রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ

রুশ বিপ্লব লালফৌজ ও কাজী নজরুল ইসলাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মুজাফ্ফর আহমদ : রুশ বিপ্লবের পঞ্চাশতম বার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘তরঙ্গ’ পত্রিকায় মুজাফ্ফর আহমদ-এর লেখা ‘রুশ বিপ্লব লালফৌজ ও কাজী নজরুল ইসলাম’ লেখাটি প্রকাশিত হয়। এ বছর রুশ বিপ্লবের শততম বার্ষিকী উপলক্ষে সাপ্তাহিক একতায় লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হল “ব্যথার দান” কাজী নজরুল ইসলামের একখানা বহু প্রশংসিত ও বহুল প্রচারিত গল্প পুস্তক। “ব্যথার দান” পড়ে আমরা তখন বুঝেছিলাম এবং এখনও বুঝতে পারছি যে রুশ বিপ্লব ও লাল ফৌজের প্রতি নজরুলের একটা আকর্ষণ জন্মেছিল। ফৌজ হতে ফেরার আগেই তার দু’টি গল্প আমরা ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ছেপেছিলেম। ১৩২৬ সালের মাঘ মাসে তো “ব্যথার দান” ছেপেছিলেনই, তার আগে কার্তিক মাসে (নভেম্বর, ১৯১৯) আমরা ছেপেছিলাম তার “হেনা” নামক গল্প। এ–দু’টি গল্পই সে ফৌজে থাকা অবস্থাতেই লিখেছিল, এবং লিখেছিল তার হাবিলদার হওয়ার পরে। ‘ব্যথার দান’ গল্প যাদের নিয়ে লেখা হয়েছে তারা বেলুচিস্তানের বাসিন্দা। নজরুলের মুখে শুনেছি যে কোন পলাতক সৈনিককে ধরার জন্য তাকে (হয়ত সঙ্গে অন্য সৈনিকও ছিল) একবার বেলুচিস্তানের গুলিস্তান, বুস্তান ও চমক প্রভৃতি এলাকায় যেতে হয়েছিল। তার গল্পে পেশোয়ারের নামও আছে। পেশোয়ারের নিকটবর্তী নৌশহরা নামক স্থানে তো নজরুলরা প্রথম সৈনিক শিক্ষাই লাভ করছিল। “ব্যথার দানের” দু’টি চরিত্র দারা ও সয়ফুলমুলক বেলুচিস্তান হতে আফগানিস্তানের সহজ এলাকা পার হয়ে তুর্কিস্তান কিংবা ককেসাসে গিয়ে লাল ফৌজে যোগ দিয়েছিল এবং বিপ্লব বিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়ছিল। “হেনা” ও “ব্যথার দান” এদু’টি গল্পই প্রেমের গল্প। কিন্তু এ দু’টি গল্পের ভিতর দিয়েই অদ্ভূত দেশ-প্রেম ফুটে উঠেছে। দু’টি গল্পেই আমরা লেখকের আন্তর্জাতিকতার পরিচয়ও পাই, তবে “ব্যথার দানে” বেশি। “ব্যথার দান” প্রেমের গল্পতো নিশ্চয়ই, কিন্তু তার ভিতর দিয়ে দেশ-প্রেম আর আন্তর্জাতিকতার প্রচারও আমরা দেখতে পাই। আমি সাহিত্য পত্রিকা হতে তুলে দিচ্ছি। নূরন্নবীর কথা গোলেস্তান ! গোলেস্তান ! জন্মভূমি !! আবার অনেকদিন পরে তোমার বুকে ফিরে এসেছি। কত ঠান্ডা তোমার কোল! কত সুন্দর তোমার ফুল। কত মিষ্টি তোমার ফল। কত শীতল তোমার জল। কত উদার তোমার আকাশ! কত স্নেহার্দ তোমার বাতাস! কত আদর মাখানো তোমার পরশ! আর কত করুণ তোমার ঐ যবুজ বুকের অবুঝ স্পন্দন। আমার মা নেই ব’লে কি মাতৃহারা আমি পথে পথে ঘুরে মরব?