কৃষি বাজেট: উন্নয়নের মহাসড়ক যাত্রা...

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অমিত রঞ্জন দে : প্রতিবছরের ন্যায় জুন মাসের প্রথম বৃহস্পতিবারেই ঘোষিত হলো জাতীয় বাজেট ২০১৭-১৮। বাজেট ঘোষণা করেই মাননীয় অর্থমন্ত্রী এই বাজেটকে তার সময়ে উত্থাপিত সর্বশ্রেষ্ঠ বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু অর্থনীতিতে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা এ বাজেটকে নানা ধরনের বিশেষণে বিশেষায়িত করছেন। কেউ বলছেন এই বাজেট গতানুগতিক, কেউ উচ্চাভিলাষী, কেউ নিকৃষ্ট, কেউ আবার অবাস্তব বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতার নবম অধ্যায়ে নিজেই বলেছেন ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট। অবশ্য বাজেটের কলেবর দেখলে তা মুখে বলবার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মোট বাজেট ঘোষিত হয়েছিল ৩,৪০,৬০৫ কোটি টাকা। এবারে তা পরিণত হয়েছে ৪০০,২৬৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ গত অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ৫৯,৬৬১ কোটি টাকা বেশি। এ থেকে বাজেট ঘোষণার অভিলাষ টের পাওয়া যায়। কিন্তু সে অভিলাষের ছোঁয়া কৃষি বাজেটে লাগেনি। গত এক দশকে কৃষিতে বাজেট ধারাবাহিকভাবে কমছে। আমরা যদি এ সরকারের চলমান দুই মেয়াদের বাজেট পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব কৃষিতে ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ১০.৯%, ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ৯.৮%, ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ৯.৬%, ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ১১.৩%, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ৯.২%, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ৭.৮%, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ৭.০%, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ৬.৭%, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ৬.১%। এই ৬.১ শতাংশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। যদি শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেট পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাবো ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিলো ১৩,৬৭৬ কোটি টাকা (৪.০১%), যা ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে হয়েছে ১৩,০০০ কোটি টাকা (৩.৪০%)। যদি শুধু টাকার অংকে হিসাব করি তাহলে গত অর্থবছরের তুলনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমেছে ৭৬ কোটি টাকা এবং শতাংশে হিসাব করলে দশমিক ৬১%। এবার ভর্তুকি প্রসঙ্গে দু-একটি কথা বলতে চাই। ২০১২-১৩ অর্থবছরের মোট বাজেট ছিল ১,৯১,৭৩৮ কোটি টাকা এবং সে বছরে কৃষিতে বরাদ্দ ছিলো ১১.৩%। গত এক দশকের বাজেট প্রণয়নে সে বছরই কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছিল এবং বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ ছিলো ৯,০০০ কোটি টাকা। তারপর থেকে বাজেটের আকার বড় বা ছোট যাইই হোক না কেন ভর্তুকি ঘোষণার পরিমাণ ৯,০০০ কোটি টাকাই স্থির থেকেছে। টাকার অংকে এখানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এবারের ৪০০,২৬৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার পরও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে বাজেট ঘোষণা করাই শেষ কথা নয়। এরপর আরো দুটো পর্যায় থাকে যেটা সম্পর্কে আমরা সাধারণত লক্ষ্যই করি না। বাজেট সংশোধিত হয় এবং তা প্রকৃতপক্ষে কত খরচ হয় সে হিসাব আমাদের কাছে থাকে না। পরের বছরের বাজেটে সংশোধিত বাজেটের চেহারা দেখা গেলেও প্রকৃত বাজেট জানার জন্য আরো একটা বছর অপেক্ষা করতে হয়। সেকারণে তা নিয়ে কাউকে কোনো কথা বলতে শোনা যায় না। এখানে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সে বছরে কৃষিতে ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়েছিল যথারীতি ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা নেমে আসে ৭ হাজার কোটি টাকায়। আবার খরচের হিসেব যদি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখবো তা মাত্র ৬ হাজার ৪৩২ কোটি টাকায় উপনীত হয়েছে। একইভাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও ভর্তুকি ঘোষণা করা হয় ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা ৬ হাজার কোটি টাকায় উপনীত হয়। প্রকৃত খরচ জানার জন্য আমাদেরকে আরো একবছর অপেক্ষা করতে হবে। এবার গুরুত্বের বিবেচনায় কৃষিকে কিভাবে দেখা হচ্ছে তা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন আমাদের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। শিল্পের প্রসার এবং তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন সত্ত্বেও এখনো দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। খুব যথাযথভাবে তিনি এটি চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন। তাহলে যে খাতে এত মানুষের সম্পৃক্ততা রয়েছে সে খাতে বাজেট বরাদ্দে এত কার্পণ্য কেন, কেন এ ঔদাসিন্য? বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে। এখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দ্বিতীয় লক্ষ্যমাত্রাই হলো ক্ষুধা থেকে মুক্তি। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান এবং টেকসই কৃষির প্রসার। এই দলিলের ২.৪ ধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে ‘২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং অভিঘাত সহনশীল এমন একটি কৃষিরীতি বাস্তবায়ন করা যা উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি করে বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে সহায়ক, জলবায়ু পরিবর্তন, চরম আবহাওয়া, খরা, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে অভিযোজনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং যা ভূমি ও মৃত্তিকার গুণগত মানের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি সাধন করবে। উপরোক্ত বিষয়সমূহ মাথায় রেখে গত নভেম্বর ২০১৬ বর্তমান সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে টেকসই করার লক্ষ্যে ‘জাতীয় জৈব কৃষিনীতি’ প্রণয়ন করেছে। যা টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে পা বাড়ানোর নমুনা বৈকি এবং এ উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে একটি প্রসংশনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এ বছরের বাজেটে কি তার কোনো প্রতিফলন আছে। যে সদিচ্ছার জায়গা থেকে নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, এবারের ঘোষিত বাজেটে প্রণয়নে কি সে সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে? জৈব কৃষিনীতির ভূমিকা পর্বের ১.২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বালাই নাশকের ব্যবহার যাতে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি না করে সেজন্য সচেতন নাগরিক সমাজের মাঝে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের চাহিদা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের আকাক্সক্ষা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে নিরিখে জৈব কৃষি (Organic Agriculture) বর্তমান বিশ্বে এক আলোচিত অধ্যায় ও দ্রুত বিকাশমান খাত হিসেবে বিবেচিত।’ দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এ নীতি বাস্তবায়নে আলাদাভাবে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। জীব প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিবীজ উন্নয়ন, বর্ধিতকরণ, মান নিরূপন ও প্রযুক্তি বিস্তারে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি ৩৩ লক্ষ টাকা। এবারেও সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এখানে টাকার অংকে কোনো পরিবর্তন আসেনি, বাজেটের আকারের সাথে ‘%’-এর বিবেচনা তো পরের কথা। জাতীয় জৈব কৃষিনীতির ধারা ২ এ যে উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে কৃষির জন্য মাটির স্বাস্থ্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে উপস্থাপিত হয়েছে। নীতিতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কৃষি রাসায়নিকের ব্যবহার মাটি ও জনস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলিকে যথোপযুক্ত সমন্বয় করে মৃত্তিকার উর্বরতা বজায় রেখে কৃষি কার্যক্রম পরিচালনা করা, জৈব কৃষির উপযোগী অঞ্চল, স্থান ও ফসল সনাক্ত করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ প্রয়োজন। অথচ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গত অর্থবছরের বরাদ্দ ছিলো যেখানে ৭ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা, সেখানে এবারের বাজেটে কোনো বরাদ্দই রাখা হয়নি। তাহলে সরকার প্রণীত ও স্বাক্ষরকৃত বা অঙ্গীকারাবদ্ধ আইন ও নীতির সাথে এবারের বাজেট কতটা সংগতিপূর্ণ। এই বাজেট কিভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দ্বিতীয় মাত্রা পূরণে সক্ষম হবে এবং তা কিভাবে উন্নয়নের মহাসড়কে সুশৃঙ্খল অভিযাত্রায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করবে?

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..