রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ

আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এম এ ওয়াদুদ : রুশ বিপ্লবের পঞ্চাশতম বার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘তরঙ্গ’ পত্রিকায় এম এ ওয়াদুদ-এর লেখা ‘আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু’ লেখাটি প্রকাশিত হয়। এ বছর রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকী উপলক্ষে সাপ্তাহিক একতায় লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হল সেবাই মানবধর্ম। এই মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোটি কোটি নর-নারী শুধু নিজ দেশেরই নয় বিশ্বের সকল দেশের মানুষের জীবন হতে যাবতীয় দুঃখ দুর্দশা দূর করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছে। শ্রমিক-কৃষক, শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রী, ডাক্তার-নার্স, বৈজ্ঞানিক, শিল্পী-কবি-সাহিত্যিক, সৈনিক-নাবিক এবং রাজনীতিবিদ প্রত্যেকের এক চিন্তা, এক লক্ষ্য— কী করে দেহমনে সুস্থ ও সবল, নতুন মানুষ তৈরি করে প্রাচুর্যে ভরা আনন্দমুখর নতুন পৃথিবী গড়ে তোলা যায়। যেখানে থাকবে না কোনও ব্যক্তি ও শ্রেণি; স্বার্থের সংঘাত অশান্তি, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, অভাব-অনটন, যেখানে কাজের অভাবে মানুষ বেকার বসে থাকবে না এবং যেখানে প্রত্যেকে হবে সকলের তরে। মাত্র অর্ধশতাব্দীর ভেতর চিকিৎসা ক্ষেত্রে সোভিয়েত বিজ্ঞান যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে তার প্রশংসায় আজ বিশ্বের মানুষ মুখর। সাম্যবাদের নতুন সমাজ গড়বার জন্য সোভিয়েত বিজ্ঞান ইতোমধ্যেই নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। কেননা সমাজতন্ত্রের সমাজ গঠনের পর, সাম্যবাদের সমাজে যেতে হলে সুস্থ মানসিকতা সম্পন্ন নতুন মানুষের প্রয়োজন হবে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার জনগণ শুধু স্বাধীনতাই অর্জন করেনি, তারা স্বাস্থ্য উপভোগের অধিকারও পেয়েছে। জারের আমলে যেখানে ২০,০০০ জনে একজন ডাক্তার ছিল অর্থাৎ যেখানে একজন কৃষক জীবনে মাত্র একবারও ডাক্তারের দেখা পেত কিনা সন্দেহ, আজ সেখানে প্রতি ৪১৮ জনে একজন ডাক্তার রয়েছে। জারের আমলে অনেক দয়ালু ডাক্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে জনদরদী ডাক্তার আই. দানিলেভ্স্কি মন্তব্য করেন, “একমাত্র রাষ্ট্রই হতে পারে শ্রেষ্ঠতম ডাক্তার, যা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সম্ভব নয়।” রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেয়েই লেনিন আইন প্রণয়ন করে দেশের সকল মেডিক্যাল সার্ভিস জাতীয়করণ করেন এবং বিনামূল্যে জনসাধারণের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেন। তখনন থেকেই ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ হয়ে গেল। অতিরিক্ত খাটুনিতে মানুষের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়, সে জন্য কেউ ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করবে না এই আইনও জারি করা