বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম লিয়াকত হোসেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

এস এ রশীদ : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক ছাত্রনেতা, খুলনা পৌরসভার সাবেক কমিশনার স ম লিয়াকত হোসেন গত ৭ জুন ঢাকার হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মরদেহ ঐ দিন খুলনায় নিজ বাড়িতে আনা হয়। ৮ জুন সকাল ১১টায় খুলনার শহীদ হাদিস পার্কে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার ও অগণিত স্বজনের শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাঁকে। স ম লিয়াকত হোসেনের জন্ম ১৯৫২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। তাঁর বাবা স ম আব্দুল খালেক ও মা বেগম খাদিজা। ১৯৬৭ সালে খুলনা হ্যানে রেলওয়ে স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং বি এল কলেজে আই এ-তে ভর্তি হন। স্কুলে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন এবং স্কুল কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। বিএল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তিনি আরো সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০ সালে আই এ পাস করে তিনি ভর্তি হন ঢাকার মিরপুর বাংলা কলেজে। বাংলা কলেজে তখন রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল তাই ছাত্র ইউনিয়ন রাজনীতির করার অপরাধে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তিতে তিনি জগন্নাথ কলেজে নতুন করে ভর্তি হন এবং বি এ পাস করেন। ১৯৭১ সালে খুলনায় ফিরে আসেন এবং কমরেড রতন সেনের নির্দেশে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য কর্মী সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কয়েকজন নেতৃবৃন্দসহ বেশকিছু অস্ত্র নিয়ে কমরেড শেখ মনিরুজ্জামানের দৌলতপুরের বাড়িতে অবস্থান করেন। দৌলতপুরের স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রচণ্ড চাপে এলাকাবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে ঐ এলাকা ত্যাগ করেন এবং ভোমরা সীমান্ত অতিক্রম করে বসিরহাটের সিপিআই অফিসে পৌঁছান। ঢাকি সোদপুরে সিপিআই-এর উদ্যোগে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা হলে অন্যান্যদের সাথে সেখানে অবস্থান গ্রহণ করেন। কমরেড রতন সেনের তত্ত্বাবধানে ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন-কমিনিস্ট পার্টির যৌথ গেরিলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে আসামের তেজপুরে সামরিক ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে কমিনিস্ট পার্টির গর্বিত সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খুলনা জেলা সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৪ সালের সম্মেলনে সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে সেই হত্যার বিচারের দাবিতে গড়ে উঠা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৬ সালে ঘরোয়া রাজনীতির সময় ছাত্র ইউনিয়ন জেলা সম্মেলনে ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়ে শ্রমিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। ১৯৮১ সালে খুলনা পৌরসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে কমিশনার নির্বাচিত হন। সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে তিনি সুনাম অর্জন করেন। পরবর্তীতে এরশাদ সামরিক শাসক বিরোধী আন্দোলনে তিনি সামনের কাতারে থেকে আন্দোলনকে বেগবান করেন। আশির দশকে দক্ষিণাঞ্চলে লবণপানি ঘের বিরোধী আন্দোলনে তিনি অন্যতম ভূমিকা রাখেন। ১৯৯২ সালের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৯২ সালের ৩১ জুলাই কমরেড রতন সেনকে হত্যার পর তাঁর হত্যার বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে তিনি রাজপথে থেকে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন। ২০০৯ সালে কমরেড রতন সেনের বসতবাড়ি রূপসা উপজেলার পালেরহাটে ডোমরা গ্রামে “কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গালর্স স্কুল” প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সিপিবি নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র রাজনীতির সহযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে এলাকায় হতদরিদ্র মেয়েদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নানা প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে স্কুলের কর্মকাণ্ড শুরু করেন। শুরুতে মেয়েদের বই, খাতা, কলম, পোশাক, ব্যাগ, জুতা, ছাতা ও দুপুরের খাওয়াসহ সবকিছু জোগাড় করতে তাঁকে বহু কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। এ সময়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বহু অর্থ স্কুলের জন্য ব্যয় করেছেন। স্কুলের কল্যাণে স্বার্থে তিনি তাঁর তিন ছেলে ও ভাইকে সম্পৃক্ত করেছেন। তাঁর এ কষ্ট সার্থক হয়েছে যখন ৮ম শ্রেণি ও এসএসসি পরীক্ষায় উপজেলা ও জেলায় চমৎকার ফলাফল করেছে এবং খেলাধুলা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে স্কুলের মেয়েরা আশানুরূপ মেধার পরিচয় দিয়েছে। স্কুলই ছিল তাঁর ধ্যান, জ্ঞান, প্রাণ। ছাত্রীদের তিনি আপন সন্তানতুল্যা মনে করতেন এবং ছাত্রীরাও তাঁকে শ্রদ্ধাভরে বড় আব্বু বলে ডাকত। ৮ জুন সকল ৮টায় যখন তার মরদেহ স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এক হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্কুলের শতশত অশ্রুসিক্ত ছাত্রীরা বিলাপ করতে থাকে। অনেকে কাঁদতে-কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অবস্থা সামাল দিতে দ্রুত তার মরদেহ নিয়ে খুলনায় রওনা হয়। খুলনা জেলাতে নতুন কোন প্রশাসনিক কর্মকর্তা যোগদান করলে লিয়াকত ভাই তার সাথে যোগাযোগ করতেন ও স্কুলে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন। অনেক কর্মকর্তা স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে ছাত্রীদের সাথে সময় কাটিয়েছেন এবং একসাথে দুপুরে ছাত্রীদের সাথে খাবার খেয়েছেন। লিয়াকত ভাই দেশ ও বিদেশে প্রাক্তন ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে স্কুলের জন্য সহযোগিতার অনুরোধ করতেন। ২২ মে মাসে তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সে সময়ে যারা তাঁকে দেখার জন্য গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে বহুজনকে বলেছিলেন, ‘তুমি এখনও আমার স্কুলটি দেখতে যাওনি।’ তার বড় ছেলে পিয়াস বলেছে, বাবা ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন একটু সুস্থতা বোধ করলে, আমাকে বলতেন, ‘আমাকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেও, স্কুলের কাজকর্ম কিভাবে চলছে তা আমাকে জানতে হবে।’ স ম লিয়াকত হোসেনের স্বপ্ন ছিল একটি অবৈতনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। তিনি কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট স্কুলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। এ বছর কলেজ শাখায় ছাত্রী ভর্তি করা হয়েছে এবং আগামী ১ জুলাই থেকে ক্লাস শুরু হবে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, লিয়াকত ভাই তাঁর কলেজে ছাত্রীদের ক্লাস করা দেখে যেতে পারলেন না। পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের স্বপ্ন পূরণ করতে। নিশ্চয়ই কমরেড রতন সেনের অনুসারী এবং স ম লিয়াকত হোসেনের স্বজনরা একদিন না একদিন সেই স্বপ্ন সফল করতে পারবে। স ম লিয়াকত হোসেন মরে নাই, তিনি বেঁচে থাকবেন হাজার স্বজনের হৃদয়ে। কমরেড স ম লিয়াকত হোসেন লাল সালাম। লেখক : সদস্য কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..