জেগে উঠছে হাওরবাসী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জলি তালুকদার: হাওরাঞ্চলে এবারের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরও জনদাবি মেনে জলমহালের ইজারা স্থগিত করেনি সরকার। তাই হাওরের ফসলহারা কৃষকদের উপর এখন শুরু হয়েছে ইজরাদারদের উৎপাত। এবার মাছ ধরার অধিকারের প্রশ্নে যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সোচ্চার হাওরবাসী। তাই জলমহালের ইজারা বাতিল করে ভাসান পানিতে মাছ ধরার আওয়াজ উঠেছে আজ ভাটির ঘরে ঘরে। কমিউনিস্ট পার্টি, ক্ষেতমজুর সমিতি, কৃষক সমিতি দীর্ঘদিন ধরে ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। এবারের হাওর বিপর্যয়ের পর আন্দোলনের শুরু থেকেই বাঁধের টাকা লুটপাটকারী সরকারি কর্মকর্তা, অসৎ ঠিকাদার, লুটেরা জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবারহ, ত্রাণ লুটপাট বন্ধ, ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকারের দাবিতে ধারাবাহিক সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ গত ৯ জুলাই সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বে জলমহাল ইজারা স্থগিত করে ভাসান পানিতে মাছ ধরার দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করা হয়েছে এবং সর্বসাধারণকে হাওরে মাছ ধরতে নামার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। মাছ ধরতে কোনো ধরনের বাধা আসলে লাল ঝান্ডা নিয়ে তা মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। হাওরে মাছ ধরার দাবিতে হাওরবাসী ইতিমধ্যে কৃষক, ক্ষেতমজুর সংগঠন এবং পার্টির নেতৃত্বে হাওর কনভেনশন, গ্রামে গ্রামে সভা সমাবেশ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সামনে বিক্ষোভ, ঘেরাও কর্মসূচি, প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি প্রদানসহ নানান কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন অগ্রসর করা হচ্ছে। আশির দশকে কমিউনিস্ট পার্টি এবং ক্ষেতমজুর সমিতির নেতৃত্বে ভাটি অঞ্চলে ইজারা প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই সংগ্রাম গড়ে উঠলে অনেক হাওরেই জলমহাল সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিল প্রশাসন। পরবর্তীতে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নানা মহলের চক্রান্তে সেগুলো আবারও ইজারাদারদের হাতে চলে যায়। যে দল যখন ক্ষমতায় এসেছে তখন সেই দলের প্রভাবশালী নেতারা জলমহালগুলো ভোগদখল করেছে। সেইসব ভোগদখলদারদের বিরুদ্ধে হাওরবাসী আবারও জোট বেঁধেছে। হাওর অপরূপ, সাগরের মত বিস্তীর্ণ জলামগ্ন এলাকা- তার মাঝে গ্রামগুলো সব দ্বীপের মত। বছরের অর্ধেক সময় পানি আর বাকি সময় ফসলের মাঠ। বৈচিত্র আর সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি দেশের হাওর অঞ্চল। হাওর অঞ্চলের মানুষকে বাঁচতে হয় প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে। যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই, সে প্রকৃতিই আবার দু’হাত ভরে সম্পদ দিয়ে হাওরকে অফুরাণ প্রাকৃতিক সম্পদের আধার করেছে। হাওর এলাকা দেশের বিশাল খাদ্যভাণ্ডার। