হাওরের পাশে বাংলাদেশ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
[‘হাওরের পাশে বাংলাদেশ’ এর উদ্যোগে হাওরের সাম্প্রতিক মহাবিপর্যয়ের কারণ এবং সমস্যা সমাধানের স্থায়ী পথ অনুসন্ধানে গঠিত ’গণতদন্ত কমিশন’ এর সদস্যবৃন্দের হাওর পরিদর্শনোত্তর পর্যবেক্ষণ প্রকাশের জন্য আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য] এবছরের আগাম বন্যার কারণে হাওর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলা– সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণায় মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। এ বিপর্যয় অংশত প্রাকৃতিক, কিন্তু প্রধানত মনুষ্যসৃষ্ট। বিশেষজ্ঞ মতে, এর একটি প্রধান দায় হলো ‘জলবায়ু পরিবর্তন’-এর। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বড় দায় হলো সরকার-প্রশাসন-প্রভাবশালীদের অবহেলা ও দুর্নীতি। বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় এক- সপ্তমাংশ জুড়ে বিস্তৃত ২১ লক্ষ হেক্টরের হাওর এলাকায় প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস। ২১ লক্ষ হেক্টরের মধ্যে অধিকতর নীচু প্রায় সাড়ে ৮ লক্ষ হেক্টর এলাকাই হাওর হিসেবে পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এর উচ্চতা মাত্র ৪/৫ মিটার। এই এলাকার উত্তরে মেঘালয়, পূর্বে আসাম-মণিপুর, দক্ষিণে ত্রিপুরা-মিজোরাম। বিশ্বের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতময় স্থান চেরাপুঞ্জি যা টাঙুয়ার হাওর থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে। ভারতের সাথে আমাদের যে ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী রয়েছে তার ২০টি নদী এ হাওরাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলের বৃষ্টিজল বঙ্গোসাগরে বয়ে নিয়ে যায়। ২০ লক্ষ একরের বিস্তীর্ণ হাওর তাৎক্ষণিকভাবে নেমে আসা এ জলপ্রবাহকে প্রাথমিকভাবে ধারণ করে রাখে বলেই এই এলাকাসহ পাশ্ববর্তী সব জেলার সুপ্রসারিত মাঠ-গ্রাম-জনপদ মানুষের বসবাসের উপযোগী রয়েছে। অন্যথায় প্রতিনিয়ত তা বন্যায় আক্রান্ত হতো। হাওরের প্রকৃতির সাথে মিল রেখে এখানকার মানুষ তাদের কৃষি-ব্যবস্থা ও জীবন-জীবিকা গড়ে তুলেছে। দেশের মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় ১৮% এখনো হাওর থেকে আসে। প্রাকৃতিক মৎস্যক্ষেত্র থেকে আসা মাছের মধ্যে হাওরের অবদান সবচেয়ে বেশী– একক অবদান ৩৬%। পরিযায়ী পাখিদের সবচেয়ে বড়ো বিচরণক্ষেত্রও এই হাওর। পরিসংখ্যানবিদ আর গবেষকদের হিসেবে বাংলাদেশে ৩৭৪ বা ৩৭৬ বা ৪১১টি হাওর থাকলেও প্রকৃতপক্ষে হাওর মাত্র একটি সুবিস্তৃত সংযুক্ত। এ বছর হাওরের জমিতে ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বোরো ধান চাষ করা হয়েছিল। গত ২৯শে মার্চ থেকে শুরু হয়ে প্রায় একমাস ব্যাপৃত ঢলের পানিতে তার ৮০% তলিয়ে গেছে, যার অর্থমূল্য ৫ হাজার কোটি টাকার অধিক। সরকারী ভাষ্য অনুযায়ী পানির নীচে ধান পঁচে এমোনিয়াসহ নানাবিধ কেমিক্যাল দূষণে হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে ২ হাজার মেট্রিক টন মাছ নষ্ট হয়েছে। অসংখ্য গবাদিপশু মারা পড়েছে। পরিবেশ দূষণে কাঁকড়া, ব্যাঙ, কেঁচো কতো পরিমাণ মারা গেছে বা জীব-অণুজীব কতো নষ্ট হয়েছে তার পরিমাপ করার উদ্যোগও কেউ নেয়নি। হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ২৪ লক্ষ কৃষক পরিবার, তাদের গবাদিপশু ইত্যাদিসহ আজ এমন এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মাঝে পড়েছে, যার নজীর নিকট অতীতে নাই। উপরোক্ত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সংগঠন ’হাওরের পাশে বাংলাদেশ’ স্বতপ্রণোদিত হয়ে