সমাজতান্ত্রিক দেশ ভিয়েতনামে পাঁচদিন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অ্যাড. মাকছুদা আক্তার লাইলী : ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বাংলাদেশের কামিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) প্রতিনিধি দলের সাথে আমার যাওয়ার বিষয়ে আমি খুবই আগ্রহী ছিলাম। এর কারণ হলো বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সংবিধান রচিত হয়। সমাজতন্ত্রের বিষয়টি সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা ও অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হলেও বাংলাদেশের জনগণ পুঁজিবাদী অর্থনীতির কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোষণ, বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা কৃষি, শিল্প কারখানা তথা উন্নয়নের সম্ভাবনাময় ও সমৃদ্ধশালী উপাদান থাকা সত্ত্বেও লুটপাট ও ভাগবাটোয়ারা রাজনীতির কারণে বাংলাদেশ উল্টোরথে হাঁটছে। শোষিত-বঞ্চিত জনগণ ও লুটপাটের সুবিধাভোগীদের মাঝে দিনে দিনে বৈষম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মানুষের প্রতিদিনের জীবনাচরণ থেকে বোঝা যায় কোথাও শান্তি নেই। সকলেই অস্থিরতার মাঝে দিনাতিপাত করছে। সঙ্গত কারণে আমার মনে হলো বাংলাদেশের সমাজতন্ত্র স্বপ্নের মাঝেই রয়েছে, ভিয়েতনাম যেহেতু দীর্ঘ বছর যুদ্ধের পর তারা বিপ্লব করতে পেরেছে। সমাজতান্ত্রিক দেশ ভিয়েতনাম আমার স্বপ্নের দেশ যেখানে সফর করতে যাব। এমন দলের প্রতিনিধি হিসেবে যার যে দল বিপ্লব ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সাম্যবাদী সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ১৯ জুন - ২৪ জুন ২০১৭ ভিয়েতনাম সফর করি। এ বিষয়ে দু’চার কথা লিখছি। ১৯ জুন সকালে ভিয়েতনামের রাজধানী হেনয়ের নয়বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেই দেখি ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির তিনজন কমরেড অপেক্ষা করছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল। পার্টির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এর নেতৃত্বে ডা. মনোজ দাশসহ আমাদের কমরেডদের উষ্ণ অভ্যর্থনার সাথে স্বাগত জানান। আমাদের ভিসা পাওয়ার যাবতীয় ব্যাবস্থা করেন, তারপর একটি গাড়িতে কমরেড সভাপতি ও অপর একটি গাড়িতে আমাদের দু’জনকে নিয়ে ৩টি গাড়ি পার্টির ওয়েস্ট লেক গেস্ট হাউজে যায়। রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ হাজার হাজার খেজুর গাছসহ নানা ধরনের গাছপালা, যেন বাংলাদেশের গাছপালা চারদিকে দেখতে পাই। আমরা যার যার রুমে যাই। রুমে যেয়ে দেখি প্রয়োজনীয় যাবতীয় সবকিছু দেওয়া, পরিপাটি করে রাখা রুম। যেখানে ফল সাজিয়ে রাখা হয়েছে। গেস্ট হাউজটি বিরাট এরিয়া জুড়ে ফুল, ফল, নানা ধরনের গাছপালা ঘেরা বাগানবাড়ির মত। পার্টির এতো ভালো গেস্ট হাউজ দেখে মনটা জুড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়ে বিকেলে আবার কমরেডগণ ফিরে এলেন। তারা পূর্বের মতো করে আমাদের পার্টির কমিশন অফিসে নিয়ে গেলেন। তখন মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। সামনে খোলা মাঠে লেক, অদূরে হো চি মিন এর সমাধিস্থল ও সংরক্ষিত হো চি মিন যাদুঘর। কমিশন অফিসে