পাঠ্যপুস্তক হেফাজতিকরণের প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক : পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল লেখকদের লেখা বাদ দেয়া এবং সাম্প্রদায়িকীকরণ এ দেশকে পরিকল্পিতভাবে হেফাজতিকরণের ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক, ছাত্র, যুব নেতৃত্ব ও সংস্কৃতি কর্মীরা। পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল লেখকদের লেখা বাদ দেয়া এবং সাম্প্রদায়িকীকরণ প্রতিরোধে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এ অভিযোগ করেন। গত ৮ এপ্রিল শনিবার বিকাল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ড. সফিউদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সংস্কৃতি কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে শিক্ষাবিদ ড. অজয় রায় বলেন, এ পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মন থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ সংবিধান মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র। প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত ছাড়া এ পরিবর্তন সম্ভব না বলে মন্তব্য করেন তিনি। আলোচনায় অংশ নেয়া রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সিপিবি’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশের শিক্ষাখাতকে হেফাজতিকরণ সার্বিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। আর এ জন্য আন্দোলন সংগ্রাম ছাড়া কোনো উপায় নেই। বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, এটি সামান্য কোনো বিকৃতি নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। এ পরিবর্তন অগ্রহণযোগ্য, সরকারের অনাকাক্সিক্ষত আত্মসমর্পণ মন্তব্য করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, এর বিরুদ্ধে ছাত্র ও শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. এবিএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ধীরে ধীরে অতল গহ্বরে নেমে যাচ্ছে দেশ। পাঠ্যপুস্তককে সাম্প্রদায়িকীকরণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলো কিছু বলেনি মন্তব্য করে তিনি এ পরিবর্তনের তীব্র প্রতিবাদ ও ঘৃণা জানান। সংস্কৃতি কর্মী রাফিউর রাব্বির মতে এগুলোকে ভুল বলে বৈধতা দেয়া ঠিক হবে না। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ভুল অযোগ্য লোকদের জন্য হয়। তিনি বলেন, এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ দরকার। আলোচনায় অংশ নেন ছাত্র নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী অভিযোগ করেন, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মৌলবাদী হেফাজতকে তোষণ করার জন্য, তাদের কথা অনুযায়ী এই পরিবর্তন করা হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসিরউদ্দিন প্রিন্স বলেন, বর্তমান সরকারের নীতি হলো টাকা যার, শিক্ষা তার। তিনি অবিলম্বে বিজ্ঞানভিত্তিক সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি জানান। গোলটেবিল আলোচনায় আরো উপস্থিত ছিলেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপনসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও ছাত্র, যুব, নারী, পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উদীচী আয়োজিত এ গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন। গোলটেবিল আলোচনায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান। এতে বলা হয়, আপনারা সকলেই অবগত আছেন যে, এ বছর প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে তা স্বাভাবিক নিয়ম মেনে হয়নি। পাঠ্যপুস্তকের ১৩ জন সম্পাদক গণমাধ্যমে দেয়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন এই পরিবর্তনগুলো করা হয়েছে তাঁদের অজান্তে। ২০১৭ সালের প্রথম দিনেই বিনামূল্যে সকল শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেবার ক্ষেত্রে সরকারের সফলতা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া পাঠ্যবইগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিগত কয়েক বছর ধরেই। ২০১৭ সালের পাঠ্যবইগুলোতে ছাপার ভুল, বানান-তথ্য বিকৃতি এবং সাম্প্রদায়িকীকরণ নিয়ে বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে মানুষের এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাগুলোকে দায়িত্বে অবহেলা হিসেবে চালানোর চেষ্টা করা হলেও, ধীরে ধীরে বের হয়ে এসেছে এইসব বিকৃতির মূল কাহিনী। পশ্চাৎপদ ও মৌলবাদের তোষণনীতির কারণেই পাঠ্যপুস্তকে এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে। এর পেছনে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ভয়ানক বিস্তার রয়েছে, তা গত কয়েক বছর ধরেই সুস্পষ্ট। এ বছরের পাঠ্যপুস্তক সেই সাম্প্রদায়িক অপ-রাজনীতির সঙ্গে সরকারের আপোষরফারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এই নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকীকরণের মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যৎকে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। তাই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পাঠ্যপুস্তকে এই ঘৃণ্য বিকৃতির বিরুদ্ধে আমাদের যেমন কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করা আবশ্যক, তেমনি সরকারেরও উচিৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঘাপটি মেরে থাকা মুখোশধারী মৌলবাদী ও জামাত ভাবাদর্শের ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তি প্রদান করা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তকগুলোতে যে ভুল ও তথ্য-ইতিহাস বিকৃতির ছড়াছড়ি, একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, এটি তিন ধরনের। এক, বানান ও তথ্যগত বিকৃতি; দুই, বাক্য গঠনে ভুল; তিন, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির অনুপ্রবেশ ঘটানো। এক ও দুই নম্বর ভুলগুলো সঠিক পরিকল্পনা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে হচ্ছে। কিন্তু তৃতীয় ভুলটি পরিকল্পিত এবং যারা করছেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি সাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র গঠনের জন্যে এই কাজটি করে চলছেন।