শিক্ষায় নয়া উদারনীতিবাদের আগ্রাসন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
লিটন নন্দী : নিওলিবারেলিজম এখন তত্ত্বের খোলস থেকে বের হয়ে আমাদের জন্য একটি বাস্তবতা। মিল্টন ফ্রিডম্যানদের এই নিওলিবারেলিজম সব কিছুকে পণ্য করে তোলে, বাদ রাখে না শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মত সাধারণ্যের অধিকারসমূহকেও। শিক্ষাকে অধিকার নয়, পণ্য হিসেবে দেখার এই প্রবণতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। থ্যাচারের শাসনামলে যুক্তরাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে অনুদান কমিয়ে আনা হয়, যা পর্যায়ক্রমে অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় টিউশন ফি-এর সূচনা করে। বিশ্ব ব্যাংক নব্বই দশকের শেষ দিকেই উচ্চশিক্ষা প্রসঙ্গে একাধিক দেশে সুপারিশ করেছে টিউশন ফি বর্ধিতকরণের, ছাত্রদেরকে ঋণ গ্রহণের দিকে ঠেলে দেয়ার আর সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গত সহস্রাব্দের শেষদিকে ১৯৯৫ সালের গ্যাটস চুক্তির মত একের পর এক চুক্তির মাধ্যমে এমন অনেক সেবা কর্মসূচিকে বাণিজ্যের আওতায় নিয়ে আসে, যা ছিলো আগে রাষ্ট্রের দায়িত্বধীন। এর ফলে শিক্ষা এখন পরিণত হয়েছে বিক্রয়যোগ্য পণ্যে, শিক্ষার খরচ কমানোর নাম করে ছেটে ফেলা হয়েছে পাঠাগার, বাড়ানো হয়েছে শ্রেণিকক্ষে ছাত্রসংখ্যা। এটা বাস্তবিকই আশঙ্কাজনক যে এরা আমাদের ব্যবহৃত শব্দ দিয়েই আমাদের ধ্বংসের অস্ত্রে শাণ দিচ্ছে। বিকেন্দ্রীকরণ বা স্বায়ত্বশাসনের কথা যেমন আমরা বারবার বলেছি, তেমনি তারাও বলেছে, কিন্তু তারা এইসব শব্দের আড়ালে চালিয়েছে নিজস্ব এজেন্ডা। যেমন, বিশ্ব-ব্যাংকের ১৯৯৪ সালের রিপোর্ট “হায়ার এডুকেশন : লেসনস অফ এক্সপেরিয়েন্স”-এ স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে সুপারিশ করা হয়েছে, কিন্তু এছাড়াও সেখানে উচ্চশিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে একটি ব্যক্তিগত পণ্য হিসেবে, যা ছাত্র-ভোক্তার দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তার বাজার পরিচালনার ক্ষমতার উৎকর্ষ ঘটাবে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল বা বাংলাদেশ, এই অঞ্চলের কোনো দেশই এইসব তৎপরতার থাবা থেকে মুক্ত নয়। আর তাই বিশ্ব-ব্যাংক ২০০১ সালে নেপালের ক্ষেত্রে প্রস্তাব করে প্রচুর পরিমাণে বেসরকারি স্কুল স্থাপনের, যার ফলশ্রুতিতে মুখ থুবড়ে পড়ে সরকারি স্কুলগুলো, আর সেই সাথে নিম্নবিত্ত জনগণের পড়াশোনার সুযোগটিও। পাকিস্তানে সামরিক শাসক জিয়াউল হকের সময় থেকে এখন পর্যন্ত ক্ষমতার বহুবার পালাবদল ঘটলেও বিশ্ব-ব্যাংকের বহুল চর্চিত ‘শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ’ ঘটা থামেনি। তাদের চার রকম মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান, মাদ্রাসাভিত্তিক, ইংরেজি মাধ্যম, ক্যাডেট শিক্ষা আর সরকারি খরচে ঊর্দু মাধ্যম, যে দৃশ্য আমাদের দেশের অনুরূপ। এইসব মাধ্যমের মধ্যে প্রথমটি আর শেষটির শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ আশঙ্কাজনক হারে কম, আবার অন্যদিকে, বাকী দুই মাধ্যম আবার সাধারণের নাগালের বাইরে। এর পাশাপাশি সেখানে চলছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি, বাজার ঘেঁষা শিক্ষায় অতিরিক্ত গুরুত্বদান প্রভৃতি। ১৯৯৫ সালে ভারতে পাস হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট, যার মাধ্যমে সেখানে উচ্চশিক্ষার পণ্যায়ন শুরু হয়ে যায়। ১৯৯৭-এ পাঁচ বছর সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয় ভারতের শিক্ষাখাতে সরকারি অনুদান ৯০ ভাগ থেকে কমিয়ে ২৫ ভাগে আনার জন্য। ২০০০ সালে ধনকুবের মুকেশ আম্বানির তত্ত্বাবধানে যে আম্বানি-বিড়লা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, তাতে বলা হয়েছিলো অনুদান শূণ্যের কোঠায় নিয়ে আসার কথা, এবং আরো বলা হয়েছিলো যে উচ্চশিক্ষায় কর্পোরেটরা বিনিয়োগ করতে পারলে উচ্চশিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০১৫ সালের মাঝে দ্বিগুণে উন্নীত হবে। এই রিপোর্টের প্রভাবে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষার পুনঃসজ্জার মাধ্যমে তাকে আরো বেশি বাজার-উপযোগী করে তোলার সুপারিশ করে, যা ব্যবসার দরজা খোলে আন্তর্জাতিক সংস্থাদের