মহা বাজেটের মহা ধোঁকা-চালের কেজি পঞ্চাশ টাকা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আলতাফ হোসাইন: মোটা চাল বাজারে বিক্রি হচ্ছে স্থান ভেদে ৪৮ টাকা থেকে ৫০ টাকায়। ফলে ছয় সদস্যের একটি পরিবারে দৈনিক যেখানে চাল লাগতো ৩ কেজি সেখানে তাকে কিনতে হচ্ছে ২ কেজি। ফলে অর্ধাহার কখনোবা অনাহার দিয়ে কোনোভাবে দিন কাটাতে হচ্ছে একজন শ্রমজীবী মানুষের পরিবারকে। আর এভাবে ক্ষুধা আর অপুষ্টিতে দ্রুতই আক্রান্ত হচ্ছে গরিব পরিবারের ছোট ছোট শিশু নারীসহ পরিবারের বয়স্ক সদস্যকেও। অথচ আমার দেশের কৃষিমন্ত্রী কি আয়েশি ভঙ্গিতে বগল বাজিয়ে প্রচার করলেন- দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ। শুধু স্বয়ং সম্পূর্ণ নয় উদ্ধৃত্ত চাল এখন বিদেশের বাজারে আমরা রফতানি করতে পারি। এমনকি আই ওয়াশের জন্য কয়েক হাজার মণ চাল শ্রীলঙ্কার বাজারে রফতানি করে দেশবাসীর কাছে স্বস্তা বাহবা নেয়ার মত চমকও দেখালেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই যে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ দেশ এবং চাল উদ্ধৃত্ত– তাহলে এসব গেল কোথায়? সব কি নিমিশেই করপুরের মত হাওয়া হয়ে গেল? নাকি সবটাই ছিল সরকারের পলিটিক্যাল স্ট্যান্ডবাজি। বলা হচ্ছে হাওরের ঢল এসে ধান ডুবিয়ে দিয়েছে। স্থান বিশেষে ‘ব্লাষ্ট’ নামক এক ধরনের রোগের কারণে- ফসলহানি হয়েছে তাই এই অবস্থা। যদি তাই হয়- সেই ক্রাইসিস তো তৈরি হবে চলতি মৌসুমী চাল উঠার পরে। কিন্তু তা না হয়ে চালের ক্রাইসিসটা শুরু হলো মৌসুমী চাল বাজারে আসার আগেই কেন? তাছাড়া হাওরের উৎপাদিত ফসলের পরিমাণটাই বা কত! পরিসংখ্যানবিদদের মতে তা দেশে খাদ্য শষ্যের যে চাহিদা তার ১/৫ পূরণ হয় এই হাওরের উৎপাদিত খাদ্য শষ্য দিয়ে। আর ব্লাষ্ট রোগের প্রকোপ এমন বেশি ছিল না যে তা দেশে খাদ্য শষ্য উৎপাদনে ব্যাপক মহামারি সৃষ্টি করেছে। স্থান বিশেষে দুই একটি অঞ্চলকে এই রোগ সাময়িক কিছু ক্ষতি করেছে বটে তবে তা কোনো মহামারী আকার ধারণ করে নাই। তাহলে এই চাল নিয়ে যে চালবাজী চলছে তার আসল কারণটি কি? তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। এটি সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব নাকি সবটাই ফাঁকা স্ট্যানবাজী। সরকার খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কায় তড়িঘড়ি করে আমদানি চালের উপরে করের বোঝা ১৮ ভাগ কমিয়ে ২৮ থেকে ১০ ভাগে নামিয়ে এনেছেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না করে এভাবে হুট করে শুল্ক কমিয়ে দিয়ে চালের আমদানি বাড়িয়ে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার যে উদ্যোগ গ্রহণ তাই বা কতটুকু বিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্ত। চাল যদি সত্যি বাজারে নাই থাকে তবে সরকারের এত দিনের ঢাকঢোল পেটানোর আওয়াজ আর বক্তৃতা-বিবৃতি ছিল নিছকই ফাপা বেলুন নাকি সবটাই পলিটিক্যাল স্ট্যান্ডবাজি। যদি স্ট্যান্ডবাজীই হয় তবে দেশে খাদ্য শষ্য উপাদানে তেমন একটা প্রভাব হয়তো পড়বে না। কিন্তু যদি এটা কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য একটা সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার অংশ হয় তবে সরকারের এই অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়ে যাবে। কেননা সরকারের অপরিকল্পিত আমদানি নীতির কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীরা আতঙ্কগ্রস্থ হবে যদি তড়িঘড়ি করে তাদের মজুদকৃত চাল বাজারে হুড় হুড় করে ছেড়ে দেয়া শুরু করে তবে চালের বাজার হঠাৎ করেই নিম্নগতি পাবে। তাতে হয়ত সরকার সাময়িকভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে- গরিব দুঃখি মানুষও হয়ত সাময়িকভাবে হাফ ছেড়ে বাঁচবে ঠিকই কিন্তু এর কু-প্রভাব যে কত সুদূরপ্রসারী