লাগামহীন চালের বাজার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর কথা বলেছিলেন তারা; সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিম্নবিত্তের ভোট টেনেছেন। ক্ষমতায় বসার পর সেই প্রতিশ্রুতি যথারীতি গেছেন ভুলে। ভুল নীতি নিয়ে, কৃষকদের অবহেলা করে, পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ফড়িয়াদের হাতে তুলে দিয় চালের বাজারকে এখন লাগামহীন বানিয়ে ছেড়েছেন মতিয়া চৌধুরী-কামরুল ইসলামরা। একা তো আর করেননি, এর দায় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের নীতি নির্ধারকদের সবার। আজ এখন বাজারে ৪৬ টাকার নিচে মোটা চালও নেই; গড়পড়তা মোটা চালের দাম ৫০ টাকার উপরে। সরকারি হিসাবেই গত এক মাসে সাধারণ মানের মোটা চালের দাম বেড়েছে আট শতাংশের বেশি; আর এক বছরে বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। মোটা চালের ভোক্তা প্রধানত নিম্নআয়ের মানুষ। আর যারা সরু চাল কেনার সামর্থ্য রাখেন, তাদের এখন প্রতি কেজিতে গুণতে হচ্ছে ৬০ টাকার বেশি। এক বছরে এ ধরনের চালের দাম বেড়েছে সরকারি হিসেবে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। প্রধান খাদ্য চালের দাম গত তিন মাস ধরে বাড়তে থাকায় খাদ্যকষ্টে পড়েছে সাধারণ মানুষ। চালের বাজার যেভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের মত খাদ্য সঙ্কট ফিরে আসার লক্ষণ দেখছেন কৃষি সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরাও। ২০০৭-২০০৮ সালে জরুরি অবস্থার সেইসব দিনে বাংলাদেশে মোটা চালের কেজি ৪০ টাকায় উঠেছিল। সরু চালের কেজি বেড়ে হয়েছিল ৫৬ টাকা। স্বাধীনতার পর সেটাই ছিল চালের সর্বোচ্চ দর। সে তুলনায় দাম বৃদ্ধির হার এখন সবচেয়ে বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের হাতে চাল নেই, এ তথ্য মিল মালিক ও আড়তদাররা জেনে গেছেন। সে কারণে তারা একজোট হয়ে ‘সিন্ডিকেট করে’ বাজারে চাল ছাড়ছেন না। এর ফল হল দাম বৃদ্ধি। তাদের অভিযোগ, চালের দাম ক্রমেই সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেলেও আমদানির উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো পদক্ষেপ সরকার নিচ্ছে না। এছাড়া বোরো মৌসুমে আগাম বৃষ্টি এবং হাওড়ে বাঁধ ভেঙে অকাল বন্যার কারণে ধান উৎপাদন কম হওয়ার পর বেশি মুনাফার লোভে মিল মালিক ও আড়তদাররা ‘সুযোগ নিয়েছেন’। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আমন ধান না ওঠা পর্যন্ত চালের বাজার কমবে না বলেও আশঙ্কা করছেন তারা। চালের বাজারে সঙ্কট কাটাতে দ্রুত মজুদ বাড়ানোর পরামর্শ দেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, চাল আমদানির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। তাহলে আমদানি খরচ কমবে, দামও কমবে। একই মত খাদ্য অধিদপ্তরেরও। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ট্যারিফ তুলে দিতে মে মাসের শুরুর ?দিকেই খাদ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি হিসাব করে দেখান, ভারত থেকে প্রতি টন চাল ৪১০ ডলারে কিনে দেশে আনতে পরিবহন ব্যয় মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় ৪৪০ ডলারের মত। এর সঙ্গে বর্তমান হারে ট্যারিফ হিসেবে যুক্ত হয় কেজিতে ৯ টাকা করে। তবে মহাপরিচালক এও স্বীকার করেছেন যে, বোরো মৌসুমের ধান এখন আর কৃষকের হাতে নেই। যাদের কাছে আছে তাদেরকে মজুতদার কিংবা বিত্তশালী কৃষক বলা যেতে পারে। সুতরাং এখন ট্যারিফ প্রত্যাহার করলে এর প্রভাব সাধারণ কৃষকের ওপর পড়বে না, বরং বাজার স্বাভাবিক হবে। সরকারের এ ধরনের নীতির মাধ্যমেই কৃষিখাত আজ ধ্বংসের মুখে পড়েছে; প্রতি বোরো এবং আমন মৌসুমে বামপন্থি বিভিন্ন দল ও সংগঠন সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার দাবি জানিয়েছিল। জানিয়েছিল হিমাগার নির্মাণসহ বিভিন্ন কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা। সরকার সেসব কথায় কান না দিয়ে ফডিয়াদের হাতেই কৃষি বিপণন ব্যবস্থা তুলে দিয়েছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন। সরকারের এই ভুল নীতির খেসারত কেন সাধারণ নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তকে দিতে হবে? এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। কৃষক আর কৃষিখাতকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য গ্রামে শহরে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..