জন্য, আর শিক্ষার দরজা বন্ধ করে দেয় নিপীড়িতদের জন্য। ২০০৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের উচ্চশিক্ষার প্রায় পঞ্চাশ ভাগ অর্থের যোগান আসে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। এখন ভারতে ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’-এর নামে ক্রমাগত উচ্চশিক্ষায় সরকারি অর্থের যোগান কমানো হচ্ছে, আর শিক্ষার খরচ ছাত্রদের ঘাড়ে চাপানো চলছে। যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়ে ওঠা, অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল সমাজের উঁচুতলার মানুষকে শিক্ষাদান, বাজার-ঘনিষ্ঠ বিষয়ে স্নাতকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি, আর সেই সাথে বৃদ্ধি বেকারত্বের হারের - প্রকৃতপক্ষে এই অঞ্চলে রাষ্ট্র নির্বিশেষে নিওলিবারেল শিক্ষানীতির চেহারা ও ফলাফল একই। ভারতে তাদের আওড়ানো ফাঁকা সব আওয়াজ, যেমন রাষ্ট্রের আর্থিক সঙ্গতি নেই বলে বিনিয়োগকারীদের দিকেই তাকাতে হবে, বা শিক্ষার কাজ ব্যক্তিকে সচেতন করা নয়, বরং তাকে বাজার-উপযোগী করা, এসব সমানভাবে গেয়ে যাওয়া হচ্ছে আমাদের দেশেও। বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে নিওলিবারেলদের আগ্রাসনের শুরু আশির দশকের প্রথমভাগে, আর বিস্তার এরশাদের পতনের পরপর। ১৯৯২ সালে এদেশে পাস হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট। নীতি নির্ধারণ পুনরায় করা হয় ২০১০ সালের অ্যাক্টে, অথচ এর মাঝে চলে গেছে আঠারোটি বছর, তৈরি হয়েছে অর্ধশত বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণের পদ্ধতি ধার্য করা হয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্রের অনুরূপ, যার পেছনে কাজ করে থাকতে পারে বর্তমান বিশ্বের বাজারের সাথে প্রতিযোগিতা। এই পদ্ধতি সংক্রান্ত কোনো বক্তব্যই ছিলো না ১৯৯২ এর অ্যাক্টে। পরবর্তীতে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এদের সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতি গ্রহণ করে। বাজার উপযোগী শিক্ষায় জোর দেয়াও শুরু হয় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের তোড়জোড়ের ফলে, যার প্রথমদিকের নিদর্শন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউটে ১৯৮৫ সালে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন, আর যার সাম্প্রতিকতম অবতার হেকেপ। এই হেকেপ বা হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রামকে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর সাথে একটি জনসেবামূলক কার্যক্রম বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। এই প্রোগ্রামের আওতায় গত দেড় বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগসমূহ আবেদনের ভিত্তিতে এবং কিছু শর্তের অধীনে বিশ্ব ব্যাঙ্ক থেকে অর্থ সাহায্য পাচ্ছে, যেসব শর্তের মাঝে রয়েছে গবেষণার বিষয়বস্তু হেকেপ কমিটি তথা বিশ্ব ব্যাংক দ্বারা নির্ধারিত হওয়া প্রভৃতি। প্রকৃতপক্ষে এই কার্যক্রমের আওতায় যে বিপুল অঙ্কের অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে, তা অনুদান নয়, বরং লগ্নীকৃত ঋণ। বিভিন্ন নামে একই ধাঁচের কার্যক্রম বিশ্ব-ব্যাংক চালাচ্ছে লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে, পাকিস্তানে, থাইল্যান্ড, নেপালে, আর ভারতে। হেকেপ কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়া হয় সরকারের আর্থিক অপারগতার কথা বলে। আসলেই কি সরকার অপারগ কিনা সেই প্রশ্ন করার অধিকারও বিরাজনীতিকরণের ফলে শিক্ষার্থীদের হাত থেকে সরে যাচ্ছে। নিওলিবারেল চিন্তাধারাই বিরাজনীতিকরণের জন্য দায়ী। ১৯৯২-তেই এদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদগুলো ছিলো, সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়, এবং তারপর আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে, অর্থাৎ এদেশের ইতিহাসের একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও কোনোদিন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ থাকার সুবিধা ভোগ করতে পারেন নাই, কারণ ঐ একই ’৯২ সালে এদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা। ক্রমাগত দোষারোপ করা হয়েছে ছাত্র রাজনীতিকে - শুধু দোষারোপ নয়, এ কথাও বলা