আন্তর্জাতিক কমিশনের চেয়ারম্যান Hoang Binh Quan এর নেতৃত্বে অন্যান্য সদস্যদের সাথে দ্বিপাক্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও কমিশনের চেয়ারম্যান আলোচনা করেন। সভায় দুই দেশের রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিনিময়সহ উভয় দেশের ও আন্তর্জাতিক সমস্যাবলী বিষয়ে মতবিনিময় করেন। সভাপতি তাঁর বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়সহ ভিয়েতনামের সমর্থনে বাংলাদেশের মতিউল কাদেরের আত্মত্যাগের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট কমিশনের চেয়ারম্যানের নিকট হস্তান্তর করেন। আন্তর্জাতিক কমিশনের সাথে সভার পর পরই ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য জনসংহতি বিধানের কেন্দ্রীয় কমিশনের চেয়ারম্যান TRUONG THI MAI ও সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মতবিনিময় করেন। নেতৃবৃন্দ দুই দেশের মধ্যেকার সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও বিদ্যমান বিষয়ে আলোচনা করে ভবিষ্যতে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়ার প্রত্যাশা ব্যাক্ত করেন। রাতে আন্তর্জাতিক কমিশনের চেয়ারম্যান এর দেওয়া নৈশভোজে সিপিবি প্রতিনিধিদল ও সিপিবির আন্তর্জাতিক কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সদস্যবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। নৈশভোজে দুই দেশের সদস্যদের মধ্যে আলোচনার মধ্য দিয়ে আন্তরিক পরিবেশে উভয় দেশের বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। সিপিবির সভাপতি ও কমিশনের চেয়ারম্যান দুই দেশের শুভেচ্ছা উপহার একে অপরের হাতে তুলে দেন। কমিশনের চেয়ারম্যান সিপিবির অন্য প্রতিনিধিদেরও শুভেচ্ছা উপহার দেন। হো চি মিন যাদুঘর দেখতে যাই। সেখানে পৌঁছলে গার্ড অব অনার দিয়ে এগিয়ে নেয়া হয়। যাদুঘর এর ঢোকার দরজার দুইদিক সুসজ্জিত করা ছিল। আমরা ভিতরে ঢুকেই প্রথমে হো চি মিন এর মমি করা দেহ দেখতে পাই, সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন এর পর বিরাট এরিয়া ঘুরে দেখি। যেখানে হো চি মিন এর ব্যবহৃত গাড়ি, থাকার ঘর, ব্যবহৃত আসবাবপত্র এবং পরিবর্তিত বাসস্থান, অফিস সভাকক্ষসহ ঘুরে দেখানোর পর হো চি মিন এর উপর ছোট একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। ওখানে সব সময় স্ক্রিনসহ ডকুমেন্টারি পর্যটকদের দেখানোর ব্যাবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়। ডকুমেন্টারিতে হো চি মিন-এর অসুস্থ্য অবস্থায় যুদ্ধ বিষয়ে নানা ধরনের পরামর্শ দেয়ার স্বতঃস্ফূর্ত জনগণের তথা নারী-পুরুষের যুদ্ধে যাওয়া ও যুদ্ধে অংশগ্রহণসহ হো চি মিন-এর অন্তিম মুহূর্তে বেশি অসুস্থ্য হয়ে পড়লে সিপিভির নেতৃবৃন্দের জরুরি বৈঠক, চিকিৎসা বিষয়ে নানা ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর তার দেহ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করার বিষয়ে পার্টির সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো ডকুমেন্টারিতে প্রদর্শন করা হয়। ওখানে একটি ছোট লেক রয়েছে সেখানে মাছগুলো এমনভাবে লাফাচ্ছিল মনে হচ্ছিল মাছগুলো মুক্তির আনন্দে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সংরক্ষিত খাবার আমরা তাদের