‘ঘুষ ছাড়া চাকরি চাই’আন্দোলন প্রসঙ্গ : আমাদের করণীয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হাফিজ আদনান রিয়াদ : মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি শোষণ-বঞ্চনাহীন, অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে লালন ধারণ করে। যেখানে সকলের জন্য ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা, মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকবে। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশই যুবক। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও বিপুল সম্ভাবনার এই যুবশক্তির অনেকটাই আজ কর্মহীন, বেকার। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক কর্তব্য। এদেশের প্রগতিশীল যুব আন্দোলনের পথিকৃৎ সংগঠন বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন। ১৯৭৬ সালের ২৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছি, আমাদের কর্মসংস্থান সংকটের অন্যতম অন্তরায় হচ্ছে ‘নিয়োগ বাণিজ্য’। গভীর উদ্বেগের বিষয়, একজন সাধারণ যুবককে তার শিক্ষা জীবনের পরীক্ষা প্রস্তুতির পাশাপাশি, শিক্ষা শেষে চাকরি পেতে আর্থিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করতে হচ্ছে। দরিদ্র বাবার জায়গা-সম্পত্তি বিক্রি করে, চড়া সুদে নেয়া টাকা ঘুষ দিয়ে হলেও চাকরি পাওয়ার জন্য এক ধরনের মানসিক পূর্ব প্রস্তুতি আগে থেকেই জেঁকে বসেছে। একদিকে কর্মহীন বেকার যুবকদের ব্যাপকতা আর অন্যদিকে সীমিত কর্মসংস্থান, এই সংকটকে আরো তীব্র করেছে। আইএলও-এর সর্বশেষ বিশ্ব যুব কর্মসংস্থান পরিস্থিতির প্রতিবেদনে দেখা যায়, এদেশে বর্তমানে পূর্ণ বেকারের সংখ্যা ১১ শতাংশ। জনসংখ্যার হিসেবে যা ১ কোটির অধিক। চাকরিতে নিয়োজিত যুবকদের ৪১ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ৫৭ শতাংশ যুবকের কর্মসন্তুষ্টি নেই। সরকারি চাকরিতে এখনও প্রায় তিন লক্ষ পদ খালি আছে। কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটময় এ পরিস্থিতির সুযোগে বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যস্তরের নেতা-কর্মী এবং এক শ্রেণির সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাকে ঘিরে একটি দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে। যারা তাদের কথিত প্রভাব-প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে অসহায় কর্মপ্রত্যাশী যুবকদের কাছ থেকে চাকরি ভেদে ২ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ টাকা লেনদেন করছে। দেশের পত্র-পত্রিকায় চাকরি ক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেনের একাধিক প্রতিবেদন বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। ‘চাকরি পেতে ঘুষ লাগে’ এটা সমাজে বিরাজমান অদৃশ্য (!!!) অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। যা অনেকটাই উন্মুক্ত গোপনীয় বিষয়। এমনকি প্রবাসে কাজ করতে যাবার সময় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়া হয় সেখানেও ঘুষ দিতে হয়। সমাজে জেঁকে বসা ঘুষ-দুর্নীতিই হচ্ছে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার পথে প্রধান অন্তরায়। তাই ঘুষ-দুর্নীতি তথা লুটপাটের ব্যবস্থাকে জিইয়ে রেখে গণমুখী ধারায় প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না। আর চাকরির নিয়োগে ঘুষ হচ্ছে দুর্নীতি নামক বিষবৃক্ষের বীজ। ঘুষ দিয়ে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি কর্মস্থলেও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে পদোন্নতি, বদলি প্রতি ক্ষেত্রেই এদের ঘুষ দিতে হয়। ঘুষের টাকা জোগার করতে তারাও তখন ঘুষ নেয়া শুরু করেন। একজন সাধারণ মানুষ যখন কোন দাপ্তরিক কাজে সেখানে যান, তখন সেখানকার দুর্নীতিবাজরা তাকে বাধ্য করেন ঘুষ প্রদানে। এভাবে আমরা সবাই ইচ্ছায় অনিচ্ছায় দুর্নীতির দুষ্টুচক্রে প্রবেশ করি। নচেৎ নানা হয়রানির শিকার হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ি। দুর্নীতিবাজদের রামরাজত্ব আজ আর শুধু কর্মস্থলেই সীমাবদ্ধ নেই। অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদকে নিরাপদ করতে তারা আজ রাজনৈতিক দলের ভেতরেও প্রভাব বিস্তার করছে। নির্বাচনের পূর্বে রমরমা মনোনয়ন বাণিজ্যের সুযোগে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী সবাই নির্বাচনে নেমে পড়ে। নির্বাচিত হলে এদের সম্পদ যেমন নিরাপদ হয়, তেমনি আরো সম্পদ অর্জনে এরা নতুন-পুরাতন আরো পথ খুঁজে নেয়। এভাবে ধীরে ধীরে গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটাই আজ দুর্নীতির পাকে পড়েছে। সঙ্গত: কারণেই যুব ইউনিয়ন ‘ঘুষ ছাড়া চাকরি চাই’- আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। ‘ঘুষ ছাড়া চাকরি চাই’- আন্দোলনের অভিযাত্রায় সারাদেশে ইতোমধ্যে গণশুনানি, মানববন্ধন-সমাবেশ, পদযাত্রা, পথসভা ও গণস্বাক্ষর সংগ্রহের মাধ্যমে আন্দোলন সংগঠনে যুব ইউনিয়ন কাজ করছে। এসব কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে আমরা সাধারণ জনগণ ও যুবকদের অকুণ্ঠ সমর্থন পাচ্ছি। অনেক ভুক্তভোগী যুবক বা তাদের অভিভাবক সেখানে তাদের অসহায় আত্মসমর্পণের কথা অকপটে বলেছেন। আবার অনেকেই দাবির যৌক্তিকতা মেনেও সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন এটা কি সম্ভব? ঘুষ কি আদৌ বন্ধ করা যাবে? যুব ইউনিয়ন কি এটা বন্ধ করতে পারবে? মানুষের মনের এই সংশয় ও অনাস্থা দূর করতে পারাটাই এ আন্দোলনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ। যুব ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের এ চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হতেই হবে। আমরা এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি বিজয়ী হবার জন্যই। লাখো শহীদের রক্তের নামে শপথ নিয়েছি এ দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই। মানুষের মাঝে সেই বিশ্বাসকে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই আসবে সফলতা। সমাজে জেঁকে বসা চাকরি পেতে ঘুষ লেনদেনের অসুস্থ প্রবণতাকে রুখে দিতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ‘ঘুষ ছাড়া চাকরি চাই’ আন্দোলনে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন উত্থাপিত দাবিসমূহ - চাকরি ক্ষেত্রে সকল প্রকার ঘুষ, দুর্নীতি, দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরির নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি নিয়োগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে প্রত্যেক জেলায় বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার বাণিজ্যে জড়িতদের চিহ্নিত করে, তাদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে ঘুষ বিরোধী প্রচারণা জোরদার করতে হবে। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচারণায় সামাজিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক ড্রাফ্ট, পে-অর্ডার গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে। চাকরি প্রত্যাশী কর্মক্ষম যুবকদের তথ্য নিবন্ধনে ‘অনলাইন জব ডাটা ব্যাংক’ চালু করতে হবে। এ লক্ষ্যে আগামী ২০’ এপ্রিল, সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জাতীয় যুব সমাবেশ আহবান করা হয়েছে। সমাবেশে সারাদেশ থেকে যুব বন্ধুরা যোগ দেবেন। জাতীয় নেতৃবৃন্দ সেখানে বক্তব্য রাখবেন। সমাবেশ শেষে সংগৃহিত গণস্বাক্ষরসহ প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয়া হবে। লক্ষ কোটি যুবকের বহুকাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান যেন ঘুষ-দুর্নীতি-দলীয়করণের ভিত্তিতে না হয়ে প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হয় তা নিশ্চিত করতে, আমাদের এই সংগ্রামে সকলের নৈতিক সমর্থন ও সক্রিয় সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, যুব ইউনিয়ন

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..