সুন্দরবনের ভবিষ্যত ইউনেস্কোর ওপর নির্ভরশীল!

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : সুন্দরবনের রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল ইউনেস্কো। সংস্থাটির প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা সুন্দরবনের আশপাশে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে তারা উদ্বেগও জানিয়েছিল। গত মার্চে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করতে এসেছিল সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল। প্রাথমিক প্রতিবেদনে তারা এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আপত্তিও জানায়। সম্প্রতি পোল্যান্ডের ক্র্যাকাও শহরে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ৪১তম সভায় এ বিষয়ে একটি কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, কিংবা নিদেনপক্ষে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা ছিল সুন্দরবন রক্ষায় মাঠে থাকা আন্দোলনকারীদের। কিন্তু সেখানে ইউনেস্কো উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি আগামী দেড় বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বেশকিছু সুপারিশ ও শর্ত দেয়া হয়েছে। এ ধরনের শর্ত ও পরামর্শ এর আগেও দিয়েছিল সংস্থাটি। কিন্তু তার কোনো কার্যকর প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। এবারের সভার দিকে তাকিয়ে ছিল রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের সবাই। এতে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে সুন্দরবনকে বাদ দেয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন ছিল। সে ক্ষেত্রে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলে সরকার উদ্যোগী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু ইউনেস্কো তুলনামূলক নমনীয় আচরণ অনেককেই হতাশ করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের লবিং কাজ করেছে এ সিদ্ধান্ত সহজেই নেয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ইউনেস্কোর গৃহীত পদক্ষেপে সুন্দর বাঁচানোর আন্দোলন কতটা প্রভাবিত হতে পারে? গত বছরের মার্চে ইউনেস্কোর রিয়েকটিভ মনিটরিং মিশন নামের একটি পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসে। তারা সুন্দরবন ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে একটি প্রতিবেদন বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির কাছে জমা দিয়েছে। এ প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত মে মাসে সুন্দরবনের ব্যাপারে একটি খসড়া সিদ্ধান্ত তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সুন্দরবন সংরক্ষণ বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত ১৩ জুলাই সমাপ্ত হওয়া সভায় এ সময় বাড়িয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ২১ সদস্যের মধ্যে অনেকেই এ সিদ্ধান্তের কিছু বিষয়ে সংশোধন চেয়েছেন। রামপাল ছাড়াও সুন্দরবনের জন্য আরও অনেক হুমকির কথা বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় উঠেছে। কমিটি থেকে সুন্দরবন ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ তা করতে সম্মত হয়েছে বলেও জানা গেছে। কিন্তু এ কাগজে কলমে কিংবা মৌখিক সম্মতির বিষয়ে আমরা আশ্বস্ত হতে পারছি না। কারণ সুন্দরবন বিনাশী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে খোদ সরকারি প্রভাবশালী লোকেরাই জড়িত বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকায় কোনো বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ও স্থাপনা নির্মাণ আইনত নিষিদ্ধ হলেও সেখানে ৩৫ একর জমিতে একটি চিংড়ির খামার প্রতিষ্ঠা করেছেন সরকারি দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। সুন্দরবনের এক কিলোমিটার সীমানার মধ্যে খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নে ওই খামারের মধ্যে একটি দোতলা ও একটি একতলা ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী চিংড়িঘেরের জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করা ও এর ভিত্তিতে পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও এক্ষেত্রে তা করা হয়নি। এরই মধ্যে সেখানকার ভূগঠনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। খামারের সীমানার মধ্যে থাকা পুকুর ইতোমধ্যে ভরাট করা হয়েছে। ঘের স্থাপনের জন্য বেড়িবাঁধ কেটে সুন্দরবনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পশুর নদ থেকে লবণপানি তোলা হয়েছে। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশ, ভূমিরূপের পরিবর্তন হয় এমন কোনো কিছু করা নিষিদ্ধ। এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড যাতে না করা হয়, সেজন্য সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকায় ১৫টি বড় সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ওই এলাকায় অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত কার্যক্রমগুলো না করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা কার্যালয়ের তথ্যমতে, সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার ইসিএ এলাকায় মোট ১৮৬টি শিল্প ও প্রকল্পকে পরিবেশের প্রাথমিক (অবস্থানগত) ও চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার মোট ৯টি উপজেলায় ১৪০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প ছাড়পত্র পেয়েছে। এছাড়া মোংলা রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত এলাকায় (ইপিজেড) ২১টি, মোংলা বন্দর শিল্প অঞ্চলে ২০টি, মোংলা বন্দরসংলগ্ন এলাকায় ৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এর বাইরে আরও ১৬টি প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র পেতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে আবেদন করেছে। এভাবে চিংড়ি ঘের, সিমেন্টসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা স্থাপনের মধ্য দিয়ে এক সময়ের ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তুত সুন্দরবন এখন ৬ হাজার বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। এখন সুন্দরবনের আশপাশে যাচ্ছে খোদ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প। মোংলা বন্দরকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে বিস্তৃত উন্নয়ন পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনার মধ্যে যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন শিল্প কারখানাও। এসবই নিয়ে আসছে সুন্দরবনের মৃত্যুর বার্তা নিয়ে। এসব দেখে চুপ নেই সচেতন মানুষরাও। সংখ্যায় কম হলেও তারা জোর আন্দোলন চালাচ্ছেন। আন্দোলনের কেন্দ্রে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলকে রাখা হলেও, লক্ষ্য পুরো সুন্দরবন বাঁচানো। এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি আন্দোলন নয় যে, কিছু দাবি-দাওয়া উত্থাপন ও তা মেনে-নেয়া না নেয়ার মধ্য দিয়েই এর জয়-পরাজয় চিহ্নিত হবে। সুন্দরবন বা প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার যেকোনো আন্দোলনই মূলত একটি দীর্ঘ যাত্রা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চার হয়। বিস্তৃতি পায়। এ আন্দোলনে সামিল প্রতিটি কর্মীর ভূমিকা অনেকটা পাহারাদারের মতো। প্রতি মুহূর্তে সচেতন থাকা তার দায়িত্ব। আর এ পরিপ্রেক্ষিতেই আসলে ইউনেস্কোর কোনো সিদ্ধান্ত আন্দোলনের গতিমুখ নির্দিষ্ট করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এ গতিমুখ নির্দিষ্টকরণের ক্ষমতা একমাত্র দেশের সাধারণ মানুষেরই। সুন্দরবন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় রয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে গৌরবের। একই সঙ্গে এ স্বীকৃতি সুন্দরবনের সুরক্ষার জন্যও ইতিবাচক। এ অবস্থায় সুন্দরবন সুরক্ষার যেকোনো আন্দোলনে ইউনেস্কো একটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বড়জোর। আন্তর্জাতিক এ সংস্থা প্রদত্ত চাপ সরকারের আত্মঘাতি নীতি পরিবর্তনে আন্দোলকারীদের পেছনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু এটুকুই। এখানে সবার আগে মানুষকেই দাঁড়াতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..