অন্ধকার দিয়ে অন্ধকার দূর করা যাবে না

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলেম-ওলামাদের এক অনুষ্ঠানে কওমী ধারার সর্বোচ্চ ডিগ্রির স্বীকৃতি দিয়েছেন। দাওরায়ে হাদিসের সনদের স্নাতকোত্তর মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা গোটা জাতিকে উদ্বিগ্ন করেছে। একে কোনোভাবেই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ভালো কোনো পদক্ষেপ বলে মেনে নেওয়া যায় না। কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তার রাষ্ট্রীয় আদর্শের পরিপন্থি হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানে অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার কথাই বলা হয়েছে। ফলে কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন না করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের উদ্যোগ দেশের সামাজিক-সাম্প্রদায়িক স্থিতিশীলতাকে আরো সংকটাপন্ন করে তুলবে। আজকে সরকার যে উন্নয়নের কথা বলে, মনে রাখা দরকার এটা বিজ্ঞানভিত্তিক ইহলৌকিক জ্ঞান-নির্মাণের প্রয়াসের ফসল। এই প্রগতির ধারাকে অবহেলা করে উপরন্তু পশ্চাৎমুখী শিক্ষার পরিবেশকে বিস্তৃত করার সমাজ-রাজনীতি-রাষ্ট্র-মানুষ কারো জন্যই মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। এই পদক্ষেপের দায় একদিন বাংলাদেশ হাড়ে হাড়ে টের পাবে। প্রধানমন্ত্রী যেদিন এই ঘোষণা দিয়েছেন সেদিন গণভবনে তার পাশে হেফাজতে ইসলামের প্রধান শফি হুজুর ছিলেন। নিশ্চয়ই ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের তাণ্ডব যারা দেখেছেন, তাদের জানা আছে হেফাজত সম্পর্কে। এই শফি হজুর নারীদের সম্পর্কে কী কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করেন তা তো আজ আর কারো অজানা নয়। স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার জন্য সেদিন কারা হুমকি দিয়েছিলো জাতি সেটা জানে। ভিন্ন মতাবলম্বীদের কারা কতল করতে চায় আজ আর তা অস্পষ্ট নয়। অথচ তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার জন্যই মুক্তিযুদ্ধে পক্ষের সরকারের, রাষ্ট্রের এতো আয়োজন! তাহলে এখানেই থামবে কেন হেফাজত? তারা সুপ্রিম কোর্টের সামনে রোমান যুগের ন্যায়বিচারের প্রতীক ‘লেডি জাস্টিস’র আদলে যে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে সেটি অপাসরণেরও দাবি জানিয়েছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নিজের সায় ব্যক্ত করেছেন, মতামত তুলে ধরেছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে লিলি ফোয়ারায় এই ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়। এটি নির্মাণ করেন ভাস্কর মৃণাল হক। ভাস্কর্যটিতে চোখ বাঁধা এক নারীর ডান হাতে তলোয়ার, বাম হাতে দাঁড়িপাল্লা। তলোয়ারটি নিচের দিকে নামানো আর দাঁড়িপাল্লাটি পরিমাপ করছে এমন ভঙ্গিতে ধরা। এটি শুধুই একটি প্রতীক, ভাস্কর্য, শিল্পকলা। মুসলিম জাহানে এগুলো বেদাতি নয়, তাহলে বাংলাদেশে এর বিরোধিতার রাজনীতির নেপথ্যে কী ইন্ধন রয়েছে? ভাস্কর্যটি স্থাপনের পর থেকেই হেফাজত তা সরানোর জন্য দাবি জানিয়ে আসছে। তারা প্রধান বিচারপতির কাছে এই ভাস্কর্যটি সরানোর দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে। যদি সরানো না হয় তাহলে আবারো মতিঝিলের শাপলা চত্বরের মতো ঘটনা ঘটানোর হুমকি দিয়েছে। শুধু হেফাজতে ইসলাম নয়, ওলামা লীগসহ কয়েকটি সংগঠনও একইভাবে বিরোধিতা করছে। এর মধ্যেই গত ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে এক বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি নিজেও এটা পছন্দ করিনি। বলা হচ্ছে, এটা নাকি গ্রিক মূর্তি। আমাদের এখানে গ্রিক মূর্তি আসবে কেন? আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটা এখানে থাকা উচিৎ না। এটা কেন করা হল? কারা করল? কীভাবে, জানি না। গ্রিকদের পোশাক ছিল এক রকম। এখানে আবার দেখি শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। এটাও হাস্যকর হয়েছে।’ এখানে প্রশ্ন খুব গুরুতরভাবে তুলতে হয়, ন্যায়বিচারের প্রতীক এই ‘লেডি জাস্টিস’ আসলে মূর্তি, নাকি ভাস্কর্য? প্রধানমন্ত্রী বার বারই বলেছেন, এটি ‘মূর্তি’। হেফাজতের ভাষাও একই। যদি মূর্তি হয়- তাহলে এখানে কারা পূজা করে? কেউ তো এখানে পূজা করে না। তাহলে একটি ‘ভাস্কর্যকে’ কেন ‘মূর্তি’ বানানো হলো, কার স্বার্থে? শুধুই এর গায়ে সাম্প্রদায়িক রঙ লাগানোর জন্য? এটি কি শিল্পকলা নিয়ে মৌলবাদীদের চিরকালের কূপমণ্ডুকতা, তাকেই উস্কে দেওয়া হলো না? আওয়ামী লীগ কি মৌলবাদতোষণের নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে না? যদিও অনেক আগেই প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, দেশ মদিনা সনদে চলছে। শত শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশ যদি স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর মদিনা সনদেই চলে, তাহলে চার মূলনীতির সংবিধানের প্রয়োজন যে আওয়ামী লীগের কাছে ফুরিয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এটি বোঝার জন্য সংবিধান-বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কথা উল্লেখ করাই যথেষ্ট। সেই সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের প্রবল বিক্ষোভকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে মৌলবাদীদের খুশি করার জন্যই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান আর স্বৈরাচার এইচ এম এরশাদের পথ ধরে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বহাল রেখেছে। ফলে কিছুদিন আগে হেফাজতের দাবি মেনে, বিমানবন্দরের সামনে থেকে লালন ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলা, তাদের দেওয়া প্রেসক্রিপশন মতো পাঠ্যপুস্তক সংশোধন, কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি, ভাস্কর্য সরানোর আবদার, পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধের দাবি- সবই ধারাবাহিকতার অংশ। স্বভাবতই প্রশ্ন থাকে তাহলে এর পর কী? ভাস্কর্য তো পৃথিবীর অনেক মুসলিম দেশেই আছে। ইরান, ইরাক, সৌদিআরব, মিশর এমনকি পৃথিবীর বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়াতেও আছে। সেখানে তো তা সরানোর কথা কখনো শোনা যায়নি। তাহলে বাংলাদেশে কেন সরাতে হবে? আসলে ভাস্কর্যটি বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে, মৌলবাদীদের রাজনৈতিক কারণেই নিজের পকেটে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। বিএনপি যেমন রাখতো, ধারণ করতো। এই প্রতিযোগিতার নামান্তর হচ্ছে সবখানেই ইসলামিকরণের পদক্ষেপ। কিন্তু এ দিয়ে কি শেষ রক্ষা হবে আওয়ামী লীগের? ইতিহাস অবশ্য এই কথা বলে না। ইতিহাসের শিক্ষা খুবই নির্মম। বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একবার ঢাকার ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিল মৌলবাদীরা। ২০০৮ সালের বিমানবন্দরের সামনে স্থাপিত লালন ভাস্কর্য তৈরি করা হচ্ছিলো। সেই বছরের অক্টোবরে সেটি ভেঙে ফেলা হয়। দিলকুশা এলাকার ‘বলাকা’ ভাস্কর্যেও সে সময় হামলা হয়। ‘লেডি জাস্টিস’ না হয় ‘মূর্তি’, লালন বা বলাকা তো মূর্তি নয়? তাহলে সেগুলোতে কেন হামলা করা হলো? হেফাজতের বয়ানে এর একটা কারণ উল্লেখ আছে। হেফাজতের যে ‘বিখ্যাত’ ১৩ দফা, তার একটিতে (নয় নম্বর দফা) বলা হয়েছে- ‘মসজিদের নগরী ঢাকাকে মূর্তির নগরীতে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করতে হবে।’ বক্তব্যটি খুব স্পষ্ট। হেফাজত বলছে, ‘ভাস্কর্যের’ নামে ‘মূর্তি’ বানানো হচ্ছে। অর্থাৎ হেফাজতের কাছে যা মূর্তি, তাই ‘ভাস্কর্য’। প্রধানমন্ত্রীও তাই মনে করেন? ইসলামী মৌলবাদীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দহরম-মহরম নতুন নয়। একটু পিছন ফিরলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০০৬ সালের বছরের ২৩ ডিসেম্বর খেলাফত মজলিসের প্রধান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল ৫ দফা সমঝোতা স্মারক সই করেছিলেন। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি ছিলো জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনের আগে ‘রাজনৈতিক কৌশলগত’ কারণে এই সমঝোতা করা হয়েছিলো বলে পরে আওয়ামী লীগ জানিয়েছিলো। মূলত মৌলবাদীদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে ক্ষমতায় ফেরাই ছিলো এই চুক্তির নেপথ্যে। এ নিয়ে সারাদেশে সমালোচনার মুখে পড়েছিলো আওয়ামী লীগ। নিজেদের কয়েকটি শরিক দলও তখন ‘বেজার’ হয়েছিলো। যদিও পরে এই নির্বাচনটি আর হয়নি। আওয়ামী লীগও তখন ‘রাজনৈতিক কৌশলগত’ কারণে খেলাফতে মজলিসের সঙ্গে করা চুক্তিটি একা একাই বাতিল করে দিয়েছিলো। বাতিল করার পর ‘বেজার হওয়া শরিকরা’ আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের প্রশস্তি গেয়েছিলেন। ‘লেডি জাস্টিস’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এমন একটা সময়ে ঘটলো যখন সরকার এক ধরনের নির্বাচনী প্রচারের মধ্যে রয়েছে। নির্বাচন হওয়ার কথা ২০১৯ সালে। নির্বাচনের বেশ খানিকটা আগে আগে আওয়ামী লীগের এই ‘রাজনৈতিক কৌশল’ নিয়ে এবার কি শরিক দলের নেতারা কিছু বলবেন? নাকি ‘রাজনৈতিক কৌশলগত’ কারণেই তারা চুপচাপ থাকবেন? সেটাই এখন দেখার বিষয়। বলা হয়ে থাকে, কোনো জাতিকে যতি ধ্বংস করতে চাও, তাহলে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আগে ধ্বংস করে দাও। এই কাজটিও করেছে এই আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজতের প্রেসক্রিপশন মেনে নিয়েই। একটি জাতীয় দৈনিকে এ ব্যাপারে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের লিখিত প্রস্তাবে মোট ২৯টি বিষয় সংযোজন ও বিয়োজনের কথা বলা হয়েছিল। ২৭টি লেখা গ্রহণ ও বর্জন করা হলেও দেখা যায়, দাবি অনুযায়ী ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত থাকা অষ্টম শ্রেণির ‘রামায়ণ কাহিনী’ (লেখক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী) এবং সপ্তম শ্রেণির ‘লালু’ (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) গল্প বাদ দেয়া হয়নি। গল্প ২টিসহ বই ছাপা হওয়ায় বিপাকে পড়ে এনসিটিবি। এরপর ছাপা বই বাতিল করা হয় এবং সংশোধনের পর নতুন করে ছাপা হয়। এই পরিবর্তনে হেফাজতসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল সন্তোষ প্রকাশ করেছে।’ পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রখ্যাত লেখকদের লেখা বাদ দেওয়ায় সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। খোদ আওয়ামী লীগের একজন মন্ত্রী বলেছেন, এখনকার পাঠ্যপুস্তক পাকিস্তানি আমলের চেয়ে খারাপ। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নানা স্থানে বলে বেড়াচ্ছেন, আওয়ামী লীগে হাইব্রিড, কাউয়া ঢুকেছে। এরা ক্ষমতার লোভে দলে এসে ভিড়েছে। এরা সুসময়ের পাখি। সুসময় চলে গেলেই উড়ে যাবে। আর যুবলীগের চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী তো আরো এক কাঠি এগিয়ে বলেছেন, শুধু দলে না, এমপি-মন্ত্রীদের মধ্যেও কাউয়া আছে। এটা সত্য। তবে অধ্যসত্য। এই সত্যের আরেকটি দিক আছে। দল, এমপি-মন্ত্রীদের মধ্যে শুধু ‘ক্ষমতালোভী হাইব্রিড বা কাউয়ারা’ নেই, সেখানে আরো এক ধরনের ‘কাউয়াও’ আছে। এই ‘কাউয়ারাই’ কি আওয়ামী লীগকে হেফাজত-তোষণের পথে, ইসলামিকরণের পথে নিয়ে যাচ্ছে? সাধু সাবধান!

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..