কমরেড আবুল কালাম আজাদ-লাল সালাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন : গত ২৯ মার্চ ২০১৭ সালে চির বিদায় নিলেন কমরেড আবুল কালাম আজাদ। পার্টি ভাঙনের পর ইনি ছিলেন দিনাজপুর জেলা পার্টির প্রথম সভাপতি। নব্বই এর দশকের সূচনালগ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পরে দুনিয়াব্যাপী সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ এর সম্পর্কে নানা বিতর্কের সূচনা হয়। অনেকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক তত্ত্বগত বিষয়গুলো নিয়েই নানা কূটতর্কে জড়িয়ে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে ঐ আদর্শের ধারক ও বাহককেই বিভ্রান্তির মধ্যে ঠেলে দিল। পুঁজিবাদী বিশ্বের থিংটেংকারা মহা উল্লাসে ফেটে পড়লেন। তারা প্রচার করতে শুরু করলেন “ মানব সভ্যতার বিকাশের পর্ব শেষ। এখন পুঁজিবাদই সর্ব রোগ হরণের মহৌষধ পুঁজিবাদকে সংস্কার করে ঝাড়াই মোছাই করে দুনিয়ার তাবৎ সমস্যার সমাধান টানতে হবে। সময়টা তখন সত্যি বড় কঠিন। এই মহা দুর্যোগের ঢেউ এসে লাগলো বাংলাদেশেও। কেন্দ্রীয় অধিকাংশ রথি মহারথিরা থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের বহু নেতারা পর্যন্ত এক হয়ে দীর্ঘ আর্টিকেল লিখে তলার কমরেডদের বুঝাতে উদ্যোগ নিলেন এখন আর সমাজতন্ত্রের দরকার নেই। পুঁজিবাদই সব সমস্যার সমাধান করে দিবে। অতএব কমিউনিস্ট পার্টি করে জীবনটাকে শেষ করার কোন দরকার নেই। তলার কর্মীরা তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে নেতাদের বক্তব্য মেলাতে চেষ্টা করলো। না, তাদের কথার সঙ্গে বাস্তবতার কোন মিল নেই। সুতরাং তলা থেকেই পার্টি বিলোপের প্রবক্তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো দৃঢ় কঠিন শপথ নিয়ে। আমার জেলার অবস্থাটা তখন অত্যন্ত নাজুক। জেলা কমিটির শহরস্থ মাত্র দু’জন সদস্য আবুল কালাম আজাদ ও মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন বাদে আর সবাই চলে গেলেন বিলোপবাদী ধারার সঙ্গে। আমি সময় নষ্ট না করে দ্রুতই আজাদ ভাই এর সঙ্গে মিলিত হয়ে সার্বিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করলাম। আজাদ ভাই আমার সব কথা শুনে একমত হলেন। তবে এই সংশয় প্রকাশ করে একান্তে এ কথাও বললেন- আলতাফ সব রথি মহারথিরা চলে গেল– আমার তো বয়স হয়েছে- তেমনটা সার্ভিস তো দিতে পারবো না। তুমি কি একাই পারবে- পার্টিটাকে রক্ষা করতে। আমি অভয় দিয়ে বললাম- ‘আজাদ ভাই’ আপনি শুধু মাথার উপরে ছাতা হয়ে থাকবেন। বাকিটা আমি সামলাবো। তোমার অবস্থা খুবই ভাল। তারা শুধু একটা অবলম্বন চায়। তিনি খুশি হয়ে বললেন- তা হলে তো খুবই ভাল। আমি আছি। তুমি কাজে নেমে পড়। উপজেলাগুলি ট্যুর করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু কিভাবে হবে- কোনো যানবাহন নেই, অর্থ নেই, কোনো সঙ্গী সাথী নেই। একদিন চলে গেলাম নিজ উপজেলা বীরগঞ্জে। সেখানেও বিভক্তির চিড় ধরেছে বলে মনে হলো। খুঁজে পেলাম উপজেলা কমিটির একজন নেতা পঞ্চানন রায়কে। তার কাছে সব কথা বললাম। সে বললো আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি, কিন্তু সমস্যা হলো আমার মটর বাইকটা তো নষ্ট হয়ে আছে। ওটা ঠিক করার জন্য আমার হাতে এই মুহূর্তে কোনো অর্থ নেই। আমি বললাম- কত টাকা লাগবে। বললো বেশি নয়- হাজার দেড়েক। আমি আর কিছু চিন্তা না করে বললাম, এই টাকা আমি দেব, আপনি গাড়িটা দ্রুত মেরামত করে নিন। নিজের সাইটের কিছু টাকা আর কিছু ধার দেনা করে তাকে ১৫০০/- (দেড় হাজার) টাকা দিলাম। সে দ্রুত গাড়িটা মেরামত করে নিল। তারপর সেই গাড়ি নিয়ে দু’জনে এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলা ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। তলার কর্মীরা সব কথা শুনে আমাদের অভয় দিল, ‘কমরেড এগিয়ে যান– আমরা আছি আপনাদের পাশে। এভাবে তলার কর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়ে নিজেই কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। তারপর কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কথা হলো পার্টির বর্তমান সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে। আমি উনাকে বললাম, একটা মিটিং এর তারিখ ঠিক করতে চাই। কিন্তু শর্ত হলো এই মিটিংএ আপনাকে আসতে হবে। কারণ আপনি তো সবই জানেন- এখানকার বিলোপবাদীরা কত শক্তিশালী। আপনার কথা শুনলে তলার কমরেডরা তাদের শত রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, সভায় উপস্থিত হতে আর কোনো দ্বিধা করবে না। সেলিম ভাই রাজী হলেন। তারিখটা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। নির্দিষ্ট তারিখে দিনাজপুর নাট্য সমিতি মিলনায়তনে সভা শুরু হলো। হলঘরটি কানায় কানায় পূর্ণ। সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। প্রধান অতিথি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। দেশ দুনিয়ার পরিস্থিতি আলোচনা