হাসিনার দিল্লি সফর প্রাপ্তির বদলে আশ্বাস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
রাজনৈতিক ভাষ্যকার : ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩৫১ জন সফরসঙ্গী নিয়ে ৪ দিনের সফরে দিল্লি গিয়েছিলেন। ঢাকায় ফিরেছেন ১০ এপ্রিল। হাসিনার এই সফরে বাংলাদেশের জনগণের ন্যূনতম প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সম্ভবত সরকার তার অস্বস্তি আর জনগণের ক্ষোভ বাড়াতে চায়নি বলেই, প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত গণসংবর্ধনা বাতিল করতে হয়। ১১ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রী সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। এ সফরে ১১ চুক্তি, ২৪টি সমঝোতা স্মারক ও ২টি এসওপি স্বাক্ষর হয়েছে। দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় তিস্তাসহ অভিন্ন নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি, বাণিজ্য ঘাটতি দূর, সুন্দরবন বিধ্বংসী রামপাল প্রকল্প বাতিল, সীমান্তে মানুষ হত্যা নিঃশর্তভাবে বন্ধ, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ ইত্যাদি বিষয়গুলোতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘোষণা নেই। ফলে বাংলাদেশের জনগণ প্রচণ্ডভাবে হতাশ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের আগেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, তিস্তাসহ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সমস্যাগুলোর সমাধানের কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না এই সফরে। জনগণের বহুল প্রত্যাশিত তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। মিডিয়া প্রচার করেছিল যে, তিস্তার পানি বণ্টনের জন্য চুক্তি না হোক চুক্তির একটা সময়সীমা অন্তত নির্ধারিত হবে। কিন্তু চুক্তি দূরের কথা, সময়সীমাও নির্ধারণ করা যায়নি। এখন তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা বাদ দিয়ে এই সফরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব কিছুতেই করা যাবে না। হাসিনার দিল্লি সফরকে মিডিয়া রীতিমতো বিনোদনের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে। হাসিনা কার জন্য কী নিয়ে গেলেন, কী কী খেলেন, কার সঙ্গে কী রসিকতা করলেন-এ রকম সব বিষয়ই মিডিয়া তুলে ধরেছে। শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে মোদির উপস্থিত থাকা, বিশেষ সংবর্ধনা, রাষ্ট্রপতির ভবনে আতিথেয়তাসহ বিভিন্ন ঘটনার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, হাসিনার এই সফরে ভারতের বাড়তি আগ্রহ ছিল। সফরে যতটা আবেগ-উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, সফরের নিট ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে এই আবেগ-উচ্ছ্বাস কি কৃত্রিম বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? তাহলে কি হাসিনাকে আবেগ-উচ্ছ্বাসে বশ করে ভারত তার স্বার্থ আদায় কিংবা বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি ঝুলিয়ে রাখতে চেয়েছে? ভারতের প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, হাসিনা ও তাঁর মেয়াদেই ‘তিস্তা চুক্তি’ হবে। একই রকম আশ্বাস দিয়েছিলেন ভারতের পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। এটাকে কেবল ‘কথার কথা’ বলেই মনে হয়। কারণ, ভারতের দিক থেকে বোঝানো হচ্ছে যে, মমতার আপত্তির কারণেই নাকি তিস্তা চুক্তি আটকে আছে। কিন্তু মমতা তো তিস্তা চুক্তির বিরোধিতায় আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি তিস্তার বদলে মৃতপ্রায় চারটি নদীর (তোর্সা, ধানসিঁড়ি, মানসিঁড়ি ও জলঢাকা) পানির কথা বলেছেন। তাঁর এই প্রস্তাব কেবল হাস্যকরই নয়, বাংলাদেশের জনগণের জন্য চরম অবমাননাকর। শেখ হাসিনা তাঁর ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। আর নিজে আস্থা রেখেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর। তিনি বলেছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, তিস্তা চুক্তি হবেই। তাঁর কথায় আস্থা