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বাঁচা এখানকার সাহসী এবং লড়াকু মানুষগুলো সারা দেশের মানুষের খাবার যোগান দেয়। এবারের হাওর বিপর্যয়ের পর তারা অনাহারে এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা মাথায় নিয়ে দিন গুনছে। আসলে এক নিরব দুর্ভিক্ষের পথে এগিয়ে যাচ্ছে গোটা হাওরাঞ্চল। প্রতি বছরের মতো এবারও হাওরের হাজার হাজার মানুষ সব শক্তি দিয়ে বাঁধ রক্ষা করার জন্য লড়াই করেছে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে দিনরাত আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল তারা যাতে কোনো রকমে বাঁধ রক্ষা করা যায়। হাওরের মানুষের অভিজ্ঞতা হলো প্রকৃতি কখনো একসাথে সবকিছু কেড়ে নেয়নি। কিন্তু মানুষের তৈরি যে বিপর্যয় হাওরের সহজ সরল মানুষগুলো সেটা কিভাবে মোকাবেলা করবে, ফলে কিছু মানুষের লুটপাটের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়ে তারা আজ সর্বস্বান্ত। যাদের বাঁধ রক্ষা করার দায়িত্ব ছিল বরাদ্দের টাকা তারা লুটপাট করেছে। হাওরগুলো আজ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বা পিআইসি, দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা, অসৎ ঠিকাদার, লুটেরা জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই লুটপাটই এবারের অকাল বন্যার অন্যতম একটি কারণ। এছাড়া নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পাহাড়ে অতিরিক্ত গাছ কাটা, পাথর সরিয়ে ফেলার ফলে পাহাড়ের বৃষ্টির পানি অসময়ে সরাসরি হাওরে চলে আসে। এবারের বন্যার ভয়াবহতা অতীতের সকল নজির ছাড়িয়ে গেছে। হাওরে সাধারণভাবে জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক এই ছয় মাস পানি থাকে আর অগ্রহায়ন থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত থাকে শুকনা। যে চৈত্র মাসে হাওর ফসলে ভরা থাকার কথা এবার সেই সময়ে হাওরে থৈ থৈ পানি। এনজিও এবং মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করে কৃষক পেল শুধু নয়ন ভাগা। পাকা ধান যখন পানির নিচে তলিয়ে যায়, সেই দৃশ্য অসহায়ের মতো দেখা ছাড়া কৃষকের আর করার কিছুই থাকে না, গভীর কষ্টবোধ থেকে কেউ এর নাম দিয়েছিল নয়নভাগা। এবার হাওরের নিঃস্ব রিক্ত কৃষকের নয়নের সেই ভাগ বহুগুণ বেড়েছে। হাওরের হাজার হাজার টন মাছ মরে ভেসে উঠতে কৃষক দেখেছে, যদিও সেখানে মাছ ধরার অধিকার তার নেই অনেকদিন ধরেই। হাঁস, কাকড়া ব্যাঙসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর মৃত্যুর পরিমাণ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। খাদ্যাভাবে গবাদি পশু পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে গৃহস্থ। হাওরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে, হাজার হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে কাজের সন্ধানে শহরে ভীড় করছে। এবারের অকাল বন্যায় হাওরে আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতির হিসাব উত্থাপন করায় প্রধানমন্ত্রী ভীষণ ক্ষেপে গিয়েছিলেন। হাওরের অসহায় মানুষগুলোর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব গোপন করে মধ্যম আয়ের ভাবমূর্তি ও উন্নয়ন রক্ষা করতে চেয়েছেন তিনি। এই পরিস্থিতির সুযোগে সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পর্যন্ত হাওরবাসীর দুর্দশা নিয়ে উপহাস করেছে। রাষ্ট্রপ্রধানের এমন ভূমিকায় হাওরের নীরব দূর্ভিক্ষ ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। হাওরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী রিকশায় চড়েছেন সেই ছবি ফলাও করে প্রচার হয়েছে কিন্তু হাওরকে দূর্গত এলাকা ঘোষণা করা হয়নি। সেখানকার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ দেয়া এবং ত্রাণ লুটপাট বন্ধ করার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। কৃষি, এনজিও এবং মহাজনী ঋণ মওকুফের উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। যে দু’তিনটি এলাকায় প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি গিয়েছিলেন সেইসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষই সরকারি বরাদ্দ পাননি। উল্টো