সিরিয়ায় কি মরণ কামড় দেবে আইএস?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বিক্রমিজিৎ ভট্টাচার্য : দু’বছর আগে ২০১৪-র গ্রীষ্মে বর্বর সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস যখন ইরাকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছিল, মসুল শহর ছিল তাদের দখলের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল। সুন্নি সম্প্রদায় প্রধান শহরের জনসংখ্যা ছিল ১৪ লক্ষ। শহর দখলের পরেই জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক প্রাণভয়ে মসুল ছেড়ে পালিয়ে যান। তারপরেও প্রায় ৬ লক্ষের বেশি মানুষকে নিয়ে তৈরি হয় আইএস এর ইরাকের রাজধানী মসুল। ফলে মসুল শহর হল আইএস-এর ‘খিলাফত’ সাম্রাজ্যের বিশ্বাজোড়া বিজ্ঞাপনেরও একটা বড় ছবি। গত অক্টোবর থেকে পায় আট মাস যুদ্ধ চলার পরে এই মসুল আজ আইএস মুক্ত হয়েছে। ইরাকি সেনা, বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী, কুর্দি পেশমারগা সেনারা একত্র হয়ে লড়েছে আইএস এর বিরুদ্ধে। এই একত্রিত বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছে মার্কিন বিমান বাহিনী ও সেনাবাহিনীর একটা অংশ। মার্কিনীদের নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টিই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, কারণ আইএস’কে গড়ে তোলার ব্যাপারে মার্কিন আর সৌদিদের অবদানই ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রকাশ্যে গলা কেটে খুন, শরিয়া আইন জারি করে নির্বিচারে হত্যা, দলবদ্ধ ধর্ষণ, জোর করে যৌনদাসী নিয়োগ-দু’বছরের আইএস শাসনের এই বিকৃত রূপ দেখেছে মসুলসহ গোটা বিশ্ব। মসুল শহর জুড়ে ছিল আইএস চেকপোস্ট। প্রতিনিয়ত চলেছে বিরামহীন অত্যাচার। আর শেষ মুহূর্তে এই শহর দখলে রাখার জন্য একেবারে বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল আইএস। কারণ এই শহরের ঐতিহাসিক আল-নুরি মসজিদে দাঁড়িয়েই স্টেনগানে হাত রেখে বিশ্বজুড়ে তাদের খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেছিল তাদের নেতা আবু বকর আল বাগদাদি। গত সপ্তাহে কোণঠাসা হয়ে সেই মসজিদটাই বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয় আইএস। মসুল আজ মুক্ত হয়েছে কিন্তু এক কথায় মসুল শহর এখন সাধারণ মানুষের জন্য ধ্বংস্তুপ। মৃত্যুপুরী। এই বছর মসুলেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং জটিল মানবিক সংকট হবে, জাতিসংঘ আগেই এই মত ব্যক্ত করেছিল। তাই বিপর্যয়ের কথা সামনে রেখে জাতিসংঘ মসুলের বাইরে নতুন শরণার্থী শিবির স্থাপনের লক্ষ্যে একটানা কাজ করেছে। এখনও পর্যন্ত প্রায় তিন লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছেন। জাতিসংঘের ধারণা আরও প্রায় ১ লক্ষ মানুষ নতুন করে শরণার্থী হিসাবে নাম লেখাবেন। ইতিমধ্যেই মৃতের সংখ্যার কোনো হিসাব নেই। মসুল শহরের নিরীহ মানুষের মৃত্যু দু’ভাবে হয়েছে- এক. আইএস জোর করে তাদের মানববোমা এবং মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে, দুই. মার্কিন বোমারু বিমান থেকে আছড়ে পড়া সালফার তাদের প্রাণ নিয়েছে। অন্যদিকে সিরিয়া সরকার আগেই এই আশঙ্কা প্রকাশ করেই রেখেছে যে মসুল থেকে তাড়া খেয়ে সিরিয়ায় তাদের মুক্তাঞ্চল রাকা শহরে ঢুকে আইএস শেষ মরণপণ যুদ্ধটা করবে সিরিয়া সরকারের সঙ্গেই আর এতে আমেরিকা মজা দেখবে কারণ তারা ঠিক এটাই চায়। আর সিরিয়ার এই ধারণাও খুব একটা ভ্রান্ত নয় কারণ, বাসার আল আসাদের সরকারের পতন ঘটানোসহ সিরিয়া-ইরাকের রাজনৈতিক ভূগোল বদলে দেবার জন্যই আইএস কে আমেরিকা ও সৌদি আরব একটানা অস্ত্র ও অর্থ জুগিয়ে গেছে প্রথমদিকে। কিন্তু পরবর্তীতে আইএস তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াতেই মার্কিনীদের অবস্থান বদল ঘটেছে। ফলে আইএস আজ তাদের যাবতীয় রসদ হারিয়ে পতনের মুখে। আবার, আইএস এর নিয়ন্ত্রিত কোনো শহর আজ নেই বলে যে একেবারে শান্তি ফিরে আসবে- এরকম ভাবাটাও মারাত্মক ভুল হবে। কারণ আইএস-এর সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই পালিয়ে গেছে এবং এই উপদ্রুত অঞ্চলে লাগাতার চোরাগোপ্তা হামলা তারা চালিয়ে যাবে। খোদ আমেরিকার ‘কমব্যাটিং টেরোরিজম সেন্টার’ এর তথ্যই বলছে - ইরাকের প্রায় ১৬টা শহর আইএস-এর দখল মুক্ত হওয়ার পরেও সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে প্রায় দেড় হাজার বার। ফলে ইরাক সিরিয়ার আইএস অধ্যুষিত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শান্তি ফিরবে এটা কোনোভাবেই বলা যায় না। এমনিতেও আরব-কুর্দি, শিয়া-সুন্নি গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে এই অঞ্চল জটিল রাজনীতির ক্ষেত্র। আসলেই লক্ষ লক্ষ নিরীহ নিরপরাধ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এক জটিল রাজনীতির পাশাখেলা চলছে ইরাক, সিরিয়া ও আইএস নিয়ে। এই যুদ্ধে প্রতি মুহূর্তে পট পরিবর্তন হচ্ছে। মস্কো ও দামাস্কাস সম্মিলিতভাবে কড়া নজর রেখে চলেছে এই মসুল শহরের শেষ পরিণতির পরেও আরও কি হয় হয় তা দেখার জন্য আর সেই সাথে আমেরিকাও যাতে কোনো রকম চালাকি করে সিরিয়ার অভ্যন্তরে না ঢুকতে পারে সেটাও নিশ্চিত করার জন্য।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..