পাহাড়ে ধস: প্রকল্প বাণিজ্যের সুযোগ নাকি সতর্কসংকেত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : গত ১৩ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে বিপুল প্রাণহানী হয়েছে। একইসঙ্গে হয়েছে সম্পদহানী। পাহাড়ী-বাঙালি নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে। এসবই সংবাদ মাধ্যমের বদৌলতে এখন সবারই জানা। স্বাভাবিকভাবেই এ ঘটনার পর সারা দেশে তীব্র আলোচনা শুরু হয় পরিবেশ ধ্বংস নিয়ে। শুরু হয় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ তৎপরতাও। টানা বৃষ্টিপাতে আবারো পাহাড়ধসের আশঙ্কায় খোলা হয় প্রচুর আশ্রয়কেন্দ্র। প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। কিন্তু কতটা? কোন কোন ক্ষেত্রে প্রশাসনের তৎপরতা দৃষ্টিগ্রাহ্য পর্যায়ে রয়েছে? একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যায় মূলত ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন সড়ক মেরামত ও পুননির্মাণের দিকেই প্রশাসনের ঝোঁক তুলনামূলক বেশি। এরই মধ্যে বান্দরবানের প্রধান আট সড়ক জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের জন্য ৮ কোটি টাকা চেয়ে সেতু ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এর সঙ্গে যখন পাহাড়ধসের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি দেখা যায়, তখনই সংশয় দানা বাঁধে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে বিপুল প্রাণহানীর প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া আলোচনার মধ্যেই জানা গেল সিলেটের টিলাগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়-টিলা কেটে বসতি স্থাপন চলছে। যত্রতত্র কাটাকাটিতে পাহাড়-টিলাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে ইতোমধ্যে। অথচ ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এসব পাহাড়-টিলার নিচে বসবাস করছে সাধারণ মানুষ। ঘটছে দুর্ঘটনাও। সিলেটের জাফলংয়ের দুটি টিলার নিচ থেকে চূড়া পর্যন্ত একের পর এক ঘর। খুপরির মতো এসব ঘর কম টাকায় শ্রমজীবী মানুষের বসতির চাহিদা পূরণ করলেও এ ঘরগুলো ঘিরে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। টিলাধসের ঘটনা ঘটলে খুপরিগুলো মাটিচাপা পড়বে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশাসন এক রকম নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। এসব টিলা ব্যক্তিমালিকানাধীন উল্লেখ করে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা দায় এড়াতে চাইছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডি যখন এখনো টাটকা, তখন আরেক পাহাড়-টিলা ঘেরা এলাকা সিলেটের প্রশাসনের এ মনোভাব পুরো প্রশাসনের নির্বিকার রূপেরই বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের বক্তব্য ও মানসিকতার নজির আমরা এর আগে হাওরের বন্যার সময়ও দেখেছি। এত বিপুল বিপর্যয়েও অমৃতবচনে জাতিকে মুগ্ধ করতে দেখা গেছে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ঘটা পাহাড়ধসে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাকে সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করে অন্য অঞ্চলগুলোয়ও ব্যাপক প্রতিরক্ষা কার্যক্রম নেয়া এবং প্রকৃতি শাসনের নামে তা ধ্বংস না করা থেকে মানুষকে বিরত রাখতে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার কথা ছিল সরকারের। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও থাকা প্রয়োজন ছিল সর্বোচ্চ নিবেদনের। কিন্তু আমরা দেখেছি এমনকি সরকারি ত্রাণ কর্মকাণ্ড নিয়েও বিতর্ক হতে। সরকারি ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে বলে এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে। নানা পত্রিকা মারফত আমরা এ খবরগুলো পেয়েছি। এসবই ইঙ্গিত দেয় যে, এত বড় একটি মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় সত্ত্বেও প্রশাসন তার প্রচলিত ছক ভাঙতে পারেনি। বরাবরের মতোই রাষ্ট্র ও এর সঙ্গে জড়িতরা একে একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে। ত্রাণের টাকা হাতিয়ে, কিংবা উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমের নামে প্রকল্প বরাদ্দ নিয়ে তা লোপাট করা, এসবই চলবে বলে স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কিত হতে হয়। অথচ এ ঘটনাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে সরকারের কাছ থেকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা আসতে পারত। সেক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য গৃহীত কর্মকাণ্ড যেমন থাকত তেমনি থাকত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। একই সঙ্গে ত্রাণ বা সড়ক সংস্কারের মতো তাৎক্ষণিক বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের জন্য থাকত একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অংশ, যা মূলত এসব কাজে দুর্নীতি প্রতিহতে কাজ করত। কিন্তু এসব কিছুই আমরা দেখিনি। ফলে এ ধরনের দুর্যোগের শঙ্কা শেষ পর্যন্ত পিছু ছাড়ছে না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..