হলো। রোগের প্রতিরোধ করাই হলো সোভিয়েত মেডিক্যাল সার্ভিসের মূলনীতি। সোভিয়েত চিকিৎসকদের আদর্শও হলো এটাই। সোভিয়েত চিকিৎসকগণ জনগণের স্বাস্থ্যকে জাতীয় সম্পদ রূপে গণ্য করতে শুরু করলেন এবং রোগী স্বয়ং রাষ্ট্র এবং সমস্ত গণপ্রতিষ্ঠান এ সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব নিলেন। ১৯১৩ সালে তাজিকিস্তানে ১৫ লক্ষ অধিবাসীর জন্য ১৩ জন ডাক্তার ছিল, অর্থাৎ লাখে একজনেরও কম। অথচ আজ সেখানে প্রতি ১০ হাজারে ১৪ জন ডাক্তার হয়েছে। কৃতিত্বের বিষয় হলো অগ্রবর্তী এবং পশ্চাদপদ অঞ্চলগুলি এক সমানে এগিয়ে চলেছে। প্রাক-বিপ্লব যুগে শিশুমৃত্যুর হার ছিল হাজারে ২৭৩; বছরে ৩০ হাজার প্রসূতি মারা যেত। সারাদেশে ছেলেমেয়েদের জন্য ক্রিশ (স্কুল) ছিল ১৯টি। স্ত্রীলোক ও শিশুদের ক্লিনিক ছিল মাত্র ৯টি, আর বর্তমানে (১৯৬৫ সালের হিসাবে) হয়েছে ১৯ হাজার ৫০০টি। বর্তমানে প্রতি হাজারে মৃত্যুর হার সোভিয়েত ইউনিয়নে ৭.৩, আমেরিকাতে ৯.৪, সুইডেনে ১০.১, ফ্রান্সে ১১.১ এবং গ্রেট ব্রিটেনে ১১.৫। অপরদিকে প্রতি হাজারে লোক বাড়ছে সোভিয়েত ইউনিয়নে ১১.২, আমেরিকাতে ১০, গ্রেট ব্রিটেনে ৬.৯, ফ্রান্সে ৬.৫ এবং সুইডেনে ৫.৮। ডাক্তারের সংখ্যা সোভিয়েত ইউনিয়নে ৫ লক্ষ ৫৫ হাজার, আমেরিকাতে ৩ লক্ষ ৫১ হাজার, গ্রেট ব্রিটেনে ৮৯ হাজার ১০০ এবং ফ্রান্সে ৭৫ হাজার। উল্লেখ্যযোগ্য যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে যত ডাক্তার আছেন তাদের মধ্যে শতকরা ৮৬ জনই মহিলা। সোভিয়েত ইউনিয়নে ট্রেনিং প্রাপ্ত নার্সের সংখ্যা ১৭ লক্ষ, গবেষক এবং শিক্ষকের সংখ্যা ৪৬ হাজার, নার্সিং স্কুল ৬০০টি, মেডিক্যাল কলেজ ৮৭টি এবং রিসার্চ ইনস্টিটিউট ৩৫৯টি। হাসপাতালে বেডের সংখ্যা প্রতি হাজার অধিবাসীর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নে ৯.৬ এবং আমেরিকাতে ৮.৫। সোভিয়েত হাসপাতালগুলিতে মোট বেডের সংখ্যা ২২ লক্ষ। জনগণের স্বাস্থ্যের প্রতি সোভিয়েত রাষ্ট্রের দরদের বাস্তব পরিচয় পাওয়া যাবে ইউক্রেনে নিপ্রোজেরজিন্স্ক্ কেমিকেল মিল্স্-এ — এখানে ৭৫০০ শ্রমিকের সেবায় ২০৩ জন ডাক্তার নিযুক্ত আছেন। ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পর থেকে সোভিয়েত দেশে বস্তুবাদী ডায়ালেকটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গীতে চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ানো শুরু হয়। দেহ সম্বন্ধে বস্তুবাদী ডায়ালেকটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গী এই শিক্ষাই দেয় যে, শরীর এবং পরিবেশ একযোগে চলে; কেননা শরীর প্রতিনিয়ত পরিবেশের সঙ্গে রাসায়নিক বস্তুর আদান-প্রদান এবং উদ্দীপনা সাড়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াতে চালু থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গী আরও শিক্ষা দেয় যে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ যেহেতু আদি এককোষী অবস্থা হতে ক্রমবিকশিত হয়েছে সেহেতু অঙ্গসমূহ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত এবং এমনভাবে পরস্পরের উপর নির্ভরশীল যে এক অঙ্গ ছাড়া