কবিতা

তুমি কি আমার স্বজন?

লাকী আক্তার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
প্রিয়, তুমি বলেছিলে, আমার চোখে নাকি সমুদ্রের স্রোতে। অথচ আজ সে চোখে শুধুই মরুভূমির প্রান্তর। প্রমত্তা নদীগুলো শুকিয়ে যেমন হয়, ঠিক তেমনি আমি আজ শূন্য, রিক্ত! প্রিয়, আমি চিৎকার করতে চাই; কিন্তু আমার কণ্ঠ যেন স্তব্ধ হয়ে আসে। আমার মনে পড়ে যায় কোনো একদিন প্রকাণ্ড এক পাহাড় ধসে, গুনে গুনে ১৫০ টি মানুষের গণকবর রচিত হয়েছিল। মনে পড়ে যায়, সেই ঘুমন্ত ছোট্ট তিনটি ভাই- বয়স যাদের ২, ৫ এবং ১২; যাদের উপর চেপে বসেছিল জগদ্দল পাহাড়। আমি আর বলতে পারিনা। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয় যেন সেই পাহাড়টা আমার উপরেও চেপে আছে। তুমি গড়গড় করে কী কী যেন বলে যাও, আমি শুনতে পাইনা! আমার মগজে শুধুই আর্তনাদের আনাগোনা! আমি কেবল শুনতে পাই- সেই রানা প্লাজা, স্পেকট্রাম, কিংবা তাজরিনের শ্রমিকদের গগনবিদারি চিৎকার। সে হাজার প্রাণের চিৎকার আমাকে পাগল করে দেয়। আমি ভুলতে পারি না, কিছুতেই ভুলতে পারি না! রং-বেরঙের কাপড়ের প্রতি নেশা আমার অনেক দিনের। লাল-নীল-বেগুনি ছাপা প্রিন্টের কাপড়! তুমি বলেছিলে প্রিন্টের কাপড়ে বেশ মানায় আমাকে। বিশ্বাস কর প্রিয়, কাপড়ের রঙ দেখে আমি আঁতকে উঠি! আমার চোখে ভেসে উঠে পোড়া কিংবা ছিন্নভিন্ন ‘সেলাই দিদিমণি’র ছবি। থান প্রিন্টের ভাঁজে ভাঁজে যেন পোড়া গন্ধ আর ছোপ ছোপ রক্ত। আমায় তুমি বলেছিলে, ভরা পূর্ণিমায় চাঁদ দেখার মত প্রশান্তি আর কিছু নেই! কিন্তু এখন ভরা পূর্ণিমাও আমাকে শঙ্কিত করে তোলে! আমার মনে পড়ে যায় যশোরের পূর্ণিমার কথা, মনে পড়ে যায় তার মায়ের কান্নাভেজা আকুতি- ‘বাবারা তোমরা একজন একজন করে এসো, আমার মেয়েটা খুব ছোট’। প্রিয়, এখন আর আমি কাঁদতেও পারি না, আমি যেন প্রস্তরখণ্ডের মত জড় হয়ে গিয়েছি। আমার কল্পনায় হানা দেয় পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটি- পূজা রানী যার নাম, ধর্ষকেরা যার যোনিপথ ব্লেড দিয়ে কেটে প্রশস্ত করেছিল। পূজার ভয়ার্ত চিৎকার আমার কানে প্রতিধ্বনিত হয়; মানুষ হিসেবে আমার জন্মকে অপরাধী করে দেয় সেই চিৎকার! আজকাল বাতাস অনুভব করলেই আমি যেন কুঁকড়ে যাই। আমার মনে পড়ে যায়, একটা ছোট্ট শিশু-নাম ছিল রাকিব। কমপ্রেসর মেশিন ব্যবহার করে বাতাস প্রবেশ করানো হয়েছিল পায়ুপথ দিয়ে, বাতাসের চাপে নাড়ীভুঁড়ি ফেটে মৃত্যু হয়েছিল তার। বাঁচবার জন্য রাকিবের ব্যর্থ আকুতি ঘোষণা করে- এই পৃথিবীতে মানুষই সবচে নিকৃষ্ট প্রাণী! ফ্লাইওভারের গার্ডার চাপায় পিষ্ট আদম সন্তান, গডফাদারের রাজত্বে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলা কিশোর বালক ত্বকি, কাঁটাতারে ঝুলতে থাকা ফেলানী, জলপাই বাগানে ক্ষত বিক্ষত তনুর নিথর দেহ, কথিত বন্দুকযুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, হাতকড়া পরা রোমেল চাকামার মৃত্যু- সবগুলো মৃত্যুর উল্টোপিঠে লেখা কিছু আকুতি। মানুষের বাঁচার সে আকুতিগুলো আমাকে তাড়া করে ফিরে। কেউ যেন ফিস ফিস করে কানে কানে বলে যায়- ‘ওঠো, নিস্তব্ধতা-জড়তা ভেঙে উঠে দাঁড়াও’। আমাকে বিদ্রোহের মন্ত্রণা দিয়ে যায় কে যেন। সেই মন্ত্রণায় আচমকা সকল আড়ষ্টতা ভেঙে যায়, আমি এক অস্থির তাড়না অনুভব করি, মনে হয় যেন আমি সম্বিত ফিরে পাই। রূপকথার সেই ফিনিক্স পাখিটা যেন আমার মধ্যে ভর করে, আমার মগজের প্রতিটি নিউরণ চঞ্চল হয়ে উঠে। এ অসময়ে যদি আমি বিদ্রোহ না করি, যদি রাজপথে না নামি, তবে আমাকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে মহাকাল। আমি বিক্ষোভে ফেটে পড়ি! আমার চোখে খেলা করে বারুদের স্ফুলিঙ্গ! প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় আমি পথে নামি। রাজপথে আমি আমার স্বজন খুঁজে ফিরি! কেউ যেন আমায় ফের মন্ত্রণা দেয়- যে মানুষ পাহাড় সমান লাশ দেখে নিশ্চল থাকে, যে মানুষ মানববিনাশী উন্নয়ন দেখে গদ গদ হয়, যে মানুষ পূজা কিংবা পূর্ণিমাদের আর্তনাদ শুনতে পায়না, সে আমার কেউ নয়। যে মানুষ ক্রমাগত নিপীড়ন দেখেও ক্ষুব্ধ হয় না, ত্বকি, রোমেল কিংবা তনুর জন্য যার হৃদয়ে বিক্ষোভ দানা বাঁধে না! সে আমার কোনো আত্মীয় না। যে মানুষ শ্রমিকের লাশের বদলা নিতে চায় না, ক্রসফায়ারে যেকোনো মৃত্যু যাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে না, সব দেখে শুনে বুঝেও শুধুমাত্র ৫৭ ধারার ভয়ে যে চুপ থাকে, তার প্রতি আমার কোনো ভালোলাগা নেই, ভালবাসা নেই। সত্যি বলছি, সে আমার কেউ নয়! সে আমার স্বজন নয়। বল প্রিয়, তুমি কি আমার স্বজন? ১৫ জুন, ২০১৭

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..