এই মুহূর্তে দরকার বাম ধারার সরকার
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
দেশ আজ এক গভীর ও ভয়াবহ সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দিক থেকে দেশের পরিস্থিতি বিপদজনক হয়ে উঠেছে। ৫৪ বছর ধরে চলতে থাকা পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার চরম দেউলিয়াপনা ও ব্যর্থতার কারণেই এই বিপদজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পেরেছে। তাই, সমস্যা-সংকটের আর্থ-সামাজিক উৎসমূল সেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান ব্যতীত এই সংকটাবর্ত থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই। একথা সত্য যে এটি একটি খুবই দুরূহ ও কঠিন কাজ। নিজ-নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে একথা আজ ক্রমেই সকলের উপলব্ধিতে স্পষ্ট হচ্ছে যে- একটি ‘সমাজতন্ত্র অভিমুখীন সমাজ বিপ্লব’ ছাড়া সমস্যা-সংকটের এই অন্ধকার অচলায়তন থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ নেই।
দেশে, বিশেষত দেশের রাজনীতিতে এখন একটি দিক নির্ধারণমূলক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চ্যালেঞ্জটি হলো, দেশের গতিপথ কি ‘ডান’ দিকেই থাকবে–নাকি এবার তা ‘বাম’ দিকে মোড় নিতে শুরু করবে, নাকি দেশে চরম ডানপন্থা ও উগ্র সাম্প্রদায়িক কালোশক্তির প্রতিক্রিয়াশীল শাসনের অন্ধকার অধ্যায় সূচিত হবে।
৫৪ বছর ধরে দেশকে চলতে হয়েছে ক্রমাগত গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকা সমস্যা-সংকটের বোঝা কাঁধে নিয়ে। এই সমস্যা-সংকটের মাত্রা আজ এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে- শাসক শ্রেণি ‘নৌকা, লাঙ্গল, পাল্লা, শীষ’–ইত্যাদি একেক সময় একেক মার্কার লেবাস নিয়ে এতোদিন যেভাবে দেশ চালাতে পেরেছে এখন কোনোভাবেই আর তা চালাতে পারছে না। অন্যদিকে, যাদের দ্বারা দেশ পরিচালনা সম্ভব–তারা এখনো তা পেরে ওঠার মতো শক্তি অর্জন করে উঠতে পারেনি। এমতাবস্থায়, রাজনীতিতে এবং সার্বিকভাবে রাষ্ট্র, অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গভীর শূন্যতা বিরাজ করছে। এই শূন্যতা পূরণ করে জাতি ও জনগণের স্বার্থে দেশ চালানোর দায়িত্ব নেয়ার মতো সবদিক থেকে তৈরি কোনো প্রগতিশীল বিকল্প শক্তির উপস্থিতি এখনো দেশে নেই। এ ধরনের বিকল্প গড়তে হলে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের প্রধান ভূমিকা যে অপরিহার্য–জীবনের বাস্তব ও ইতিহাসের পাঠের অভিজ্ঞতা তার প্রমাণ দেয়। কিন্তু এদেশে বাস্তবতা হলো এখনো এখানে ‘সমাজতন্ত্র অভিমুখীন বিকল্প’ প্রতিষ্ঠার জন্য কমিউনিস্ট ও বামপন্থি দল ও শক্তির বিকাশ যে মাত্রা ও পরিমাণে বিকশিত হওয়া বাঞ্ছনীয় ও প্রত্যাশিত তা এখনো অর্জন করা যায়নি। এ কারণে কি তাহলে চলমান রুগ্নতা-ব্যাধি-সমস্যা-সংকটের অচলায়তনে আটকে থাকাটাকে আমাদের ‘বিধিলিপি’ বলে মেনে নিতে হবে? না। এটি আমাদের জন্য মোটেও কোনো অপরিবর্তনীয় বিধিলিপি নয়। সমাজব্যবস্থার ও রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রের উপযুক্ত প্রগতিমুখীন পরিবর্তন সাধন করার মধ্য দিয়ে এই অন্ধকার অচলায়তনের আবর্ত থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব।
