রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ

‘সোভিয়েট সাম্যবাদ : এক নতুন সভ্যতা’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সরদার ফজলুর করিম : রুশ বিপ্লবের সত্তরতম বার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘মুক্তির জয়যাত্রা’ সংকলনে সরদার ফজলুল করিম-এর লেখা ‘সোভিয়েট সাম্যবাদ : এক নতুন সভ্যতা’ লেখাটি প্রকাশিত হয়। এ বছর রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকী উপলক্ষে সাপ্তাহিক একতায় লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হল ১৯১৭ সালে আমার জন্ম ঘটেনি। ১৯১৭ সালে একটি নতুন সমাজ ব্যবস্থা, একটি নতুন সভ্যতার জন্ম ঘটেছিল। সোভিয়েট সমাজ ব্যবস্থা। ১৯৪০-এর দশকে ১৯১৭-তে জাত সেই সমাজ ব্যবস্থা আমাকে নতুন এক জীবন দান করেছিল। শুধু আমাকে নয়। সেকালের প্রজন্মকে। কিন্তু সোভিয়েট বিপ্লবের কাছে আমার নিজের ব্যক্তিগত ঋণের কথা বলছি। ১৭ কি ১৮ বছরের এক তরুণ। চল্লিশের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দূর ইউরোপে মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সে যুদ্ধের বীরপুরুষ এ্যড্লফ হিটলার। তার স্বস্তিকা, তার অদ্ভূত মুখাবয়ব আর তার অনুচর এবং সদম্ভ সশস্ত্র বাহিনীর ‘হেটলফ হিটলার’ বলে উত্তোলিত হস্তের ছবিতে দৈনিক কাগজের পৃষ্ঠা পূর্ণ থাকে। ৪০ থেকে ৪২ সালের কথা। দিগ্বিজয়ী হিটলার। উত্তরে, দক্ষেণে, পশ্চিমে তার অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব অপারেজয়। ১৭৮৯-তে আধুনিকালের উন্মোচনকারী বিপ্লবের যাত্রী ফরাসী দেশ এই হিটলারের পদানত। রাজধানী প্যারিসে গঠিত হয়েছে হিটলারের পদলেহনকারী পেতা সরকার। ফরাসী দেশের আকাশে-বাতাসে স্বস্তিকার আন্দোলন। জার্মান ফ্যাসিস্ট বাহিনীর মার্চপাস্ট। পরাধীন ভারতের তখণ মূল প্রশ্ন স্বাধীনতা অর্জন। কিন্তু সে সংগ্রাম নানা মত ও পথে বিভক্ত। সাম্প্রদায়িকতার অন্তঘার্ত প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। এমন পরিবেশে আমার প্রজন্মের তরুণ মন বিভ্রান্ত। মানুষের সমাজের বিবর্তন কোন লক্ষ্যে? কে তার চালক? সে কি হিটলার? হিটলারকে মনে হচ্ছে অজেয়। হিটলার কার প্রতিনিধি? কোন সমাজ ব্যবস্থার? সমাজ ব্যবস্থা কাকে বলে? এইসব জিজ্ঞাসায় আকীর্ণ মন। ‘৪১-এর ২২ শে জুন হিটলার আক্রমণ করেছিল সোভিয়েট ইউনিয়নকে। সে আক্রমণের খবর নিশ্চিয়ই কাগজের পৃষ্ঠা জুড়ে বার হয়েছিল। কিন্তু তার তাৎপর্য সেই মূহুর্তে মুসলিম সমাজভুক্ত একটি মধ্যবিত্ত তরুণ ছাত্রের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি। তখনো তার মনে হিটলারের বিক্রম। কিন্তু ৪২ শেষ হয়ে ৪৩-এ না পড়তেই এক নতুন বিস্ময় সেদিনের তরুণের মনকে আবিষ্ট করতে লাগ। কোন এক বীরের বিক্রম নয়। একটা সমগ্র দেশের বিক্রম। কিন্তু শুধু দেশ বললেই কি জবাব মিলে? দেশ তো ফ্রান্সও