দেশ-জাতি ও প্রকৃতির প্রতি দায়বোধ থেকে হাওরাঞ্চলে এই মহাবিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ এবং হাওর সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ ও পদ্ধতি অনুসন্ধানের লক্ষ্যে গত ২৬ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে ২৮ সদস্য বিশিষ্ট ‘গণতদন্ত কমিশন’ ঘোষনা করে। হাওর সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ‘কমিশন’ ক্ষতিগ্রস্থ হাওরবাসীদের রক্ষায় সরকার আপৎকালীন যে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করেছে তার অপ্রতুলতা, দুর্নীতি, হাওরে পর্যাপ্ত ত্রাণ, রেশন এবং সুদমুক্ত ঋণ বিতরণ, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে জড়িত দুর্নীতিবাজদের বিচার এবং হাওরের সকল জলমহালের ইজারা বাতিল করে ভাসান পানিতে মাছ ধরার অবাধ অধিকারের স্বীকৃতি ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণকে নিজেদের কর্ম পরিধির আওতাভুক্ত করেছে। সেই প্রেক্ষিতে গণতদন্ত কমিশনের পক্ষে গত ২৯ জুন থেকে ১ জুলাই তিন দিনের হাওরাঞ্চল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন ১৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদল। এতে ছিলেন গণতদন্ত কমিশনের সদস্য ডা. শাকিল আখতার, জাকির হোসেন, ড. হালিম দাদ খান, জাকিয়া শিশির, আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, সাদিয়া জেরিন পিয়া এবং হাওরের পাশে বাংলাদেশ-এর সদস্য প্রকৌশলী এনায়েতুর রহমান, মোঃ রিয়াজ উদ্দিন খান, আবদুল হালিম, মেরীলিনা সরকার, সুব্রত দাস খোকন, নাসরুল আনোয়ার, আতিকুর রহমান পূর্ণিয়া, শামীমা নাসরিন লাবণ্য। প্রতিনিধিদল তিনদিনে কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর, নিকলী, মিঠামইন, ইটনা, নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও জামালগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন জনপদ পরিদর্শন করেন। এরমধ্যে বাজিতপুর ও মিঠামইনে স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবগের্র সাথে মতবিনিময় হয়। খালিয়াজুরী ও ধর্মপাশার গোলকপুর বাজারে কৃষক-ক্ষেতমজুরদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত মতবিনিময় সভা ও সমাবেশে এবং অন্যান্য এলাকায় স্থানীয় সাংবাদিক ও ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনায় নিম্নলিখিত পর্যবেক্ষণসমূহ উঠে এসেছে। সময়মত ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি এবং বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি (পিআইসি) কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের দুর্নীতি এবারের ভয়াবহ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। স্বাধীনতার পর ফসল রক্ষা ও ভেড়ী বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার একটা হিসাব নেয়া প্রয়োজন ও দুর্নীতির খতিয়ান বের করা দরকার। হাওর রক্ষার নামে যুগ যুগ ধরে বাঁধ নির্মাণের যে প্রযুক্তি অনুসরণ করা হচ্ছে, স্থানীয় জনগণের দৃষ্টিতে তা “লুট-পাটের” প্রযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত। হাওরের ২৪ লক্ষ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হলেও ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে ৩ লক্ষ পরিবার যা মোট ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারসমূহের মাত্র এক অষ্টমাংশ। হাওরের মধ্যবিত্তরা বেশী বিপদগ্রস্থ। এদের সহায়তার আওতায় আনা দরকার। শুধু চাল ও অর্থ সাহায্য যথেষ্ট নয়, চিকিৎসা ও ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রয়োজন। কৃষি ঋণ, এনজিও ঋণ মওকুফ করতে হবে। আগামী ফসল না