হলো। সমাজতন্ত্রের সোভিয়েত ইউনিয়ন মডেল এর বিপর্যয় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আদর্শিক কোন বিপর্যয় নয়-প্রয়োগের ভুল- ইত্যাদি নানা বিষয়ে সভায় দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা হলো। নেতাকর্মীরা সবাই আশ্বস্ত হলেন এবং পার্টি রক্ষায় এবং আগামীতে পার্টিকে আরো বেশি শক্তিশালী ও লড়াকু করে গড়ে তোলার জন্য আবার নতুন করে শপথ নিলেন। সভা শেষে পার্টি কমরেডদের সর্বসম্মতিক্রমে এডহক ভিত্তিতে একটা জেলা কমিটি গঠন করা হলো। এই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হলেন আবুল কালাম আজাদ আর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন। বিলোপবাদীরা এই অবস্থাকে কিছুতেই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারলো না। তারা নানারকম ভয়ভীতি, নছিয়ত আর প্রলোভন দিয়ে নতুন করে পার্টি গঠনের সূচনা পর্বে যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে কমরেডরা এগিয়ে এসেছিল তার কিয়দংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু এতদ্বসত্ত্বেও পার্টির অগ্রযাত্রাকে কোনভাবে ব্যাহত করতে পারে নাই। যাই হোক সেই থেকে পার্টি এখনও টিকে আছে এবং জোর কদমে এগিয়ে যাচ্ছে। আজকে পার্টিতে নতুন নতুন মুখ এসেছে। তারা তাদের সাধ্যমত হাল ধরেছেন এবং পার্টিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কমরেড আবুল কালাম আজাদ খুব বেশি সময় পার্টিতে সক্রিয় থাকতে পারেন নাই। বার্ধক্যজনিত কারণে পরবর্তীতে নিজেই সভাপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। কিন্তু মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি পার্টি ছাড়েন নাই। আমরা জেলা পার্টি তাঁর অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভব করছি। কমরেড আবুল কালাম আজাদের এর মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। উনার বাবার নাম মতিব উদ্দীন আহাং আর মাতার নাম তছিরন নেছা। শহরের অদূরে বিরল উপজেলার ২নং ফরককাবাদ ইউনিয়নের দপতৈড় গ্রামে এক নির্জন পল্লীতে এক সাধারণ কৃষক পরিবারে ১৯৩৮ সালে ১৩ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া শেষ করে তৎকালীন দিনাজপুর শহরের একমাত্র কলেজ সুরেন্দ্রনাথ কলেজে শিক্ষা জীবন শুরু করেন এবং এই কলেজে শিক্ষাকালেই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং খুব অল্পসময়ের মধ্যেই সবার কাছে একজন গ্রহণযোগ্য নেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলশ্রুতিতে ষাটের দশকের সূচনালগ্নে কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনে প্রথমে ভি.পি এবং পরে জি.এস নির্বাচিত হন এবং অত্যন্ত সফলতা আর দক্ষতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেন। এই কলেজে পড়াকালীন সময়েই ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী আজাদী হাই এর সঙ্গে সুুসম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৬২ সালে উভয়ের সম্মতিতে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। আজাদী হাইও রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দিনাজপুর জেলা মহিলা পরিষদ এর সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আজাদ ও আজাদী হাই দম্পতির দুই মেয়ে ডাঃ জাহিদ আজাদ সোমা ও ডাঃ সানজিদা আজাদ কান্তা বর্তমানে স্বপরিবারে অস্ট্রেলিয়ায় বাস করেন। একমাত্র ছেলে রাশেদ আজাদ ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কমরেড আবুল কালাম আজাদ এম.এন কলেজ থেকে বি.এ পাস করে স্থানীয় ফরাককাবাদ হাইস্কুলে, এর পরে দিনাজপুর শহরস্থ একাডেমী হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরে লাইব্রেরি সায়েন্সে ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করে শহরের একটি প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কে.বি.এম কলেজে লাইব্রেরিয়ান পদে চাকুরিরত ছিলেন। অবসরে অর্থাৎ সান্ধ্যকালীন সময়ে স্থানীয় খাজা নাজিম উদ্দীন হল এন্ড লাইব্রেরির গ্রন্থাগরিক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শখ ছিল বই পড়া, গান শোনা। সামাজিক নানা-কর্মকাণ্ডসহ দিনাজপুরের সুষ্ঠু ধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নানা অবদান রাখেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে নানা দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে আইয়ুব শাসনামলে শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ৬৯’র গণ অভ্যূত্থান, মুক্তি, পরবর্তীতে স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এদেশের বাম গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও সাম্রাজ্যবিরোধী নানান আন্দোলনে সব সময়ে সামনের কাতারে থেকে লড়াই করেছেন। বুদ্ধিজীবী মহলেও তার পরিচিত ছিল অন্যন্য। তাঁর এই এসব অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..