অপর অঙ্গ চলতে পারে না এবং একের বৈকল্য অপরের বৈকল্য ঘটায়। বস্তুবাদী ডায়ালেকটিক্যাল বিজ্ঞানের আর এক শিক্ষা হলো এই যে, মানুষের দেহে সুস্থ কিংবা অসুস্থ আচরণ পরিবেশের প্রভাবেই গড়ে উঠে। এজন্য বলা হয় মানুষ পরিবেশের সৃষ্টি। এমন যথার্থ শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল বলেই সোভিয়েত দেশের মানুষ বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণরূপে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারমুক্ত হতে পেরেছেন। এ ব্যাপারে ভরোবিয়ভূ, টন্কভ্, লিস্গাফ্ট্, ফিলাটভ্ প্রমুখ বিজ্ঞানীদের অবদানই সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া উনবিংশ শতকের প্রগতশীল বস্তুবাদী দার্শনিক চার্নেসেভ্স্কি, ডব্রোলিওবভ্, হার্জেন, বেলিন্স্কি প্রমুখ মনীষীদের শিক্ষা ও প্রভাবে মানুষের মধ্যে বস্তুবাদী ধারণা জন্মিবার সুযোগ হয়েছিল। ইম্মিউনিটি বা আনাক্রম্যতা বিজ্ঞানের ন্যায় কোষের অভ্যন্তরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপারেরও প্রতিষ্ঠাতা হলেন সোভিয়েত চিকিৎসা বিজ্ঞানী আই, আই, মেচ্নিকভ্ (১৮৪৫-১৯১৬)। এ হতেই ধারণা করা যেতে পারে সে দেশের বিজ্ঞান গোড়া হতেই কত মৌলিক গবেষণার ভিতর দিয়ে গড়ে উঠেছে। পিরোগভ, লিস্গাফ্ট্, মেচ্নিকভ্ প্রমুখ বহু বিজ্ঞানী তাঁদের সমস্ত শক্তি জনসাধারণের সেবায় নিয়োগ করেন। সেজন্য তাঁরা একদিকে যেমন বিশিষ্ট জননেতা হয়েছিলেন, অন্যদিকে জার সরকারের উৎপীড়নও সহ্য করতে হয়েছিল। সোভিয়েত ফিজিওলজি বিজ্ঞান: সোভিয়েত ফিজিওলজির কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্সের জন্যই সে দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞান আজ এত কৃতিত্বের দাবিদার। ফিজিওলজিতে প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁদের নাম উল্লেখযোগ্য তাঁরা হলেন ফিলোমাফিট্স্কি, বাসভ্, মিলোসøাভ্স্কি, অভসিযানিকভ্, কুলিয়াভকো, বটকিন এবং আরও অনেকে। কিন্তু যাঁদের বিশেষ চিন্তা এবং গবেষণার ফলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিপ্লব এসেছে তাঁদের শ্রেষ্ঠতম হলেন পাভ্লভ্ (১৮৪৯-১৯৩৬)। পাভ্লভের শিক্ষক আই, সেচেনভ্ (১৮২৯-১৯০৫) মস্তিষ্কের রিফ্লেক্স এবং মস্তিষ্ক কোষের ইনহিবিশান প্রথম আবিষ্কার করেন। ১৮৬৩ সালে তিনি মস্তিষ্কের রিফ্লেক্স নামক বই লিখে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সেচেনভ্ই হলেন সোভিয়েত শরীর বিজ্ঞানের জনক। তাঁরই অনুপ্রেরণাকে পাভ্লভ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্স তত্ত্বকে সুনির্দিষ্ট রূপদান করেন। আজ যখন ধনতান্ত্রিক সমাজে বুর্জোয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাইকোলজি প্রয়োগ করে মানুষের দেহ ও মনকে দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, নৈরাশ্য, ক্রুরতায় ভরে তোলা হচ্ছে, সোভিয়েত ইউনিয়নে সেক্ষেত্রে বাস্তবে পাভ্লভের তত্ত্বকে প্রয়োগ করে মানুষকে সত্যিকার মানুষে পরিণত করা হচ্ছে। কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্স বা পাভলভ তত্ত্ব: মানুষের