হয়েছে যে ছাত্র রাজনীতি তার উপযোগিতা বহু আগে হারিয়ে ফেলেছে, ছাত্র রাজনীতির একমাত্র উপযোগিতা ছিলো দেশের স্বাধীনতা আনয়নে। অথচ ছাত্র রাজনীতি যে দেশের রাজনীতির ছায়ামাত্র নয়, ছাত্র দলগুলো যে কেবল বড় দলগুলোর ছত্রচ্ছায়ায় বড় হওয়া দল নয়, ছাত্র রাজনীতি যে শিক্ষার্থীদের কথা বলবার জায়গা, তাদের চাহিদার বিষয়ে কথা বলবার জায়গা, এ কথা বেমালুম চেপে যাওয়া হয়েছে। ফলে আমরা দুই দশক ধরে রাজনীতিবিমুখ শিক্ষিত সম্প্রদায় গড়ে উঠতে দেখেছি, যাদের বিশ্বাস নিয়ম ভেঙে নয়, নিয়মে একীভূত হয়েই যতদূর সম্ভব পরিবর্তন আমতে হবে। অন্যদিকে মিডিয়ায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে ফলাওভাবে দেখানো হয়েছে রণক্ষেত্র হিসেবে, যার ফলে এদেশের মানুষের মনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ে বিরাগের সৃষ্টি হয়েছে, তাদের কাছে সেই রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সস্তা শিক্ষার অনুষঙ্গ। এতে করে শিক্ষা যে প্রকৃতপক্ষে বাজারে কেনবার সামগ্রী নয়, এ সত্য চাপা পড়ে গেছে, মধ্যবিত্ত সমাজ ভাবতে শিখেছে, পড়াশোনার বিনিময় মূল্য হয় পয়সা নয় জীবনের ঝুঁকি। ইউজিসির ২০০৬-এর বিশ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র সুপারিশ করেছিলো যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেনো অনুদান নব্বই ভাগ থেকে সত্তরে কমিয়ে আনা হয়, যা বাস্তবিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়া থেকেই রুখে দেয়ার নামান্তর। ঐ বিশ ভাগ বাড়তি অর্থের যোগানের কথা বলেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চড়া মূল্যের সান্ধ্যকালীন কোর্সের আর ফি বর্ধিতকরণের শুরু। কৌশলপত্রটি বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতন এবং শিক্ষার্থীদের ফি নির্ধারণ করতে ইউজিসির অনুমতির প্রয়োজন, কিন্তু ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সেই ক্ষমতা খর্ব করা হয়, বলা হয়, এসব ক্ষেত্রে ইউজিসির অনুমতির প্রয়োজন নাই, কুধু জানানোই যথেষ্ট। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বারবার এইসব সান্ধ্যকালীন কোর্স আর বর্ধিত ফি-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। ঢাবিতে ২০০৬ থেকে বর্তমান পর্যন্ত সিএসই, সাংবাদিকতা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রভৃতি বিভাগে আন্দোলনের মুখে সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিল করা হলেও পরবর্তীতে ঐসব কোর্স চালু করা হয়েছে পুনরায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ফি বাড়ানোর এবং সান্ধ্যকালীন কোর্সের প্রতিবাদে ২০১৪ সালের দুই ফেব্রুয়ারি ক্লাস বয়কট করে রাস্তায় নেমে এলে তাদের উপর চড়াও হয় পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন। শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয় সেইদিন, এছাড়াও তাদের উপর ছোড়া হয় বোমা ও গুলি। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে আগের ফি পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। ২০১০ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলে ঘটে একাধিক বহিষ্কার, ২৪১ গ্রেফতার এবং উপর্যুপরি লাঠিপেটার ঘটনা। আন্দোলন জারি থাকলে কর্তৃপক্ষ এখানেও বর্ধিত ফি কর্তন করতে বাধ্য হয়। ২০১০ সালে ও ২০১৫ সালে টিউশন ফিতে কর আরোপের বিরুদ্ধে দুই দফা সফলতার সাথে আন্দোলন করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালে নতুন আইন প্রণয়নের পরপর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন জমা পড়ে ৫৬টি। এই সব আবেদনকারীদের মাঝে ছিলো রাজনীতিবিদ, কোচিং ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মকর্তা, কিন্তু ছিলেন না কোনো শিক্ষক বা শিক্ষাবিদ। অনেক আবেদনকারীই আবার খুলতে চেয়েছিলেন একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়। পরবর্তীতে, ২০১৬-র ফেব্রুয়ারির ভেতরে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা ৫১ থেকে বেড়ে ৮০-তে উন্নীত হয়। এই নতুন অনুমতিপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি বড় অংশই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের অধীনেই অনুমতি পাওয়ার যোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারি অনুদান কমিয়ে দেয়ার হুমকির চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে, এই বক্তব্যের ভেতর, যা পাওয়া যায় ২০০৫ সালের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইনে। বলা হয়েছিলো যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যয় নির্বাহের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ফি নিতে পারবে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা লাগাতার আন্দোলন করায় এই সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়। কিন্তু সেই হুমকির রেশ কাটেনি, আর তার প্রমাণস্বরূপ কয়েকদিন আগেই আমাদের অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিত এনজিওদের সাথে আলোচনায় বলেছেন, সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজসহ স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি পাঁচ গুণ বৃদ্ধি করা হবে। বাদ দেয়া যায় না বাজারমুখী বিষয় নির্ধারণের কথাও। দেশের মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, অথচ দেশের পয়ত্রিশটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে পনেরোটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রযুক্তিগত শিক্ষা বা প্রকৌশলবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য সৃষ্ট। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি যেই বিষয়টির আসন তৈরি করা হয়েছে সেটি ব্যবসায় প্রশাসন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন খোলা বিভাগসমূহের নামগুলো যদি আমরা লক্ষ্য করি, তাহলে দেখতে পাবো অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপের মত কিছু শব্দজট, যা খুলবার পেছনে আবারও দাবি করা হবে, বাজারের চাহিদা। কিন্তু বাজারের চাহিদাটা আসলে কী? বাজারে প্রকৃতপক্ষে এসব বিষয়ের চাহিদা কতটুকু, তার কোনো মানসম্মত পরিসংখ্যান আমাদের হাতে আসে না। আমাদেরকে শুধু বলা হয়, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এইসব বিষয়ের অনেক গুরুত্ব রয়েছে। অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক প্রচুর শিক্ষার্থী এখন বেকার, এবং আরো ভয়াবহ এই যে এদের মাঝে যারা চাকরিতে রয়েছেন, তাদের ভাষ্যমতে, পেশাগত জীবনের সাথে তাদের অর্জিত শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। আবার, যেসব বিষয়কে যুগোপযোগী মনে করা হচ্ছে না, সেসব বিষয়ে অনুদান কমিয়ে দেয়ার মাধ্যমে বিভাগগুলোকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। যেমন, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাবির মনোবিজ্ঞান বিভাগে তত্ত্বীয় মনোবিজ্ঞানের উপর মাস্টার্স কোর্স অপসারণ করা হয়েছে, এবং সেই জায়গায় যুক্ত করা হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাইকোলজি ও স্কুল সাইকোলজি, যেগুলো মূলত ফলিত মনোবিজ্ঞানের শাখাবিশেষ। শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধকরণ হতে পারে এসব তৎপরতা প্রতিহত করার প্রথম উপায়। সমাধানের পথ আছে আমাদের নতুন করে নিওলিবারেলিজমকে ব্যাখ্যা করায়ও। আমাদের ছাত্রদের সাথে সংযোগের মাধ্যমের উপর এবং ভাষার ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে, জোর দিতে হবে গবেষণায়। দক্ষিণ এশিয়ায় নিওলিবারেলিজম ও শিক্ষা নিয়ে এই আলোচনা কোনো ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস নয়, এটি কেবলই অন্ধকার সময়ের গল্প নয়, এটি ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই করার গল্পও, কেনো না গত ত্রিশ বছরে এই অঞ্চলে যেমন শিক্ষার উপর নিওলিবারেলরা লাগাতার আক্রমণ চালিয়ে গিয়েছে, তেমনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করারোপের বিরুদ্ধে, বা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি বাড়ানোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আমরা জয়ও লাভ করেছি বারবার। সেই জয় সীমিত হতে পারে, কিন্তু সেই জয় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেই জয় সাক্ষ্য দেয় যে এইসব এজেন্ডার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ফল আনয়ন এখনো সম্ভব। সহযোগিতায় : মিম আরাফাত মানব, নিসর্গ নিলয়

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..