গণমানুষের মুক্তি ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আবদুল মোতালেব : সাধারণ ভাবে বলা যায়, কোন দেশের রাষ্ট্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সঙ্কট নিরসনকল্পে অথবা বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি ও সংগঠনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে রাজনৈতিক সংগ্রাম। গণমানুষের অধিকার আদায় ও প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রাজনীতিই প্রধান হাতিয়ার। তবে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে গণমানুষের অংশগ্রহণ কেবল স্বতঃস্ফূর্ত হলেই হয় না, প্রয়োজন সচেতন গণমানুষের ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ। এখানেই গণমানুষের মুক্তি সংগ্রামে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ভূমিকা অনিবার্য হয়ে ওঠে। কোন দেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রাম রাজনৈতিক দল বা দলসমূহের ইচ্ছে মাফিক ঘটেনা। যেকোন সংগ্রামের উপযুক্ততা ও সফলতা বাস্তব শর্ত নির্ভর বহির্বাস্তবতা ও অন্তর্বান্তবতা। গণমানুষেরস্বার্থ পরিপন্থি রাষ্ট্রনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সমস্যা-সঙ্কট, অসঙ্গতি-অসামঞ্জস্য, যা দৃশ্যমান, সেগুলোই বহির্বাবস্তবতা। অন্তর্বাস্তবতা মানুষের ভেতরের বিষয়, মানস প্রক্রিয়াজাত চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধ, যার প্রকাশ মানুষের বসনে-ভূষণে, বচনে-আচরণে, প্রথায়-আচারে, জীবনচর্চার নানা মাত্রিক প্রকাশে। তাই রাজনীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের বিষয়টি গুরুত্ববাহী। কারণ রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে সমাজ পরিবর্তন বা মানুষের মুক্তি সংগ্রাম সফল হয় না, হলেও তা হয় আংশিক ও স্বল্পস্থায়ী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই এর দৃষ্টান্ত। দ্বিজাতিতত্ত্ব ভিত্তিক ধর্মতন্ত্রী সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পরপরই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর যে আঘাত নেমে আসে, তাতেই মোহ ভাঙে বাঙালির, উন্মেষ ঘটে ভাষা-সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার; যা ধাপে ধাপে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উপনীত হয় একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের মোহনায়। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মাঠে ময়দানে ও গণমাধ্যমে পরিবেশিত ও প্রচারিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, সঙ্গীত, নাটক ইত্যাদি মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষকে উজ্জ্বীবিত ও অনুপ্রাণিত করেছে, প্রত্যয়দীপ্ত করেছে বিজয়ের পথে এগিয়ে যেতে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী মানুষের আকাঙ্ক্ষা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অপুষ্টিমুক্ত গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, যার প্রতিফলন ঘটে বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতিসমূহে। এগুলো বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজন ছিল সুস্পষ্ট রাজনীতিক কর্মসূচির, তারও চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগ্রামের, সংস্কৃতি বিকাশের নতুন পথরচনার। কিন্তু শাসক শ্রেণির অন্তর্দ্বন্দ্ব দুর্বল রাজনৈতিক চেতনা, সিদ্ধান্তের অস্পষ্টতা ও অদূরদর্শিতা এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির জোরালো ভূমিকা পালনে অপারগতা ও উদাসীনতার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। ফলে রাষ্ট্র বদল হল কিন্তু সমাজ বদল হল না। সমাজের ভেতরে রয়ে গেল পাকিন্তানের ধর্মতন্ত্রী, একচেটিয়া পুঁজিবাদী ও ঔপনিবেশিক-সামন্তবাদী ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধ। স্বাধীনতাবিরোধী ও পরাজিত শক্তি সুযোগ পেল ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে শক্তি সঞ্চয়ের এবং কী পরিমাণে শক্তি তারা সঞ্চয় করেছিল তা বোঝা গেল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত হল, বেয়োনেটবুটের আঘাতে রক্ত মূল্যে কেনা সংবিধান ক্ষতবিক্ষত হল, নির্বাসিত হল রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসমূহ। মুক্তবাজার অর্থনীতির জালে বন্দি হল দেশ ও জাতি। ধর্মতন্ত্রী সাম্প্রদায়িতার উত্থান কলঙ্কিত করল