এনসিটিবির অনুমোদনের বাইরে মাদ্রাসা এবং কিন্ডার গার্টেন নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যা পড়ানো হয় তা আরো ভয়াবহ। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, শিশু শ্রেণির বর্ণমালা পরিচয় বইয়ে ‘গ’ বর্ণ পরিচয়ে লেখা হয়েছে ‘গান শোনা ভাল নয়’। হাজার বছরের আবহমান অসাম্প্রদায়িক আর সৌহার্দ্যের সংস্কৃতিকে আজ পাঠ্যপুস্তক থেকে তুলে দেয়া হচ্ছে। সৃষ্টি করা হচ্ছে জাতিগত, ধর্মীয় আর নারী-পুরুষের ভেদ-বৈষম্য। এ চক্রান্ত পরিকল্পিত, কেননা বাঙালির সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের পূর্বশর্তই হলো গুণগত ও সঠিক শিক্ষা। শিক্ষা হলো সাংস্কৃতিক পুঁজি। যে ‘উন্নয়ন’- এর কথা বলে আজ সরকার তার সামগ্রিক আপোস আর মৌলবাদের তোষণনীতিকে বৈধ করার অপচেষ্টা করছে, সে উন্নয়ন কেবলই অবকাঠামোগত। কিন্তু শিশুর মননে যে সংস্কৃতির আলো পৌঁছানো প্রয়োজন, সে পথে একের পর এক বাধা সৃষ্টি করছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নৈতিক বোধের স্ফূরণ না ঘটিয়ে সেখানে তৈরি করা হচ্ছে বিভেদ আর সাম্প্রদায়িকতা। শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের মন-মানস উদার ও উন্নত মানবিক চেতনায় গড়ার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়াশীল ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী পাঠ্যক্রমে প্রাধান্য পেয়েছে। জঙ্গিবাদের যে ভয়াল রূপ আমরা দেখছি, তা যে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে নির্মূল করা সম্ভব নয়– এ কথা সকলেই মানবেন। এই ক্যান্সারের মতো জঙ্গিবাদকে দমনের জন্যে প্রয়োজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সরকার একদিকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলছে, অন্যদিকে পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে দিচ্ছে জঙ্গিবাদের সুপ্ত উপাদান। মৌলবাদের কাছে সরকার কতোটা পরাজিত, তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ পাঠ্যপুস্তক থেকে শিশুদের সৃজন ও মনন বিকাশের উপযোগী রচনা বাদ দেয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন শাহ, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, এস ওয়াজেদ আলী, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখের রচনা যে হীন চক্রান্তে বাদ দেয়া হয়েছে, সেই চক্রান্তেরই ভয়ানক রূপ হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের জঙ্গিবাদ আর মৌলবাদের প্রসার ঘটাবে বাংলাদেশে। শুধু তাই নয়, লেখকদের লেখা-কবিতার লাইন পরিবর্তন করার দুঃসাহসও দেখিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাঠ্যপুস্তকের পেছনের মলাটে যে নির্লজ্জ দলীয়করণ করা হয়েছে, দলীয় প্রধানের তোষামোদী করে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে– তা অতীতে কখনও দেখা যায়নি। পাঠ্যপুস্তকে যে বিভৎস সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে, তাকে আবার বৈধতা দেয়া হয়েছে অপ্রাসঙ্গিক তোষামোদ করে। অবস্থা এতোই বিপদজনক যে, এই দলীয় তোষামোদেও ভুল বানান, ভুল তথ্য বিদ্যমান। তা না হলে, সরকার নিজেকে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা বিরোধী বলে ঘোষণা করলেও এবং এর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চাকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বললেও, পাঠ্যপুস্তকে কেনো পশ্চাদপসরণের চিত্র? এই পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তাতে দেশের অসাম্প্রদায়িক বিবেকবান মানুষ যারপরনাই হতাশ হয়েছে। প্রিয় বন্ধুগণ, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই অপরাপর সমমনা সংগঠনসমূহের সাথে মতবিনিময় করে তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলনের কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। ভুলে ভরা এ পাঠ্যপুস্তকসমূহ প্রত্যাহার এবং বিষয়টি তদন্ত করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট নাগরিকের যৌথ বিবৃতি প্রকাশ, সংবাদ সম্মেলন, এনসিটিবির সামনে অবস্থান ও বিক্ষোভ সমাবেশ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাও ও স্মারকলিপি পেশ করা হয়। আমরা মনে করি এই সাম্প্রদায়িক ও ভুলে ভরা পাঠ্যপুস্তকের ধনাত্নক পরিবর্তন আনার জন্য একটি ব্যাপক গণআন্দোলন প্রয়োজন। যে আন্দোলন সামগ্রিকভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অর্জনের সাথে সম্পৃক্ত। এবং এ আন্দোলনে বিজয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের কাঙ্খিত ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে হাঁটতে পারবো। আপনাদের সকলের আলোচনায় সেই আন্দোলনের কর্মসূচি গৃহীত হোক উদীচী এই প্রত্যাশা করে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..