জলজ পরিবেশের উপর শিপিং ও ড্রেজিং-এর ক্ষতিকর প্রভাব

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
[সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র ১০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মূল উপস্থাপনা হিসেবে কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. মো: আনোয়ার হোসেন কর্তৃক পেশকৃত।] এটি ‘Critical Reviwe of Shipping and Dredging Plans to facilitate Coal transport for the Coal fired power plant at Rampal, Khulna, Bangladesh’ by Dr. William Kleindl of University of Montana and Dr. Jon Brodie of James Cook University, Australia’র মূল্যায়ন সংক্ষেপ: জলজ পরিবেশের উপর শিপিং ও ড্রেজিং-এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নগুলি নিম্নরূপ: (১) সরকার বঙ্গোপসাগর ও পশুর নদীতে ড্রেজিং-এর ফলে সৃষ্ট পরিবেশের উপর হুমকিগুলো পর্যাপ্তভাবে মূল্যায়ন করেনি এবং ঐ হুমকিগুলি নিরসন ও হ্রাস করার পর্যাপ্ত পরিকল্পনা করেনি। (২) ড্রেজিং-এর উপর পরিবেশের মূল্যায়ন (ইআইএ) অসম্পূর্ণ এবং জনগণের মতামত বর্জিত। কয়লা পরিবহনের জন্য গভীর চ্যানেল তৈরি করতে ৩৩ মিলিয়ন টন পলি-কাদা বঙ্গোপসাগর ও পশুর নদী হতে ড্রেজিং করা হবে। (৩) ড্রেজিং করা ও পলি-কাদার ডিজপোজাল সুন্দরবনের খাড়ি ও বঙ্গোপসাগরের পানি ঘোলা করবে, ফলে আলো প্রবেশ করবে না এবং খাদ্যচক্রের ভিত্তি ফাইটোপ্লাঙ্কটন জন্মাতে বাঁধা সৃষ্টি করবে। (৪) ডাম্পিং করা পলি-কাদা ও ঘোলা পানি জলের তলদেশে বাস করা জলজপ্রাণীদের বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকা হুমকিতে ফেলবে। (৫) ঘোলা পানি ডলফিন, মাছ ও জলজপাখিসহ বিভিন্ন শিকারীদের শিকার দেখা ও ধরা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। ফলে এরা বিপন্ন হবে। (৬) ড্রেজিং-এর ফলে শব্দদূষণ ও রাতে আলো দূষণ জলজ বন্যজীবনকে বিশৃঙ্খল করবে। ফলে প্রাণীরা অত্র এলাকা এড়িয়ে চলবে এবং খাদ্য সংগ্রহের জায়গা কমে যাবে। (৭) ড্রেজিং ও ডাম্পিং-এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হবে। পর্যায়ক্রমে পাশর্^বর্তী ইকোসিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ে পানিতে ভাসমান পলির পরিমাণ (ঘোলাত্ব) বাড়িয়ে দেবে। (৮) মাছসহ জলজপ্রাণীদের কানকুয়া, ফুলকা, নাকের ছিদ্রসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঘোলা পানির কাদা দ্বারা বন্ধ বা ক্লোগিং হবে ফলে জলজ জীবণ বিপন্ন হবে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবে ছোট মাছ ও ছোট প্রাণীগুলো, ফলে এরা দ্রুত বিলুপ্ত হবে। (৯) বাংলাদেশ সরকার ড্রেজিং করা পলি-কাদা কোথায় ডাম্পিং করবে তা সুনির্দিষ্ট করেনি এবং জলজ প্রজাতিসমূহের ওপর হুমকি মূল্যায়ন করেনি। (১০) রামপাল ও মোংলা পোর্টের মধ্যে ড্রেজিংকৃত ৩.৮৮ মিলিয়ন টন পলি-কাদা উজানে পশুর নদীর অববাহিকায় ডাম্পিং করবে বলে দাবী করেছে সরকার। যা ডলফিন প্রজতির বিচরণ ও প্রজনন এলাকা, সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য সাইট-এর উজানে বা উপরের দিকে হওয়ায় এর পরিবেশকে বিপন্ন করবে। (১১) সরকার পরে অন্য রিপোর্টে বিপরীত মতামত দিয়ে বলেছে ড্রেজিংকৃত পলি-কাদা দিয়ে রামপাল সাইটের নিচুভূমি ভরাট করবে। (১২) ড্রেজিংকৃত পলি-কাদা যাতে নদীতে আসতে না পারে সেজন্য মাটির বাঁধ দেয়া হবে। এ বাঁধ দেয়া এলাকাটি বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল কারন এলাকাটি সমুদ্র সমতল থেকে ১ মিটার উঁচু এবং ভূগর্ভস্থ পানির তল থেকে ১ মিটার উপরে অবস্থিত। (১৩) পলি-কাদা হতে নদীর ও ভূগর্ভস্থ পানিতে দূষণ ছড়াবে। (১৪) জলজ প্রাণী, মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রজাতির প্রভূত ক্ষতি করবে। টক্সিন অবমুক্ত হবে পানি-বাতাসে। (১৫) নদী ও খাল ভরাট করে সরু করার জন্য বন্যা ও ভূমি ক্ষয় বাড়বে। (১৬) বঙ্গোপসাগর হতে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত ক্যাপিটাল ড্রেজিং করে ৩০ মিলিয়ন টন