রেখে ধৈর্য ধরতে পারি।” হাসিনার ওপর যে আমরা আস্থা রাখব, তার ভিত্তিটা কী? কীসের ভিত্তিতে হাসিনা মোদির ওপর আস্থা রাখছেন? ঢাকায় ফিরে সফর সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “পুরোটাই তৃপ্তির। হতাশার কিছু নেই। আমি সেখানে কোনো কিছু চাইতে যাইনি। গিয়েছিলাম বন্ধুত্ব চাইতে, সেটা পেয়েছি।” প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকেই তাঁর নতজানু অবস্থান এবং অপ্রাপ্তি আড়াল করার চেষ্টার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে, সেগুলোর শর্ত আমাদের জানানো হচ্ছে না। ভারত যে ঋণ আমাদের দেবে, তার শর্তই বা কী? এসব সম্পর্কে দেশবাসীকে কিছুই জানানো হয়নি। এমনকি এসব নিয়ে সংসদেও আলোচনা হয়নি। সম্পাদিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক প্রকাশের বিষয়টিকে নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরং বলেছেন, “এগুলো নিয়ে লুকোছাপার কোনো কারণ নেই। গণমাধ্যমে এসেছে। কিছু চুক্তি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে। সংসদে অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। যে কেউ জানতে পারবে। এটা আর প্রকাশ করার কিছু নেই।” জ্বালানি খাত নিয়ে যেসব উদ্যোগ ও প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ভারতের ওপর একেবারেই নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের দুই প্রান্তে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক এবং গ্যাস নেওয়ার পাইপলাইন নির্মাণে বাংলাদেশ সম্মত হয়েছে। আসামে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বিহারে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে একটি গ্রিড উপকেন্দ্র করে তার মাধ্যমে আসামের বিদ্যুৎ বিহারে নেওয়া হবে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সমঝোতার বিষয়টিকেও গোপন রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানগত গুরুত্বের কারণে চীনকে ঠেকাতে ভারতের প্রয়োজন বাংলাদেশকে। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি বা সমঝোতা প্রয়োজন ভারতের জন্য, বাংলাদেশের জন্য নয়। এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, বাংলাদেশ কার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে? জাতিসংঘের সংস্কার বিতর্কে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ভারতের দাবিকে সমর্থন করে এসেছেন শেখ হাসিনা। চীন এই দাবির বিরোধিতা করে আসছে প্রকাশ্যেই। দুই দেশের ঝগড়া-বিবাদ-যুদ্ধে বাংলাদেশ কেন যুক্ত হবে? প্রতিরক্ষা খাতে ৫০ ডলার ঋণ দিয়ে যে অস্ত্র কিনতে হবে, তা কি ভারত থেকে কিনতে হবে? যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অস্ত্র যে ভারত থেকে কিনতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু চুক্তি বা সমঝোতা মানেই কিছু শর্ত থাকে। আমাদের আশঙ্কা (যেহেতু সবকিছু গোপনে রাখা হচ্ছে) যে, ভারত থেকেই আমাদের অস্ত্র কিনতে হবে। তাই যদি হয়, তাহলে ভারতের অকেজো অস্ত্র আমাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাছাড়া ভারত যেখানে নিজেই অস্ত্র আমদানি করে, সেখানে ভারত থেকে আমরা অস্ত্র কিনব কোন যুক্তিতে? কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক আনন্দবাজার প্রত্রিকা’ গত ৯ এপ্রিল ‘প্রতিরক্ষায় চুক্তি নয়, দুটো মউ ঢাকা ও দিল্লির’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, “দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ঘণ্টা বাজিয়ে সুপ্রতিবেশীকে সরব সতর্ক করা নয়। বরং মউ-এর মোড়কে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বড় মাপের সমঝোতার পথে হাঁটতে চলেছে ভারত। শেখ হাসিনার আসন্ন সফরে দু’দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দুটি সমঝোতাপত্র সই হবে। বাংলাদেশকে সমরাস্ত্র কেনার জন্য দেওয়া হবে ৫০ কোটি ডলার ঋণ-সাহায্য। সব মিলিয়ে এর পর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভূকৌশলগত রাজনীতিতে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছনো