উদ্বাস্তু নদীর স্রোতে নাকাল নগরবাসী!

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

স্বয়ম মজুমদার : দেশের নদ-নদীগুলোর অবস্থা বেশ সঙ্গীন। এটি অনেক পুরোনো কথা। প্রতি বছরই বর্ষার বন্যায় কিংবা শীতের খরায় আমাদের নদীর কথা মনে পড়ে পর্যায়ক্রমে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এর পর যথারীতি দীর্ঘ ঘুম সবাইকে কাবু করে ফেলে। কী রাষ্ট্র, কী মানুষ। কিছু সচেতন তখনো থাকে পথে, কিন্তু তাদের কথা কারো কানে শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় না। পৌঁছায় না যে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বছর বছর বন্যা ও খরার পর্যায়ক্রমিক বিন্যাস। মানুষ উদ্বাস্তু হলে, শহরমুখী হয়। নদী ভাঙন কিংবা বন্যায়, কিংবা মঙ্গায় পীড়িত মানুষ জীবিকার তাগিদে ছুটে আসে শহরে। এ স্থানান্তর স্বেচ্ছায় নয়। এ স্থানান্তরের পেছেন রয়েছে বিস্তর আহাজারি। এ স্থানান্তর একদিনে হয় না। চূড়ান্ত স্থানান্তরের আগে অসংখ্য সংকেত আসে। আমাদের হাওড়গুলোও এ সংকেত দিয়েছিল। কিন্তু আমরা তা শুনিনি। তাই সব ভাসিয়ে নিয়েছে। মানুষের স্থানান্তরতো এর একটি ধারাবাহিকতা মাত্র। এ স্থানান্তর প্রাণ-প্রকৃতির সবখানে ঘটে চলেছে। আমরা আমাদের নদীগুলোকে হত্যা করছি। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও নদীশাসনে ইতোমধ্যে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে আমাদের নদীগুলো। কিন্তু প্রতি বর্ষায় তারা ফিরে আসে। যে নাগরিক চাহিদায় আমরা এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছি, তাকেই জানান দিতে নিজ অস্তিত্বহীনতা। অনেকটা অতৃপ্ত আত্মার মতো। আর তাই প্রতি বর্ষায় নিয়মমাফিক শহরগুলোয় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। নাগরিক মানুষ রিকশা কিংবা পাবলিক বাসের বদলে মনে মনে খোঁজ করে নৌকার। এ এক দারুণ চক্র, যার কোনো শেষ নেই। রাষ্ট্রও একে খুব একটা সংকট হিসেবে মনে করছে না। মনে করলে মৌসুমি বয়ানের বদলে আমরা বছরব্যাপী কর্মযজ্ঞ দেখতে পেতাম। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে সম্প্রতি জলাবদ্ধতার যে চিত্র দেখা গেছে, তা ভয়াবহ। কর্মজীবীরা যেতে পারছেন না কর্মক্ষেত্রে। শিশুরা স্কুলে। কিন্তু প্রশাসনের হাতে কোনো নিদান নেই। সম্প্রতি এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, এটা থেকে মুক্তির জন্য এক ধরনের বিপ্লব প্রয়োজন। ঢাকার খালগুলোর মধ্যে এখন দুইটাও বোধ হয় নেই। খাল ভরাট করে সেখানে চার-পাঁচতলা ভবন করা হয়েছে। পানি যাবে কোথায়? তবে এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের বক্তব্য হচ্ছে, এর জন্য দায়ী জেলা প্রশাসন। কারণ তারাই এর মালিক। আর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ওয়াসার। অর্থাৎ বরাবরের মতোই আমাদের সামনে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে একটি ধাঁধার, যার কোনো মিমাংসা নেই। কারণ কোনো মিমাংসাকারী কর্তৃপক্ষকে আমরা চিনি না। আমাদের নদীগুলোকে রক্ষার জন্য রয়েছে নদী রক্ষা টাস্কফোর্স। রয়েছে জেলা প্রশাসন। শহরগুলোর জন্য পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশন। রয়েছে ওয়াসা। এ সবই সরকারি সংস্থা। এবং দরকারিও। কিন্তু এসব সংস্থার সামনে যখনই কোনো সংকট নিয়ে উপস্থিত হওয়া যায়, তখনই অন্য কোনো সংস্থাকে দেখিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘আমি নিষ্পাপ, পাপি ওদিকে’। কিন্তু আমরা জোর গলায় বলতে পারছি না যে, আমরা কোনো পাপির খোঁজে নামিনি। আমরা শুধু আমাদের সংকটের মীমাংসা চাই। পাপের প্রসঙ্গ টানলে এ দেশের কোন ব্যক্তিটি প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসের পাপ থেকে বাঁচতে পারে তা বলা মুশকিল। কারণ আমাদের নদী ও মাঠে, পাহাড় ও সমতলে প্রকৃতি ধ্বংস করে যে বিষ ছড়ানো হয়েছে তাতে আমাদের কারো না কারো কোনো না কোনো অবদান রয়েছে। এখন আমাদের বুঝতে হবে, রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর জলাবদ্ধতা বা পয়োনিষ্কাশনে বিদ্যমান সংকটের সঙ্গে জলাধার সংকোচনের সম্পর্ককে। এর একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটির সমাধান সম্ভব নয়। শেষ করছি বাহুবলি-২ এর কথা স্মরণ করে। অনেক আলোচনা হয়েছে সিনেমাটি নিয়ে। অনেক রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে সিনেমাটি। এ চলচ্চিত্র নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বিশেষত এতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি নিয়ে ছুটেছে প্রশংসার তুবড়ি। সিনেমাটি আমিও দেখেছি। ভালোও লেগেছে। প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতিও আছে। কিন্তু একটি দৃশ্য চোখে লেগে রয়েছে এখনো। আর তা হলো, বাঁধে আবদ্ধ নদীটির জনপদ গ্রাসের চিত্র। সোনা তথা উন্নয়নের লোভে একটি নদীকে শিকলে বেঁধে ফেলা হয়েছিল। তদনগদ উন্নয়ন অন্ধ করে দিয়েছিল ওই জনপদের নেতাকে। উদ্দেশ্য হাসিলে হত্যা করা হয়েছিল সংবেদনশীল অংশকে। কিন্তু এত কিছু করেও শেষ রক্ষা হয়নি। বাঁচেনি সেই নেতা ও তার অনুসারীরা। আর চূড়ান্ত সংকটের আগে আওয়াজ না তোলায় ভূমিহারা হতে হয়েছে সে জনপদের সাধারণ মানুষকেও। এ দৃশ্য কোনো গল্প নয় আমার কাছে। এর বাস্তবতা এই বাংলাদেশেই বিদ্যমান। চটজলদি উন্নয়নের বলিতে যখন একটি একটি করে নদী উন্মূল হয়, হয় উদ্বাস্তু, তখন এ বাস্তবতাই আমাদের দিকে ধেয়ে আসে। এখন সিদ্ধান্তটি আমাদের নিতে হবে; আমরা এ বাস্তবতায় মুখ বুজে থাকব, নাকি উদ্বাস্তু নদীর তোড়ে ভেসে যাব একদিন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..