চালের বাজারে আগুন গরিবের পেটে লাথি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক : চালের দাম একাধারে বাড়ছে। সরকার মনে করছে, চালের সংকট এমন পর্যায়ে যায়নি যে এভাবে লাগামহীনভাবে দাম বাড়বে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে কারসাজির মাধ্যমে চালের দাম একটানা বাড়িয়ে অতি মুনাফা করছেন। এ জন্য চালের বাজার কড়া নজরদারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম কেজিতে দুই থেকে দশ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় হাওরাঞ্চলের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সারাদেশে প্রত্যাশিত পরিমাণ বোরো ফসল উৎপাদিত হয়েছে। নতুন ধানও বাজারে এসেছে। তাই সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, চালের দাম এত বাড়ার কথা নয়। চালের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সরকারকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। এ জন্য ধান ছাঁটাই, চালের মজুদ, বাজারে চাল সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি কঠোরভাবে নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, দমজুদের সংকট কাটাতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।’ তিনি ব্যবসায়ীদের নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, ‘দুঃসময়ে যারা পাশে থাকে না সরকার তাদের ক্ষেত্রে কোনো অনুকম্পা দেখাবে না। শর্ত না মানলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তালিকাভুক্ত চালকল মালিকরা সরকারের সঙ্গে চুক্তির পর চাল সরবরাহ করছে কি-না তা তদারকি করতে বলা হয়েছে। গুদামে চাল মজুদের হালনাগাদ তথ্য জানতে চেয়ে খাদ্য অধিদপ্তর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকদের গুদাম পরিদর্শন করে তারা সরকারি বিধান যথাযথভাবে পালন করছেন কি-না তা যাচাই করা প্রয়োজন। বেসরকারি পর্যায়ে চালের সরবরাহ অবাধ ও নিরুপদ্রব কি-না তা পরিবীক্ষণ করা দরকার। লাইসেন্সের শর্ত মোতাবেক খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীদের নিয়মিতভাবে মজুদের হিসাব দাখিল নিশ্চিত করতে হবে। হিসাবের সঠিকতা যাচাই করার জন্য তাদের সংরক্ষণাগার পরিবীক্ষণ করে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, দি কন্ট্রোল অব এসেনসিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট ১৯৫৬ ক্ষমতা বলে লাইসেন্সের মাধ্যমে সরকার আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী ও চালকল মালিককে ধান-চাল মজুদের সর্বোচ্চ পরিমাণ ও মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এরপরও এ নির্দেশ তারা সঠিকভাবে অনুসরণ করছেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খাদ্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে চালকল মালিকদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তারা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চাল নিয়ে কারসাজি করছে কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে কি-না তাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী তারা চাল না দিলে জরিমানা গুনতে হবে। প্রয়োজনে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। তবে একটি সূত্র জানায়, এমন খবরে চালকল মালিকরা সরকারকে চাল সরবরাহে অনেকটা আনাগ্রহ দেখাচ্ছে। আর এতেই খাদ্যশস্য অভিযান সংগ্রহে ভাটা পড়েছে। জানা যায়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলতি অর্থবছরে ২২ হাজার ৪৬৩ চালকল মালিকের সঙ্গে বোরো চাল সংগ্রহের জন্য চুক্তি করে সরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা সরকারি গুদামে ৮ লাখ টন চাল সরবরাহ করবে। কিন্তু ঘোষণার একমাস সময় পেরিয়ে গেলেও গুদামে ঢুকেছে মাত্র ৭ হাজার ২৭৮ টন চাল। চাল সংগ্রহের জন্য খাদ্যমন্ত্রী নিজে উত্তরাঞ্চলে মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপরও খাদ্যশস্য সংগ্রহে কাক্সিক্ষত গতি আসেনি। খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন, আমদানি করা চাল ৩০ জুনের মধ্যে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও আপৎকালীন পরিস্থিতি সামল দিতে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান-চাল সংগ্রহেও আশাব্যঞ্জক সাড়া পাচ্ছে না খাদ্য মন্ত্রণালয়। চলতি বছর প্রতিকেজি চাল ৩৪ টাকা করে সংগ্রহ করার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু চালকলের মালিকরা তাতে সাড়া দিচ্ছেন না। ইতিমধ্যে চালকল মালিকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ অটো, মেজর, হাসকিং ও মিল মালিক সমিতি খাদ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, তারা প্রতিকেজি চালে আরও ৪ টাকা বেশি চান। বাংলাদেশ অটো, মেজর, হাসকিং ও মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী সমকালকে বলেন, উৎপাদন খরচ দিলেই আমরা সরকারি গুদামে চাল দিতে রাজি আছি। এক কেজি ধান কিনে তা মিলে ভাঙিয়ে চালে পরিণত করতে হলে ৩৭ থেকে ৩৮ টাকা খরচ হয়। তাই লোকসান দিয়ে ৩৪ টাকা কেজিতে চাল দেওয়া সম্ভব নয়। সূত্র জানায়, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে চাল বিক্রির লাইসেন্স পেয়েছেন। লাইসেন্স দেওয়ার সময় অনেকের ক্ষেত্রে যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়নি। রংপুরের তারাগঞ্জ এলাকায় চালকল নেই, বিদ্যুৎ সংযোগ নেই অথচ চাতাল দেখেই অনেককে চাল সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শুধু রংপুর নয়, দেশের শস্যভাণ্ডারখ্যাত উত্তরবঙ্গে যাচাই-বাছাই ছাড়া অনেকেই লাইসেন্স পেয়েছেন। নীতিমালা অনুযায়ী চালকল মালিক হিসেবে লাইসেন্স নিতে হলে ব্যবসায়ীদের ধান-চাল শুকানোর চাতাল, চালকল, বিদ্যুৎ সংযোগ, গুদাম ব্যবসার অনুমতিপত্র, পরিবেশের ছাড়পত্র ও আয়করের কাগজপত্র থাকতে হবে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব শর্ত পূরণ হয়নি। এখন এসব চাতাল মালিকরা খাদ্য সংগ্রহ অভিযানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। অতীতে বাজারমূল্য থেকে বেশি দামে তারাই চাল বিক্রির সুযোগ পেয়েছিলেন। এবার বাজার পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..