যাবে বলে আশা করছে নয়াদিল্লি।” “কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে নিচু তারে (প্রতিরক্ষার) বিষয়টিকে বাঁধার পরিকল্পনা করা হয়েছে” বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। “হাসিনা সরকারকে চাপে না ফেলা” এবং “চীনের উদ্দেশেও খুব ঢাক ঢোল পিটিয়ে কোনও বার্তা না দেওয়া”র লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে রিপোর্টটিতে বলা হয়, “প্রতিরক্ষার মতো বিষয়ে কিছু গোপনীয়তা রাখা ভারতীয় কৌশলের মধ্যে পড়ে। তাই বেণী না ভিজিয়ে স্নান করার একটি কৌশল হিসাবে এখনই ভারত-বাংলাদেশ সমঝোতাকে চুক্তির আকার না দিয়ে, তার আগের ধাপ ‘মউ’-সই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” সাউথ ব্লকের বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথনকে উদ্ধৃত করে রিপোর্টটিতে “দু’দেশের মধ্যে চলতি সামরিক সহযোগিতাগুলিকে একটি ছাতার তলায় নিয়ে এসে একটি সামগ্রিক ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করা” এবং “ভারত থেকে সমরাস্ত্র এবং সামরিক প্রযুক্তি কেনার জন্য বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়া”র কথা উল্লেখ করা হয়। এই রিপোর্ট থেকে ভারতের উদ্দেশ্য বোঝা যায়। হাসিনাকে শুধু আশ্বাস নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে। ভারত ক্রমাগতভাবে তার সুবিধা বাংলাদেশের কাছ থেকে নগদ আদায় করে নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অধিকাংশ ইস্যুকে ঝুলিয়ে রেখে শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতির ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে প্রবোধ দিয়ে যাচ্ছে। এই সফরকালে দু’দেশের মধ্যে আন্তরিক সহযোগিতা প্রসারিত করার যে সুযোগ ছিল, ভারতের একতরফা আচরণ তার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। দু’দেশের বন্ধুত্ব প্রসারিত করার প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক সরকার দায়ী হলেও, বাংলাদেশ সরকারের দুর্বলতা ও নতজানু ভারতনীতি দায় এড়াতে পারে না। মমতার প্রসঙ্গ টেনে এনে দিল্লি সফরের প্রাপ্তি সম্পর্কে শেখ হাসিনা হিন্দি ভাষায় বলেছেন, “দিদিকি সাথ বাত হুয়ি। পানি মাঙ্গা লেকিন ইলেকট্রিসিটি তো মিলা। কুছ তো মিল গ্যায়া’ (দিদির সঙ্গে তিস্তা নিয়ে কথা হয়েছে। পানি না পেলেও বিদ্যুৎ তো পেলাম। কিছু তো পেলাম)। হাসিনার এই বক্তব্য চরম বিভ্রান্তিকর। পানিপ্রাপ্তি আর বিদ্যুতপ্রাপ্তিকে তিনি গুলিয়ে ফেলেছেন। বিদ্যুৎপ্রাপ্তির যে কথা তিনি বলেছেন, সেই বিদ্যুৎ আমাদের ভারতের কাছ থেকে কিনে নিতে হবে। আর তিস্তার পানিপ্রাপ্তি আমাদের অধিকার। তাই দুটো বিষয় কোনোভাবেই এক নয়। দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। সম্পর্ক তো বায়বীয় কিছু নয়! সহযোগিতা একতরফা হয় না। অমীমাংসিত সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে যেখানে সুসম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই সম্ভব নয়, সেখানে সম্পর্ক ‘নতুন মাত্রায় উন্নীত’ হবে কী করে? বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের বন্ধুত্বকে আড়াল করে দু’দেশের শাসকশ্রেণির বন্ধুত্বকে তুলে ধরার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। দু’দেশের শাসকশ্রেণি দু’দেশের জনগণের বন্ধুত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে সংহতি ও সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দু’দেশের মধ্যকার সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। শেখ হাসিনা যেদিন দিল্লি পৌঁছান, সেদিন ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় তাঁর একটা লেখা প্রকাশিত হয়। সেই নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব বহতা নদীর মতো এবং তা ঔদার্যে পূর্ণ।” খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- নদীর পানিপ্রবাহ যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বন্ধুত্ব কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..