লিচুর থোকায় ঝুলছে কৃষকের হাসি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
পাবনা সংবাদদাতা : পাবনার লিচু বাগানগুলোতে পাকা, আধা-পাকা লিচুতে দুলছে কৃষকের হাসি। লিচু চাষিরা হাজার কোটি টাকার উপরে লিচু বিক্রির সম্ভাবনা দেখছেন। লিচুর ‘রাজধানী’ ঈশ্বরদীসহ পাবনার বিভিন্ন অঞ্চলের বাগানগুলোতে গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে আধাপাকা রসালো ফল লিচু। ইতোমধ্যেই দেশি (মোজাফফরপুরী) জাতের লিচু বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এখনও ১৫/২০ দিন সময় লাগবে বোম্বাই ও চায়না জাতের সুস্বাদু লিচু বাজারে আসতে। বৈরি আবহাওয়ার কারণে এ বছর পাবনা জেলার লিচু বাগানগুলোর প্রায় ৩০ ভাগ গাছে লিচু ধরেনি। লিচু কম ধরার কারনে চাষিরা বাজারে ভালো দাম পাবেন বলে আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু বোম্বাই ও চায়না জাতের লিচু পাকার ভরাভরি সময়ে রমজান মাস শুরু হওয়ায় লিচুর চাহিদা অনেকটাই কমে যাবে বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন বাগান মালিক এবং লিচু ব্যবসায়ীরা। পাবনার লিচু ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়ে থাকে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে পাবনা জেলায় এবার ১ হাজার কোটি টাকার বেশি লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। এ এলাকার লিচু চাষি ও ব্যবসায়ীরা দিনরাত ধরে লিচুর শত্রু বাদুর আর কাঠবিড়ালি তাড়াতে টিনের তৈরি ঠংঠং শব্দ তৈরির রশি টানতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পাবনা জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলার পাবনা সদরে ৭২৫ হেক্টর, আটঘরিয়াতে ৩৫ হেক্টর, ঈশ্বরদীতে ২ হাজার ৫১৫ হেক্টর, চাটমোহরে ২৭৫ হেক্টর, ভাঙ্গুড়াতে ৭০ হেক্টর, ফরিদপুরে ১২ হেক্টর, বেড়ায় ১০ হেক্টর, সুজানগরে ২০ হেক্টর ও সুজানগর উপজেলায় ৮০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান আছে। জেলায় মোট ৩,৭৪২ হেক্টর বা ২৮ হাজার ৬৫ বিঘা জমিতে লিচুর আবাদ করছেন চাষিরা। গতবারের চেয়ে ৫’শ হেক্টর জমিতে বেশি লিচু আবাদ করছেন কৃষকেরা। লিচু আবাদ নিয়ে কথা বলতেই জেলার সদর উপজেলার চকউগ্রগড়, উগ্রগড়, জোয়ারদহ, মধুপুর, মৌগ্রাম, শালাইপুর, গয়েশপুর, জালালপুর, মালঞ্চি এলাকার লিচু চাষিরা জানান, এক বিঘা জমির একটি লিচু বাগানে ১৬টি লিচু গাছ লাগানো যায়। মোজাফফরপুরী বা দেশি জাতের লিচুর বড় কলম লাগালে ১-২ বছর পরই ফল ধরা শুরু করে। কিন্তু বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের লিচু গাছের কলম লাগালে ৩-৪ বছর পর গাছে ফল ধরে। তারা আরও জানান, কোন বাগানে গাছের বয়স ১২/১৪ বছর হলেই তখন পূর্ণাঙ্গ বাগান হিসেবে ধরা হয়। এসব বাগানের একটি গাছে ভালোভাবে লিচু আসলে সর্বনিম্ন ৪ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এতে করে এক বিঘা জমির একটি বাগানে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করা যায়। যা অন্য যে কোন ফসল আবাদ করে বছরে এক বিঘা জমি থেকে এত পরিমাণ টাকা অর্জন করা সম্ভব নয়। ভালো লাভ এবং লিচু আবাদের জন্য উর্বর ভূমি হওয়ায় বিশেষ করে পাবনার সদর ও ঈশ্বরদী উপজেলার অনেক কৃষকই লিচু বাগান তৈরি করতে ঝুঁকে পড়েছেন। তারা আরও জানান, পাবনা অঞ্চলে বোম্বাই, চায়না-৩, মোজাফফরপুরী দেশি জাতের লিচু আবাদ হচ্ছে। দেশি জাতের লিচু আকারে ছোট। পাকা শুরু হয় উন্নত জাতের লিচুর চেয়ে ১৫-২০ দিন আগে। এছাড়াও অল্প দিনেই লিচু পাকার কারণে বাগানে কম সময় শ্রম দিতে হয়। বেশি দিন রাত জেগে পাহারা দিতে হয় না। তাই অনেক চাষি দেশি জাতের লিচু আবাদে আগ্রহী। পাবনা সদর উপজেলার চকউগ্রগড় গ্রামের লিচু চাষি হারুন-অর রশিদ ও লিচু ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক জানান, তাদের বাগানের সবগুলো গাছই বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের লিচু। লিচু পাকতে আরো ২ সপ্তাহ সময় লাগবে। রমজান মাসে লিচু পাকা পুরোপুরি শুরু হয়ে যাবে। ফলে আশানুরুপ দাম পাওয়া যাবে না। কৃষিতে জাতীয় পুরস্কার ও পদক এবং খেতাব প্রাপ্ত ঈশ্বরদীর লিচু চাষি কিতাব মন্ডল ওরফে লিচু কিতাব জানান, পাবনার মাটি লিচু চাষের জন্য খবুই উপযোগী। লিচু এখন পাবনা অঞ্চলের জন্য একটি অর্থকরী ফসল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ধান, গম, পাটসহ অন্যান্য ফসলের চেয়ে কম খরচে এবং কম পরিশ্রমে লিচু চাষ করে অধিক লাভবান হচ্ছে কৃষকরা। ঈশ্বরদীর রুপপুর, ভারইমারি, জয়নগর, আওতাপাড়া, পাকশী, বক্তারপুর ও দাশুড়িয়াসহ ২০টি গ্রামে শুধু লিচু আর লিচু। এবার লিচুর ফলন কম হয়েছে। তারপরও রমজান মাসে লিচুর ভরা মৌসুম হওয়ায় চাষিরা উপযুক্ত দামে ফল বিক্রি করতে পারবেন না বলে আশংকা কাজ করছে। এজন্য সরকারের কাছে পাবনাতে একটা ফল সংরক্ষণাগারের দাবি স্থানীয় কৃষকদের। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রওশন আলম জানান, আবহাওয়ায় কারণে এবছর লিচু কম ধরেছে। তারপরও প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে চাষিরা লাভবান হবেন। পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভূতি ভূষণ সরকার জানান, এবার লিচুর ফলন কম হলেও আবাদ বেশি হওয়ায় লাভবান হবেন লিচু চাষিরা। কৃষি বিভাগ থেকে সবসময় ভালো ফলনের পরামর্শদান অব্যাহত রয়েছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..