সামনে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের আনন্দে অংশীদার হওয়ার স্বাদ অনুভব করি। সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সংরক্ষিত রেকর্ড খাতায় তাঁর অনুভূতি ও মতামত লিপিবদ্ধ করে স্বাক্ষর করেন। প্রতিনিধি দু’দলের সকলেই সেখানে স্বাক্ষর করি। হো চি মিন যাদুঘর এর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দলকে হো চি মিন এর অবয়ব খচিত ব্যাজ পরিয়ে দিয়ে সম্মানিত করা হয়। নির্ধারিত সময়ে দেখি কমরেডগণ চলে এসেছেন, সেখান থেকে তারা ফুলের বুকেট কমরেড সভাপতির হাতে তুলে দেন এবং বিদায়ী অভিবাদন জানান। কমরেডগণ আমাদের হ্যানয়ের নয় বাই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে নিয়ে আসেন। কমরেড Mr. Le Gia Kien সাউথইস্ট এশিয়া প্যাসিফিক বিভাগ, সিপিভির বহিস্থ সম্পর্ক বিভাগ ও কেন্দ্রীয় কমিশনের সদস্য নয়বাই বিমান বন্দরে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে বিদায় জানান। ২০ জুন বিকালে প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টার ফ্লাইটে আমরা দিয়েন বিয়েন পৌঁছাই। দিয়েন বিয়েন বিমান বন্দরে দিয়েন বিয়েন প্রোভিন্সিয়াল পার্টি কমিটির নেতৃবৃন্দ বিমানবন্দরে ফুলের বুকেট দিয়ে সিপিবির সভাপতির নেতৃত্বে সফররত বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে স্বাগত ও উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। নির্ধারিত সময়ে আমরা পার্টির নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকে মিলিত হই এবং নৈশভোজে অংশগ্রহণ করি। বৈঠকে দিয়েন বিয়েন প্রোভিন্সিয়াল পার্টির ডেপুটি সেক্রেটারি LO VAN MUON ও সিপিবির সভাপতি দ্বিপাক্ষিক মতবিনিময় করেন। দিয়েন বিয়েন এর জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধের বিষয়সহ আর্থসামাজিক বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়। তাদের গৌরবোজ্জল ইতিহাস তুলে ধরেন। সকালের নির্ধারিত সময়সূচি জেনে আমরা যার যার মত ঘুমাতে যাই। পরদিন অর্থাৎ ২১শে জুন সকালে নাস্তার পর Chen Sy Dien Bien Phu -তে যাই। সৈনিকে কাপ এর ডিজাইন করা ভবনের ভিতরে যাই, সেখানে চারদিকে পাহাড় ঘেরা দিয়েন বিয়েন-এ কিভাবে একের পর এক যুদ্ধে জনগণ অংশগ্রহণ করে ও বিজয় অর্জন করে তার উপরে একটি ডকুমেন্টারি দেখি। এক ধরনের যন্ত্রের ন্যায় তৈরি বিদ্যুৎ প্রবাহের মধ্যে রং বদলের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা হয়। দিয়েন বিয়েনের যুদ্ধ যাদুঘর যেখানে ঐ অঞ্চলের যুদ্ধের ডকুমেন্টারি যুদ্ধের সময় ও পরে পাওয়া অস্ত্র, গোলা-বারুদ, ট্যাংক এর মতো ভারী অস্ত্রসহ নানা ধরনের অস্ত্র, বিভিন্ন গেরিলা ভাষ্কর্য বিভিন্ন পজিশন তুলে ধরা হয়েছে, তাদের ব্যবহৃত বিছানাপত্র, তাদের ছবি, শরণার্থীদের খাদ্য পরিবহন, সাইকেলে খাবার বহন, আহতদের চিকিৎসা, মিলিটারি হাসপাতাল সবকিছু ছবিতে এবং ভাস্কর্যে প্রদর্শিত হয়েছে। সৈনিকদের ব্যবহৃত ক্যাপ, বিভিন্ন ধরনের ট্যাঙ্ক, মর্টার সেল সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া সে সময় বিভিন্ন দেশে প্রকাশিত পত্রিকা ও ম্যাগাজিন সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হয়েছে। এরপর আমরা দিয়েন এর যুদ্ধক্ষেত্রের বাঙ্কার