জলের সংসার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আওলাদ হোসেন রনি : ‘বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়’- হাওরবাসী বিরহী উকিল মুন্সীর এই অক্ষম আক্ষেপ হাওরবাসীর আজন্মের। জলের উপর যাদের বসবাস সেই জলধিবাসীদেরই বরাবর পড়তে হয় জলসংকটে। বর্ষায় যারা জলের বাড়াবাড়িতে জলদুর্যোগের মুখোমুখি হন তারাই হেমন্তে পড়েন পানীয় জলের সংকটে, এমনকি গোসলের জলের জন্যেও তাদের হতে হয় সংকটের মুখোমুখি। এই জলধিবাসীরা জলের সাথে বসবাস করতে করতে একসময় ঠিকই জলের নামতা মুখস্থ করেন। আর এভাবেই বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮ ভাগের একভাগ জনসংখ্যার ভূখণ্ড, কৃষি অর্থনীতির পীঠস্থান হাওর জনপদ টিকে আছে হাজার বছর ধরে। প্রাচীন লৌহিত্য সাগরের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া এই ভূখণ্ডে একসময় বসতি ছিলো গারো, খাসিয়া, হাজং ইত্যাদি আদিবাসীদের। কিন্তু হাওরের উর্বর ভূমি আর মৎস্য সম্পদের কারণে একসময় বাঙালিরা সেখানে স্থায়ী বসতি শুরু করে। গবেষকদের মতে, সাগর থেকেই হাওর নামের উৎপত্তি (সাগর>হাগর>হাওর কিংবা সাগর>সায়র>হাওর)। বাংলাদেশের সাতটি জেলার মোট দুই কোটি মানুষের অবস্থান এই হাওর জনপদে। দেশের প্রায় ৮০ ভাগ ধান উৎপাদন হয় এই হাওরে। ধান, মাছ আর গবাদিপশুতে সমৃদ্ধ এই শান্তির জনপদে মানুষে মানুষের সম্মিলনে তৈরি হয়েছে বাংলা লোকসংস্কৃতির অভূতপূর্ব, আশ্চর্য সুন্দর কিছু ধারা। চর্যাপদের কবিকঙ্ক, কাহ্নপা থেকে শুরু করে মরমি বাউল সাধক হাছন রাজা, রাধারমন, শাহ আব্দুল করিম, দূরবীন শাহ, সীতালং ফকির, উকিল মুন্সি, জালাল খাঁ-দের তালিকাটি এতোই দীর্ঘ যে তা এখানে উপস্থাপন করা বাতুলতা। বাংলা লোকসংস্কৃতির শক্তিমান ধারা- ঘেটু গান এবং ধামাইল গানের জন্মই হয়েছে এই অঞ্চলে। এতো এতো সম্পদে যাদের পূর্ণতা, কেমন কাটে তাদের জীবনযাত্রা, কেমন কাটে তাদের বাৎসরিক ধারাপাত? মূলত প্রকৃতি নির্ভর সেচ ব্যাবস্থায়ই এখানকার কৃষি পরিচালিত। বর্ষার পানি নদীতে নেমে গেলে শুরু হয় ধান চাষ, আরেকবার বর্ষার পানি আসার আগেই ধান মাড়াই করে ঘরে তোলেন কৃষকেরা। বর্ষায় যাপন করেন অবসর। বর্ষার পানি এলে জেলেদের শুরু হয় মাছ ধরা আর পানি নেমে হাওর শুকিয়ে গেলে শুরু হয় তাদের অবসর। হাওরবাসী নারীরা ধান আর মাছ শুকিয়ে খাদ্য মজুদ রাখেন প্রতিবছর। অবসরে চলে বিনোদন। আর যোগাযোগ বা যাতায়াতের ক্ষেত্রে হাওরবাসী মানুষের এই প্রবাদটিই যথেষ্ট- ‘বর্ষায় নাও/হেমন্তে পাও/এইডাই আওরের বাও।’ এই ছিলো এখানকার সরল ধারাপাত। কিন্তু উন্নয়নের বিনাশী আগ্রাসনে সেই ধারাপাত ছিন্নপ্রায়। গত কয়েক বছরে হাওরবাসীর সারা জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ভ্রান্ত হয়েছে। তাদের ফসলি অর্থ বছরের শুরুটাই হয়েছে বিনাশ দিয়ে। প্রতি বছর বাঁধ ভেঙে অকালে বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে তাদের সকল সম্পদ। কিন্তু এবারের বন্যাটিকে তারা অভিহিত করছেন স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে। এই বন্যার ফলে শুধুমাত্র তাদের ধান আর মাছেরই ক্ষতি হয়নি, ক্ষতি হয়েছে গবাদিপশুর, ক্ষতি হয়েছে তাদের শিক্ষাব্যবস্থার, হয়েছে জ্বালানি সংকট, তাদের সঞ্চিত অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ার ফলে চরম মাত্রায় হয়েছে অর্থ সংকট। এই অভূতপূর্ব সংকট মোকাবিলায় তাদের পাড়ি জমাতে হচ্ছে শহরগুলোতে। যার ফলে জন্ম হয়েছে জলউদ্বাস্তুর। হাওরের জমজমাট বাজারগুলো এখন পরিণত হয়েছে নীরব এবং হতাশ আড্ডাখানায়। মূলত যে কারণে এই সংকটটি তৈরি হয়েছে সেই কারণটি অনুসন্ধান না করলে শুধুমাত্র ত্রাণ আর পূণর্বাসন দিয়ে এই সংকট কখনোই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। মূলত ভারতে পাহাড়ি খনিগুলোতে উন্নয়নের এলোপাথাড়ি আক্রমণে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে অল্প বৃষ্টিপাতেই, ঠিক একই কারণে পাহাড়ি বালুতে নিম্নাঞ্চলের নদীগুলো ভরাট হয়, হাওর অঞ্চলের প্রধান প্রধান নদীগুলো গভীরতা হারানোর কারণে সেই ঢল সহজেই দুর্নীতি আর অনিয়মের ব্যাধিতে আক্রান্ত দুর্বল বাঁধগুলোকে ভেঙে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু নয়, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগলিক বৈচিত্র্য, বাংলাদেশের প্রতিবেশ-পরিবেশ এককথায় বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত এই হাওর সংকটের সাথে। তাই সেই সংকটটির স্থায়ী সমাধান হওয়া আশু জরুরি, সেই সংকট সমাধান বাংলাদেশের সকল অধিবাসীর কর্তব্য। আর যদি সেটি না হয় তাহলে আজন্ম আক্ষেপী হাওরবাসী বাউল ছাত্তার পাগলার সেই গানটিই হবে নাগরিক বাংলাদেশের শেষ পরিণতি- ‘কাঙ্গাল মাইরা জাঙ্গাল দিলে গোনাহ হইবো তোর।’ তথ্যসূত্রঃ নেত্রকোনা জেলার ইতিহাস- আলী আহম্মদ খান আইয়ুব হাওরবাসীর চোখে হাওর দেখুন- পাভেল পার্থ (সাপ্তাহিক একতা) বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি’র প্রকাশিত প্রচারপত্র এবং হাওরবাসীর একান্ত সাক্ষাৎকার।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..