ভোলার বেড়িবাঁধগুলো জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ভোলা সংবাদদাতা : ভোলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ রয়েছে ৩০০ কিলোমিটার। এসব বাঁধের উদ্দেশ্য নদীবেষ্টিত এ দ্বীপজেলাটিকে ভাঙন ও প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা করা। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় এসব বাঁধের অধিকাংশই জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে জোয়ারের পানির চাপে বিভিন্ন স্থানের প্রায় ৪১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এ অবস্থায় চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে জেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষ। জানা যায়, এমনিতেই ভোলার বেড়িবাঁধগুলো খুব উঁচু নয়। প্রায়ই জোয়ারের পানি বাঁধ উপচে জেলার নিম্নাঞ্চলসহ নদীতীরবর্তী অঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে পড়তে হয় এসব অঞ্চলের মানুষকে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে প্রতি বছর সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তা কোনো কাজে লাগছে না। প্রকৃতির সঙ্গে নিত্য লড়াই করে বেঁচে থাকা এ মানুষগুলো জানান, শুষ্ক মৌসুম শেষে বর্ষার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ভাঙন আর প্লাবন-আতঙ্ক। চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেও জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৪১ কি. মি. বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাঁধের কিছু কিছু স্থানে ফাটলও দেখা দিয়েছে। জানা যায়, সম্প্রতি চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, দৌলতখান ও মনপুরা উপজেলার কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। তাছাড়া বেশকিছু স্থানে বাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করে প্রায় সপ্তাহব্যাপী পানিবন্দি হয়ে পড়ে লক্ষাধিক মানুষ। এর মধ্যে তজুমদ্দিন উপজেলার চৌমাথা এলাকার লঞ্চঘাট-সংলগ্ন বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় টানা পাঁচদিন ওই অঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এ সময় তলিয়ে যায় বসতবাড়ি, ফসল ও মাছের ঘের। বর্তমানে পানির চাপ কিছুটা কম হলেও আগামীতে আবারো এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আতঙ্কে আছেন ভুক্তভোগীরা। বেড়িবাঁধ নিয়ে এ এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাউবোর প্রতিটি কাজেই ঠিকাদাররা অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেন। বেড়িবাঁধগুলো ১১ ফুট উঁচু ও ১৪ ফুট প্রশস্ত হওয়ার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। এতে প্রবল জোয়ারের সময় বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করে। তাছাড়া প্রস্থ কম হওয়ায় পানির চাপে সহজেই বাঁধ ভেঙে যায়। তজুমদ্দিন উপজেলার চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবৎ বেড়িবাঁধগুলোর সংস্কার হয়নি। এতে এগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে অবস্থা এতই নাজুক যে, যেকোনো সময় জোয়ারের পানির চাপে তা ভেঙে যেতে পারে। এ উপজেলার দায়িত্বে থাকা পাউবো ডিভিশন-২-এর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এরই মধ্যে উপজেলার বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিটার বাঁধ পুনঃসংস্কারের কাজ চলছে। কয়েকদিনের মধ্যেই এ কাজ শেষ হবে।’ এছাড়া জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ ও বাঁধ না থাকায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছেন মনপুরা উপজেলার ঈশ্বরগঞ্জ, কাউয়ারটেক ও চরনিজামের আট গ্রামের মানুষ। এ উপজেলার ৮১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় রোহানুর আগাতে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। এতে চলতি বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে উপজেলার নিম্নাঞ্চলসহ বহু মানুষের বসতঘর, মাছসহ পুকুর ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মনপুরা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মো. ছালাউদ্দিন বলেন, ‘মনপুরার অনেক স্থানে বেড়িবাঁধ নেই। আর যেসব স্থানে আছে, তা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।’ একই কথা বলেন উপজেলা চেয়ারম্যান মিসেস সেলিনা আক্তার চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবার বর্ষায়ও এ উপজেলার মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বহু জায়গায় বেড়িবাঁধ না থাকায় সামান্য জোয়ারের পানিতেই তলিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা ও ক্ষেতের ফসল।’ এ ব্যাপারে কথা হলে পাউবো ডিভিশন-২-এর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম জানান, চলতি বর্ষা মৌসুমে পুরনো বাঁধ সংস্কার ও নতুন বাঁধের নির্মাণ কাজ চলছে। এরই মধ্যে প্রায় সাত কিলোমিটার বেড়িবাঁধের কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে সাড়ে চার কিলোমিটার নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও দুই কিলোমিটার পুরনো বেড়িবাঁধের সংস্কার। খুব শিগগিরই এ কাজ সমাপ্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে উপজেলার মানুষ প্লাবনের হাত থেকে মুক্তি পাবে। এছাড়া চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর ও কুকরী-মুকরী ইউনিয়নের প্রায় ১২ গ্রামের মানুষও রয়েছেন চরম আতঙ্কে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে সদর উপজেলা ও দৌলতখান উপজেলার বিভিন্ন স্থানের বেড়িবাঁধ। এসব বাঁধের দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন বলে মত স্থানীয়দের। তবে চলতি বর্ষা মৌসুমে মেঘনার ভাঙন থেকে ভোলাবাসীকে রক্ষায় সিসি ব্লক স্থাপন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারসহ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড ভোলা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জহীর উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ভোলায় নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রতি বছরই ব্যাপক কাজ করা হয়। কিন্তু এ অঞ্চলে ভাঙনের তীব্রতা এত বেশি যে, কোনো পরিকল্পনাই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। তার পরও আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত আছে।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..