ট্রাম্পের সিরিয়া হামলা

সাম্রাজ্যবাদী দূরভিসন্ধি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : সারা পৃথিবীর অজস্র মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়ে সিরিয়ার ইদলিবে হয়ে গেলো সারিন গ্যাস আক্রমণ। চার লক্ষ মৃত্যু আর সিরিয়ার অর্ধেক মানুষকে ঘরছাড়া করা এই গৃহযুদ্ধের নিহতের তালিকায় যুক্ত হলো আরো অনেকগুলো নাম, মৃত শিশুদের ছবিতে ছেয়ে গেলো বিশ্ব। আর এই সুযোগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৬ এপ্রিল রাতে সিরিয়ার বিমান ঘাঁটিতে সামরিক হামলার নির্দেশ দেন এই বলে যে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কেমিকেল অস্ত্রের প্রসার ও ব্যবহার রুখে দিতে হবে, আর তাই এই আক্রমণ’। এই ইদলিব আক্রমণে আসাদ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা আমাদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়, আর তাই ট্রাম্পের এই তড়িৎ আক্রমণ স্বভাবতই সন্দেহের উদ্রেক করে। তার প্রশাসন একই সময়ে আইএসের সাথে যুদ্ধের নামে ইরাকে একাধিক বোমা হামলায় জড়িত, যার ফলে ইরাকের মসুলে কয়েকদিন আগে শতাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সাম্রাজ্যবাদ সৌদী আরবকে সহায়তা দিচ্ছে হুতি বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধে, যা ইয়েমেনকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি আর সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি করে দিয়েছে। ট্রাম্পের সিরিয়া আক্রমণ এবার ঘটলো যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী প্রবেশ ঠেকাতে তিনি কাজ শুরু করার সাথে সাথেই। আমাদের মনে রাখা জরুরি যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির লাগাতার উপস্থিতিই ২০০৩ এর ইরাক যুদ্ধ, ’৯০-এর পারস্য উপকূল যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরাক-সিরিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের আরো অজস্র দুর্গতির জন্য দায়ী। ২০১১-তে আসাদ প্রশাসনের বিরুদ্ধে যে গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিলো, সেই কথিত ‘আরব-বসন্ত’ দ্রুত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয় বৈদেশিক শক্তির ক্রমাগত ইন্ধন আর সংশ্লিষ্টতায়। সেই গণ-আন্দোলনই কালক্রমে আজকের গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। এক পক্ষে সৌদী প্রশাসন, তুরস্ক আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আসাদ-বিরোধী বিভিন্ন শক্তিকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে, আর অন্যপক্ষে ইরান ও রাশিয়া আসাদের স্বৈরতন্ত্রকেই প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছে। যেমন, ইদলিব আক্রমণের পরেই পুতিন মন্তব্য করেছেন যে আসাদকে দোষারোপ করতেই এই কেমিকেল হামলা। প্রকৃত অর্থে, গোটা বিশ্বের বড় বড় শক্তিরা সিরিয়াকে ঘিরে যেনো ভিয়েতনাম যুদ্ধের মত আরেকটি প্রক্সি যুদ্ধের ছক কাটছে, এই অবস্থায়, ট্রাম্পের বিমান-ঘাঁটি হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনের অবস্থানের অংশ হিসেবে দেখা সম্ভব, কিন্তু একে দেখা সম্ভব সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া হিসেবেও, যেই জড়িয়ে পড়া, বলা বাহুল্য নিপীড়িত মানুষের কোনো কাজেই আসবে না। এই ঘটনাকে রাশিয়ার প্রতি ছুড়ে দেয়া আক্রমণ হিসেবেও দেখা যায়, কারণ এই মুহূর্তে পুতিনের রাশিয়া আসাদকে সামরিক সব রকম সহায়তা দিচ্ছে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রিপাবলিক ও ডেমোক্রেট উভয় পক্ষেরই গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। ডেমোক্রেট দল থেকে নির্বাচিত সিনেটর চাক শুমার একে চিহ্নিত করেছেন ‘উচিত কাজ’ বলে। গত নির্বাচনের ডেমোক্রেট দলীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারী ক্লিনটন বলেছেন, তিনি সিরিয়ার বিমান ঘাঁটি সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেয়ার পক্ষপাতী। এসবই প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সুবিধাভোগী উপরতলার মানুষেরা সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে কখনো পিছপা হবে না, তাদের মুখপাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত্র একজন ব্যক্তি হলেও। সিরিয়ার জনগণ নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, তারা বরং ট্রাম্প তার নির্বাচনকালীন বক্তব্য থেকে সরে এসেছেন এই নিয়েই খুশি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ট্রাম্পই বলেছিলেন যে ক্ষমতায় গেলে তিনি আইএস ইস্যু ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন তৎপরতা কমিয়ে আনবেন, কারণ তার কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে আলাদা করে রাখাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এই প্রতিশ্রুতিটিও তিনি অপরাপর প্রতিশ্রুতির মত দ্রুত ভেঙে ফেলছেন। তিনি যদিও দাবি করেছেন যে ইদলিবে মারা যাওয়া শিশুদের ছবিই তাকে আক্রমণের নির্দেশ দিতে বাধ্য করেছে, কিন্তু আমরা জানি যে তাঁর এই আক্রমণের উদ্দেশ্য প্রকৃতপক্ষে নিজের দেশে তার ক্রমহ্রাসমান জনপ্রিয়তা থেকে মানুষের চোখ সরিয়ে নেয়া। জনগণের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মুসলিম নিষিদ্ধকরণ থেকে পিছু হটতে বাধ্য হওয়ার পর এখন পুলিশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদ আর ট্রাম্পকেয়ার বাতিলের ঘটনায় মার্কিন মিডিয়া এখন সরগরম। সিনেট যদিও বা ট্রাম্প মনোনীত গোরসাচকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দিতে সমর্থ হয়েছে, রিপাবলিকান দলটি বিভিন্ন বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হওয়ায় আর গণরোষের ফলে ট্রাম্পের এজেন্ডার অনেক অংশই বাস্তবায়নের মুখ দেখছে না। এসব ব্যর্থতা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়া হতে পারে ট্রাম্পের সিরিয়া আক্রমণের একটি বড় কারণ। ট্রাম্প এই সুযোগে রাশিয়ার প্রতি তার অনমনীয়তাও প্রকাশ করে থাকতে পারেন, বিশেষ করে গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে যখন কংস্রসে থেকে এখনো অনুসন্ধান চলছে, আর ট্রাম্প-পুতিন দহরম মহরম নিয়ে গুঞ্জন যেখানে হরহামেশাই শোনা যায়। বিতর্কিত সব বক্তব্য দেয়া ব্যাননকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে সরিয়ে দেয়া আর জেনারেলদেরকে মধ্যপ্রাচ্যে লাগামছাড়া আক্রমণের সুযোগ করে দেয়া তার রাশিয়া বিরোধিতার অংশ বলেই মনে হয়। ধনতন্ত্র আর সাম্রাজ্যবাদ সিরিয়ার জনগণের চারদিকে এক খানা খন্দের আয়োজন করেছে। মধ্যপ্রাচ্য-যুক্তরাষ্ট্র নির্বিশেষে গোটা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণি আর তরুণ সমাজকে এখন যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, এবং তা করতে হবে এখনই। (সোস্যালিস্ট ওয়ার্ল্ড ডট নেটে প্রকাশিত টম ক্রেনের ‘হোয়াই ডিড ওয়াশিংটন ওর্ডার এয়ার স্ট্রাইকস অন সিরিয়া’ অবলম্বনে মিম আরাফাত মানব)

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..