– তাইবা হবে না কেন? কে আমায় শাসন করবে? ওগো আমার কেউ যে নেই।.... আমার বেশ মনে পড়ছে জননীর সেই স্নেহ-বিজড়িত চুম্বন, আর অফুরন্ত অমূলক আশঙ্কা, আমার অনেকগুলি ভাই-বোন মারা যাবার পর আমার আগমন, আমার মা’র সেই ক্ষুধিত স্নেহের ব্যাকুল বেদনা;– সেই ঘুম পাড়ানোর সরল ছড়া– ঘুম পাড়ানোর মাসী-পিসী ঘুম দিয়ে যেও, বাটা ভরে’ পান দিব গাল ভরে খেয়ো!” আর আমার মনে পড়ছে, আমাদের মা ছেলের শত অকারণ আদর আবদার! সবই এত স্পষ্ট হয়ে আমার চোখে ভাসছে।... ওঃ! মা আজ কোথায়?– না, চিরটাদিনই আমার জন্যে এত ক্লেশ, এত যাতনা সইবার কিসের দায় ঠেকেছে মা’র? মা মরে খুব ভাল করেছেন! হ্যাঁ, কিন্তু মায়ের সেই অন্ধ স্নেহটাইত আমাকে আমার এই বড়-মা দেশটাকে চিনতে দেয়নি। বেহেশ্ত হতে তোমার আবদেরে ছেলের কান্না তুমি শুনতে পাচ্ছ কিনা জানিনে মা, কিন্তু এ আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি যে, তোমায় হারিয়েছি বলেই– তোমার স্নেহের মস্ত শিকলটা আপনা হতে ছিঁড়ে গিয়েছে বলেই আজ তোমার চেয়েও মহয়িসী জন্মভূমিকে চিনতে পেরেছি। তবে না, এও আমাকে স্বীকার করতে হবে,– তোমাকে আগে আমার প্রাণ-ভরা শ্রদ্ধা ভক্তি ভালবাসা অন্তরের অন্তর হতে দিয়েই তোমার চেয়েও বড় জন্মভূমিকে ভালবাসতে শিখেছি। তোমায় আমি ছোট করছিনে মা। ধরতে গেলে তুমিও বড়। ভালবাসতে শিখিয়েছ ত তুমিই। আমার প্রাণের স্নেহের সুরধুনী বইয়েছত তুমিই। আমাকে কাজে অকাজে এমন করে সাড়া দিতে শিখিখয়েছ যে তুমিই। তুমি পথ দেখিয়েছ, আর তাই আমি চলেছি সেই পথ ধরে। লোকে ভাবছে, কি খামখেয়ালী পাগল আমি! কি কাঁটাভরা ধ্বংসের পথে চলেছি আমি! কিন্তু মা আমাদের চলার খবর তুমি জান, আর আমি জানি, আর খোদা জানেন। ১৯১৯ সালে নজরুলের “ব্যথার দান’ গল্পে যে দেশপ্রেম ফুটে উঠেছিল তার জন্যে কলকাতার একটি প্রেস অন্ততঃ গল্পটি ছাপাতে রাজি হয়নি। শুধু দেশপ্রেম নয়, নজরুল ইসলামের এই গল্পের ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিকতা ফুটে উঠেছে। আমাদের সাহিত্যে একটা নূতন জিনিস বলতে হবে। এখন আমি “ব্যথার দানের” কাহিনী সম্বন্ধে কিছু বলি। ঘটনার স্থান বেলুচিস্তানের গুলিস্তান, বুস্তান ও চমন প্রভৃতি জায়গা। দুজন যুবক– দারা (নূরন্নবী) ও সয়ফুলমুলক এবং একজন যুবতী বেদৌরাকে নিয়ে এই প্রেমের গল্প রচিত হয়েছে। দারার মা মরবার সময়ে তাঁর একান্ত স্নেহের পাত্রী বেদৌরাকে দারার হাতে সঁপে দিয়ে যান এবং বলে যান যে দারা যেন কোন অবস্থাতেই বেদৌরাকে না ছাড়ে। তাদের দু’জন কিন্তু আগে হতেই একে অন্যকে গভীরভাবে ভালবাসত। এই অবস্থায় হঠাৎ একদিন কোথা হতে বেদৌরার এক ভণ্ড মামা এসে জোর করে বেদৌরাকে দারার নিকট হতে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। সেই থেকে দারা খুঁজতে লাগল বেদৌরাকে। কিছুদিন পর বেদৌরা তার ভণ্ড মামার জাল ছিঁড়ে পালিয়ে গেল। সেদিন থেকে সেও খুঁজতে লাগল দারাকে। এই সময় সায়ফুলমুলকের সঙ্গে বেদৌরার দেখা হল। সে নানান কথা রটিয়ে বেদৌরার মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে লাগল এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রলুব্ধ করতে লাগল বেদৌরাকে। এক