ইতিহাসে পাভলভ্ই সর্বপ্রথম প্রমাণ করেন যে, মানুষের দেহ ও মন তথা মস্তিষ্ক কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্স দ্বারা চলে। পাভলভ প্রমাণ করলেন যে মস্তিস্কের রিফ্লেক্সশনগুলি নিম্ন কেন্দ্রের রিফ্লেক্সের ন্যায় সাধারণ এবং স্থায়ী ধরনের নয় বরং কন্ডিশান্ড এবং অস্থায়ী ধরনের যা গড়তে এবং ভাঙতে পারে এবং প্রাণীর পরিবেশ অনুযায়ী গঠিত হয়। কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্সকে বুঝাবার জন্য পাভ্লভ্ মানুষের সমগ্র দেহকে টেলিফোন সিস্টেমের সঙ্গে তুলনা করেছেন। টেলিফোনের কেন্দ্রে থাকে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ এবং সুইচ-বোর্ড, যাতে রয়েছে বাইরের অপর প্রত্যেক টেলিফোনের সঙ্গে অস্থায়ী সংযোগ স্থাপন করবার ব্যবস্থা। একচেঞ্জ হতে নির্গত তারের এক প্রান্তে থাকে বক্তা অপর প্রান্তে শ্রোতা। তদ্রুপ আমাদের দেহের কেন্দ্রে থাকে মস্তিষ্ক বা কর্টেক্স। প্রত্যেকের মস্তিষ্কে আছে পনেরশ কোটি মস্তিষ্ক কোষ, যাতে রয়েছে পরিবেশ হতে আগত স্টিমুলি বা উদ্দীপকের সঙ্গে অস্থায়ী সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা। মস্তিষ্ক কোষ হতে নির্গত সুতার ন্যায় কোটি কোটি স্নায়ুর এক প্রান্তে রয়েছে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক ইত্যাদি গ্রাক-যন্ত্র বা ইন্দ্রিয় এবং অপর প্রান্তে রয়েছে দেহের কোটি কোটি কোষ। টেলিফোন কেন্দ্রের অস্থায়ী সংযোগের ভিতর দিয়ে জৈব-বিদ্যুৎ-তরঙ্গ রূপে প্রতিফলিত হয়ে অপর প্রান্তস্থিত পেশীকোষ গ্রন্থিকোষ এবং স্নায়ুকোষে কাজের সাড়া জাগায়। পাভলভের একটি বিখ্যাত এক্সপেরিমেন্ট এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি একটি কুকুরকে মাংস দিবার কয়েক সেকেন্ড আগে একটি আলো দেখাতেন; তারপর মাংস খেতে দিতেন। এভাবে কিছুদিন খাওয়াবার পর দেখা গেল, আলো জ্বালাবার পর মাংস না দিতেই কুকুরের লালগ্রন্থি হতে লালা ঝরতে শুরু করছে। এর থেকে তিনি সিদ্ধান্ত করলেন, নিশ্চয়ই কুকুরের মস্তিষ্কের দৃষ্টিকেন্দ্রের সঙ্গে খাদ্য-কেন্দ্রের একটি অস্থায়ী সংযোগ স্থাপিত হয়েছে––যার ভিতর দিয়ে মেডুলাস্থিত লালাকেন্দ্র হয়ে লালাগ্রন্থিতে স্নায়ু রিফ্লেক্স এবং দেহকোষ নিরন্তর মস্তিষ্ক কোষে অস্থায়ী সংযোগের মাধ্যমে স্নায়ুরিফ্লেক্সের দ্বারা একযোগে উদ্দীপনা সাড়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াতে কাজ করে প্রাণীদেহকে চালু রাখে। এসবই বস্তুগতভাবে সংঘটিত হয়। এতে রহস্য বা অলৌকিকত্ত্বের কিছু নেই। মস্তিষ্কের এই সাময়িক সংযোগের কানেকশানের মাধ্যমে সারা দেহ জুড়ে যে স্নায়ু-রিফ্লেক্স সৃষ্টি হয় পাভলভ তার নাম দিলেন কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্স। কেননা ইহা জীবন ধারণের বিশেষ অবস্থাধীন গড়ে উঠে। জন্মের পর শিক্ষাদীক্ষায় এবং প্র্যাকটিক্যাল কাজের ভিতর দিয়ে গড়ে উঠে বলে এগুলিকে শিক্ষাগত আচরণ বা রিফ্লেক্সও বলা হয়। কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্সের সুবিধা বিলক্ষণ। ইহার ফলেই প্রাণীরা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে আত্মরক্ষা করে থাকে। খাদ্য খাবার আগেই লালা ঝরার ব্যবস্থা আছে বলে ক্ষুধা হজম ভাল হয় : লাঠি দেখেই শরীরে যদি মার খাবার সাড়া জেগে পালাতে পারা যায় তবে সুবিধা বই কি। তবে শিক্ষা এবং পরিবেশ গুণে যেমন স্বাস্থ্যকর এবং ভাল কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্স গড়ে উঠে; তেমনি শিক্ষা ও পরিবেশের দোষে অস্বাস্থ্যকর এবং খারাপ কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্স অতএব খারাপ আচরণ গড়ে উঠে। পাভলভ কুকুরকে প্রতিকূল পরিবেশে রেখেও পরীক্ষা করে দেখেছেন কি হয়। দেখা গেছে মাংস না দিয়ে বারে বারে আলো, শব্দ ইত্যাদির উদ্দীপনাতে মস্তিষ্ক কোষ ইনহিবিটেড হয়ে পড়ে বা দমে যায়, ফলে লালা ক্ষরণ বাধাপ্রাপ্ত হয়। আবার বারে বারে খাবার দিলেও ইনহিবিশান দেখা দিয়ে রসক্ষরণ হ্রাস পায়। পাভ্লভ আবিষ্কার করেছেন মস্তিষ্ক কোষের ইনহিবিশানের ফলেই ঘুম পায়। পাভ্লভ আবিষ্কার করেছেন মস্তিষ্ক কোষের ইনহিবিশনের ফলেই ঘুম পায়। প্রতিদিনের কাজের শেষে দেহের আভ্যন্তরীণ পরিবেশে যে ক্লেদ জমে তাতে হয় আভ্যন্তরীণ ইনহিবিশান। ফলে স্বাভাবিক ঘুম আসে। পক্ষান্তরে দেহের বাহিরের পরিবেশ হতে যে ইনহিবিশান সৃষ্টি হয় তা অস্বাভাবিক ঘুম আনে। আবার ইনহিবিশান যদি সম্পূর্ণ না হয় এবং মস্তিষ্কের যে অংশ একসাইটেড বা উত্তেজিত অবস্থায় থাকে সে অংশে বাইরের কিম্বা ভিতরের উদ্দীপনাতে কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্স চলতে থাকে। ইহাই স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্নের আকারে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। এতকাল স্বপ্ন, ঘুম, স্মৃতি, মেধা, কর্মশক্তি ইত্যাদি অতিপ্রাকৃত শক্তির দ্বারা চালিত হয় বলে যে ভুল ধারণা চালু ছিল, পাভলভের কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্সের আবিষ্কারের পর দূরীভূত হতে শুরু করেছে। আশা করা যায় বস্তুবাদী শিক্ষার কল্যাণে এই শতাব্দীতেই সকলেরই এ ভুল ভাঙবে। কুকুরকে অত্যাধিক উত্তেজিত রাখলে অথবা ভয়, আতঙ্ক এবং অনিদ্রার অবস্থায় রাখলে নিউরোসিস বা স্নায়ু বৈকল্য দেখা দেয়। স্নায়ুর এক্সাইটেশান এবং ইনহিবিশানে অসমতা হলেই নিউরোসিস দেখা দেয়। দেহে এবং প্রকৃতিতে সর্বত্রই দুই বিপরীত প্রক্রিয়া একই সঙ্গে চলে। অসমতার অর্থই হলো টেনসান। এভাবে পাভ্লভ, সেনেভেল আরব্ধ কাজকে আরো বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেলেন। আজ সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন এঁদের কাজকে উত্তরোত্তর এগিয়ে নিয়ে চলেছেন বাইকভ্, আইরাপেটিয়ান্ট্স্, র্চেনিগভ্স্স্কি, ডেলভ্, কনরাদি, অল্নিয়ানস্কায়া, রগ্ভ, স্লোনিস, ভøাদিমিরভ এবং আরও অনেকে। বস্তুতঃ সেচেনভ্ এবং বিশেষ করে পাভ্লভের কাজেই সোভিয়েত চিকিৎসা বিজ্ঞানের সম্মুখে খুলে দিয়েছে অনন্ত সম্ভাবনার দ্বার। পরিবেশ এবং কন্ডিশান্ড রিফ্লেক্সই অতীতের মানুষকে এত বিচিত্র রূপ দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে কত যে অনন্তরূপ দিবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..