ছিল। শৌর্যে, বীর্যে, ঐতিহ্যে তো ক্ষুদ্র নয়। কিন্তু আস আত্মসমর্পন করল কত সহজে। কিন্তু রাশিয়া কেমন করে ঠেকিয়ে দিচ্ছে সমগ্র পরাজিত ইউরোপের শক্তির মাথায় চড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যে ফ্যাসিস্ট বাহিনী, তাকে? পিছু যে হটছে না সোভিয়েট বাহিনী, তা নয়। ছেড়ে দিতে হচ্ছে এলাকার পর এলাকা। লেনিনগ্রাড অবরুদ্ধ। নেপোলিয়নের মত হিটলারের বাহিনী মস্কোর অদূরে উপস্থিত হয়েছে। পিছু হটছে লালফৌজ। তবু আত্মসমর্পন করেনি সোভিয়েট বাহিনী। আত্মদান করেছে। হাজারে হাজারে, লক্ষে। হিটলার বাহিনীর অগ্রসরের কাহিনী যেমন পৌঁছেছিল সেদিন আমাদের কাছে, তেমনি পৌঁছেছিল সোভিয়েট মানুষের আত্মদানের কাহিনী। এই আত্মদানের কাহিনীই সোভিয়েট সমাজ ব্যবস্থাকে আমাদের মনের সামনে সেদিন উপস্থিত করে দিয়েছিল। নতুন বিস্ময়ভরা মন আর চোখ নিয়ে আমরা সেদিন তাকিয়েছিলাম মরণপণ সংগ্রামরত এই সোভিয়েটের দিকে। বীর হিটলারের অপছায়ায় ক্রমান্বয়ে আমাদের মন থেকে ইতিহাসের নারকীয় কীট হিসাবে অপসৃত হচ্ছিল। একটি নতুন জীবনবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গি সেদিন আমাদের মধ্যে জন্মলাভ করেছিল। সেই ৪০-র দশকে। ৪২ থেকে ৪৫ সালে। এ একটি প্রক্রিয়ার ব্যাপার। একদিনের ব্যাপার নয়। কোন একটি ঘটনার ভিত্তিতে তাকে আজ ৪৫ বছর পরে স্মৃতির পটে তুলে আনা যায় না। তবু নিজের ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাসেও সেই সময়টি যে নতুন চেতনা লাভে অনুপ্রেরণায় পূর্ণ হয়ে উঠছিল। তাকে স্মরণ করতে কোন অসুবিধা হয় না। এই চেতনা সৃষ্টিতে নানা সুহদ, সৃজন সেদিন সাহায্য করেছিলেন। তাঁদের কারুর নাম হঠাৎ আলেঅর ঝলকানীর মত, চোখ বুজে মনের দিকে তাকালেই ঝলসে ওঠে। এমন কয়েকজন সৃজনের মধ্যে বৈদেশিক একটি নাম ছিল ঃ সিডনী এবং বিয়েট্রিস ওয়েব। এ একটি নাম যেমন। তেমনি একটি ন। দু’টি নাম। আজকের যুগের তরুণদের কাছে এ নাম দু’টি হয়ত নিতান্ত গবেষণার বিষয়। কিন্তু সেকালে ইংল্যাণ্ডের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং চিন্তার ক্ষেত্রে এ দু’টি নাম ছিল যেমন ছিল সুপরিচিত, তেমনি বামপন্থী মহলের প্রিয়নাম। না, এঁদের কাউকে আমি দেখিনি। তাঁদের রচনার কোন একটি যে পাঠ করেছি, তাও হয়ত নয়। কিন্তু তাঁদের বিপুল সংখ্যক রচনার মধ্যে ‘সোভিয়েট কম্যুনিজমঃ এ নিউ সিভিলিজেশনঃ ‘সোভিয়েট সাম্যবাদ, এক নতুন সভ্যতা’ শিরোনামের গ্রন্থখানি সেকালে পঠিত, অপঠিতভাবে আমাদের মত তরুণদের কাছে পরিচিত এবং প্রিয় ছিল। সিডনী এবং বিয়েন্ট্রিসওয়েব তথা ওয়েব দম্পতির এই গ্রন্থের নামের একটি বৈশিষ্ট্যের কথা সেদিনই শুনেছিলাম। সোভিয়েট সমাজ ব্যবস্থা মাত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তার নতুন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা সারা পৃথিবীর উৎসুক দৃষ্টির সামনে পরীক্ষিত হচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী তার শত্রু। তার বিরুদ্ধ প্রচারক। বলশেভিকদের রাজত্ব। বলশেভিক মানে তো বুনো দৈত্য এবং সেই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোভিয়েটের মর্মকথা, সোভিয়েট বিপ্লবের নতুন মানবতাবাদী তাৎপর্যের কথা যেসব লেখক ও চিন্তাবিদ সেদিন বিবৃত এবং ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সিডনী এবং বিয়েট্রিস ওয়েব। তাঁরা নাকি তাঁদের গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে শিরোনামের সামনে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখেছিলেন। অর্থাৎ বিশের দশকে প্রকাশিত সে গ্রন্থে তাঁরা যেন তখনো নিঃসন্দেহ নন, সোভিয়েট সাম্যবাদ একটি নতুন সভ্যতা কিনা। কিন্তু ত্রিশের দশকে তাঁদের গ্রন্থের পরবর্তী সংস্করে ওয়েব দম্পতি তাঁদের গ্রন্থের শিরোনামের সামনের সেই প্রশ্নবোধক চিহ্নটিকে মুছে দিয়েছিলেন। এবার গ্রন্থখানির শিরোনাম দাঁড়িয়েছিল, নিঃশর্তভাবে ঃ ‘সোভিয়েট কম্যুনিজম ঃ এ নিউ সিভিলিজেশনঃ সোভিয়েট সাম্যবাদ ঃ এক নতুন সভ্যতা’। ওয়েব দম্পতির এই গ্রন্থ পাঠ করার ক্ষমতা আমার তখন হয়ত ছিল না। হয়ত এ গ্রন্থ আমি পাঠ করতে পারিনি। কিন্তু এ গ্রন্থ যে সেকালে আমাদের মধ্যে বিপুলভাবে আলোচিত গ্রন্থ ছিল, তা স্মৃতির পটে এই অমলিন রেখাটি থেকেই বুঝতে পারা যায়। কিন্তু আর একজন সোভিয়েট সুহৃদ এবং শিক্ষাবিদ, প্যাট, স্লোনের, ‘রাশিয়া উইথ আইউট ইলিউশন’ বা ‘মোহমুক্ত দৃষ্টিতে রাশিয়া‘ আমি যে পাঠ করেছিলাম, সেটি নিশ্চিত। আর একখানি বই ছিল জসুয়া কুনিজের ‘ডনওভার সমরকন্দ’। মধ্য-এশিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামন্ততান্ত্রিক অবস্থা থেকে সোভিয়েট বিপ্লবের সাহায্য এবং সহযোগিতায় নতুন জীবনে প্রবেশের কাহিনী। এই বইয়ের রচনারীতিটি যেমন নাটকীয় ও রোমঞ্চকর ছিল, তার আবেদনও তেমনি আমাদের মনের উপর ছিল গভীর। পরবর্তীকালে আমাদের প্রখ্যাত লেখক বিনয় ঘোষ এ বই-এর বাংলা রূপান্তরও করেছিলেন। কেমন করে আমরা সোভিয়েটের কথা, ১৯১৭ সালের বিপ্লবের কথা, সোভিয়েট সমাজ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যের কথা সেদিন জেনেছিলাম তা স্মরণ করতেই এইসব বই-এর কথা মনে ভেসে ওঠে। একটা আফসোসের ব্যাপার, আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতির যা বর্তমান পরিবেশ তাতে পুরানো এমন গ্রন্থেল সঙ্গে আমাদের আর সাক্ষাৎ ঘটে না। এমন কোন নিশ্চিত ভাণ্ডার নেই যেখানে গেলে এ সব গ্রন্থের সঙ্গে আবার আমরা পরিচিত হতে পারি। কেবল সেকালের আমাদের কথা নয়। একালের তরুণদেরও প্রয়োজন রয়েছে এইসব পুরানো গ্রন্থকে পাঠ করার। কেননা ঐসব গ্রন্থেই নতুন নতুন চিন্তা ও সভ্যতার ভিত রচিত হয়েছিল। সেদিনকার প্রগতিশীল মানব সভ্যতার শুভার্থী এই চিন্তাবিদদের দূরদৃষ্টি ইতিহাসের পরবর্তী বাকশ কিভাবে বাস্তব