গ্যাস ও জ্বালানি খাতের ভুল দাম নীতি: বিপন্ন করছে জাতীয় স্বার্থ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এম এম আকাশ : তেল-গ্যাসকে বলা হয় স্ট্রাটেজিক পণ্য বা কৌশলগত পণ্য, কারণ এগুলোর মাধ্যমেই অর্থনীতির শিরা-উপশিরা শক্তি সঞ্চয় করে এবং সব উৎপাদনেও তারা কমবেশি যুক্ত হয়। উৎপাদন ও পরিবহনে এরা যুক্ত হয় শক্তি ও গতি সৃষ্টিকারী জ্বালানি হিসেবে। তাছাড়া বিদ্যুত শক্তি তৈরিতে এগুলো ব্যবহƒত হয়। সুতরাং অপ্রত্যক্ষভাবে বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল সব শিল্প, কৃষি ও অন্যান্য সার্ভিস সেক্টরের সার্ভিসও চূড়ান্ত বিচারে এসব জ্বালানির উপর বিপুল ভাবে নির্ভরশীল। তাই এগুলোকে বলা হয় স্ট্যাটেজিক বা কৌশলগত পণ্য। এই স্ট্রাটেজিক বা কৌশলগত পণ্যের সঠিক দাম কিভাবে নির্ধারিত হবে? সেটা নিছক বাজারের সাপ্লাই এবং ডিমান্ডের উপর ছেড়ে দেয়াটা কি ঠিক হবে? মুক্তবাজার অর্থনীতিই কি এদের ভবিতব্য? তা যে ঠিক হবে না তা এখন উদারনৈতিক মুক্তবাজারপন্থিরাও মানেন। একমাত্র কট্টরপন্থী নিওলিবারালরা তা অস্বীকার করে চলেছেন। সুতরাং স্ট্রাটেজিক পণ্যের দাম একটা যৌক্তিকতার মাধ্যমে একটা র্যাশনালিটির মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। শুধু চাহিদা আছে তাই যথেচ্ছা দাম আদায় (আসলে খাজনা আদায়!) মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। চেষ্টা করতে হবে দাম কম রাখতে আর উৎপাদনে গতি সঞ্চারে সর্বাধিক সহায়তা দিতে। এটাই পৃথিবীতে Rational Economist-দের কাছে স্বীকৃত স্ট্যান্ডার্ড। বর্তমান সরকার তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতির পক্ষে হলেও, এ নীতি কিছুটা মেনে চলছেন এবং সেজন্য আমাদের দেশেও গ্যাস বিদ্যুৎ পানি এগুলোর দাম সরকার এবং ত্রিপক্ষীয় সংস্থাই (ভোক্তা, সরকার ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ) এযাবৎ পরিকল্পিত ও যৌথভাবে নির্ধারণ করে এসেছে। আমাদের দেশে ত্রিপক্ষীয় সংস্থার বিকল্প হিসেবে সম্প্রতি সরকার একটি নতুন পদ্ধতি বের করেছেন। যেখানে একটি তৃতীয় নিরপেক্ষ দাম নির্ধারক কর্তৃপক্ষ থাকবে। সেখানে স্টেকহোল্ডার বা যাদের স্বার্থ এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারা নিজ নিজ বক্তব্য খোলাখুলি ভাবে বা স্বচ্ছতার সঙ্গে পেশ করবেন। পাশাপাশি যারা বিশেষজ্ঞ তারা প্যানেল হিসেব আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন। সেটা সবাই মিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। এটার নাম দেয়া হয়েছে গণশুনানি। আর এ গণশুনানির মাধ্যমেই দামটা নির্ধারিত হবে। আসলে দামটা নির্ধারণ করবেন গোপনে সরকারই, তবে একটা গণশুনানির মাধ্যমে সকল দিক বিবেচনায় নিয়ে সেটা স্থির করার আনুষ্ঠানিকতা সেখানে থাকবে। এখানে নির্ধারিত দামই পরবর্তীতে বাজারে স্বীকৃত দাম হিসেবে প্রচলিত হবে। তখন কেউ আইন লঙ্ঘন করলে সরকারের দায়িত্ব হবে তাকে ঠেকানো। কৌশলগত পণ্যের দামের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রচলিত নীতি অনেকটা অভিন্ন। তবে এখন আমরা জানতে পারছি যে এই দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার গণশুনানিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না- সেখানে উচ্চারিত যুক্তিগুলি সরকারের কানে ঢুকছে না। গণশুনানিতে ওঠা অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও এখন উপেক্ষা করা হচ্ছে। এবং সম্প্রতি এই প্রবণতাটা এতই বেড়েছে যে গণশুনানি বাদেই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাবে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে এমন আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। গনশুনানির অস্বস্তিটুকুও সরকার সহ্য করতে অপারগ! সাম্প্রতিক বাজেটে গ্যাস ও বিদ্যুতের উপরেও ১৫% শতাংশ ভ্যাট ধরা হয়েছে। আগেও বিদ্যুতের উপর ভ্যাট ছিল কিন্তু তা ছিল ৫ শতাংশ অর্থাৎ আগে ১০০০ টাকার বিদ্যুত বিলে গ্রাহককে ভ্যাট দিতে হোত ৫০ টাকা। এখন দিতে হবে ১৫০ টাকা। কিন্তু সরকারের বর্তমান প্রস্তাব হচ্ছে আগেই দাম বাড়াতে হবে ১৫% ভ্যাট যোগ করে। অবশ্য বিদ্যুৎ খাতে সরকার একই সঙ্গে যেসব কর ছাড় দিয়েছে, তা হিসাবে নিয়ে বিদ্যুৎ সচিবের সর্বশেষ ভাষ্য হচ্ছে যে, বিদ্যুতের নীট যৌক্তিক দাম বৃদ্ধি আসলে করতে হবে ৮ শতাংশ মাত্র। (দৈনিক প্রথম আলো, ১৩ জুন সংখ্যা, শ্রী অরুন কর্মকারের রিপোর্ট দ্রঃ) অনুরুপ ভাবে গ্যাসের পুর্বনির্ধারিত ভ্যাটের হার ১৩% থেকে ১৫%-এ উন্নীত হওয়ায় গ্যাসেরও দাম সামান্য বাড়াতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে বাজেট পাস হয়ে গেলে সেটা আইনের শক্তি ধারণ করবে এবং তখন গনশুনানি ব্যাতিরেকেই এসব স্ট্র্যাটেজিক পণ্যের দাম বৃদ্ধি কি অনিবার্য হয়ে উঠবে না? তাই এই বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট অবস্থান আগেই ব্যাখ্যাত হওয়া প্রয়োজন। সরকার দাম বাড়াতে বদ্ধপরিকর বিধায় হয়তো এ ব্যাপারে নিজের আইন নিজে লঙ্ঘন করে আলোচনার সভ্য সুযোগটুকুও রহিত করে দেয়া হবে। গ্যাসের দাম নিয়ে আগে থেকেই একটা বিতর্ক ছিল। বাংলাদেশের গ্যাসের দাম কিভাবে নির্ধারণ করব আমরা। বাংলাদেশে যেহেতু গ্যাস ব্যবহƒত হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে সুতরাং গ্যাসের দাম খুব বেশি বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুতের দামটাও বেড়ে যাবে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী জ্বালানি মূল্য পড়তির পটভূমিতে দাম সমন্বয় করলে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির দামও সমন্বয় করতে হোত এবং বিদ্যুতের দামও নিম্নগামী হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। বিদ্যুৎ তৈরির ক্ষেত্রে আমরা গ্যাস ব্যবহার করি, কয়লা ব্যবহার করি, অনেক সময় আমরা আমদানিকৃত ডিজেল বা অন্য তেলও ব্যবহার করি। যদি ধারাবাহিকভাবে দামের ক্রম দেখি তাহলে তেল ব্যবহার করে যে বিদ্যুৎ সেটার দাম সবথেকে বেশি। কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম মাঝারি, আর গ্যাসের ক্ষেত্রে দাম সবথেকে কম। বিদ্যুতের গড় দাম এসব জ্বালানির দামের গতি প্রবণতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানি মিশ্রণের (Energy Mix) উপর নির্ভর করবে। সরকারের আদর্শ নীতি হওয়া উচিৎ ছিল অনুকুল জ্বালানি মিশ্রণ নিশ্চিত করে, আন্তর্জাতিক মূল্য