রাষ্ট্র ও সমাজদেহকে, যার খেসারত এখনও পর্যন্ত দিতে হচ্ছে গণমানুষকে-গোটা জাতিকে। মুক্তি সংগ্রামে রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই। কিন্তু সেই রাজনীতির ভেতরে সংস্কৃতির বিকাশ না ঘটলে তা কখনো গভীরতা ও বিস্তৃতি লাভ করে না, মুক্তি সংগ্রাম পৌঁছাতে পারে না কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। শেণিবিভক্ত সমাজে শাসক গোষ্ঠী সংস্কৃতিকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তারা নিজেদের সংস্কৃতিকে নানা কৌশলে চাপিয়ে দিয়ে গণমানুষের সৃজন শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ফলে সংস্কৃতি আপন শক্তিতে বিকাশ লাভ করতে পারে না। এভাবে অজ্ঞ-অনক্ষর জনগণ হয়ে পড়ে ভীত ও বাস্তববিমুখ। গণমানুষ কেবল আর্থিকভাবেই দরিদ্র নয়, মানসিকভাবেও দারিদ্র্যক্লিষ্ট। তাই তাদের মনে ও মগজে বাসা বাঁধে ভাববাদী ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধ, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার। তারা হয়ে পড়ে একান্তভাবে ভাগ্য নির্ভর। এসবের হাত থেকে মুক্তির জন্যে দরকার তাদের বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী ও যুক্তিবাদী করে তোলা। কিন্তু সমাজকে অশিক্ষা ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে রেখে সফল সাংস্কৃতিক আন্দোলন আশা করা যায় না। সমাজ বিকাশের স্বার্থে তাই অনক্ষরতা-অশিক্ষা দূরীকরণের কার্যক্রমসহ পাঠচক্র গঠন ও পাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তা হতে পারে সংস্কৃতির লক্ষ্যে পৌঁছানোর শক্তিশালী উপায়। বিশ্বের সব দেশে, সব কালে সংখ্যালঘিষ্ঠ শাসকশ্রেণি সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমানুষের ওপর শাসন-শোষণ-অত্যাচার-নিপীড়ন চালায় এবং সমাজ শৃঙ্খলার নামে, আইনের নামে, এমনকি ধর্মের নামে, গণমানুষের চেতনাকে দমিত ও ভোঁতা করে রাখে। এ কাজে রাষ্ট্রের শান্ত্রী-সেপাই, আইন-আদালতকে ব্যবহার করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। অথচ এরাই আবার গণমানুষের নেতা সেজে তাদের ভাগ্যোন্নয়নের বাণী শোনায়, কিন্তু কোন ভাগ্যোন্নয়ন ঘটে না, ঘটা সম্ভবও নয়, বরং তারা ধনে ও মনে হয়ে পড়ে আরো নিঃস্ব। প্রকৃত সত্য এই যে, লড়াই-সংগ্রাম ছাড়া কারো ভাগ্যবদল হয় না। তাই গণমানুষের অধিকার আদায় ও প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তাদেরই করতে হবে। বিষয়টি রাজনৈতিক সংগ্রামের। সে সংগ্রামে জয়ী হতে হলে গণমানুষের চেতনার জাগরণ ও উৎকর্ষসাধন প্রয়োজন। মানসিক উৎকর্ষ সাধন করে সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা সংস্কৃতির কাজ। মানুষের চিন্তা-চেতনার জগতে ও তার মানস গঠনে পরিবর্তন আনতে এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের ঐক্য গড়ে তুলতে পারে কেবল সংস্কৃতি। তাই গণ মানুষের মুক্তি সংগ্রামে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম অচেছদ্য নয় কেবল, সাংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সংগ্রাম সম্ভব নয়। প্রকৃত পক্ষে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম থেকেই রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্ম। আবার রাজনৈতিক সংগ্রামের সাফল্যকে ধরে রাখার বাহনও সংস্কৃতি। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত বাংলার স্বদেশি আন্দোলন থেকে সাতচলিশ পরবর্তী বিভক্ত বাংলার ভাষা আন্দোলন, গণ অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত ও সফল নাও হতে পারত, যদি তার পেছনে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণ প্রবাহ না থাকত, সংস্কৃতির উজ্জ্বীবনী ধারায় বাংলার গণমানুষ আপ্লুত ও জাগ্রত না হত। সংস্কৃতি যে গণমানুষের মুক্তি সংগ্রামে কত বড় হাতিয়ার, অতীতের নানামাত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম থেকে তা যেমন প্রমাণিত হয়েছে, বর্তমানে ও আগামিদিনের আন্দোলন সংগ্রামেও সে প্রমাণ রাখতে সক্ষম। সংস্কৃতির কাজ, অতীত আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শৈল্পিক কৌশলে জনগণের কাছে তুলে ধরা এবং তাদের মধ্যে নতুন চেতনা, নতুন আশা ও নতুন স্বপ্ন সৃষ্টি করা; মানুষের ভেতরে সুপ্ত থাকা বিবেকবান, সংবেদনশীল মানুষটিকে জাগিয়ে তোলা, জাগিয়ে রাখা, নিরন্তর প্রেরণা শক্তি জুগিয়ে বিকশিত করে এগিয়ে নেওয়া। বর্তমান বিশ্বে ধর্মতান্ত্রিক সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও জাতিগত সংঘাত গণমানুষের মুক্তি সংগ্রামের পথে প্রবল প্রতিবন্ধক। ধর্মের প্রতি মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও তার তাঁবেদার দেশীয় ক্ষমতালিপ্সু লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণি অর্থসহ সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী গড়ে তোলে এবং শ্রেণীগত স্বার্থে ব্যবহার করে। এই মৌলবাদের সহিংস ও সশস্ত্ররূপ জঙ্গিবাদ, তার তাণ্ডবলীলায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল দরিদ্র ও উন্নয়নকামী দেশ সন্ত্রস্ত। উদ্দেশ্য, ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদী জঙ্গিবাদীদের দিয়ে দেশের মধ্যে সহিংস নৈরাজ্য সৃষ্টি করে লগ্নিপুঁজির বাজার পাকাপোক্ত ও সম্প্রসারণ করা। দ্বিতীয়ত, মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চার ও মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির মাধ্যমে গণমানুষের মুক্তি সংগ্রামকে দমিত ও প্রতিহত করে কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখা। বস্তুতপক্ষে, মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী ও দেশীয় ক্ষমতা লিপ্সু লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণি উভয়ে সাম্রাজ্যবাদেরই অনুগত দেশীয় প্রতিনিধি। তাই শাসন ক্ষমতা ও উচ্ছ্বিষ্ট পুঁজির ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বকলহে লিপ্ত হলেও সাম্রাজ্যবাদ দেশের সম্পদ লুট করে নিলেও তারা থাকে নিশ্চুপ, নির্বাক। বর্তমানে গোটা বিশ্ব বিশ্বায়নের জোয়ারের প্রবল স্রোতে ভাসছে। সে স্রোতের তোড় এখন প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশ্বায়নের অর্থ, বৃহত্তর কর্পোরেট পুঁজিবাদী মুক্তবাজার ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া। এ বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া আসলে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অনাহার, অপুষ্টি, অশিক্ষা, শোষণ-বঞ্চনার বিশ্বায়ন। রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিতে, এ বিশ্বায়ন অসাম্য বৈষম্য, অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, বেকারত্বের বিশ্বায়ন। সংক্ষেপে বলা যায়, এ বিশ্বায়ন মানুষের বিশ্বায়ন নয়, বি-মানবীকরণের বিশ্বায়ন; উন্নয়নের বিশ্বায়ন নয়, পুঁজিবাজার দখলের বিশ্বায়ন; সম্পদের বিশ্বায়ন নয়, লুণ্ঠন ও নিঃস্বকরণের বিশ্বায়ন; শ্রমের বিশ্বায়ন নয়; মাদকের বিশ্বায়ন। সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে, বিশ্বায়নের অর্থ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু বিচিত্র সংস্কৃতির সম্মিলন নয়, বরং সকল বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে বিশ্বায়নের সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও প্রসারণ। বিশ্বায়ন চায়, সারাবিশ্বে এমন একটা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে যাতে বিশ্বের সকল মানুষের মধ্যে একই রকমের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধ থাকে। উদ্দেশ্য, শ্রমঘাম সৃষ্ট দেশজ সংস্কৃতির মূলভিত্তির উৎসাদন এবং গণমানুষকে শেকড়হীন, আত্মপরিচয়হীন করে তোলা। এভাবে বিশ্বের সকল দেশের সংস্কৃতিকে গ্রাস করে শোষণ প্রক্রিয়াকে জোরদার করার লক্ষ্যে দেশজ সংস্কৃতির বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ ও রুদ্ধ করাই তার অন্বিষ্ট। বিশ্বায়নের এই আগ্রাসী ধারণাকে কার্যকর করার জন্যে কর্পোরেট পুঁজির মালিক ও তার দেশীয় প্রতিনিধিরা উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় গড়ে তুলেছে শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম। প্রচার মাধ্যমগুলোর মধ্যে টেলিভিশনের ভূমিকা ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি। টেলিভিশন এখন শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষেরও নিত্যসঙ্গী। ফলে বিশ্বায়নের সংস্কৃতির স্রোতে ভাসছে গ্রামাঞ্চলও। টেলিভিশনে প্রচারিত আকাশ সংস্কৃতি (ডিশ এ্যান্টেনার মাধ্যমে) সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক, চলচ্চিত্র প্রভৃতির বিষয়, কাহিনী, চিত্র ও চরিত্রকে এমন ভাবে ও ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়, যা বাস্তবসম্পর্ক বিরহিত, কল্পলোক বিহারী নিছক বিনোদনের উপকরণ। এছাড়া পর্ণপত্র, নীল ছবি, ভিডিও চিত্র, মাদকদ্রব্য