দেশে শক্তি ভারসাম্যের ক্ষেত্রে যে সমীকরণ আজ বিরাজ করছে, তা প্রয়োজনের চেয়ে কিছুটা দুর্বল হলেও তার ভিত্তিতে উপযুক্ত কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে ‘বিকল্প’ গড়ার লক্ষ্যে কদম বাড়ানো সম্ভব। এই কদম বাড়াতে পারাটাই হলো এই মুহূর্তে মোড় ঘুরাতে পারার মতো তাৎপর্যপূর্ণ একটি কাজ। তবে এক্ষেত্রে যাত্রা শুরু করতে হবে কিছুটা নিচু স্তর থেকে। সমাজের নানান অংশের মানুষরা ভিন্ন ভিন্ন রূপে ও কম বা বেশি মাত্রায় কোন কোনভাবে বঞ্চিত, তাদের সকলের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘ন্যূনতম সাধারণ চার্টারের’ ভিত্তিতে ‘নয়া যুক্তফ্রন্ট’ তথা একটি ‘রংধনু-কোয়ালিশন’ গড়ে তুলতে হবে। তৃণমূল থেকে রচিত হয়ে আসা এরূপ একটি ‘জনতার চার্টার’ বাস্তবায়নের জন্য একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে গণসংগ্রাম শ্রেণিসংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা ও সংগঠন প্রসারিত করতে হবে। এভাবে সৃষ্টি হওয়া জনসমর্থনের শক্তির ওপর নির্ভর করে দেশে ‘নয়া যুক্তফ্রন্টের’ সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বারবার হেলেদুলে পথ বদল না করে একাগ্রতা নিয়ে এই পথে অগ্রসর হলে এই সম্মিলিত গণশক্তির বিজয় কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।
সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি পরিপূর্ণ ‘সমাজতন্ত্র অভিমুখীন বাম গণতান্ত্রিক বিপ্লবী সমাজ রূপান্তরের’ জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো যদি এই মুহূর্তে পূরণ না-ও হয়ে থাকে, তথাপি লেভেলটা কিছু পরিমাণে নামিয়ে এনে হলেও, মৌলিক সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে মোড় ঘুরাতে হবে, কদম বাড়াতে হবে। বামপন্থিদের সেই কাজে প্রধান উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের জন্য আজ এটি একটি ‘ফরজ’ কতর্ব্য হয়ে উঠেছে। কারণ রাজনীতিতে যে শূন্যতার জন্ম হয়েছে তা শূন্য থাকবে না। কোনো না কোনো বিকল্প দ্বারা তা পূরণ হয়ে যাবে। অর্থাৎ বিকল্পের কোনো বিকল্প নেই! বামপন্থিদের পক্ষ থেকে ‘বিকল্প’ গড়ার কাজটি মুহূর্তের জন্যও ‘পেন্ডিং’ রাখা হবে অপরাধ। বামপন্থিরা তাদের এই আশু কর্তব্য হিসেবে যদি দেশের বাম অভিমুখীন মোড় ঘুরানো নিশ্চিত করার কাজটি অবহেলা করে তাহলে তা সেই শূন্যতা পূরণে চরম ডানপন্থি ও জামায়াতসহ উগ্রসাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থায় দেশকে টেনে নামানোর অথবা দেশের অস্তিত্ব মুছে ফেলার পথ করে দেয়া।
’২৪-এর ‘ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের’ একটি প্রধান আওয়াজ ছিল ‘সংস্কার চাই’। ছাত্র-শ্রমিক-জনতা, তথা দেশের কোটি কোটি জনগণ ছিল এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি, তার প্রকৃত নায়ক। কিন্তু তারা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী শাসন ক্ষমতা পরিচালনার দায়িত্ব তাদের হাতে আসেনি। তাদের বদলে তাদেরই নাম বেচে অভ্যুত্থানের ‘মাস্টার মাইন্ড’ ও ‘মেটিকুলাসলি প্ল্যান’ করেছে বলে দাবিদার একটি গ্রুপ রাষ্ট্রক্ষমতার অন্যতম নিয়ন্ত্রক হয়ে কর্তৃত্ববাদী কায়দায় উল্টাপাল্টা পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। অন্যদিকে, স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী ও মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার বাহিনীর আত্মস্বীকৃত ‘বেসামরিক ও প্যারা মিলিটারি অক্সিলারি ফোর্স’ জামায়াতে ইসলাম