হ্রাসের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। সরকার তার ঘোষিত নীতিতে সে ভাবে চলার কথা ঘোষণা করলেও শেষে এসে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে এক নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চলেছেন। সরকার ভাবছে বিদ্যুৎ দিলেই হলো- দাম যাই হোক না কেন। ক্ষতি যাই হোক না কেন। একথা সত্য যে গ্যাসের দাম সবথেকে কম কারণ সেটা আমাদের নিজস্ব বলে। আমরা নিজেরা ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত গ্যাস ব্যবহার করলে সেটার যা দাম পড়ে, সেখানে লাভ করার পরেও কয়লা কিংবা অন্য উপকরণ থেকে কম থাকছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ। ফলে গ্যাসের দাম কম রাখলে বিদ্যুতের দামও কম থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে একটা প্রশ্ন বার বার ঘুরেফিরে এসেছে সেটা হচ্ছে গ্যাসের দাম কম রাখলে যখন বেশি দামের জ্বালানিতে যাব তখন কিভাবে সমন্বয় করা হবে। অন্যদিকে আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে গ্যাস তো অফুরন্ত নয়। কারণ গ্যাস মাটির নিচে আছে। সেখান থেকে উত্তোলন করে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মাটির নিচ থেকে গ্যাসের সরবরাহ শেষ হয় গেলে তখন কি হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই সরকার গণশুনানির মাধ্যমে নির্ধারণ করেছে গ্যাসের দাম একেবারে কস্ট প্রাইস (Cost Price) হবে না। এক্ষেত্রে গ্যাসের দাম এমন সহনীয় মাত্রায় রাখতে হবে যেখানে প্রফিট (profit) হবে তবে সেটা বেশি হবে না। আর একই সাথে ঐ প্রফিট কাজে লাগিয়ে একটা ফান্ড গঠন করা যেতে পারে যা গ্যাস সংক্রান্ত উন্নয়নে কাজে লাগানো যাবে। তা সরকার করেছেও কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে তা ঠিকমত কাজে লাগানো হচ্ছে না এবং দেশি কোম্পানির বদলে বিদেশি কোম্পানির উপর আমাদের নির্ভরতা বাড়ছে। এখানে শাসক দল ও অসৎ আমলাতন্ত্রের দুর্নীতির ভূমিকা বিদ্যমান। আমরাও তাই বেশি দাম দিয়ে বিদেশি গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছি। এমনকি বর্তমানে আমাদের গ্যাসফিল্ড বিদেশিরা আমাদের না জানিয়ে অন্য বিদেশিদের কাছে হস্তান্তর করে দিচ্ছে! (দেখুন শেভরন ও চীনা কোম্পানির সাম্প্রতিক ডিলসমূহ) সম্প্রতি সরকারের বাজেটের উপর চাপ পড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় কর আদায় সম্ভব হচ্ছে না। ওয়েলথ ট্যাক্সের কথা সরকার বলেছিল, কিন্তু সম্পদশালীদের টিকিটিও স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি। কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগও দেয়া হয়েছিল, তবে খুব একটা লাভ হয়নি এতে। অন্যদিকে ভ্যাট আমরা বাড়িয়েছি কিন্তু আর বেশি জায়াগায় বাড়ানোার সুযোগ নেই। ডাক্তারি সার্ভিস থেকে শুরু করে আরো কিছু ক্ষেত্রে ট্যাক্স বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তেমন লাভ হয়নি। তাই সরকার নানা দিক থেকে ট্যাক্স আদায়ের চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে সেগুলো সম্ভব না হওয়াতে সরকার অন্য অগতানুগতিক পদ্ধতিও অবলম্বন করছে। দেখা গেছে রিজার্ভের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে নেয়া, সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ (এবারের বাজেটে এর পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা), এসব কথা সরকার ভাবছেন। যেহেতু আমাদের রিজার্ভ যথেষ্ঠ পরিমাণে বেড়ে গেছে, সেজন্য অতটা চাপ এক্ষেত্রে এতদিন ছিল না। কিন্তু এটাও এখন হুমকির মুখে পড়বে যেহেতু রিজার্ভে এখন স্থবিরতার লক্ষণ দেখা গেছে বা যাবে কারণ এই বছর থেকে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে শ্লথ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এটা সাময়িক নাকি স্থায়ী তা বোঝা যাচ্ছে না। এসবের ফলে সরকারের মাথা প্রায় খারাপ হওয়ার দশা। মাত্র ৩৫০ কোটি টাকার জন্য সরকার Small Depositor-দের ওপর হাস্যকর আবগারি শুল্ক বসিয়েছেন। আর সেরকমই একটা প্রস্তাব হচ্ছে গ্যাস খাতে আবার ২ শতাংশ অতিরিক্ত ভ্যাট! এতে করে আগে যে নীতির উপর নির্ভর করে কাজ করা হত তার লঙ্ঘন হতে যাচ্ছে। আগে নীতি ছিল যেটুকু দর বাড়বে তার সুফল ভোক্তারাই ভোগ করতে পারবেন। ভোক্তারা ততটুকু অতিরিক্ত দামই বহন করবে যেটা দিয়ে তাদের জন্য ভবিষ্যতে আরও গ্যাস খুঁজে বের করে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। সুতরাং ভবিষ্যতে ক্রমাগত আর গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে না। আর সেই হিসেবে ভোক্তারা প্রথম দিকের গ্যাসের দাম বৃদ্ধি মেনে নিয়েছিল। আমরা দেখতে পেয়েছি এইভাবে হাজার কোটি টাকার উপরে জমা হয়েছিল গ্যাস ডেভলপমেন্ট ফান্ডে। কিন্তু সেই টাকা যদি বাপেক্সকে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ব্যবহার করতে দেয়া যেত তাতে লাভ ছিল বেশ। তাতে করে যদি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করা যেত তাহলে নতুন গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু সেটা না হওয়াতে বিদেশশ গ্যাসের উপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। এতে করে বিদেশিদের প্রভাব বেড়েছে যার দাম দেশিদের চেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে বিদেশিদের গ্যাসের আনুপাতিক মান বৃদ্ধির বিপরীতে গ্যাসের গড় দাম বেড়ে গেছে। বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে সরকার বাধ্য হচ্ছে। আমরা সরকারকে প্রশ্ন করতে পারি, গ্যাস ডেভলপমেন্ট ফান্ডের অর্থ কিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে? সেটা যদি ঠিকমত ব্যবহার করা হত তবে গ্যাসের দাম এত বাড়ার কথা ছিল না। অন্যদিকে সিএনজি পাম্প ও ফিলিং স্টেশন মালিকদের তরফ থেকে কিছু আতঙ্ক ও চাপ থাকছে যারা এই খাতে বিপুল অর্থ ইনভেস্ট করেছেন। তারা গাড়ির গ্যাস চাহিদা সংকোচনের আশঙ্কা করছেন। সম্প্রতি চিন্তা করা হচ্ছে লিকুইড গ্যাস আমদানি ও ব্যবহারের। সেটাও সি.এন.জি গ্যাসের বাজারমূল্যকে প্রভাবিত করবে। ভবিষ্যতে এলএনজি গ্যাসের দামের সঙ্গে মিল রাখতে গেলে লোকাল গ্যাসের দামও আরো বাড়িয়ে দিতে হবে। এসবের সম্মিলিত ফলাফল ভোক্তার জন্য অবশ্যই আরো প্রতিকূল হবে। কিন্তু সেটাই বা তড়িঘড়ি করে এখনই কেন? সিএনজি মালিকরা দাবি করছে এতে করে লোকাল মালিকরা বিপাকে পড়বে। বিশেষ করে স্থানীয় গ্যাসের দাম বাড়ালে তার ডিমান্ড কমে যাবে। বিশেষ করে গ্যাসের দাম যদি বেড়ে যায় আর তেলের সমান হয় তবে গাড়ি চালকরা তেলে শিফট করে যাবেন এবং তখন সি.