ব্রিটেনে প্রাক-বসন্ত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শান্তনু দে : ব্রেক্সিট-উত্তর রাজনৈতিক ভূকম্পন ব্রিটেনে। ব্রিটিশ নির্বাচন, ব্যয়সংকোচ ও যুদ্ধের দক্ষিণপন্থী কর্মসূচির জন্য এক বড় ধাক্কা। একইসঙ্গে, এই নির্বাচন ব্রিটিশ জনগণের বামপন্থার দিকে ফেরার স্পষ্ট ইঙ্গিত। ৬৫০-সদস্যের সংসদে কনজারভেটিভ, বা টোরি পার্টির ছিল ৩৩১টি আসনের সামান্য গরিষ্ঠতা। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল লেবার পার্টির ছিল ২৩২টি আসন। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির ৫৬, সবক’টিই স্কটল্যান্ডে। ব্রেক্সিটের রায় মেনে ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগের পর কোনও সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই গত বছর প্রধানমন্ত্রী হন থেরেসা মে। তিন বছর বাকি থাকতেই তড়িঘড়ি ডেকে দেন আগাম নির্বাচন। মনে করেছিলেন নিজের হাত আরও শক্ত করতে পারবেন। ভুল করেছিলেন। যেমন করেছিলেন তাঁর পূর্বসূরি ক্যামেরন। রাজনৈতিক বাজিতে হেরে গিয়ে এখন মে দৃশ্যতই অস্বস্তিতে। ক্যামেরনের মতো তিনিও পড়তে পারেননি দেওয়াল লিখন। টোরিরা জিতেছে মাত্র ৩১৮টি আসনে। গরিষ্ঠতা থেকে আটটি কম। দু’বছর আগের তুলনায় ১৩টি আসন কম। সংখ্যালঘু সরকার করতে মে নিয়েছেন আয়ারল্যান্ডের ব্রিটিশ অধিকৃত প্রদেশে ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ানিস্ট পার্টি (ডিইউপি)-র সমর্থন। ডিইউপি জিতেছে ১০টি আসনে (সেখানে বাকি সাতটি আসন জিতেছে সিন ফিয়েন)। ডিইউপি প্রকাশ্যেই ক্যাথলিক-বিরোধী, সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে রয়েছে গাঁটছড়া, আইরিশ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাদের ছিল আধা সামরিক ভাড়াটে বাহিনী। সমকামিতা বা গর্ভপাতের মতো সামাজিক বিষয় নিয়ে রয়েছে গোঁড়ামি। সমলিঙ্গের বিবাহ থেকে গর্ভপাত-বিরোধী তারা। উত্তর আয়ারল্যান্ডে গর্ভপাত এখনও বেআইনি। লেবার জিতেছে অতিরিক্ত ৩০টি আসনে। তাদের আসন সংখ্যা বেড়ে এখন ২৬২। তবে, লেবার কতটা ডাউনিং স্ট্রিটের কাছে পৌঁছাল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, এই নির্বাচন দেখিয়েছে ব্রিটিশ জনগণের মনোভাবে, রাজনৈতিক সচেতনতায় পরিবর্তন। রেল, ডাক, শক্তি সংস্থাগুলির পুনর্জাতীয়করণ, ধনীদের উপর কর আরোপ, ব্যয়সংকোচের অবসান, কর্মসংস্থান ও ট্রেড ইউনিয়নের প্রসার, ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ১০ পাউন্ড বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি মকুব, শ্রমজীবী জনগণের জন্য সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বেসরকারিকরণ বন্ধের কর্মসূচি নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছিলেন জেরেমি করবিন। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া-সহ অন্যত্র ব্রিটিশ ও মার্কিন আগ্রাসনের ঘোর বিরোধী করবিন। সিন ফিয়েনের নেতা গেরি অ্যাডামসকে ব্রিটিশ সংসদে ভাষণ দেওয়ার জন্য তিনিই প্রথম জানিয়েছিলেন আমন্ত্রণ। সেকারণে কর্পোরেট মিডিয়া তাঁর গায়ে সেঁটে দিয়েছে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি, হামাস, হিজবোল্লাহ’র বন্ধুর তকমা। করবিনের সমর্থন এসেছে সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণির একটি অংশ, বিশেষত তরুণদের কাছ থেকে। পঁচিশ বছরের নিচে এবারে ভোটদানের হার ছিল ৭২ শতাংশ, যেখানে ২০১৫-তে ছিল ৪৩ শতাংশ। তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগ ভোটই পড়েছে করবিনের পক্ষে। ভোটার তালিকায় ছিল নাম তোলার হিড়িক, যাদের অধিকাংশই ছাত্র। শেষ দিনে নাম লিখিয়েছেন ৬,০০,০০০ মানুষ, যাদের দুই-তৃতীয়াংশের বয়স চৌত্রিশের নিচে। লালঝান্ডা নিয়ে করবিনের সমর্থনে মিছিল করেছেন শ্রমিকরা। সবমিলিয়ে বেড়েছে ভোটদানের হার, ১৯৯৭ সালে টনি ব্লেয়ারের সাধারণ নির্বাচনের পর সর্বোচ্চ। লেবারে নবযৌবন। সাড়ে ৯ শতাংশ ভোট বেড়েছে লেবারের। ১৯৪৫ সালে সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে যে কোনো দলের নিরিখে দ্বিতীয় বৃহত্তম। লেবারের সঙ্গে এখন ৪০ শতাংশের সমর্থন, গত শতকের ছয়ের দশকের পর থেকে (১৯৯৭ সালে টনি ব্লেয়ারের পর) দ্বিতীয় বৃহত্তম। ৩৫ লক্ষ ভোট বেড়ে লেবারের সঙ্গে এখন ১ কোটি ২৯ লক্ষের সমর্থন। ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়ে লন্ডনের আইলিংটন নর্থ কেন্দ্র থেকে পুনর্র্নিবাচিত করবিন। ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত লেবারের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কর্পোরেট মিডিয়ার চরম একপেশে প্রচার সত্ত্বেও তাক লাগিয়ে দেওয়া এই সাফল্য। করবিনকে শুধু টোরিদের বিরুদ্ধে নয়, লড়তে হয়েছে তাঁর দলের ‘নব্য’ লেবারদের বিরুদ্ধে। দু’বছর ধরে সংসদীয় লেবার পার্টির অভ্যন্তরে তাঁর বিরুদ্ধে লাগাতার কুৎসা প্রচারের মুখেই এই জয়। কারণ, এই সময় তিনি ছিলেন রাস্তায়, প্রচারে। জনসমাবেশে, মিছিলে। কারখানার গেট থেকে টেলিভিশন বিতর্কে। ইশ্তেহারের বার্তা তিনি সরাসরি নিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের কাছে। টোরির প্রতি বিশ্বাসে আঘাত হানতে, কর্পোরেট মিডিয়ার মিথ্যা প্রচারকে দূরে রাখতে ভোটারদের করে দিয়েছেন মুখোমুখি যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ। ব্রিটেন একটি শক্তিশালী পুঁজিবাদী দেশ, যার ব্যাঙ্ক অংশ নেয় বিশ্ব অর্থনীতির আধিপত্য বিস্তারে, যার পরমাণু অস্ত্র সমৃদ্ধ বাহিনী হস্তক্ষেপ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে, সেখানে নির্বাচনী সংগ্রামের সীমাবদ্ধতাকে মনে রাখা জরুরি। সংসদ যারাই নিয়ন্ত্রণ করুক, মিডিয়া বিলিওনেয়ারদের হাতে। একটি বড় অংশের মিডিয়ার মালিক অস্ট্রেলীয় বিলিওনেয়ার রুপার্ট মার্ডক। সামরিক বাহিনী ও রাজতন্ত্রের সঙ্গে বুর্জোয়া ও অভিজাতদের রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন যোগসূত্র। শাসকশ্রেণি নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে। লেবার পার্টি নিজেই পুরোপুরি ব্রিটিশ ও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের প্রতি বিশ্বস্ত। তা সে যতোই করবিন ব্রিটিশ আগ্রাসনের সমালোচনা করুন, আর টনি ব্লেয়ারকে যুদ্ধাপরাধী বলে নিন্দা করুন না কেন। এটা ঠিক, মে’র শোচনীয় পরাজয় স্বস্তি এনেছে শ্রমজীবী জনগণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে। তৈরি করেছে এক নতুন আশা। করবিনের লেবারের এই সাফল্য দেখিয়েছে বার্নি স্যান্ডার্স ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী হলে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেতে পারতেন না হোয়াইট হাউসে। কিন্তু, এরপর ব্রিটেনে কী হবে? টোরিরা এখনও ক্ষমতায়। সংসদে বৃহত্তম দল। থেরেসা মে এখনও প্রধানমন্ত্রী। সম্ভবত, খুব বেশি দিন থাকবেন না। উগ্র রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ানিস্ট পার্টি (ডিইউপি)-র সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার গড়লেও, আদৌ উজ্জ্বল নয় ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক সংকট সত্ত্বেও তারা চাপাবে ব্যয়সংকোচের নীতি। নিয়ে চলবে ইরাক, সিরিয়ায় যুদ্ধের নীতি। লেবার পার্টির নেতৃত্ব ও তার নীতিকে ঘিরে এখন লেবার আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শুরুতে