উন্নয়ন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দেশে ‘উন্নয়ন’, ‘গণতন্ত্র’ দরকার, সামাজিক-অর্থনৈতিক ‘ন্যায় বিচার’ দরকার। দরকার অনেক কিছুই। সরকার আসে যায় ঠিকই, তথাপি সব সরকারই বলছে- আগে ‘উন্নয়ন‘ হোক, তারপরে ‘গণতন্ত্র’, ‘ন্যায় বিচার’ ইত্যাদির দিকে নজর দেয়া যাবে। এক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হলো, একটি ‘উন্নয়নশীল’ দেশের জন্য ‘গণতন্ত্র’ হচ্ছে বিলাসিতা। যেটুকু ‘গণতন্ত্র‘ দেশের মানুষ পেয়েছে, সেটুকুই বরঞ্চ বেশি হয়ে গেছে। ‘উন্নয়নের’ স্বার্থে তা বরঞ্চ আরো কাট্ছাট্ করা প্রয়োজন। আর, ‘উন্নয়ন’ না হলে সামাজিক-অর্থনৈতিক ‘ন্যায়বিচার’ অর্জন করার প্রশ্ন তোলাটিই হয়ে থাকবে অবান্তর। অতএব, ‘উন্নয়নের’ স্বার্থে ‘গণতন্ত্রহীনতা’, সামাজিক-অর্থনৈতিক ‘বৈষম্যের’ ক্রমবৃদ্ধি মেনে নিতে হবে। ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ন্যায়বিচারের’ ক্ষেত্রে জনগণকে এই ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। এভাবেই, নীতি-দর্শনের দিক থেকেই, গণতন্ত্রহীনতা-বৈষম্য-লুটপাট ইত্যাদিকে তারা তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ স্বাভাবিক অনুসঙ্গ রূপে তুলে ধরছে। দেশের ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেপরোয়া ‘লুটপাট’ চলছে। বহুল আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারি, সোনালী ব্যাংক-বেসিক ব্যাংকে অর্থ কেলেঙ্কারি, কয়েক দফা শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি ইত্যাদি হলো তার কয়েকটি নিদর্শন মাত্র। এগুলোর বাইরেও অসংখ্য ছোট-বড় অর্থ আত্মসাতের ঘটনার খবর প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে। তাছাড়া, যে সব ঘটনা প্রচারে আসে তার বাইরে কয়েক গুণ বেশি সংখ্যক এরূপ ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। ব্যাংকে ঋণখেলাপির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে এখন দেড় লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ ১ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি। ‘উন্নয়নের’ নমুনা দেখানোর জন্য দেশে চোখ ধাঁধানো কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব বড় বড় প্রকল্পে যে বিপুল অর্থ খরচ করা হচ্ছে তাও হয়ে উঠেছে লুটপাটের উৎস। উদাহরণ হিসেবে ফ্লাইওভার নির্মাণের খরচের দৃষ্টান্তটি দেখা যাক। কলকাতায় পরমা পার্ক সার্কাস ফ্লাইওভারের জন্য কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি টাকা, বাটা নগর ফ্লাইওভার নির্মাণে খরচ হয়েছে কিলোমিটার প্রতি ৪৪ কোটি টাকা, মালয়েশিয়ায় নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি খরচ পড়েছে ৫৭ কোটি টাকা, চীনে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ৫০ কোটি টাকার সামান্য কম বা বেশি। অথচ গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে কিলোমিটার প্রতি ২৪১ কোটি টাকা। যা কিনা এসব হিসেবের চেয়ে ৪/৫ গুণ বেশি অর্থাৎ অথচ বাংলাদেশে একজন নির্মাণ শ্রমিকের মজুরি ভারতের তুলনায় ৫০ শতাংশ, চীনের তুলনায় ১৭ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ার তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ কম। কয়েকগুণ বেশি ব্যয় হওয়ার কারণ যে স্বাভাবিক বাড়তি খরচ নয়, বরঞ্চ তা যে ‘কমিশন খাওয়া’ সহ নানা পন্থায় বিপুল পরিমাণের বেপরোয়া লুটপাট– সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। গত চার দশক ধরে দেশের সরকারগুলো যে ‘উন্নয়ন’- কৌশল অনুসরণ করছে তাতে লুটপাটের আয়োজন বৃদ্ধি করতে পারাটি হয়ে থাকছে ‘উন্নয়নের’ প্রাথমিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। গরিব-মধ্যবিত্তকে বঞ্চিত করার ও দেশের সম্পদ লুটে নেয়ার সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমেই দেশের ১ শতাংশেরও কম মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। ফলে ‘বৈষম্য’ বেড়েই চলেছে। ‘উন্নয়নের’ এই অমানবিক ও যন্ত্রণাদায়ক পথ ছাড়া দেশের অগ্রগতির অন্য পথ আছে। ‘লুটপাটকে‘ ভিত্তি করে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের সমতাভিত্তিক দেয়া-নেয়ার ধারায়, পরিকল্পিত পদ্ধতিতে, অসহনীয় ‘প্রসব বেদনার’ জন্ম না দিয়েই, আরো দ্রুত ও মানবিক পন্থায় উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব। মহান মুক্তিযুদ্ধ সে পথ ধরে চলার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল। সেই পথ ধরেই দেশ অগ্রসর হবে– এটিই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন। দেশকে সেই পথে ফেরাতে হবে। বঞ্চিত ৯৯ শতাংশ মানুষের পুনর্জাগরণই তা সম্ভব করে তুলতে পারে।
সম্পাদকীয়
ঘুষ-দুর্নীতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..