ইরানে হামলার জন্য পটভূমি তৈরিতে মাঠে নেমেছে ট্রাম্প প্রশাসন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হাসান তারিক চৌধুরী : বেশ কিছুদিন ধীর গতিতে চলার পর আবারো মার্কিন প্রশাসন ইরান সম্পর্কে তৎপর হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এবারের মিশন হলো, ইরানে হামলার জন্য একটা পটভূমি তৈরি করা। এজন্য বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বেশ জোরের সাথেই মাঠে নেমেছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্স এপ্রিল মাসের প্রথম দিনেই এখবর দুনিয়াবাসীকে জানিয়ে দিয়েছে। রয়টার্সের ভাষ্যমতে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ইরানের ব্যাপারে আগের চেয়ে কঠোর নীতি নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনের সেনা কম্যান্ডার জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেছেন, ‘ইরান বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী হুমকি’। মার্কিন কংগ্রেসের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির প্রধানের সামনে আয়োজিত এক শুনানীতে সম্প্রতি তিনি এ মন্তব্য করেন। জেনারেল ভোটেল অবিলম্বে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার জন্য মার্কিন সরকারের প্রতি পরামর্শ দেন। মার্কিনের এ উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক অনুমোদিত ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কিত সমঝোতাকেও চ্যালেঞ্জ করেন। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, চীন, ফ্রান্স এবং জার্মানী তখন এ পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কিত সমঝোতাকে মেনে নিয়েছিলো। যেমনি ভাবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কিত সমঝোতাকে মার্কিন প্রশাসন চ্যালেঞ্জ করেছে। ঠিক একইভাবে আজ ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কিত সমঝোতাকেও এখন মার্কিন প্রশাসন চ্যালেঞ্জ করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদির সঙ্গে এ সভায় জেনারেল ভোটেলের কথার প্রতিধ্বনি করেন। এভাবে পূর্বেকার প্রতিশ্রুতি থেকে প্রত্যাবর্তন আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও আইনের সম্পূর্ণ বিরোধী। মার্কিন এর বর্তমান রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার এখন সে বেআইনি কাজই অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে শুরু করেছে। যার ফলে, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ নতুন করে এক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সংকটের মধ্যে পতিত হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে আজ শুধু ইরানই নয়, পুরো এশিয়া এবং বিশ্ব জ্বালানি তেল বাজার এক সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। ট্রাম্পের এ অবস্থানের কারণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এশীয় মিত্ররাও এখন ইরানের বিরুদ্ধে হিংস্র হয়ে উঠেছে। যার মাশুল দিতে হচ্ছে এ অঞ্চলের সাধারণ জনগণকে। মার্কিনের এসময়ের তীব্র ইরান বিরোধী অবস্থানের কারণে ভারতের বর্তমান উগ্র সাম্প্রদায়িক বিজেপির সরকার ইরান থেকে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে তেল আমদানি বহুগুণে কমিয়ে দেবার সিদ্ধান্তের কথা ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছে। যদিও গত ৫ এপ্রিল লন্ডনে ইরানের তেলমন্ত্রী বলেছেন, ভারতের এ সিদ্ধান্তে তেহরানের বড় কোনো সমস্যা হবে না। তারপরও একথা সত্য যে, ভারতের মতো এতো বড় ক্রেতা যে কোনো বিক্রেতার কাছেই অনেক মূল্যবান। ফলে এক্ষেত্রে ইরানকে যে বিরাট চাপের মধ্যে পড়তে হবে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানকে এ কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এ কথা সবাই জানে যে, বিশ্ব বাজারে ইরান এখন নানা কারণে অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে অশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি করছে। অপরদিকে, ভারতের রয়েছে অনেক বড় বড় তেল শোধনাগার। ফলে অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে অশোধিত জ্বালানি তেল ক্রয় করে তা শোধন করে বেশ লাভের মুখই দেখছিলো ভারত। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির সরকার এখন তার আন্তর্জাতিক প্রভুকে খুশি করতে গিয়ে অপেক্ষাকৃত বেশিমূল্যে অশোধিত জ্বালানি তেল ক্রয় করতে যাচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভারতের করদাতা জনগণ। এভাবেই সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী রাজনীতি অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলে। আজকের ভারত তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজ অত্যন্ত হাস্যকর যে যুক্তির মাধ্যমে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে চাইছে। এর চেয়ে বড় ভণ্ডামী আর কিছু হতে পারে না। মার্কিন প্রশাসন আজ ইরানকে বিশ্বের স্থিতিশীলতা এবং শান্তির জন্য বিরাট হুমকি বলে প্রচার করছে। অথচ, ইরাক এবং আফগানিস্তানে ব্যাপক গণহত্যা চালানোর মধ্যদিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজেই প্রমাণ করেছে যে, বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তাদের চেয়ে বড় হুমকি আর কেউ নেই। আজ যে সুন্নি জঙ্গি আইএস সারা পৃথিবীতে ভয়ানক ত্রাসের জন্ম দিয়েছে। তার দায়ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এড়াতে পারে না। সেজন্য ইরানকে সন্ত্রাসবাদের রপ্তানিকারক বলে দেয়া মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস এর অভিযোগের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম ঘাসেম সম্প্রতি বলেছেন, ‘সৌদি রাজতন্ত্রের মদদপুষ্ট ওহাবীতন্ত্রই হলো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বড় শেকড়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখন উচিত সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে তার মিত্র সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেয়া। যাতে করে তারা সুন্নি জঙ্গি সন্ত্রাসবাদকে মদদ দিতে না পারে। অযথা ইরানকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই’। অবশ্য ইরানী কর্তৃপক্ষের এ পরামর্শের উত্তরে মার্কিন সরকার কি বলেছে? তা এখনো জানা যায় নি। তবে জঙ্গি আইএস দমনে ইরান রাশিয়ার সাথে তার সহযোগিতার মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ২৭ মার্চ মস্কো সফরকালে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ বলেছেন, ‘এখন থেকে রুশ সেনারা সিরিয়ার জঙ্গি দমনে ইরানের সেনা ঘাঁটিগুলো ক্ষেত্র বিশেষে ব্যাবহার করতে পারবে’। রাশিয়ার সাথে ইরানের এ সহযোগিতামূলক সম্পর্কে এখন আরো হিংস্র হয়ে উঠেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..