দেখা যাচ্ছে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ। লেবারের সংসদীয় দলে তাঁর সমালোচকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা শুরু করেছেন করবিন। করবিনের ছায়া বিদেশসচিব এমিলি থ্রোনবেরি স্কাই নিউজকে বলেছেন, লেবার এখন পুরো আমাদের নিয়ন্ত্রণে। ২০১৫’তে দলের নেতৃত্ব নির্বাচনে তাঁর কাছে হেরে যাওয়া ইভেট কুপার বলেছেন, গত বছর থেকে সংসদীয় দলের ‘অনেক পরিবর্তন হয়েছে’, লেবার এখন সম্পূর্ণ করবিনের পিছনে। ব্লেয়ারের দিন শেষ, লেবার এখন দৃশ্যতই জেরেমি করবিনের। লেবারকে খতিয়ে দেখতে হবে পরমাণু সমরাস্ত্র নিয়ে দক্ষিণপন্থি প্রণয়ের সম্পর্ককে। মনে রাখতে হবে লেবারের পক্ষে এবারে গ্রিন, লিবারেল ডেমোক্র্যাট এবং প্লাইড ক্যামরি’র ভোটাররা কিছু কৌশলী ভোট দিয়েছেন। জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষাকে পরিত্যাগ না করলেও স্কটল্যান্ডের শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে দেখা গিয়েছে শ্রেণি রাজনীতিতে ফেরার ইঙ্গিত। ফল ঘোষণার পরে করবিন বলেছেন, ‘আমরা বদলে দিয়েছি ব্রিটিশ রাজনীতির মুখ।’ বলেছেন, ‘রাজনীতি বদলে গিয়েছে’ এবং ‘অতীতের জায়গায় আর ফিরে যাবে না।’ ছায়া চ্যান্সেলার জন ম্যাকডোনেল বলেছেন, ‘এই প্রচার এই দেশের রাজনৈতিক আলোচনার চরিত্রকেই বদলে দিয়েছে।’ এখন লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন এবং প্লাইড ক্যামরিকে ঠিক করতে হবে তারা কী করবে। এককাট্টা হয়ে টোরি-বিরোধী প্রচারে নামবে কি না, নতুন সাধারণ নির্বাচন এবং যত দ্রুত সম্ভব লেবার সরকার গঠনে যোগ্য ভূমিকা পালন করবে কি না, সে ব্যাপারে নিতে হবে জরুরি সিদ্ধান্ত। অথবা, আগামী নির্বাচনে তাদের হারাতে হবে আরও ভোট। ব্রেক্সিটের পর দ্বিতীয় রাজনৈতিক ভূকম্পন। এবারে ফাটল ধরিয়েছে বামমুখী কর্মসূচি। ব্রিটিশ জনগণের বামমুখী উত্থান ব্রিটিশ রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে নতুন সকাল। ব্রিটিশ জনগণের এই মেজাজই এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁরা ঝুঁকেছেন বামপন্থার দিকে। ২০১৬’র ব্রেক্সিট থেকে অনেকটা সরে এসেছেন, যখন অধিকাংশই বেছে নিয়েছিলেন ব্রেক্সিটকে এবং উগ্র দক্ষিণপন্থী জাতিবিদ্বেষী শক্তিকে দিয়েছিলেন নতুন মাত্রা। কিন্তু, এবারে প্রায় ধুয়ে মুছে সাফ উগ্র দক্ষিণপন্থি দল নাইজেল ফারাজের ইউকিপ। জিততে পারেনি একটি আসনেও। সমর্থনের হার নেমে এসেছে ২ শতাংশেরও নিচে। শোচনীয় পরাজয়ের দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেছেন উগ্র দক্ষিণপন্থি ইউকিপের শীর্ষ নেতা পল নাটাল। ফারাজের পদত্যাগের পর গত বছর নভেম্বরে দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন নাটাল। গতবার একটি আসন থাকলেও, এবারে একটি আসনেও জিততে পারেনি ইউকিপ। সমর্থনের হার ১২.৬ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১.৮ শতাংশে। বস্টন অ্যান্ড স্কেগনেস কেন্দ্রে নাটাল তিন নম্বরে। পেয়েছেন সাকুল্যে ৩,৩০৮টি ভোট। সমর্থনের হার মাত্র ৭.৭ শতাংশ, যেখানে দু’বছর আগে ছিল ২৬.০৮ শতাংশ। ইউকিপের ভোট যখন ১১ শতাংশ পড়েছে, তখন লেবারের বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ। ব্রিটিশ জনগণের এই বামমুখী উত্থানই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। শাসক অভিজাতদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের প্রথম লড়াইয়ে জিতেছেন করবিন। এই উত্থানকে ধরে রাখতে হলে করবিনের লেবারকে হাঁটতে হবে আরও বহু পথ। থাকতে হবে রাস্তায়। গণআন্দোলনে, গণসংগ্রামে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..