অশনি সংকেত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাংলা নববর্ষের ঠিক প্রাক্কালে কয়েকটি ঘটনা পর পর ঘটে গেল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর শেষ করে ফিরেছেন। গণমাধ্যম ও মানুষ শেখ হাসিনার এই সফর নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা, দেনা-পাওনার হিসেব কষছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রধানমন্ত্রী গণভবনে হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য ইসলামী সংগঠনের আলেমদের সঙ্গে বসেন। সেখানে তিনি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রির স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেন। পরে তা নিয়ে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়। হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা গোটা জাতিকে উদ্বিগ্ন করেছে। কারণ, কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তার রাষ্ট্রীয় আদর্শের পরিপন্থী হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানে অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার কথাই বলা হয়েছে। ফলে কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন না করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ। এই আপসকামীতা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দিবে বলে দলের একাংশের নেতারা মনে করলেও, বাংলাদেশের জন্য তা বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনবে। পশ্চাৎপদ একটি ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন না করে মূলধারার সঙ্গে মিলিয়ে দিলেই সেটি বিজ্ঞানভিক্তিক হয়ে যায় না। বোঝাই যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠের ফায়দা লুটার জন্যই এই কৌশল নিয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদকও নানাভাবে সেটিকে জায়েজ করার চেষ্টা করেছেন। এটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের রাজনীতির জন্য একটি অশনি সংকেত। সেই একই আসরে হেফাজতের নেতারা সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে যে ‘লেডি জাস্টিস’ এর ভাস্কর্য বসানো হয়েছে, সেটি অপসারণের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করেন। এখানে এই ভাস্কর্যটি স্থাপনের পর থেকেই হেফাজতে ইসলাম তা অপসারণের জন্য নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। তাদের ভাষায় এটি ‘মূর্তি’। এই ‘মূতি’ অপসারণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তাদের কথায় সায় দিয়েছেন। তিনি শুধু সায় দেননি, তিনি একই ভাষায় বলেছেন, ‘আমি নিজেও এটা পছন্দ করিনি। বলা হচ্ছে, এটা নাকি গ্রিক মূর্তি। আমাদের এখানে গ্রিক মূর্তি আসবে কেন? আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটা এখানে থাকা উচিৎ না। এটা কেন করা হল? কারা করল? কীভাবে, জানি না। গ্রিকদের পোশাক ছিল এক রকম। এখানে আবার দেখি শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। এটাও হাস্যকর হয়েছে।’ অথচ এই ধরনের ভাস্কর্য পৃথিবীর অনেক দেশ, এমনকি ইসলামিক দেশেও রয়েছে। তাদের দেশের আলেমরা এসব ভাস্কর্য সরানোর দাবি তুলেছেন বলে কখনো শোনা যায়নি। তবু একে ‘মূর্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অপসারণের জন্য নানা ফন্দিফিকির করা হচ্ছে। দেশের অনেক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মানুষ এই ধরনের ঘটনাকে দীর্ঘসময় ধরে বাঙালির যে লালিত চেতনা তার উপর একটি আঘাত বলে মনে করছেন। শিল্পকলার প্রতি উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরূপ মনোভাব আজ নতুন নয়। এর আগেও এই মৌলবাদীরাই বিমানবন্দরের সামনের লালন ভাস্কর্য হতে দেয়নি। তারা তখন মতিঝিলের বলাকা ভাস্কর্যে হামলা করেছে। সেসময় বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক লিখেছিলেন, ‘কঠিন ইসলামিক দেশের একটির নাম লিবিয়া। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলিতে বিশাল একটা মসজিদ আছে। মসজিদের সামনেই গ্রিকদের তৈরি একটি মূর্তি স্বমহিমায় শোভা পাচ্ছে। সেখানকার মাদ্রাসার ছাত্ররা মূর্তিটা ভেঙে ফেলেনি। ...আফগানিস্তানের তালেবানরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মূর্তি (যা ছিল বিশ্ব-ঐতিহ্যের অংশ) ভেঙে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। আমরা ভাঙছি সাঁইজির মূর্তি...’। নয় বছর পর আবার আমরা একই ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি। কেন হচ্ছি? নাকি আমাদের সেই অস্থিরতার সামনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। নতুন বছরের শুরুতেই নতুন এই মেরুকরণ বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য নিশ্চয়ই কোনো ভাল বিষয় নয়। এটা একটা অশনি সংকেত। এই ঘটনাগুলো কোনো একদিনের নয়। বরং এটি ধারাবাহিক মৌলবাদ-তোষণনীতির অনিবার্য ফল। মনে করা ভুল হবে যে, মৌলবাদীরা এখানেই থেমে যাবে। রাজনৈতিক দলের আস্কারা ও উস্কানি পেয়ে বরং তারা আরো নতুন নতুন দাবি নিয়ে মাঠে নামবে। যেমন এখন তারা নানাভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা বাতিল করার জন্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নববর্ষের আঁকা আলপনা নষ্ট করে দিয়েছে মৌলবাদীরা। যদিও পরে আবার তা আঁকা হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের বহুসংস্কৃতির, বহুবৈচিত্র্যের উপর আঘাত। একে এখনি প্রতিরোধ করা না গেলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ এক ভয়ানক রূপ ধারণ করবে। তাই এই মৌলবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সংগ্রাম গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এটাই হোক, এই নববর্ষের অঙ্গীকার।
সম্পাদকীয়
ঘুষ-দুর্নীতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..