এন.জি-র স্থানীয় বিনিয়োগও মার খাবে। এক্ষেত্রে তারা যে দামের ও চাহিদার কথা ভেবে বিনিয়োগ করেছিলেন তা বদলে যাওয়ার প্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা। এল.এন.জি.-বৃহৎ ও আধুনিক পুঁজির কাছে প্রতিযোগিতায় হেরে ভবিষ্যতে পুঁজি খোয়ানোর আশঙ্কা করছেন তারা। সরকারের একটা ভুল পলিসি হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ এর বাড়তি আয় এবং কথিত ডেভলপমেন্ট ফান্ড থেকে টাকা সরকার নিয়ে যাচ্ছে গ্যাস খাত বহির্ভূত ম্যাক্রো বাজেটের রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়ের দিকে, যেটা সঠিক নয়। কারণ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী দামে দেয়াটা এবং শিল্প ও অন্যান্য খাতের সঙ্গে তার সমন্বয় করে নেয়াটা জরুরি। এখানে অন্য উন্নয়ন খাতে যদি এই খাতের আয় সরিয়ে নেয়া হয়। তবে সব দিক থেকে দাম বেড়ে যাবে বিদ্যুতের এবং গ্যাসের। বলতে গেলে তখন পুরো Macro খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে আউটপুট এবং সাপ্লাই ক্যাপাসিটি সঙ্কুচিত হওয়ার মাধ্যমে। এছাড়া দেখতে হবে এই স্থানান্তরিত অর্থ কোন খাতে ব্যায় হচ্ছে। বিশেষ করে আমরা মেনে নিতে পারতাম যদি এই অর্থ গ্যাস খোঁজ করার কাজে ব্যবহার করা হত। কিন্তু তা না করে মূলতঃ সেখানে বিদেশিদের ডেকে আনা হচ্ছে। সমুদ্র বিজয়ের পর আমরা মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী যে সম্ভাব্য গ্যাসফিল্ড পেয়েছি তার অপর পাশের বেল্টেই মিয়ানমারে এখনই গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশে ঐ অঞ্চলের কাছাকাছি গ্যাস অনুসন্ধান করছে বিদেশি একটি কোম্পানি। তাতে গ্যাস আবিষ্কৃত হলেও তার দাম পড়বে বেশি। সেখানে গ্যাস উত্তোলনে যুক্ত একটি কমিটির সঙ্গে কথা বলে দেখেছি তারা বলেছেন এখন প্রযুক্তি কোনো সমস্যা না, সেটা ভাড়া পাওয়া যায়। আর অর্থায়নও কোনো ব্যাপার না। এক্ষেত্রে যে দেশি কোম্পানিটি সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছে তাদের পক্ষে এই সমুদ্রবক্ষের কাজে অর্থ প্রদান করা কোনো ব্যাপার ছিল না। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন করছেন আমাদের গ্যাস রয়েছে, প্রযুক্তি রয়েছে তবে তার উত্তোলন দেশি কোম্পানি দ্বারা করা হচ্ছে না কেন? আমরা একদিকে ক্রমাগত নির্বিচারে স্ট্র্যাটেজিক পণ্যের দাম বাড়াচ্ছি, তাতে ভোক্তা ও বিনিয়েগকারী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, বিদেশিদের তুলনায় আমাদের প্রতিযোগিতা ক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে। আর একইভাবে উপার্জিত বাড়তি আয় দিয়ে জ্বালানি খাতের কোনো ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাও আমরা তৈরি করছি না! যার ফলে হুমকির মুখে পড়ছে দেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যত। সরকারের ভেতরে কি তাহলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার কেউই নেই? লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..