ইতালো কালভিনো

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ইতালো কালভিনোর জন্ম ১৯২৩ সালে হাভানার সান্তিয়াগো ডি লাস ভেগাসে। তার বাবা ছিলেন একজন কৃষিবিদ, যার বদৌলতে তার শৈশবের একটি অংশ কেটেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোয়। আর মা ছিলেন একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী। পরবর্তী জীবনে কালভিনো যখন বিখ্যাত হয়ে উঠছেন আর বিশ্বের সামনে হাজির করছেন চির পরিচিত ভঙ্গিমায় অভিনব গল্প কথনশৈলী, তখন এ দুজনের উত্তরাধিকার হিসেবে তাকে খুব গভীরে শনাক্ত করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছিলেন ইতালির তুরিনে। সে সময় থেকেই বাম-বলয়ের সঙ্গে তরুণ কালভিনোর ওঠাবসা শুরু। যুদ্ধের পর যোগ দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। কিন্তু পরে ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাঙ্গেরি আক্রমণের প্রতিবাদে পার্টি রাজনীতি থেকে সরে আসেন। কিন্তু গোটা সময়ে লেখায় কখনো খামতি হয়নি। মূলত ছোট গল্পই তার বিচরণ ক্ষেত্র। লিখেছেন তিনটি উপন্যাসও। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে, দ্য ক্রো কামস লাস্ট, দ্য ব্যারন ইন দ্য ট্রিজ, কসমিকোমিকস ও দ্য পাথ টু দ্য নেস্ট অব স্পাইডার্স এবং দ্য হোয়াইট শুনার, ইয়ুথ ইন তুরিন ও দ্য কুইনস নেকলেস। পেশায় সাংবাদিক এ লেখক মারা যান ১৯৮৫ সালে। কালভিনোর এ দুই গল্প নেয়া হয়েছে তার নাম্বারর্স ইন দ্য ডার্ক বই থেকে। রোমান ভাষা থেকে কালভিনোর এ বইটি অনুবাদ করেছিলেন টিম পার্কস। টিম পার্কসের অনুবাদে ‘ডাঙ্গুলি’ গল্পটির নাম ছিল ‘মেকিং ডু’। আর ‘শত্রু’ শীর্ষক গল্পটির নাম ছিল ‘কনশাস’। দুটি গল্পেরই নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনুবাদকের সীমিত স্বাধীনতাকে ব্যবহার করা হয়েছে। - নেলসন ডাঙ্গুলি এক শহর ছিল, যেখানে সবই ছিল নিষিদ্ধ। শুধু একটি বিষয়ই নিষিদ্ধ ছিল না, আর তা হলো ডাঙ্গুলি। ফলে সবাই শহরের পেছনের বড় মাঠে জড়ো হতো, আর দিন পার করে দিত ডাঙ্গুলি খেলেই। আর যেহেতু আইনে কোনো কিছুকে নিষিদ্ধ করার পেছনে থাকে কোনো না কোনো শুভ কারণ, সেহেতু এ নিয়ে অভিযোগ করার কিছু খুঁজে পেল না কেউ। এমনকি এর সঙ্গে মানিয়ে নিতেও কারো কোনো সমস্যা হলো না। বহু বছর কেটে গেল। একদিন শহরের কর্তাদের মনে হলো, সবকিছুর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রাখার আর কোনো প্রয়োজন নেই। ফলে তারা বার্তাবাহকদের ডাকল, আর সবাইকে জানিয়ে দিতে বললো- ‘যে কেউ চাইলে যা কিছু করতে পারে’। নির্দেশ মতো বার্তাবাহকরা ছুটে গেল শহরের সেইসব স্থানে, যেখানে সবাই সমবেত হতো ডাঙ্গুলি খেলতে। ‘শোনো শোনো, শোনো সবাই’ তারা ঘোষণা করল- ‘এখন থেকে কোনো কিছুই আর নিষিদ্ধ নয়।’ কিন্তু ডাঙ্গুলি খেলায় মগ্ন কেউই তার কথা শুনল না। তারা আবারো চিৎকার করে বলল- ‘বুঝতে পারছ? তোমরা তোমাদের ইচ্ছা মতো যা কিছু করতে পার।’ এবার তারা প্রত্যুত্তর পেল। সবাই বলে উঠল, ‘ভালো। আমরা ডাঙ্গুলি খেলছি।’ এতে ব্যস্ত হয়ে উঠল ওইসব বার্তাবাহক। আর তড়িত গতিতে তারা সবাইকে মনে করিয়ে দিতে লাগল, সেইসব চমৎকার ও কার্যকর কাজ সম্পর্কে, যেসবে তারা ব্যস্ত ছিল এক সময়। তারা বোঝাতে থাকলো যে, এখন আবারো সেইসব কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সবার সামনে এসেছে। কিন্তু কেউই তাদের কোনো কথা শুনল না। তারা শুধু একমনে ডাঙ্গুলি খেলতে লাগল, খেলতেই লাগল...। এমনকি শ্বাস নেয়ারও কোনো ফুরসৎ যেন নেই তাদের। অবশেষে সব চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে বুঝতে পেরে কর্তৃপক্ষের কাছেই ফিরে গেল বার্তাবাহকেরা। ‘সহজ’ সব শুনে শহরের কর্তারা বললেন- ‘ডাঙ্গুলি খেলাটাই নিষিদ্ধ করা হোক’। এটাই সেই সময়, যখন মানুষেরা বিদ্রোহ করেছিল, আর হত্যা করেছিল কর্তাদের অনেককে। এরপর কোনো সময় নষ্ট না করেই তারা ফিরেছিল ডাঙ্গুলি খেলতে। শত্রু একটা যুদ্ধ এল সামনে, আর লিগি নামের এক লোক জানতে চাইল সে যেতে পারবে কিনা। সবাই খুব প্রশংসা করল তার। লিগি চলে গেল সেই স্থানে যেখানে রাইফেল দেয়া হয়। আর একটি রাইফেল তুলে নিয়ে বললো, ‘এখন আমি যাচ্ছি, আর আলবার্তো নামের একজনকে হত্যা করব।’ তারা জানতে চাইল আলবার্তোর পরিচয়। ‘একজন শত্রু’ সে বললো, ‘আমার শত্রু।’ কিন্তু তারা তাকে বোঝালো যে, একটি বিশেষ ধরনের শত্রুকে তার হত্যা করতে হবে, যাকে ইচ্ছা তাকে নয়। ‘তো?’ লিগি বললো ‘আমাকে বোকা মনে কর? এই আলবার্তো ঠিক ওই রকমেরই, তাদেরই একজন। যখন আমি শুনলাম, তোমরা এত বড় যুদ্ধে যাচ্ছ, আমার মনে হলো, আমিও যাব। আর এভাবেই আমি আলবার্তোকে হত্যা করতে পারব। আর এজন্যই আমি এসেছি। আমি ওই আলবার্তোকে চিনি, সে একটা আস্ত শয়তান। সে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, কোনো কারণ ছাড়াই সে আমাকে অপমান করেছে। এটা অনেক পুরোনো গল্প। তোমরা চাইলে আমি পুরোটা বলছি।’ তারা বললো, আচ্ছা ঠিক আছে। ‘ঠিক আছে’ লিগি বললো, ‘বল আলবার্তো কোথায় আছে। আমি সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে যুদ্ধ করব।’ তারা বললো, তারা জানে না। ‘কোনো ব্যাপার না’ লিগি বললো, ‘কাউকে নিশ্চয় পাব, যে জানে। একদিন না একদিন তার সঙ্গে আমার দেখা হবে।’ তারা বললো, সে এটা করতে পারে না। তার সেখানেই গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে, যেখানে তারা তাকে পাঠাবে। আর সেখানে যে-ই থাকুক তাকেই হত্যা করতে হবে। তারা এই আলবার্তো সম্পর্কে কিছুই জানে না। লিগি বললো ‘দেখেছ, আমার সত্যিই তোমাদের পুরো গল্পটা বলা উচিত। কারণ ওই লোক সত্যিকারের শয়তান, আর তোমরা তার সঙ্গে যুদ্ধ করে ঠিক কাজটিই করছ।’ কিন্তু অন্য কেউই তার কথা শুনতে চাইল না। লিগি এর কোনো অর্থ খুঁজে পেল না। সে বললো, ‘শত্রুপক্ষের যে কাউকে হত্যা করাই তোমাদের কাছে সমান হতে পারে, কিন্তু আলবার্তোর সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন কাউকে হত্যা করলে, আমি সত্যিই খুব হতাশ হব।’ তার কথায় অন্যরা অধীর হয়ে উঠল। তাদের একজন তাকে যুদ্ধ সম্পর্কে বয়ান দিল, আর বোঝালো যে, কেন সে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে বিশেষ কোনো শত্রুকে হত্যা করতে পারে না। লিগিরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। আর সে জানালো, ‘যদি তা-ই হয়, তাহলে আমাকে তোমরা বাদ দিতে পার।’ কিন্তু তারা বললো, ‘তুমি থাকছ। তুমি যেতে পারবে না।’ তারা সমস্বরে বললো, ‘ফরোয়ার্ড মার্চ, ওয়ান-টু, ওয়ান-টু..।’ আর তাকে তারা যুদ্ধে পাঠিয়ে দিল। যুদ্ধে গেলেও লিগির মনে স্বস্তি ছিল না। সে খুব নিস্পৃহভাবে মানুষ হত্যা করতে লাগল। আর খুঁজতে লাগলো আলবার্তোকে, নিদেনপক্ষে তার পরিবারের কাউকে। প্রতিটি শত্রু নিধনের বিপরীতে তারা তাকে মেডেল দিতে লাগলো। কিন্তু সে কোনো স্বস্তি পেল না। তার মনে হলো, ‘যদি আমি আলবার্তোকেই মারতে না পারি, তাহলে বিনা কারণে এতজনকে হত্যার কোনো অর্থ নেই।’ এদিকে তারা একের পর এক রৌপ্য, স্বর্ণসহ বিভিন্ন মেডেল দিতে লাগলো তাকে, সবকিছু দিতে লাগলো। আর লিগি ভাবতে লাগলো, ‘আজ কিছু মারি, কাল আরো কিছু, আর এভাবেই তাদের সংখ্যা কমবে। আর একদিন না একদিন ওই শয়তান সামনে আসতে বাধ্য হবে।’ কিন্তু লিগি আলবার্তোকে খুঁজে পাওয়ার আগেই শত্রুপক্ষ আত্মসমর্পণ করলো। তার এই ভেবে খুব খারাপ লাগলো যে, কোনো কারণ ছাড়াই সে অগণিত মানুষকে হত্যা করেছে। আর যেহেতু তাদের ফিরে পাওয়া আর সম্ভব নয়, সেহেতু সব মেডেল একটি ব্যাগে রেখে মৃতদের পরিবার ও সন্তানদের খুঁজতে সে শত্রু দেশে গেল। আর এভাবেই সে একদিন আলবার্তোর দেখা পেল। ‘যাক’ সে বললো, ‘অবশেষে দেখা হলো। আর সে হত্যা করলো আলবার্তোকে। আর এর পরই তারা তাকে গ্রেফতার করলো, তার বিচার হলো। এবং তার মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হলো। বিচারে সে বারবার একই কথা বললো যে, একটু শান্তি পাওয়ার জন্য তার এটা করার ছিল। কিন্তু কেউই তার কোনো কথা শুনলো না।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..