মৃত্যুফাঁদে ৫ লাখেরও বেশি মানুষ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : চট্টগ্রামের ৩০টি পাহাড়ের ‘মৃত্যুফাঁদে’ এখনও পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছেন। এসব পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে ২১ হাজার পরিবারকে অন্যত্র স্থানান্তরের সুপারিশ করেছিল পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। গত মে মাসে সভা ডেকে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারও ঘোষণা দিয়েছিলেন, পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে সলিমপুর এলাকায় স্থানান্তর করা হবে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে পাহাড়ের পাদদেশে মাইকিং করা হয়। লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযানও চালায় প্রশাসন। উচ্ছেদ অভিযানের সপ্তাহ দুয়েক আগে কয়েকটি বাড়িঘরের গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে যাওয়ার দিন কয়েক পরেই আবারও গ্যাস, বিদ্যুৎ এনে দিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের মধ্যে জনপ্রতিনিধিও রয়েছেন। প্রভাবশালীদের আশ্বাস পেয়ে মৃত্যুকূপে ফিরেও আসেন সেখানকার বাসিন্দারাও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসন যদি আন্তরিকতা নিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করে তবে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগই আলোর মুখ দেখবে না। পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের সব উদ্যোগই বর্তমানে থমকে আছে। চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা ও পুনর্বাসনের জন্য ২০০৭ সালে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়। দশ বছর ধরে ওই তহবিলের প্রায় ৭৪ লাখ টাকা পড়ে আছে। এ ছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করতে সিটি করপোরেশন সাত কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণ করলেও সেখানে ঠাঁই হয়নি নিম্নবিত্তদের। উল্টো ভবনটি এখন অস্থায়ী নগর ভবনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে এখনও ঝুঁকিপূর্ণভাবে কয়েক লাখ মানুষ বসবাস করছে। তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। স্থায়ীভাবে তাদের পুনর্বাসনেরও চিন্তাভাবনা সরকারের আছে। সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নিম্নবিত্তদের জন্য একটি ভবন নির্মাণ করা হলেও তাতে ঠাঁই হবে মাত্র ৩৩টি পরিবারের। তাই এটি বাদ দিয়ে আমরা নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা করছি। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার রুহুল আমিন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী কয়েক লাখ মানুষকে সলিমপুরে পুনর্বাসন করা হবে। কেউ পাহাড় কেটে কিংবা দখল করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারবেন না। যারা পাহাড়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেবে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। তবে দায়িত্বশীলদের এমন কথাতেও আস্থা রাখতে পারছেন না নিম্নআয়ের মানুষ। তাই উচ্ছেদের পর আবারও তারা মৃত্যুকূপে ফিরে যাচ্ছেন। বস্তিবাসীর ফ্ল্যাটে হচ্ছে অস্থায়ী নগর ভবন :পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বাস করা বস্তিবাসীর জন্য নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটে অস্থায়ী নগর ভবন করার সিদ্ধান্ত চসিকের। গত ১৪ ডিসেম্বর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের নিয়ে ভবনটি পরিদর্শনও করেন সিটি মেয়র। অথচ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের দাবির মুখে ২০১০ সালে বাটালী পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বস্তি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়ে ২০১৩ সালে বড় ধরনের বাধা ছাড়াই বস্তি উচ্ছেদ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৩ জন বস্তিবাসীর কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি ও হলফনামা নেয় সিটি করপোরেশন। তখন প্রতি ফ্ল্যাটের দাম ধরা হয় ছয় লাখ টাকা। অ্যাপার্টমেন্টের জন্য এককালীন নেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা। মাসিক আড়াই হাজার টাকা কিস্তিতে এই মূল্য পরিশোধ করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল বস্তিবাসীদের। ২০১৩ সালে টাইগারপাসে ১২ কাঠা আয়তনের নিজস্ব জায়গার ওপর ভবন নির্মাণকাজ শুরু করে চসিক। সাততলা ভবনটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৪৩ হাজার ৮ টাকা। ভবনটিতে ২৫০ বর্গফুট আয়তনের ১৬১টি ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে। সাততলা ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তবে এখনও ভবনটিতে রঙ করা হয়নি। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বহুতল ভবনটির নিচতলার একটি অংশ সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য রাখা হয়েছে। অন্য অংশে মুদি, ওষুধ ও সেলুনের দোকানের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য পাঠশালা স্থাপনেরও পরিকল্পনা ছিল। দ্বিতীয় থেকে সাততলা পর্যন্ত অ্যাপার্টমেন্ট। ২৫০ বর্গফুট আয়তনের প্রত্যেক অ্যাপার্টমেন্টে একটি থাকার ঘর, একটি শৌচাগার ও ছোট আকারের রান্নাঘর রয়েছে। কিন্তু এখন কাঠামো পরিবর্তন করে এটিকে করা হবে নগর ভবন। ঝুঁকিতে আছে ৩০ পাহাড় : পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির লোলুপ দৃষ্টিতে পড়ে চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ৩০টি পাহাড়। দিনে নয়তো রাতে এসব পাহাড় কেটে কেউ গড়ে তুলেছে জনবসতি, কেউ দোকানপাট, ইটভাটা, শিল্প কারখানা গড়ে তুলছে। নেওয়া হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প; সড়কও নির্মাণ করা হচ্ছে। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকা অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো হচ্ছে সলিমপুর বাস্তুহারা পাহাড়, টাইগারপাস-লালখান বাজার রোড সংলগ্ন পাহাড়, সিআরবি পাহাড়ের পাদদেশ, টাইগারপাস মোড়ের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ, মোজাফফর নগর পাহাড়, কাট্টলি থেকে সীতাকু- পর্যন্ত পাহাড়, প্রবর্তক পাহাড়, গোলপাহাড়, ইস্পাহানি পাহাড়, বন গবেষণাগার ও বন গবেষণা ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পাহাড়, জয়পাহাড়, চট্টেশ্বরী হিল, মতিঝর্ণা ও বাটালিহিল সংলগ্ন পাহাড়, রেলওয়ে এমপ্লয়িজ গার্লস স্কুল সংলগ্ন পাহাড়, ফয়’স লেক আবাসিক এলাকা পাহাড়, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়, গরীবুল্লাহ শাহ মাজারের পাশের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়, ডিসি হিলের চেরাগী পাহাড়ের দিকের ফুলের দোকানগুলোর অংশ, পরিবেশ অধিদপ্তর সংলগ্ন সিটি করপোরেশনের পাহাড়, একে খান অ্যান্ড কোং-এর পাহাড়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন পাহাড়, কৈবল্যধামে বিশ্ব কলোনির পাহাড়, মিয়ার পাহাড়, লালখান বাজার চান্দমারি রোড সংলগ্ন জামেয়াতুল উলুম ইসলামি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পাহাড়, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট একাডেমির উত্তর পাশের মীর মোহাম্মদ হাসানের মালিকানাধীন পাহাড়, ইস্পাহানি পাহাড় সংলগ্ন দক্ষিণ পাশের হারুন খানের মালিকানাধীন পাহাড়ের পশ্চিমাংশ, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, লেক সিটি আবাসিক এলাকার পাহাড় ও সিডিএ এভিনিউ রোডের পাশে অবস্থিত ব্লোসম গার্ডেন সংলগ্ন পাহাড়। গত ৮ মে অনুষ্ঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সর্বশেষ সভায় এ পাহাড়গুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিহ্নত করা হয়। পাহাড়কে সুরক্ষিত রাখতে এসব পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা কয়েক লাখ মানুষকে অন্যত্র পুনর্বাসনেরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এ বৈঠকে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তায়িত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা যা বলেন : চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করলেই দুর্ঘটনা ঘটবে। কারণ যারা পাহাড় কাটে তারা পরিবেশের বিষয়টি চিন্তা করে না। সুবিধাজনক স্থানে পাহাড় কেটেই বসতি গড়ে তোলা হয়। এ কারণে বর্ষাকালে ঝুঁকির মাত্রা বেশি হয়। প্রাকৃতিক কারণে যতটা না ঝুঁকি তৈরি হয় তার চেয়ে বেশি হচ্ছে মানবসৃষ্ট কারণে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, নিম্নবিত্তরা বাধ্য হয়েই মৃত্যুফাঁদে বসবাস করেন। তাদের পুনর্বাসনে আন্তরিকতা নিয়ে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..