ওঠা পর্যন্ত ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। আগামী ফসল মওসুমের জন্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। নতুন কৃষি ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্থ ২৪ লক্ষ পরিবারকে সরকারি সাহায্যের আওতায় আনতে হবে। গবাদিপশুর খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। এ বছরের জন্য হাওরের জলমহালসমূহের অবৈধ ইজারা বাতিল করতে হবে। ভাসান পানিতে মাছ শিকারের অধিকার উন্মুক্ত করে দিতে হবে। ভাসান পানিতে মাছ শিকারের অধিকার বাস্তবায়নের আন্দোলন জোরদার করতে হবে। প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট সময় (চৈত্র মাসের ১৫ তারিখ থেকে জৈষ্ঠ্য মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত) হাওর অঞ্চলে মাছ ধরা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। উক্ত সময়ে জন্য জেলেদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে হাওরের মৎস উৎপাদনের পরিমাণ দুবছরের মধ্যেই দ্বিগুণ হবে বলে ধারণা পোষণ করা হয়। চাষের সময়কাল কম লাগে এমন উন্নত জাতের ধান আবিষ্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে। হাওরের সকল প্রকার বন্যা এবং ফসলহানির অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে নদীর তলদেশ ক্রমাগত ভাবে ভরাট হয়ে যাওয়া, ফলশ্রুতিতে নদীর পানি ধারন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একসময় হাওর অঞ্চলের নদীগুলোর গভীরতা ছিল ক্ষেত্র বিশেষ ৮০/১০০ ফুট, বর্তমানে পলি জমে তা ক্ষেত্র বিষেশ ২০/৩০ ফুটে দাঁড়িয়েছে, ফলে উজানের ভারী বর্ষণজনিত পানি প্রবাহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও তিতাস নদীর সংযোগ খালসহ সুরমা এবং কুশিয়ারা নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং-এর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। নদী ছাড়াও হাওর অঞ্চলে ছোট ছোট খালগুলো ভরাট হচ্ছে ও দখল হচ্ছে, ফলে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। হাওরের বুক চিরে ’আবুরা’ সড়কের নামে উঁচু বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে। কারণ এটি হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। সেনানিবাসের মত যে কোন স্থাপনা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এখনই বন্ধ করতে হবে। নৌ যোগাযোগ বাড়ানো উপর জোর দিতে হবে। হাওরাঞ্চলে গর্ভবতী নারীদের নিরাপদ ডেলিভারী ও নবজাতকদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুবিধা নেই। সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার মান শোচনীয়। স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করেই হাওর রক্ষা আন্দোলন বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এরজন্য যথাযথ কৌশল অবলম্বন করে একটি জাগরণ সৃষ্টির মাধ্যমে লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের এই পর্যবেক্ষণগুলো হাওরের স্থানীয় জনগণের সাথে মতবিনিময়কালে পাওয়া গেছে। এগুলো আমাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। কমিশনের সিদ্ধান্তানুযায়ি আগামী ২৯ জুলাই ঢাকায় দিনব্যাপী হাওর বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। আগষ্ট মাসে হাওর অঞ্চলের সাতটি জেলার হাওর উপজেলাসমূহে তদন্ত কমিশনের সদস্যবৃন্দ সফর করবেন। তাঁরা হাওরবাসীদের সাথে কথা বলে সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করার চেষ্টা করবেন। স্থানীয় মানুষ সমস্যাটিকে কিভাবে দেখেন এবং এর সমাধান কিভাবে করতে চান তাও বোঝার চেষ্টা করবেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..