সত্য বলে প্রমাণিত করেছে তার উপলব্ধিতাঁদের গ্রন্থ এবং চিন্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কবাদে তৈরি হতে পারে না। আমি এমন একটি চিন্তা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে প্রথমে খোঁজ করেছিলাম তার বই-এর তালিকায় এসব বই এর নাম আছে কিনা। এইসব বই-এর কিছূ নামতালিকায় অবশ্য আমি পেলাম। কিন্তু সিডনী এবং বিয়েট্রিস ওয়েবের সেই ‘সোভিয়েট সভ্যতা’ নামক গ্রন্থ কিংবা জসুয়া কুনিজের ‘ডন ওভার সমরকন্দ’কে খুঁজে পেলাম না। অথচ এ সমস্ত বই-এর পুনর্মুদ্রণও আমাদের চিন্তার শক্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক। প্যাট স্লোনের ‘রাশিয়া উইথ আউট ইলিউশন’ও পেলাম না। তবে দুঃখ একটু কমল যখন পুরোনো বই তল্লাশ করতে করতে প্যাট স্লোনের ১৯৩৭ সালে ভিকটর গলান্জ কর্তৃক প্রকাশিত ‘সোভিয়েট ডেমোক্রাসি’ বা সোভিয়েট গণতন্ত্র শিরোনামের গ্রন্থখানিকে হাতে নিতে পারলাম। প্যাট স্লোন নিজে ছিলেন অধ্যাপক। বিংশ শতকে উদ্ভুত মানব ইতিহাসের বৃহত্তম বিস্ময় সোভিয়েট সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর ছিল প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তিনি সোভিয়েট রাশিয়াতে শিক্ষকতা করেছেন ত্রিশের দশকের গোড়ার দিকে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাঁর বক্তব্য যেমন প্রাঞ্জল এবং জোরাল তেমনি পাঠকের মনে প্রত্যয় সৃষ্টিকারী। ২৮৮ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থের কলেবরে হয়ত তেমন বৃহৎ নয়। কিন্তু অধ্যাপক স্লোনা তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার উদারহণসমৃদ্ধ প্রাঞ্জল সংক্ষিপ্ত প্রকাশে সোভিয়েট সভ্যতার তিনটি মূল বৈশিষ্ট্যকে উপস্থিত করেছেন। সোভিয়েট সমাজব্যবস্থা যে মানুষের ইতিহাসে একটি ‘নতুন জীবনের’ উদ্বোধন, এ কথা তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর গ্রন্থের প্রথম ভাগে ঃ ‘নতুন জীবন’ শিরোনাম দিয়ে। দ্বিতীয় ভাগ, ‘নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থা’ শিরোনামে লেখক সোভিয়েট রাষ্ট্র কাঠামোর মূল চরিত্রগুলি উপস্থিত করেছেন। ‘সোভিয়েট কাকে বলে’, ‘শ্রমিকের রাষ্ট্র কি’, ‘গণতান্ত্রিক প্রতিরক্ষা তথা লালফৌজের বৈশিষ্ট্য’, ‘জাতিসমূহের রাষ্ট্র‘, ‘সমাজতান্ত্রিক সংবিধান’, ‘পার্টি বা দলের কথা’, ‘গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা এবং বিরোধীতার স্বাধীনতা’ঃ এইসব শিরোনামের অধ্যায়ে তিনি সোভিয়েট ব্যবস্থার চরিত্রকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর গ্রন্থের শেষ ভাগটির তিনি নাম দিয়েছেন ঃ ‘এ এক নতুন গণতন্ত্র ঃ এ নিউ ডেমোক্রেসি’। প্যাট স্লোনের এই গ্রন্থখানির ভূমিকার দু’একটি অংশ এখঅনে আমি অনুবাদ করে দিলাম। লেখকের ভূমিকার এই কথাটি কয়টি আজকের দিনেও এমন বই-এর প্রয়োজনের বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে তুলবে। ‘...