হবে তা টের পাওয়া যাবে খুব শীঘ্রই। কারণ এমত পরিস্থিতিতে চালের বাজারে অতি ঝড় এসে পড়বে ধানের বাজারে। ধানের মূল্য হু হু করে কমতে থাকবে। আর তার পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ। কেননা কৃষককূল এমনতিইে তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে দিশেহারা– তার উপরে এই অপরিকল্পিত আমদানি নীতি মরার উপরে খাড়ার ঘাঁ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে কৃষক খাদ্য শষ্য উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে এবং তার পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ। দেশে পুনরায় ধীরে ধীরে একটা স্থায়ী খাদ্য সংকটের দিকে ধাবিত হবে। আর তখন সরকারকে বগল বাজানোর পরিবর্তে শূণ্য তালা বাজাতে হবে। সংগ্রামী পাঠকবৃন্দ- এই হলো আমাদের দেশের কৃষি ব্যবস্থা। আর এই হলো আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কৃষি এখনও কর্মসংস্থানের দিক থেকে এই দেশের একটি বৃহৎ খাত। অথচ এই খাতটি একটি দৃশ্যমান অবহেলা ও অনাদরের কারণে তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কৃষিতে সরকারের কোনো নীতিমালা নেই। কৃষি চলছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এখানে যতটুকু সাফল্য তার বিন্দুমাত্র কৃতিত্ব কোনো সরকারের নেই। কৃষককূল তার নিজস্ব সৃজনী শক্তি, নিজস্ব শ্রম আর ঘাম দিয়ে এই কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অথচ প্রতি সরকারের আমলে দেখা যায় কৃষিতে বাড়তি প্রণোদনা দেয়া যেখানে জরুরি সেখানে উলটো সার, বীজ, কীটনাশকসহ সকল কৃষি উপকরণের মূল্য দফায় দফায় বৃদ্ধি কৃষকসহ গোটা কৃষি ব্যবস্থাটাকে একটা দুর্বিসহ অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কৃষির মত এই একটি বৃহৎ খাতে যখন এই অবস্থা ঠিক সেই মুহূর্তে সরকার ২০১৭-১৮ সালের বাজেট দিয়েছেন এবং বাজেট ইতোমধ্যে সংসদে অনুমোদিত হয়েছে। এই বাজেটকে অর্থমন্ত্রী তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ বাজেট বলে ঘোষণা দিয়েছেন। বাজেট নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এই বাজেট অর্থমন্ত্রীর জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ প্রতারণা। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রণিত বাজেট আকারে বৃহৎ হলেও প্রকারে এটি একটি ক্ষুদ্র কারচুপির বাজেট। কেননা এই বাজেটে ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের কোনো সঙ্গতি নেই। বিশাল বিশাল চোখ ধাধাঁনো প্রকল্প দিয়ে বাজেটের আকার বাড়িয়ে তোলা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এত টাকার বাজেট (যার পরিমাণ ৪ লাখ ২৬৬ হাজার কোটি টাকা) নির্বাহ কিভাবে হবে সরকারের সে ব্যাপারে কোনো পরিসংখ্যান নেই। আয়ের থেকে ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এবারের বাজেট একটি বিশাল ঘাটতির বাজেট। তার উপরে জনগণের পবিত্র আমানতের উপরে আবগারী শুল্ক চাপিয়ে এবং ভ্যাট নামক একটি দুঃশ্চরিত্র ও অপ্রত্যক্ষ করের বোঝা সাধারণ জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সরকার তার বিশাল বাজেটের ব্যয় নির্বাহ করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার যে পাঁয়তারা করেছিল তাও জনগণের প্রবল চাপের কারণে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হওয়ায়-বাজেট ঘাটতির পরিমাণ এখন আরও বেড়ে গেল। সরকারকে এখন এই বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে নানা অসৎ কর্মকাণ্ডের আশ্রয় ও প্রশ্রয় নিতে হবে। সাংবাদিকরা যখন অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করে এত বড় ঘাটতির টাকা মিটআপ হবে কিভাবে। অর্থমন্ত্রী তার স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলেছেণ- কেন ঋণ করে। আবারো যখন তাকে প্রশ্ন করা এত আসবে কোথা থেকে? তখন তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেন কেন বিদেশ থেকে। স্বনির্ভর অর্থনীতির প্রবক্তা- আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য অর্থমন্ত্রীর কি বিন¤্র প্রস্তাবনা। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা কি বলে বাজেট বর্ষের শেষ প্রান্তে এসে সরকারকে অর্থের অভাবে হয় প্রকল্প কাটছাট করতে হয়েছে নয়তো বা দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপরে ঘাড় মটকে কোনোভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহ করতে হয়েছে। ফলে ব্যক্তিখাতে ঋণ প্রবাহে যেমন বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে- ঠিক একইভাবে বিদেশি বিনিয়োগ তো আসেই নাই উল্টো দেশীয় বিনিয়োগ খাতে নেমেছে শ্লথগতি। ফলে সরকার জি.ডি.পি হারের পরিমাণ যতই স্থিতিস্থাপক দেখাক না কেন সেই জিডিপির গ্রোথ নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বেকারত্ব বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমাগতহারে বেড়েই চলেছে। সুতরাং এই অপরিকল্পিত বাজেট যখন বর্ষশেষে এসে একটা মহা হিমশিম অবস্থায় হাবুডুবু খাবে তখন দেখা যাবে সরকার দেশের প্রয়োজনীয় ও জরুরি যেমন স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতের মত জনগুরুত্বপূর্ণ এ খাতের নানা প্রকল্প কাটছাট করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে। কেননা এত ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারের প্রশাসন যন্ত্রের যে সক্ষমতা বিশেষ করে নায্য কর আদায়ের ক্ষেত্রে যা দরকার তা নেই। তার সঙ্গে যুক্ত হবে দুর্নীতি। সুতরাং অর্থমন্ত্রীর শ্রেষ্ট এই বাজেট জাতির জন্য একটি শ্রেষ্ট পরিহাস কিনা তা দেখার জন্য দেশবাসীকে খুব একটা বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। সম্মানিত পাঠকবৃন্দ- বাজেটের সূচনায় আছে একটা বড় গলদ। প্রতি দেশে প্রতিটি সরকারের ঘোষিত বাজেটের একটা দর্শন থাকে। সেই দর্শনের উপরে রচিত হয় বাজেট। আমাদের সরকারেরও আছে এমন একটি দর্শন। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের সরকারগুলির দর্শন হলো ধনীক তোষণ নীতি। আর সেই কারণে অর্থনীতিতে এযাবতকাল ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে যে নীতি বা দর্শন তা হলো মুক্তবাজার অর্থনীতি। যা কিনা দেশের বিদ্যমান সংবিধানের পুরোপুরিভাবে সাংঘর্ষিক। কেননা সংবিধান যে দিক নির্দেশনা দেয় তা হলো একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিক নির্দেশনা। যেখানে খোলাবাজার বা মুক্তবাজার নীতির কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ আমাদের দেশের বুর্জোয়া ধারার রাজনৈতিক দলগুলি সংবিধানের সঙ্গে বৈপরিত্য সেই খোলা বাজার নীতিকে অবলীলায় এদেশে চালিয়ে যাচ্ছে। দেশে এ ব্যাপারে শ্রমজীবী মানুষের কিংবা মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কোনো সুসংগঠিত আন্দোলন সংগ্রাম না থাকায় এই বিপরীত ধর্মী একটা অর্থনৈতিক নীতিমালাকে অনায়াসে চালিয়ে নিতে তারা সক্ষম হচ্ছে। ফলে সংকট দূরিভূত হচ্ছেই না— উল্টো দিনের পর দিন এই প্র্যাকটিস দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গণকে আরও গভীর থেকে গভীরতর সংকটের দিকে ঠেলে নিচ্ছে। ধন বৈষম্য, শ্রেণি বৈষম্য দিনে দিনে এত বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে যে গোটা সমাজ জীবনকে তা ক্ষয়ে ক্ষয়ে খাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী গণআন্দোলন যত তাড়াতাড়ি গড়ে তোলা যায়— ততই মঙ্গল। তাই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে সংগঠিত হওয়ার পথে মনযোগী হতে হবে। লেখক : সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..