দুর্বল মুহূর্তে বেদৌরা সয়ফুলমুলকের এই লোভের নিকটে ধরা দিল। তবে, অল্পদিনের ভিতরেই সয়ফুলমুলক বুঝতে পারল যে বেদৌরার হৃদয়ের সমস্ত স্থান জুড়ে বসে আছে দারা। সেখানে তিল পরিমাণও স্থান নেই সয়ফুলমুলকের জন্যে। তাতে সয়ফুলমুলকের অনুতাপের আর সীমা থাকল না। সে ক্ষমা চাইল বেদৌরার নিকটে, বলল কোনো মহান কাজে জীবন বলি দিয়ে সে তার অন্যায় কাজের প্রায়শ্চিত্ত করবে। এরপরে দারার সঙ্গে বেদৌরারও দেখা হয়ে গেল। সে সব কথা খুলে বলল দারাকে। যুক্তি দিয়ে বিচার করে দারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছল যে বেদৌরা নির্দোষ। কিন্তু সে তার মনের গহিনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল যে, হিংসা সেখানে বাসা বেঁধেছে। এতে তার রাগ হলো নিজের উপরে। সে তার মন হতে হিংসা ধুয়ে ফেলার জন্যে বেদৌরার নিকট হতে বিদায় নিয়ে চলে গেল। কিন্তু কোথায় গিয়ে সয়ফুলমুলক কোন মহান কাজে তার জীবন বলি দেবে? আর কোথায় গিয়েই বা দারা ধুয়ে ফেলবে তার মনের হিংসা? এখন সয়ফুলমুলকের মুখ হতেই কথাটা শোনা যাক। সে বলছে, “যা’ ভাবলুম, তা’ আর হ’ল কই? ঘুরতে ঘুরতে শেষে এই লালফৌজে যোগ দিলুম। এ পরদেশীকে তাদের দলে আসতে দেখে তারা খুব উৎফুল্ল হয়েছে। মনে করছে, এদের এই মহান নিঃস্বার্থ ইচ্ছা বিশ্বের অন্তরে অন্তরে শক্তি সঞ্চয় করছে। আমায় আদর ক’রে এদের দলে নিয়ে এরা বুঝিয়ে দিলে যে কত মহাপ্রাণতা আর পবিত্র নিঃস্বার্থপরতা প্রণোদিত হয়ে তারা উৎপীড়িত বিশ্ববাসীর পক্ষ নিয়ে অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, এবং আমিও সেই মহান ব্যক্তি সংঘের একজন।.... “কিন্তু সহসা একি দেখলুম? দারা কোথা হতে এখানে এলো? সেদিন তাকে অনেক ক’রে জিজ্ঞাসা করায় সে বললে, “এর চেয়ে ভালো কাজ আর দুনিয়ায় খুঁজে পেলুম না, তাই এ দলে এসেছি।” সয়ফুলমুলক ও দারা দু’জনেই যোগ দিল লালফৌজে। অথচ “ব্যথার দান” পুস্তকে আছে যে তারা মুক্তি সেবক সৈন্যদের দলে যোগ দিয়েছিল। এখানে আমার কিছু বলার আছে। নজরুল ইসলাম যখন “ব্যথার দান” গল্পটি আমাদের নিকটে পাঠিয়েছিল তখন তাতে এ দুজনের লালফৌজে যোগ দেওয়ার কথাই, অর্থাৎ আমি উপরে যে উদ্ধৃতি দিয়েছি ঠিক সেই রকমই ছিল। আমিই তা থেকে ‘লালফৌজ’ কেটে দিয়ে তার জায়গায় ‘মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল’ বসিয়ে দিয়েছিলাম। ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ ভারতে ‘লালফৌজ’ কথা উচ্চারণ করাও দোষের ছিল। সেই “লালফৌজে” ব্রিটিশ-ভারতের লোকেরা যে যোগ দেবে, তা যদি গল্পেও হয়, তা পুলিশের পক্ষে হজম করা মোটেই সহজ হতো না। রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবের পরে ভূতপূর্ব জার সাম্রাজ্যের ভিতরকার বিপ্লববিরোধীরা সৈন্যদল গঠন করে লড়াই শুরু করে। এই লড়াইয়ের পক্ষে অর্থ ও যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করতে থাকে জগতের ছোট বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি। এই শক্তিগুলির লোকবলও এই বিপ্লববিরোধী যুদ্ধে শামিল হয়েছিল। সকল দিক হতে বিপ্লবী রাশিয়া অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। বিপ্লবকে বাঁচাবার জন্যে রুশ দেশের ভিতরে মজুর শ্রেণীর পার্টি ও সোভিয়েত রাষ্ট্রের নেতৃত্বে জনগণ যে-সৈন্যদল গঠন করেছিল তার নাম দেওয়া হলো “লালফৌজ”। কিন্তু অক্টোবর বিপ্লব যেমন একা রুশ দেশেল মজুর কৃষকের বিপ্লব ছিল না, সমস্ত দুনিয়ার মজুর কৃষকেরা সে বিপ্লবকে আপন মনে করে নিয়েছিল, সেইরকম বিপ্লববিরোধী গৃহযুদ্ধেও লালফৌজ একা ছিল না। লালফৌজকে এই গৃহযুদ্ধে সাহায্য করতে এসেছিল সমস্ত জগতের মেহনতী মানুষেরা ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা। আমাদের ভারতবর্ষও পেছিয়ে ছিল না। এই সময়ে আমাদের দেশে ভারতে ব্রিটিশ গর্ভণমেন্ট লালের আতঙ্কে শঙ্কিত চারদিক হতে আট ঘাট এমনভাবে বেঁধে ফেলেছিল যেন অক্টোবর বিপ্লবের কোনো হাওয়াই এদেশে প্রবেশ করতে না পারে। ঠিক এমন সময়ে একজন ভারতীয় সৈনিকের লেখা গল্পের নায়েকরা যদি ‘লালফৌজে” যোগ দেয় তা হলে তার সৈনিক শৃংখলার দিক হতেও খুব ভালো হতো না। তাই আমি নজরুলকে জিজ্ঞাসা না করেও তার “লালফৌজ” কেটে দিয়েছিলেন। তার জায়গায় “মুক্তি সেবক সৈন্যদের দল” এইভেবে লিখে দিয়েছিলেম যে যাঁর যা খুশি তিনি তাই বুঝে নিবেন। কিন্তু এখন “ব্যথার দান” গল্পে মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল কথাটার জায়গায় নজরুলের গোড়ায় লেখা ‘লালফৌজ’ কথাটা বসিয়ে দেওয়া একান্ত কর্তব্য। একথা মনে রাখতে হবে যে, নজরুলের লেখা ‘ব্যথার দান’ আমার হাত দিয়েই ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ছাপা হয়েছিল। আমার পরিবর্তনে সে খুব খুশী হয়ে আমায় ধন্যবাদ জানিয়ে পত্র লিখেছিল। তারপরে, সে যখন কোলকাতার ছুটিতে এসেছিল তখনও শ্রী শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সম্মুখে আবারও সে আমায় ‘লালফৌজ’ কথার পরিবর্তনের জন্য ধন্যবাদ দিয়েছিল। এখন কথা হচ্ছে রুশ বিপ্লবের প্রতি এবং তার ফলে যে ‘লালফৌজ’ গঠিত হয়েছিল সেই ‘লালফৌজের’ প্রতি নজরুল ইসলামের কোন সহানুভূতি ছিল কিনা, না, শুধু কথায় কথায় তার গল্পে ‘লালফৌজ’ কথা এসে গিয়েছিল? আবার এমনও অনেক অবিশ্বাসী থাকতে পারেন যাঁরা বলেন লালফৌজের কোন উল্লেখই তো গল্পে নেই, তাই নিয়ে আবার আলোচনা কেন? আমি তাঁদের জিজ্ঞাসা করতে চাই যে, মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল’ ও ‘মহান ব্যক্তি সংঘ’ বলতে তাঁরা কি বুঝেছেন? আসল কথা হচ্ছে এই রুশ দেশের অক্টোবর বিপ্লব ও লালফৌজের লড়াই নজরুল ইসলামের মনে সাড়া জাগিয়েছিল। তাই সে ইচ্ছা করেই বেলুচিস্তানকে তার গল্পের ঘটনাস্থল করেছিল। কারণ, সে বেলুচিস্তান হতে অনেক সহজে সোভিয়েত দেশের সীমানা পৌঁছানো যায়। (চলবে)

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..