ইতিহাসকে, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অর্জনকে, উল্টে দেয়ার তার অভিসন্ধি প্রকাশ্যে এনে এক উত্তাল অভিযানে নেমে পড়ে। এদিকে, এতোদিন ধরে চালু থাকা দ্বি-মেরুভিত্তিক রাজনীতির কাঠামোতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে রাজনীতির মাঠ এখন বিএনপির জন্য এককভাবে উন্মুক্ত হয়ে আছে ভেবে সরকার গঠনের লক্ষ্যে সে তার মনোযোগ ও কর্মকৌশল কেন্দ্রীভূত করে অগ্রসর হতে থাকে। ষড়যন্ত্রের খেলাকে সে অনেকটা হালকাভাবে নেয়। এসবের মধ্য দিয়ে দেশে আজ স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানে অভূতপূর্ব গণশক্তির উত্তাল জাগরণে জন্ম নেয়া উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি ডানপন্থি ও জামায়াতসহ উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তি একের পর এক তাদের ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করার সুযোগ পাচ্ছে। দেশের ভিত্তি, শিকড় ও অস্তিত্ব আজ তার চ্যালেঞ্জ করার উদ্ধৃত দেখাচ্ছে। তাদের এই উদ্ধত্যপূর্ণ রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করে দেশের অস্তিত্ব, ঐতিহাসিক অর্জন, মুক্তিযুদ্ধের ফসল ও দেশ-জাতি-জনগণের প্রগতিশীল ভবিষ্যত রচনার গুরুদায়িত্ব আজ বিশেষভাবে এসে পড়েছে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের কাঁধে। এ কাজে সাফল্য আনতে হলে বামপন্থি ছাড়াও অন্যান্য শক্তিকে সম্ভবমতো সাথে নিতে পারাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাদের ওপর নির্ভর করে থাকা হবে স্বেচ্ছামরণের মতো আত্মঘাতী কাজ। দেশের কমিউনিস্ট-বাম-প্রগতিশীল শক্তিকে আজ সাহস-দৃঢ়তা-বিচক্ষণতার সাথে তাদের ওপর ইতিহাস অর্পিত চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব গ্রহণ করে বিজয়ী হতে হবে।
চব্বিশের ঐতিহাসিক ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের’ পর ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বছরাধিককাল ধরে কাজ করছে। এ সময়ের মধ্যে যা অত্যাবশ্যক ছিল এবং আরও কম সময়ে যা করা সম্ভব ছিল–এমন অনেক প্রয়োজনীয় কাজ না করলেও, এই সরকার ‘অকাজ’ কিছু একটা কম করেনি। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে অবস্থাটি স্পষ্ট হবে।
ক্ষমতাসীনরা শুরু থেকেই বলছে যে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলী ছিল ছাত্র-জনতার একটি ‘স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান’। দু’দিন পরেই তারা দাবি করা শুরু করলো যে এই ঘটনাবলী পরিচালনা করেছে একটি ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবং তা ‘মেটিকুলাসলি (অর্থাৎ অতি নিখুঁত ও সূক্ষ্মভাবে) সংগঠিত করা হয়েছিল। তখনই এ প্রশ্ন উঠেছিল যে, যেটাকে ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ বলা হচ্ছে, তাকে একই মুখে ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও ‘মেটিকুলাস প্ল্যানিং’ দ্বারা সংগঠিত হয়েছে বলে চিত্রায়িত করা যায় কি? কোনো ঘটনা ‘সংগঠিত’ করা হলে তা যে স্বতঃস্ফূত হতে পারে না- একথা বুঝতে খুব একটা জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। আজও এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল নায়ক ও তার প্রধান কারিগর ছিল ছাত্র-শ্রমিক-জনতা। সাথে সাথে একথাও সত্য যে ছাত্র সমন্বয়কদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের সম্পর্কে