গণতন্ত্র এবং একনায়কতন্ত্র ঃ ডেমোক্রেসি এ- ডিরেক্টরশীপ ঃ এ বিষয়টি ? গণতন্ত্র এবং নাকনায়কতন্ত্র বা ডিক্টেটরশীপ সম্পর্কে আজকাল বিস্তর যেমন লেখা হচ্ছে, তেমনি বিস্তর আলোচনা আমরা শুনতেও পাচ্ছি। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে, এ আওয়াজ অহরহই উচ্চারিত হচ্ছে। আর যে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে তার দৃষ্টান্ত হিসাবে দেখানো হচ্ছে সোভিয়েট ইউনিয়নকে। কিন্তু একদিকে সোভিয়েট ইউনিয়ন যখন একনায়কতন্ত্র হিসাবে দেখানো হচ্ছে, তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের এমন প্রখ্যাত চিন্তাবিদও আছেন যাঁরা তাঁদের বক্তব্যতে বলছেন যে, সোভিয়েট ইউনিয়নের যে শাসনব্যবস্থা তার মধ্যেই রয়েছে গনতন্ত্রের মূল বৈশিষ্টগুলি। “গণতন্ত্রের সবচাইতে জনপ্রিয় সংজ্ঞা হচ্ছে আব্রাহাম লিংকনের দেওয়া সংজ্ঞা। তাতে তিনি গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন ঃ গণতন্ত্র হচ্ছে “জনগণের সরকার, জনগণ দ্বারা পরিচালিত সরকার এবং জনগণের জন্য সরকার ঃ গভর্ণমেন্ট অব দি পিপল বাই দি পিপল ফর দি পিপল।” “আমরা এখানে সরকার ব্যবস্থার সুপরিচিত গবেষক, লেখক সিডনী এবং বিয়েট্রিস ওয়েবের বক্তব্যের কিছুটা উদ্ধৃতি করছিঃ “সোভিয়েট রিপাবলিক সমূহের রাষ্ট্র সংস্থা এমন রাষ্ট্র ব্যবস্থা নয় যেখানে সরকার এবং জনগণ পরস্পরের বিরোধী পক্ষ হিসাবে পরিগণিত হয়।...অথচ সমস্ত পরিচিত রাষ্ট্রব্যবস্থাতেই ব্যাপারটা এরকম ঃ যেন দু’টো পক্ষঃ সরকার এবং জনগণ। সোভিয়েট ইউনিয়নের সরকার হচ্ছে সকল প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকদের দ্বারা পরিচালিত সরকার। এই পরিচালকরা সংগঠিত হয় নানা প্রকারে ঃ নানা ধরণের কালেকটিভ বা যৌথ সংস্থায়। তাদের নানা দায়িত্ব। এবং সে দায়িত্বের অন্রতম হচ্ছে একটি একেবারে নতুন প্রকারের অর্থনীতির দ্বারা সমগ্র দেশের সম্পদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদনা করা।” (সোভিয়েট কমিউনিজম ঃ পৃষ্ঠা ৪৫০) “ওয়েব দম্পতির এই বিবরণ সঠিক বলে বলতে হয়, সোভিয়েটই হচ্ছে গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংজ্ঞার সাক্ষাৎ দৃষ্টান্ত। সুপরিচিত সমাজতন্ত্রী লেখক। কাজেই তাঁদের দেয়া বিবরণের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব থাকা সম্ভব। সে জন্যই আর একজন লেখক, তিনি জারের রাশিয়াকে দেখেছেন এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি যাঁর কোনদিন কোন সহানুভূতি ছিল না। তিনি যখণ ওয়েব দম্পতির বর্ণনাকে সত্য বলে অভিহিত করেন, তখন কথাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।” “আমি স্যার বারনার্ড প্যারেস-এর কথা বলছি। স্যার বারনার্ড প্যারেস জারের রাশিয়াতে বাস করেছেন। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে সোভিয়েট সরকার স্থাপিত হলে তিনি বৃটিশ সরকারের পক্ষ হয়ে রাশিয়াতে কাজ করেন। বৃটিশ সরকার তখন সশস্ত্র হস্তক্ষেপে সোভিয়েট ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার আশা নিয়ে একশ মিলিয়ন পাউন্ড নিয়োগ করেছিল। ১৯১৯ সালে স্যার বারনার্ড ইংল্যাণ্ডে ফিরে আসেন এবং ইংল্যান্ডে বলশেভিকবাদ প্রবর্তনের প্রচারের বিরুদ্ধে জবাব দানের জন্য ইংল্যান্ডের প্রত্যেকটি কাউন্টিতে প্রকাশ্য বক্তৃতা দানে নিজেকে নিয়োজিত করেন। “১৯৩৫- এর শেষের দিকে আমরা দেখি স্যার বারনার্ড আবার সোভিয়েট গেছেন। এবার তিনি যান রাশিয়াতে। রাশিয়া হচ্ছে সোভিয়েট সমাজতান্ত্রিক রিপাবলিক সমূহের ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় অঙ্গরাষ্ট্র। দেশে ফিরে এসে এবার তিনি তঁঅর অভিজ্ঞতার উপর ক্ষুদ্রাকার একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং সেখানে এই প্রশ্নটিকে উত্থাপন করেন ঃ সোভিয়েট সরকার জনসাধারণের কাছ থেকে কতখানি ব্যবধানে অবস্থিত? “প্রশ্নটির জবা দিয়ে স্যার বারনার্ড এবার বলেন ঃ “জারের আমলে আমি দেখেছি, সরকার জনসাধারণের কাছ থেকে কি চরমভাবে বিচ্ছিন্ন। সেকালের সরকারি মন্ত্রীদের এবং বিশেষ করে জারতন্ত্রের শেষ দিনগুলোর মন্ত্রীদের নিযুক্ত করা হত সমাজের একটি একেবারে সংকীর্ণ গোষ্ঠী থেকে। কোন নীতি বা নিয়ন্ত্রণ শূণ্যভাবে। আমার মনের কামনা ছিল, রাশিয়ার জনসাধারণ যেন তাদের সরকারের দোরে এসে দাঁড়াতে পারে। ১৯১৭- তে কিছুকালের জন্য আমি দেখেছিলাম, জনসাধারণ যেন সরকারের নিকটবর্তীতে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তখনো আমার মনে হয়েছে যেন, স্পষ্টভাবে না হলেও, রুশ জনতা আর রুশ বুদ্ধিজীবির মধ্যে একটা ব্যবধান থেকে গেছে।... কিন্তু আজ সোভিয়েটে আমি যা দেখেছি তাতে বলতে পারিঃ সেই ব্যবধানের আজ আর কোন অস্তিত্ব নেই। আমি সরকারী অফিস বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই দেখেছি সরকার এবং জনসাধারণ, এদের উভয়ের উৎসব অভিন্ন” (স্যার বারনার্ড প্যারেস- এর বই ঃ ‘মস্কো এ্যাডমিটস ও ক্রিটিক ঃ বা মস্কো সমালোচাককে স্বাগতঃ জানায়, পৃষ্ঠা ৩৫)। “কাজেই য়েব দম্পতির বক্তব্য যে, “সোভিয়েট রাষ্ট্রের সরকার পরিচালিত হয় তার সকর বয়ঃপ্রাপ্ত নাগরিকদের দ্বারা’, সে বক্তব্য সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে স্যার বারনার্ড প্যারেস- এর অভিজ্ঞতা দ্বারা। এরা উভয়েই বলছেন, সোভিয়েট সরকারের রয়েছেন এমন সব বৈশিষ্ট্য যাকে আমরা এক নায়কতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচনা করিনে। যাকে আমরা বিবেচিনা করি গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বলে।”... (প্যাট স্লোন ঃ সোভিয়েট ডেমোক্রাসি ঃ পৃঃ ৮-১১)

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..