দলীয় লোকজনের দুর্নীতি বেড়েছে। এই সুযোগে সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় লোকজন ‘ঘর পোড়ার মধ্যে আলুপোড়া দিয়েছে’। প্রথমে বাঁধের টাকা এখন ত্রাণ লুটপাট করছে। ফলে হাওরাঞ্চলের মানুষ পেয়েছে ঘোড়ার ডিম। সরকারের ভুলনীতি, দুর্নীতি ও লুটপাটের ফলে ভাটির দুই কোটি মানুষ আজ এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। কিন্ত আগাম বন্যায় ধান গাছ পচে তৈরি হওয়া এ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে মাছ, হাঁসসহ অসংখ্য জলজ প্রাণী মারা যায়। তাছাড়া মেঘালয় পাহাড়ে অপরিকল্পিত কয়লা, পাথর ও ইউরেনিয়াম খনির ফলে ভাটির উর্বর ভূমি এবং জলাভূমি ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নত ও উচ্চফলনশীল ধান উৎপাদন করতে গিয়ে একদিকে হাওরের নিজস্ব জাতের ধান ধ্বংস হয়েছে, অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরা শক্তি নিঃশেষ হয়েছে। ফলে আজ হাওরের প্রাণ-প্রকৃতি জীববৈচিত্র এক ধরনের হুমকির মধ্যে পড়েছে। ধান গেছে এখন মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা তাদের একমাত্র বাঁচার অবলম্বন। হাওরের উন্মুক্ত পানিতে মাছ ধরার সুযোগ পায় না ভাটি এলাকার মানুষ। ইজারাদারদের দৌরাত্মের কাছে সাধারণ মানুষ সত্যি অসহায়। ইজারাদারদের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। এ এলাকার মানুষের বাড়ি, জমি, হাওর এর উপর রাজত্ব করছে বাইরের প্রভাবশালি এবং সরকার দলীয় লোকজন যারা এখানে ‘ওয়াটারলর্ড’ নামে কুখ্যাত। হাওর এলাকায় তাদেরই রাজত্ব চলে, না খেয়ে মরলেও নিজের জমিতে মাছ ধরার অধিকার ভাটির মানুষের নেই। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হয়েছে বহু আগে কিন্তু ওয়াটারলর্ডদের অত্যাচারে ভাটি এলাকার মানুষের জীবন আজও দুর্বিসহ অবস্থার মধ্যেই আছে। ইজারা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা না করে রাজস্ব আদায়ের নামে রাষ্ট্র ক্ষমতাশীল দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লুটপাটের এই বিরাট ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। সরকার যত একর জমি ইজারার জন্য বরাদ্দ করে তারা এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইজারাদারদের দৌরাত্ম এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, সাধারণ কৃষকের জমি, এমনকি বাড়ির ঘাট পর্যন্ত দখল হয়ে যাচ্ছে। যার দরুন সাধারণ কৃষক বা জেলে তার নিজের জমিতে মাছ ধরা তো দূরের কথা বাড়িতে যে পানি আসে সেখানে পর্যন্ত মাছ ধরতে গেলে ইজারাদারদের লাঠিয়াল বাহিনী জাল কেড়ে নিয়ে যায় এবং হামলা চালায়। হাওরের সমস্যা রাজনৈতিক, লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী ও কর্পোরেট স্বার্থের কবল থেকে হাওর বাঁচাতে হবে। হাওরের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে সংগ্রামী। তাদের লড়াকু বৈশিষ্টের কারণেই একটা মাত্র ফসল বার বার ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পরও প্রতিবারই সাহস নিয়ে নতুন করে ফসল বুনেছে। আজ হাওরবাসীর সামনে বাঁচা মরার প্রশ্ন। সমস্ত ধান তলিয়ে গেছে, মাছ ধরা ছাড়া এখন আর কোনো কাজ নাই হাওরে। লক্ষ লক্ষ হাওরবাসীর জন্য সরকার কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেনি। উল্টা হাওর ইজারা দিয়ে তাদের বাঁচার অবলম্বনটুকু কেড়ে নিয়েছে। ফলে আজ হাওরের মানুষ নিজেদের জমিতে পর্যন্ত মাছ ধরতে পারে না। তাই আজ আবার ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার আদায়ে মরণপণ লড়াইয়ে নামতে প্রস্তুত হাওরবাসী।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..