ইত্যাদিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে সমাজের সর্বত্র। উদ্দেশ্য, একদিকে মানুষকে ভাববাদী আত্মচেতনাহীন, বাস্তববিমুখ করা; অন্য দিকে তাকে লোভী, ভোগবাদী মোহাচ্ছন্ন, বিকারগ্রস্ত ও আত্মকেন্দ্রিক করে তোলা। তাই জনগণ এখন জারি, সারি, ভাটিয়ালি ভুলে পপ, রক, ব্যান্ডসংগীতে মাতোয়ারা হয়। মোহাচ্ছন্ন বলেই বাজারে বিশেষ ব্রান্ডের শাড়ি, জামাসহ নানা পণ্য কেনার ধুম পড়ে যায়, বাবা-মা’র অপরাগতায় কিশোরী যুবতী আত্মহত্যা করে কিংবা দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে বিচ্ছেদের কালোছায়া। স্পাইডার ম্যান হতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুঘটে দুরন্ত কিশোরের। এসব প্রচার মাধ্যমের কারণেই অতিসাধারণ মানুষও এখন মনে করে, অর্থই সকল সার্থকতার মূল সুখ-শান্তির উৎস। ভোগবাদ ও অর্থলোভ তাকে করে তুলেছে স্বার্থপর ও নীতিনৈতিকতাহীন। কর্পোরেট পুঁজি নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রে প্রচারিত সংস্কৃতি তাই সুস্থ সংস্কৃতি নয়, শিল্প সংস্কৃতির নির্মোকে পণ্যের বিজ্ঞাপন। সমাজ ও জীবনের এই অবক্ষয় ও অপচয় রোধে মানুষকে বাস্তবমুখী ও বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভয়াবহতা চিহ্নিত ও চিত্রিত করে বাস্তবনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক কার্যক্রম গ্রহণ করা এবং সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে অব্যাহত সংগ্রাম করা একান্ত প্রয়োজন। বর্তমানে সাংস্কৃতিক আন্দোলন অনেকটাই শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বলয়ে সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে শ্রমজীবী গণমানুষের উপর তার প্রভাব খুব একটা পড়ছে না। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আন্দোলন সংগ্রামে সম্পৃক্ত না করে সমাজ পরবর্তন আশা করা যায় না। তাই মানুষের মুক্তি সংগ্রামে অঙ্গীকারাবদ্ধ প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠনগুলোর প্রয়োজন শহর থেকে গ্রামে, রাজপথ থেকে মেঠোপথ-আলপথে ছড়িয়ে পড়া এবং গণমানুষের ভাষায় গণমানুষের কথা তুলে ধরা। এক্ষেত্রে দেশে প্রচলিত ও ক্রমবিলীয়মান লোকঐতিহ্য ও লোক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে বিশাল সহায়ক হতে পারে। লোক সংস্কৃতি লোকমানুষ তথা গণমানুষেরই সৃষ্টি। এর মধ্যেই তার আত্মপরিচয় ও সত্তার শেকড় প্রোথিত। লোক সংস্কৃতির আয়নায় নিজেকে দেখে সে আত্মচেতনায় জেগে উঠবে নিঃসন্দেহে। চেতনাহীন, ঘুমন্ত মানুষ কখনো সমাজকে জাগাতে পারেনা, সাহসী কণ্ঠে বলতে পারে না নিজের অধিকারের কথা। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শোষণের কৌশল ও পদ্ধতিতেও পরিবর্তন ঘটেছ্ এমতাবস্থায় প্রয়োজন সমকালীন সমস্যা সঙ্কট ও তার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার উপযোগী সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক ইত্যাদি। লোক সংস্কৃতির বস্তুনিষ্ঠ জীবনমুখী ও প্রগতিশীল উপাদানকে আত্মস্থ করে লোকজ আঙ্গিক ও রীতিতে রচিত সঙ্গীত, নাটক, যাত্রা, পালাগান প্রভৃতি গণমানুষের সংগ্রামী চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে ও জাগিয়ে রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ একসূত্রে গাঁথা। এদেরকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পরাভূত করতে প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগ্রাম ও গণমুখী সাংস্কৃতিক সংগ্রামের বিকল্প নেই। তবে এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের গুরুত্বটা অধিক। বিশ্বায়ন কবলিত বিশ্বে মুক্তির সংগ্রাম মোটেই সরল ও একরৈখিক নয়, জটিল ও নানামাত্রিক। বর্তমান বৈশ্বিক ও দৈশিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে, সমাজের আমূল পরিবর্তন তথা শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্যে আবশ্যক সংগ্রাম, ঐক্যবদ্ধ গণ মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রাম। তবে তারও চেয়ে অধিক আবশ্যক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। সংস্কৃতিই গণমানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার মূল হাতিয়ার। কারণ সংস্কৃতির লক্ষ্য, ঐক্য, মুক্তিকামী গণমানুষের চেতনার ঐক্য। লেখক : অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক, সহ-সভাপতি, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..