দেখতে যাই, পাহাড়গুলোতে বাঙ্কার করে গেরিলা যুদ্ধে করেছিল। বাঙ্কারগুলো সিমেন্ট দিয়ে পাকা করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আর একটি পাহাড় এলাকায় বাঙ্কার করে অফিস বানানো হয়েছিল। চেয়ার, টেবিল রয়েছে সেখানে অফিস হতো, গোপন বৈঠক হতো। পুরো বাঙ্কার পাকা করে সংরক্ষণ করাসহ পর্যটকদের দেখার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। এরপর QUYET EHIEN QUET THANG বিজয়স্তম্ভ দেখতে যাই। বিজয় পতাকা নারী-পুরুষের যৌথ ভাষ্কর্য তৈরি করে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এরপর দিয়েন বিয়েনে গেস্ট হাউজে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হই। পার্টির নেতৃবৃন্দ গেস্ট হাউজ থেকে এবং এয়ার পোর্টে এসে বিদায় জানান। দুপুরে হেনয় এয়ার পোর্টে এসে সেখান থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টার ফ্লাইটে হো চি মিন সিটিতে যাই। হো চি মিন পার্টির কমরেডগণ আমাদের পূর্বের ন্যায় ভিন্ন ভিন্ন গাড়িতে পার্টি গেস্ট হাউজে নিয়ে যায়, সেখানে সন্ধ্যায় পৌঁছালে সেখানকার নেতৃবৃন্দ স্বাগত জানান। ২২ জুন সকালের নাস্তা খাওয়ার পর তারা আসলে আমাদের Cu Chi Tunnel দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাহিরে থেকে কিছু বুঝা যায় না। সরু সুড়ঙ্গ পথ ও বাঙ্কার তৈরি করে লুকিয়ে থেকে গেরিলারা যুদ্ধ করেছে। ২৫০ কিলোমিটার জুড়ে এই সুড়ঙ্গ পথ হওয়ায় কোনোভাবে শত্রুরা শনাক্ত করতে পারেনি। কোথাও আক্রমণ করলে দুই, চার কিলোমিটার ধ্বংস করলে কিছু করতে পারে নাই, কোনো স্পাই সনাক্ত করতে সক্ষম হয় নাই। যারা ভেতরে অবস্থান করেছে তাদেরই শুধু ঐ সুরঙ্গ পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। নারীরা সংখ্যায় বেশি কুচি সুড়ঙ্গের পথে অবস্থান করেছে ও গেরিলা যুদ্ধে বিশেষ করে তরুণী নারীরা অংশগ্রহণ করেছে। কুচি টানেলগুলো একইভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের মাধ্যমে ট্যানেলগুলোতে বাঙ্কার, চিকিৎসা, বাঙ্কারসহ সবকিছু একদিকে দেখানো হয়েছে। বাঙ্কারগুলোতেও ভাস্কর্য স্থাপন করে প্রদর্শন আরও জীবন্ত করে তুলেছে। সুড়ঙ্গ পথে জায়গায় জায়গায় গোপন মুখ রাখা হয়েছে যা উইপোকার ঢিবির মতো যাতে ফাঁক দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস যাওয়া আসা করতে পারে। এইভাবে বাঙ্কারে অবস্থান, চিকিৎসা, অফিস ঘর, গোপন বৈঠক, রান্নার চুলা যেন আগুন জ্বলছে এমনভাবে সকল কিছু ব্যাবস্থাকে ভাস্কর্য দিয়ে তথ্য সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হয়েছে। ঐদিন গেস্ট হাউজে ফিরে দুপুরের খাবার সেরে আমরা WAR REMNANTSE MUSEUM দেখতে যাই। সেখানে যুদ্ধে ধ্বংসের সকল ডকুমেন্ট ছবি, ভাস্কর্য প্রদর্শন করা হয়েছে। ধ্বংসখণ্ড থেকে সংগৃহীত নানা ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ সংরক্ষণ করা হয়েছে। মিলিটারি বিশেষ কোর্ট ছিল, সেখানে বাঙ্কারের এক ফুট উঁচু লোহার চারকোনা লম্বা খাঁচার নিচে ৫/৭ জনকে একসাথে বন্দী করে রেখে পরবর্তীতে বিচার করা হতো। বন্দীদের বলি দেওয়ার যন্ত্র, নারী নির্যাতনের বিশেষ কক্ষ এগুলো সংরক্ষণসহ নানা ধরনের ভাস্কর্য স্থাপন করে পর্যটকদের সামনে তথ্য তুলে ধারা হয়। এরপর Reunification Palace -এ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট এর ভবন, সাংসদ, মন্ত্রীদের বৈঠকের স্থান, শত্রুদের আসা-যাওয়ার জন্য হেলিকপ্টার নামা ও আসা যাওয়ার ব্যবস্থা, ওয়্যারলেস, টেলিফোন, ফ্যাক্স যাবতীয় যোগাযোগের ব্যবস্থাসহ প্রেসিডেন্ট এর বাসভবন তার স্ত্রীর বিলাসবহুল আসবাবপত্র সংরক্ষণ করে ইতিহাস তুলে ধরা হয়। ঐদিন সন্ধ্যায় হো চো মিন সিটি কমিটির সাথে দ্বিপাক্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল ও ভিয়েতনাম হো চো মিন সিটি পার্টি কমিটির ডেপুটি সেক্রেটারী VO THI DUNG এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সিপিভির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ অংশ গ্রহণ করেন। কমরেড সভাপতি ও সিপিভির নেতৃবৃন্দ মতবিমিয়কালে দু’দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও বিদ্যমান রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক সম্পর্কসহ আন্তর্জাতিক সমস্যার বিষয়ে মতবিনিময় করেন। পরবর্তীতে নৈশভোজে অংশগ্রহণ করা হয়। আন্তরিক পরিবেশে নৈশভোজের সময় দুই দেশের প্রতিনিধিদের দেশের জনগণের সার্বিক অবস্থা, নারীদের অবস্থা বিষয়েও মতনিবিনয় করা হয়। দুই দেশের প্রতিনিধিদের ভবিষ্যতে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে বলে প্রত্যাশা করে সকল কর্মসূচি সফলভাবে শেষ করা হয়। ২৩ জুন সকাল ৯টা-১১টা আমরা হোচিমিন শহর ঘুরে দেখি ও খাবার শেষে দুপুরের ফ্লাইটে ব্যাংকক হয়ে ঢাকায় ফিরে আসি। ভিয়েতনাম সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত LE GIA KIEN ইংরেজিতে অনুবাদ ও DOUNG VAN BINH সফরের যাতায়াত ও অন্যান্য বিষয়ে সহায়তা করেছেন। দুইজন কমরেডকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ভিয়েতনাম থাকাকালে প্রত্যেকটি জায়গায় হেনয়, দিয়েন, বিয়েন ও হোচিমিন সিটি পার্টির গেস্ট হাউজে অবস্থান করেছি। গেস্ট হাউজগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। সময়মত খাবার টেবিলে হাজির হয়ে দেখতাম প্রিন্ট করা কার্ডসহ খাবারের মেনু উল্লেখপূর্বক সুসজ্জিত টেবিলে পরিবেশন করা হতো। খাবার হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন চেনা সব খাবার, কবুতর, চিংড়ি, আইড়সহ নানা ধরনের চেনা মাছসহ সামুদ্রিক মাছ ও সবজির মধ্যে ঢেড়স, শসা, ধনিয়া পাতা, পুদিনা পাতা এবং ফল লিচু, কলা, কমলা ও অন্যান্য। প্রত্যেকবার খাবার শেষে গ্রিন টি বা সেই এলাকার কোনো সবুজ পাতার গরম রস দেওয়া হতো। যা হজম ক্রিয়ায় সহায়তা করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে বিধ্বস্ত অবস্থা কাটিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর ও উন্নত। সমাজতান্ত্রিক দেশে বিভিন্ন দেশের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে গাড়ি থেকে শুরু করে নানা ধরনের শিল্প কারখানা স্থাপন এবং উন্নত কৃষি কাজের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে এত দ্রুত উন্নত হতে পেরেছে। ভিয়েতনামের জনগণকে দেখেছি যার যার মত কাজ করছে, গণতান্ত্রিক ও সুশৃঙ্খল অবস্থা দেখে আমার মনে হয়েছে দীর্ঘদিন গেরিলা যুদ্ধ করার কারণে তারা জাতিগতভাবে ঐক্য বিপ্লবী শৃঙ্খলা অর্জন করেছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..