অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরুন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হায়দার আকবর খান রনো : আওয়ামী লীগ সরকারের সাম্প্রতিক আচরণ, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং প্রকাশ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে কটুক্তি এক বিপদজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে দুইটি বড় বুর্জোয়া দল দেশ শাসন করে আসছে। মধ্যে অবশ্য দুই বৎসরের জন্য ছিল সেনা শাসিত এক অদ্ভুত ধরণের সরকার। শ্রেণি চরিত্রগতভাবে আওয়ামী লীগ বিএনপির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। উভয়ই লুটেরা পুঁজিপতি শ্রেণির প্রতিনিধি, গণবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর এবং অগণতান্ত্রিক। তবে অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে আমরা দুই দলের মধ্যে সামান্য পার্থক্য লক্ষ্য করে এসেছি। বিএনপি যেখানে স্বাধীনতার শত্রু জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে, এমনকি একসঙ্গে মন্ত্রীসভাও গঠন করেছিল, সেখানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের, যারা আবার জামায়াতের শীর্ষ নেতা, তাদের বিচারের ব্যবস্থা করেছে এবং ইতোমধ্যেই তাদের সকলেরই বিচার সম্পন্ন হয়েছে ও শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি নানাভাবে এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল এবং তাদের জোট সঙ্গীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিল। এমনকি প্রধান আসামীদের মধ্যে একজন ছিলেন বিএনপির অন্যতম শীর্ষনেতা। গণজাগরণ মঞ্চ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার, তখন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া এটাকে নাস্তিকদের মঞ্চ বলে গালি দিয়েছেন। এই সকল প্রতিক্রিয়াশীল নেতাদের দৃষ্টিতে ‘নাস্তিক’ একটা গালি বিশেষ। কিন্তু গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িয়ক দৃষ্টিভঙ্গি হলো প্রত্যেক নাগরিকের যে কোনো ধর্মে বিশ্বাস করার বা না করার অধিকার আছে। এই দিক দিয়ে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি বিএনপির চেয়ে যে উন্নত ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু বর্তমানের আওয়ামী লীগ সেই পার্থক্য মুছে ফেলেছে। কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ইফতার পরবর্তী আলোচনায় যে ভাষায় সেকুলারিজমে বিশ্বাসী লোকদের নিন্দা করেছেন, তা আমাদের মর্মাহত না করে পারে না। আওয়ামী লীগের এই দক্ষিণমুখী মোড় আমাদের অনেক দিনের অনেক বিজয়কে ছিনিয়ে নিচ্ছে। আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে ’৭১এর চেতনা। ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই ১৯৭১ সালে জনগণ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিল। সশস্ত্র সংগ্রামের উত্তাপ থাকতে থাকতেই রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের সংবিধান। তাই এই সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে স্থান পেয়েছিল সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। শুধু তাই নয় সংবিধানের ৩৮ ধারায় সবধরণের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল। ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে গণতন্ত্র, শোষণমুক্তি, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা- এই সবই বুঝানো হয়ে থাকে। প্রত্যেক দেশের জাতীয়তার নিজস্ব কিছু ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য থাকে। যেহেতু পাকিস্তানি ভাবাদর্শ ও জিন্নাহ’র দ্বিজাতি তত্ত্বকে খণ্ডন করেই বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল, তাই আমাদের জাতীয়তাবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। অনেকে এটাকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন অথবা একই দেশের দুই অংশের মধ্যে ভাগাভাগির লড়াই বলে বিকৃত ব্যাখ্যা দিতে চান। কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যেকটি সভ্যের দায়িত্ব হল এমন বিকৃত ব্যাখ্যাকে খণ্ডন করা এবং সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ তুলে ধরা, যা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা। সমাজতন্ত্রের কথা তো আওয়ামী লীগ সরকার এখন উচ্চারণও করে না। ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায়ও কি তারা অবস্থান করেন? অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তারা আগেও যথেষ্ট নড়বড়ে অবস্থানে ছিলেন। ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ’৭২ এর সংবিধানকে ফিরিয়ে আনলেও জিয়া ও এরশাদ কর্তৃক যে সকল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী সংশোধনী আনা হয়েছিল, সেগুলি অপরিবর্তিত রাখা হয়। সংবিধানের ৩৮ ধারা পুনঃস্থাপিত হল না। অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল অব্যাহত থাকল। জিয়াউর রহমান জনগণকে প্রতারিত করার ও ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেবার প্রয়োজনে যে ‘বিসমিল্লাহ’ শব্দ যোগ করেছিলেন, তা একই ভাবে রয়ে গেল। ইসলাম রাষ্ট্রধর্মও থাকলো। তা হলে ধর্মনিরপেক্ষতার রইলটা কি? বস্তুতঃ ধর্মনিরপেক্ষতায় তারা এখন বিশ্বাস করেন না। এমনকি অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নেও আন্তরিক নন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা আমরা দেখেছি, সেখানে আওয়ামী লীগের উস্কানি ছিল বলে শোনা যায়। এমনকি সরকারের খুব উঁচু জায়গার কোনো কোনো নেতা হিন্দু বিদ্বেষী বাক্য উচ্চারণ করেছেন বলেও অভিযোগ আছে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাসগুপ্তও অভিযোগ করেছেন, বিগত কয়েক বছরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় আওয়ামী লীগের লোকজনও জড়িত ছিল। সবশেষে হেফাজত ইসলামের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল দাবির কাছে আত্মসমর্পন, হিন্দুত্বের অভিযোগে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন, ভাস্কর্য সরানো এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষা সম্পর্কে কটুক্তি-আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়াশীলতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে। আর এরই সুযোগে মৌলবাদী তৎপরতা, পাকিস্তানি ভাবাদর্শের প্রচার অনেক বেড়ে গেছে। ’৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে অভিমুখে আমরা জাতি হিসাবে যাত্রা শুরু করেছিলাম, এখন ঠিক উল্টোমুখী যাত্রা চলছে। আর তার অগ্রভাগে আছে শুধু বিএনপি নয়, শুধু জামায়াত নয়, আওয়ামী লীগও। অনেক প্রগতিশীলদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে যে মোহ ছিল তা কাটতে শুরু করেছে। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি খুবই খারাপ। সশস্ত্র মৌলবাদীদের সশস্ত্র তৎপরতার একটা বিপদ। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ যখন সেই মৌলবাদী আইডিয়ার কাছে জাতীয়তাবাদী শক্তি আত্মসমর্পন করে। এমনই এক পরিস্থিতিতে কমিউনিস্টদের কাজ ও দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। গণতন্ত্রের জন্য অব্যাহত লড়াই এবং শোীষত মজুর-কৃষকদের শ্রেণি সংগ্রামকে জোরদার করার পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকেও আরও উঁচুতে তুলে ধরতে হবে। সমগ্র পার্টিকে এই কাজ করতে হবে। তবে এই ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট ও নারী ফ্রন্টের লড়াই অধিক গুরুত্ব বহন করে বলে আমি মনে করি। বুর্জোয়া দলের উপর কখনই নির্ভর করা যায় না। উপরন্তু প্রধান বুর্জোয়া দল আওয়ামী লীগের বিশ্বাসঘাতকতা ও আকস্মিক পশ্চাৎপসরণ, এমনকি বলা যেতে পারে ব্যাক টার্ন, খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মনে হচ্ছে ৭১-র বিজয় যেন আর নেই। না, এমন আশঙ্কাকে আমরা বাস্তবায়িত হতে দেব না। কমরেড, সর্বশক্তি দিয়ে অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরুন। বুর্জোয়ার ধোঁকাবাজি, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে উন্মোচিত করুন। মনে রাখতে হবে, আমরা কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরাই হবো গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার চ্যাম্পিয়ন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..