‘কুবো এ- দা টু স্ট্রিংস’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

অনিন্দ্য উদয় ট্রাভিস নাইট পরিচালিত চলচিত্র ‘কুবো এ- দা টু স্ট্রিংস’ এর কথা উঠলে প্রথমেই সবার আলোচনায় আসে এটি স্টপ মোশন ব্যবহার করে পর্দায় আমাদের সামনে যে নিপুণ শৈল্পিক দৃশ্যায়ন তুলে এনেছে। এর কারিগরি দিক নিয়ে অনেক বিস্তারিত আলোচনা এবং এর গল্পবর্ণনার ম্যাজিকালিটি নিয়ে উচ্ছ্বাসের আড়ালে একটি শিশুর মনের ভিতরের যে সরল অথচ বিচিত্র ভাবনার জগৎ আমাদের সামনে উন্মোচিত হলো তা নিয়ে আলাপ করার জন্যই এই লেখা। অনেক দর্শক-সমালোচকের মতে সহজেই অনুমেয় এবং দুর্বল গল্পের কারণে দৃশ্য সৌন্দর্য নিয়েও সিনেমাটি দারুণ হয়ে উঠতে পারে নি। এশীয় দর্শক বা প্রাচ্য সম্পর্কে যাদের স্পষ্ট ধারণা আছে, তাদের অনেকেই জাপানের পটভূমিতে সিনেমাটিতে যে আমেরিকান ভঙ্গির কথোপকথন এবং হাস্যরসের মেজাজ দেখানো হয়েছে তাতে বিরক্ত হয়েছেন। পশ্চিমাদের এশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে আবছা ধারণা এবং তাদের যে কোন শিল্প রচনায় প্রাচ্যকে রহস্যময় করে তোলার যে প্রবণতার কঠোর সমালোচনা করা হয়, সিনেমাটি তা অতিক্রম করতে পারে নি। অ্যানিমেটেড সিমেনার দুনিয়ায় স্টুডিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শুধু জিবলি স্টুডিও থেকে আমরা এখন যে মানের কাজ পাচ্ছি আর তাতে প্রাচ্যের যে নির্জলা চিত্রায়ন হয়, এমন সময়ে লাইকা স্টুডিয়ো যখন জাপানের লোকগল্পের আদলে কিছু পরিবেশন করতে যায় তখন এমন সমালোচনা আসবেই। তবু আমরা যদি এর গল্পকারের পরিচয়টা মনে রাখি তাহলে হয়তো এতো রাজনীতিক ভাবনার জায়গা থেকে সরে এসে কেবল গল্পটি নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ আছে। শ্যানন টিন্ডেল একজন অ্যানিমেটর এবং ক্যারেকটার ডিজাইনার যে প্রাচীন জাপানের পটভূমিতে একটি কাল্পনিক অ্যাডভেঞ্চারের গল্প দেখাতে চেয়েছেন। তার নিজের জবানিতেই আমরা জানি যে তিনি এমন গল্প বলতে চান যা তার ব্যক্তিগত। সেই দিক থেকে ‘কুবো এ- দা টু স্ট্রিংস’ এর প্রতীকী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ‘সেন্টো’ এবং ‘বৌদ্ধ’ ধর্মের দার্শনিক তফাৎ বা এমন অনেক সম্ভাব্য ইন্টারপ্রিটেশনকে বাদ দিয়ে সরল কোনো ব্যক্তিগত গল্প কি আমরা পেতে পারি? অ্যানিমেটেড মানেই ছোটদের জন্য ছবি, এমন ধারণা অনেক আগেই ভেঙে গেছে। এই কেন্দ্রীয় চরিত্রে আমরা পাই কুবো নামের এক বালককে যে একটি রহস্যময় এবং এডভেঞ্চারাস যাত্রার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, অর্থাৎ ছোটদের জন্য লেখা গল্পের চিরায়ত প্লট। কিন্তু এমন কাহিনীর মধ্যে দিয়ে বর্ণিত হলেও গল্পের থিম হলো মৃত্যু, আমাদের নশ্বরতা এবং বিস্মৃতি। পরিচালক প্রথম দৃশ্যের অন্ধকার, চাঁদ আর সমুদ্রের মাঝে পাহাড়সম ঢেউ এর মুখোমুখি ক্ষুদ্র নৌকায় বসে থাকা একা একজন নারীকে এনে আমাদের সচেতন করে দেয় যে সে হালকা কিছু পরিবেশন করছেন না। ম্যাথু ম্যাকনের কণ্ঠ অভিনীত বিটলস চরিত্রের মাধ্যমে কিছু কমিক রিলিফ দেওয়া হলেও সমস্ত সময় ধরেই একটি অনিশ্চয়তায় মধ্যে দর্শককে রাখা হয়। প্লটের অনেক দিক যে শুধু অস্পষ্ট তাই নয়, কিছু প্রশ্ন ইচ্ছে করেই অমীমাংসিত রেখে দেওয়া হয়েছে। মনোযোগ ধরে রাখার সহজ কৌশল আর ম্যাজিকালিটির তকমা পাওয়ার প্রলোভন, এর বাইরে গল্পের কোনো প্রয়োজনে এমনটা করা শিল্পসম্মত হতে পারে তা বুঝতে সম্ভাব্য ইন্টারপ্রিটেশন থেকে যে কোনো একটিকে নিয়ে এর একটি দ্বিতীয় পাঠ আমরা তৈরি করতে পারি। প্রথমেই চাঁদের এই দৃশ্যায়ন, স্বর্গলোকে থাকা কুবোর নানার নাম-পরিচয় (মুন কিং) আর সিনেমার শেষ অংশে সে যে জরাগ্রস্থ মানব জীবনের নশ্বরতার কথা বলে তাতে সেন্টো মিথলজির সুক্যওয়ামি (ঃংঁশুঁড়সর) এর রেফারেন্স চলে আসেই। তবু যদি আমরা একটি সাদামাটা গল্প খোঁজার চেষ্টা অব্যাহত রাখি- একটি অভিজাত বংশের মেয়ে (কুবোর মা) নিজ পছন্দে বিয়ে করে এক সাধারণ সাহসী মানুষকে। অহংকারে আঘাত লাগায় মুন কিং (কুবোর নানা) আক্রমণ করে অথবা অভিশাপ দেয় এবং তাতে ভেঙে যায় নতুন পরিবার। তীব্র শোকে সন্তানকে নিয়ে সংসার ছাড়ে মা। একরকম বিস্মৃতির মধ্যে কুবোকে সে বীর পিতার গল্প শোনায় আর তাকে নিজ পরিবার থেকে দূরে নিরাপদে রাখার জন্য সর্বদা সতর্ক করে রাখে। কিন্তু বীরত্বের সব গল্পের বাইরে কেমন ছিল সে, এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় কুবো। একদিন বিগত পরিজনকে লন্ঠন জ্বালিয়ে ডেকে এনে তাদের গল্প শোনা এবং স্বর্গযাত্রা সুগমনের লৌকিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সে মুখোমুখি হয় নিজের অতীতের এবং তার এত দিন ধরে শিখে আসা যুদ্ধের গল্প দিয়ে তার মোকাবেলা করতে চায়। তাই আমরা একটি অভিযানের গল্প পাই যাতে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ম্যাজিকাল মিরর আর্মারের তিনটি অংশ খুঁজে বের করতে হবে কুবোকে। এই অভিযানের মধ্যেই সে বানর এর কথায় বুঝতে পারে তার নানা যে তাকে ঘৃণা করতো বলে সে বুঝতে শিখেছে এটিও একটি একপেশে ভাবনা (স্বপ্ন দৃশ্যের ঠিক আগে) বরং সে তাকে নিজের মতোই অভিজাত হিসেবে দেখতে চেয়েছিলো। একদিকে মা বাবাকে হারানো অপর দিকে জীবিত স্বজনদের শত্রু বলে জানা- এই সীমাহীন যাতনার মধ্যে থেকে কুবোর বালক মন একটি উত্তর খুঁজে নেয় আর তা হল ‘স্মৃতি’। সমস্ত হারিয়ে যাওয়া বা ক্ষয়ের মধ্যেও ভালোবাসার স্মৃতি মানুষকে মৃত্যু-শোক থেকে বেরিয়ে আসার শক্তি দেয়। ম্যাজিকাল মিরর আর্মার এর খোঁজে পরিচালিত অভিযানের সমস্ত অংশকে বাদ দিয়ে এমন একটি গল্প যে খুব কষ্টকল্পিত নয় সিমেনার দুই জায়গার তার পক্ষে সায় পাওয়া যায়। প্রথম ভাগে কুবো যখন তার মাকে জিজ্ঞাসা করে তার বাবা কেমন ছিল; মা উত্তর দেওয়া শুরু করে- সে ছিল বীর যোদ্ধা, তলোয়ার আর ধনুক চালনায় দক্ষ.. এমন সময় কুবো মাকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চায়, সে আসলে কেমন ছিল যখন কোনো যুদ্ধ ছিল না, যখন সে আমাদের সাথে ছিল। একই প্রশ্ন বিটল কুবোকে করে জাহাজে মাছ খাবার সময়। সে জানতে চায় এমন বীরত্বের অভিযান শুরু করার আগে সে কেমন ছিল। সিমেনাটি তাই সবশেষে মৃত্যু এবং মানবিকতার প্রতি আমাদের শীতল অন্ধত্ব এর বিপরীতে যুদ্ধ না বরং ভালোবাসা বিস্মৃত না হবার কথা বলে। বিস্মৃত না হবার জন্য গল্পের চেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম আর কি হতে পারে? গল্প বলার মধ্যে দিয়ে হয়তো আমরা আমাদের জীবনের অন্ধকার গল্পটিও বদলাতে পারি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..