পলি-কাদা বঙ্গোপসাগরে ডাম্পিং করা হবে। যাহা আশেপাশের জলজ ইকোলজি ও মহামূল্যবান সুন্দরবনকে হুমকিতে ফেলবে, বিপন্ন ডলফিন প্রজাতিসমূহকে আরো বিপন্ন করবে। (১৭) সরকার বঙ্গোপসাগর ও পশুর নদীর মধ্যে দিয়ে কয়লা পরিবহনের হুমকিগুলি ও ঐ হুমকিগুলো জরুরিভাবে মোকাবিলা করার ব্যবস্থাগুলো ভালভাবে মূল্যায়ন করেনি। (১৮) কয়লা পরিবহন দুর্ঘটনা জরুরিভাবে মোকাবিলা করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয় নাই। (১৯) ইউনেস্কো ও আইইউসিএন-এর রিঅ্যাকটিভ মনিটরিং মিশন (জগগ) এর ৬নং সুপারিশে বলা আছে স্টকহোল্ডারদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ জাহাজ দুর্ঘটনা মোকাবিলার জন্য সময়মত ও সমন্বিতভাবে এবং ইউএনডিপির জন্য ওয়েল স্পিল অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দ্রুত ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকার ’ন্যাশনাল ওয়েল স্পিল কন্টিনজেন্সি’ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে দাবি করছে। বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন পাওয়া যায় না। (২০) জানুয়ারি ১৩, ২০১৭ সালে পশুর নদীর মোহনায় এমভি আইচগাতি জাহাজ ডুবে যায়, যা ১০০০ টন কয়লা ও শতশত গ্যালন তেল পানিতে নির্গত করেছে। সেটি এখনও সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য সাইট ও সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড মেরিন সংরক্ষিত এলাকাকে দূষিত করছে। (২১) এখনও পর্যন্ত সরকার জাহাজটিকে সরিয়ে ফেলার এবং বিষাক্ত তেল অপসারণের কোন দৃশ্যমান কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। (২২) বিগত তিন বছরে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য সাইট ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নদীতে চারটি জাহাজডুবির ঘটনা ও তার উদ্ধার কাজের নমুনা প্রমাণ করে সরকারের দুর্ঘটনা মোকাবিলা করার জরুরি ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। (২৩) আকরাম পয়েন্টে কয়লা ট্রান্সশিপমেন্ট হতে উদ্ভুত ঝুঁকি ও ঝুঁকি মোকাবেলা করার ব্যবস্থাগুলো পর্যাপ্তভাবে পর্যালোচনা করেনি সরকার। (২৪) রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে বছরে ৮০,০০০ DWT (deadweight tons) ধারণ ক্ষমতার ৫৯টি জাহাজ চলাচলের প্রয়োজন হবে। সপ্তাহে প্রায় একটি করে। (২৫) সরকারি তথ্যে বলা হচ্ছে ৫০০০-১০০০০ DWT (deadweight tons) ধারণ ক্ষমতার জাহাজ ব্যবহার করা হবে, ফলে সপ্তাহে ৮-১৬টি জাহাজ বা বছরে ৪৭২-৯৪৪ টি জাহাজ চলাচল করবে। (২৬) বছরের ১৪৫ দিন আকরাম পয়েন্ট কয়লা ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য ব্যস্ত থাকবে। (২৭) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং ফরেস্ট আইন ১৯২৭ অনুসারে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং কোনো বাণিজ্যিক কাজ, বন, বন্যপ্রাণী ও সম্পদের ক্ষতিসাধন গ্রহণযোগ্য হবে না। (২৮) সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য সাইট ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভিতরে অবস্থিত আকরাম পয়েন্টে কয়লা ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য প্রতি সপ্তাহে কর্মযজ্ঞ হবে যা বানিজ্যিক কাজ। ফলে এটি আইনের বরখেলাপ। (২৯) ইআইএ-তে আকরাম পয়েন্টে কয়লা ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য সুন্দরবনের ক্ষতি মূল্যায়ন করেনি। (৩০) আকরাম পয়েন্টে কয়লা ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য শব্দ, আলো, কয়লার ধুলিকনা ও তেল স্পিল দূষণের সম্ভাবনা প্রবল। (৩১) আকরাম পয়েন্ট এলাকাটি বিভিন্ন ডলফিন প্রজাতির বিচরণ ক্ষেত্রের কাছে অবস্থিত যা ডলফিন প্রজাতির বিচরণ পরিবেশ ব্যাহত করবে। (৩২) দীর্ঘমেয়াদি নৌ চলাচল ও ড্রেজিং-এর ফলাফল ডলফিন প্রজাতির জন্য প্রাণঘাতি ও উপ প্রাণঘাতি হবে। (৩৩) শব্দ ও রাত্রিকালীন আলো জলজ ও স্থলজ বন্যপ্রাণীদের জীবনধারণ পদ্ধতিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..