উন্নয়ন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এ দেশের মানুষ এক শতাব্দীর মধ্যে তিন-তিনবার তাদের ‘দেশ’ বদল হতে দেখেছে। দেশ বদলের পাশাপাশি ডজন-ডজনবার দেশের ‘সরকার’ বদল হয়েছে। মানুষের প্রশ্ন, দেশ বদল হয়, সরকার বদল হয়–তবুও কোনো কিছুতেই মানুষের ‘অবস্থার’ মৌলিক কোনো বদল হয় না কেন? গত চার দশকের বেশি সময় ধরে যেভাবে দেশ পরিচালিত হচ্ছে তাতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী ক্ষুব্ধ। অল্প কিছু ‘ভাগ্যবান’ ব্যক্তির অবস্থা রাজকীয় হয়ে উঠলেও পনের আনা মানুষের ক্ষেত্রে একদিকের দুর্ভোগ কোনো সময়ে কিছুটা কমলেও দুর্যোগ আরো তীব্র ওঠে অন্যদিকে। দৈনন্দিন জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে পরিস্থিতির মৌলিক কোনো হেরফের ঘটার জোরালো কোনো লক্ষণও তেমনভাবে মানুষের কাছে দৃশ্যমান হচ্ছে না। এক নিরূপায় শ্বাসরুদ্ধকর আবর্তের বেড়াজালে সবাই আটকা পড়ে আছে। এমন অনুভূতি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে বছর-বছর ধরে গ্রাস করে আছে। এই অবস্থাকে অনেকেই ‘পোড়া কপাল’ বলে মেনে নিয়ে কঠোর জীবন সংগ্রামে পরিপূর্ণ নিমগ্ন হয়ে আছে। ব্যাপক জনগণের উপলব্দি হলো, দেশ এখন অনেকটাই একধরনের ‘অচলায়তনে’ বন্দি। ‘উন্নয়নের’ যে মডেল ধরে গত চার দশককাল এদেশ পরিচালিত হচ্ছে তাতে অল্প কিছু মানুষ কল্পনাতীত পরিমাণে সম্পদশালী হয়ে উঠেছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে শুধুমাত্র তার ছিটেফোঁটা এসে পৌঁছাতে পেরেছে। ফলে বৈষম্য বেড়েছে। সে বৈষম্য ক্রমাগত আরো কুৎসিত রূপ ও বিপজ্জনক মাত্রা পেয়ে চলেছে। শাসক শ্রেণি ও তার পক্ষের পণ্ডিতরা তত্ত্ব দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে ‘উন্নয়নের’ স্বার্থেই কিছু লোকের হাতে সম্পদের পাহাড় জমতে দেয়া উচিৎ। চুরি-বাটপারি-দুর্নীতি-লুটপাট যে পন্থায়ই তা করা হোক না কেন, তাতে বৈষম্য যতোই বৃদ্ধি পাক না কেন–‘উন্নয়নের’ স্বার্থে তা করতে দিতে হবে। তাদের মতে এসব নাকি হলো ‘উন্নয়নের’ প্রসব বেদনা। এই বেদনা সহ্য করতে হবে। কিছু ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত এই সম্পদ নাকি একসময় ‘চুইয়ে পড়ে’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিচের তলার ব্যপক গরিব জনগণের হাতে পৌঁছাবে। এটিই হলো পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী বাজার-মৌলবাদ ভিত্তিক তথাকথিত উন্নয়ন-মডেল। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ ও বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজির ওপর নির্ভরশীলতা ও বেপরোয়া লুটপাটতন্ত্র হলো এই মডেলের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ এই একই অর্থনৈতিক দর্শন ও ‘উন্নয়ন’ মডেলের ‘অচলায়তনে’ বন্দি হয়ে আছে। ‘উন্নয়নের’ প্রসব বেদনায় কাতর জনগণ যেন বিদ্রোহ না করে বসতে পারে সেজন্য রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি তত্ত্ব হাজির ও কার্যকর করা হচ্ছে। তা হলো ‘উন্নয়ন আগে গণতন্ত্র পরে’– এই তত্ত্ব। শাসক শ্রেণি ও তার পক্ষের পণ্ডিতদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে ‘উন্নয়নের‘ স্বার্থে অনেক সময় জনগণকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে ‘তিতো ওষুধ’ খাওয়ানোটা প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষার সবকিছুর প্রতি সবসময় গুরুত্ব দিলে কি চলবে? তাই জনগণকে তাদের মন খুলে সবসময় সব কথা বলতে দেয়া যাবে না, চিৎকার করতে দেয়া যাবে না, কাঁদতে দেওয়া যাবে না। সবাইকে নীরবে সব কষ্ট হজম করে যেতে হবে। সব অন্যায় সহ্য করে যেতে হবে। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে নিরঙ্কুশ হতে দেয়া যাবে না। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলো কোনোভাবে যেন সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা ধনীক শ্রেণির প্রভাবের বাইরে না যেতে পারে সেজন্য শাসক-শোষক গোষ্ঠী দেশে একধরনের ‘নিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্যের’ অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছে। দু’টি বুর্জোয়া দলের মধ্যে স্থায়ী সংঘাত জিইয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছে। এর পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধ জঙ্গি শক্তিকে তারা লালন পালন করছে। জামায়াত-শিবিরসহ বিভিন্ন উগ্র সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি শক্তিকে তারা তাদের সুবিধামতো ব্যবহার করছে। নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে তারা এই বিপজ্জনক অন্ধকারের কালো শক্তিকে নিয়ে খেলা করছে। বুর্জোয়া দল দু’টির গণবিরোধী কাজ ও রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার সুযোগ নিয়ে এসব অপশক্তি জনগণকে বিভ্রান্ত করতে স্বক্ষম হচ্ছে। তারা একদিকে সাম্প্রদায়িকতার সামাজিকীকরণ ঘটিয়ে চলেছে ও সাথে সাথে অন্তর্ঘাত চালিয়ে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। সরকার বদলের পাশাপাশি ‘ব্যবস্থারও’ বদল ঘটাতে হবে। তাই, ‘সিস্টেমের’ বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া সাধারণ মানুষের মুক্তি নেই। লড়াই চালাতে হবে সেই লক্ষ্যে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..