদীবন্দর গোয়ালন্দ পর্যন্ত ৭৫ কি. মি. রেলপথ সম্প্রারণ করা হয়। কিন্তু রেলওয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক দেশের প্রথম এই স্টেশনটির অবস্থা জরাজীর্ণ ও খুবই নাজুক। কর্তৃপক্ষের অবজ্ঞা ও চরম উদাসীনতায় রেলওয়ে বিভাগ ঐতিহ্য হারাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এককালে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও পণ্য পরিবহনে এ অঞ্চলের মানুষের জগতি রেলওয়ে স্টেশনটির কদর ছিল যথেষ্ট। কিন্তু কালের বিবর্তনে দেড়শ বছর আগের ঐতিহ্যমণ্ডিত এই স্টেশনটির আসল রূপ ও জৌলুস হারিয়ে গেছে। দ্বিতলা স্টেশন ভবনটির ছাদে জন্মেছে প্রচুর আগাছা। এছাড়া ভবনটিতে ধরেছে ফাটল। ঐতিহ্যমণ্ডিত স্টেশন ভবনটি এক রকম পরিত্যক্ত। ওয়েটিং রুম ভেঙে পড়েছে। প্লাটফর্মের ইট ও গাঁথুনি ক্ষয়ে গেছে। প্লাটফর্মের সঙ্গেই তৎকালে নির্মিত বিশাল আয়তনের ওভারহেড পানির ট্যাংকটি ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। স্টেশনটিতে নেই কোনো নিরাপত্তা কর্মী। এছাড়া নিরাপত্তা বেষ্টনি না থাকায় উন্মুক্ত স্টেশনটির পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে চারণভূমিতে। স্টেশনে নেই কোলাহল ও রাতের বেলায় থাকে না ঝলমলে বাতি। চারদিকে নির্জন ও ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজমান। সর্বোপরি স্টেশনটিতে যাত্রীসেবার নেই কোনো বালাই। জগতি রেলওয়ে স্টেশন ডিঙিয়ে কুষ্টিয়া-পোড়াদহ ও কুষ্টিয়া-গোয়ালন্দ রুটে আন্তঃনগরসহ মেইল ও শাটল ট্রেন চলাচল করে। এই স্টেশনে স্টপেজ রয়েছে শুধুমাত্র মেইল ও শাটল ট্রেনের। এসব ট্রেনে হাতেগোনা অল্প কিছু যাত্রী উঠা-নামা করে। শুধমাত্র ট্রেন আসার পূর্ব মুহূর্তে স্টেশন মাস্টারের ছোট কামড়ার কার্যালয়টি খোলা হয় এবং ট্রেন ছাড়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই স্টেশন থেকে অল্প সংখ্যক যেসব যাত্রী ট্রেনে উঠা-নামা করেন তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। যাত্রী ছাউনিটি ব্যবহার অযোগ্য এবং সেখানে বসার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের প্লাটফর্মের এদিক-ওদিক একঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এদিকে লোকবলের অভাবে স্টেশনের কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। সহকারী স্টেশন মাস্টার, একজন গেটম্যান ও একজন পয়েসম্যান স্টেশনটিতে নিয়োজিত আছেন। আরো কমপক্ষে ১২/১৫টি পদ শূন্য রয়েছে। বর্তমানে এটি শুধু কাগজে-কলমে স্টেশন হিসেবে তালিকাভুক্ত। দৃশ্যত এ স্টেশনে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা একবারে ভেঙে পড়েছে। স্টেশনটিতে নিরাপত্তা বেষ্টনি ও নিরাপত্তা কর্মী না থাকায় ইতোমধ্যে মূল্যবান বহু সম্পদ খোয়া গেছে। নিরাপত্তার অভাবে স্টেশন এলাকায় প্রতিনিয়ত রেললাইনের সঙ্গে সংযুক্ত পিন চুরি হচ্ছে। এই পিন চুরি ঠেকানো না গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে রেলওয়ে বিভাগের কর্মচারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি সত্বেও এই স্টেশনটিতে উন্নয়ন কিংবা আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। এক সময় ভারতের কলকাতায় যাতায়াত ও বাণিজ্যিকভাবে পণ্য আমদানি-রফতানিও হতো জগতি স্টেশন থেকে। এখন তা শুধুই স্মৃতি। এদিকে ঐতিহ্যের ধারক দেশের প্রথম এই স্টেশনটির আধুনিকায়ন না হওয়ায় রেলওয়ে বিভাগ ঐতিহ্য হারাচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আধুনিকায়নসহ স্টেশনটির হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার দাবি এলাকাবাসীর। কুষ্টিয়ার পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও ট্রেনের নিয়মিত যাত্রী কামরুন্নাহার জানান, জগতি এলাকায় দেশের প্রথম রেলওয়ে স্টেশনটির এ বেহাল অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়। উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় স্টেশনটির আধুনিকায়নসহ যাত্রী সেবার মান উন্নয়নের দাবি জানান তিনি। কুষ্টিয়া জজ কোর্টের প্রতিথযশা আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মাসুম বলেন, ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালন করা আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য। পাশাপাশি দেশের প্রথম স্টেশন হিসেবে ঐতিহ্যগতভাবে ‘জগতি রেলওয়ে স্টেশনটিকে’ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতাভুক্ত করে আধুনিক মডেল স্টেশনে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান। জরাজীর্ণ স্টেশন ভবন, প্রয়োজনীয় লোকবল অভাবসহ অন্যান্য সংকটে জগতি স্টেশনটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে সহকারী স্টেশন মাস্টার মো. ইলিয়াস হোসেন স্বীকার করেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..