একথাটিও বলতে হয় যে, তাদের নিজ স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বহুদিন ধরে শীর্ষ স্থানীয় নেতৃত্বসহ তাদের কেউ কেউ ছাত্রলীগের নিরাপদ ছত্রছায়ায় থেকে এবং এমনকি লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে ছাত্রলীগের কমিটিতে নাম দিয়ে তার সব অপকর্মের অংশীদার হয়েছিল। এসব ‘বীরপুরুষদের’ এহেন ভূমিকার সাথে তাদের অনন্য বীরত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার দম্ভ যে একবারেই বেমানান, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গণঅভ্যুত্থানের অধিকাংশ শহীদদের শ্রেণিগত পরিচয় যে ‘শ্রমিক’ সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে এবং ভুলিয়ে দিয়ে, এবং সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী তো দূরের কথা এমনকি ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চলতে থাকা আন্দোলনের সব পর্যায়ে ক্রিয়াশীল সংগ্রামী ছাত্র সংগঠনগুলোকে কার্যত অগ্রাহ্য করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীগত অংশ নিজেদের সমস্ত ছাত্র-জনতার স্বঘোষিত নেতৃত্ব ও মুখপত্র হিসেবে দাবি করে বসে। তারা রাতারাতি সরকার-প্রশাসন-অর্থনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-ইতিহাস সবকিছুর নিয়ন্ত্রকের অধিকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ‘নয়া-কর্তৃত্ববাদী’ চরিত্র ধারণ করতে শুরু করে।
শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট পালিয়ে যান এবং তার সরকার অস্তিত্ব হারায়। এই অবস্থায় ৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নিয়ে বঙ্গভবনে সংবিধান সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতিসহ রাষ্ট্রপতির কাছে শপথবাক্য পাঠ করে বর্তমান ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ তার কাজ শুরু করেছিল। এই সরকার যে কোনো ‘বিপ্লবী সরকার’ কিংবা ‘নিয়মিত সরকার’ নয়, নির্দিষ্ট ম্যান্ডেট প্রাপ্ত একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ মাত্র, সে কথা একটি স্বর্বজন স্বীকৃত সত্য। কিন্তু এর পরপরই তাদের ভেতর থেকে ‘নয়া প্রজাতন্ত্র’, ‘নতুন পতাকা’, ‘নতুন জাতীয় সংগীত’, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিয়ে নতুন সংবিধান রচনা’ ইত্যাদি সম্পর্কে ঘোষণা আসতে শুরু করেছিল। কিন্তু প্রভাবশালী সব মহলকে এসব কাজে ষোল আনা একমত করাতে ব্যর্থ হয়ে এবং জনমতসহ বাস্তব পরিস্থিতিকে মন মতো ছক অনুসারে রূপ দিতে না পারায় তারা এসব পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। সংবিধান বহাল রেখে তার অধীনে শপথ নেয়া সরকারের যে এ ধরনের দাবি উত্থাপন করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এ ধরনের দাবি উত্থাপন করতে হলে যে সংবিধান বাতিল করে সংবিধান বহির্ভূত প্রক্রিয়ায় একটি বিপ্লবী সরকারের পক্ষেই তা সম্ভব, সে কথা কি এই অভ্যুত্থান পরিকল্পনাকারী ‘পণ্ডিতজনেরা’ জানতেন না। নাকি তারা এসব বিষয়ে নিতান্তই, আহাম্মক হওয়া সত্ত্বেও ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও ‘মেটিকুলাস প্ল্যানার’-এর স্বআরোপিত তকমা লাগিয়েছেন।
গণঅভ্যুত্থানে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন পরিদৃষ্ট হয়েছিল অভ্যুত্থান চলাকালে দেয়ালে-দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিগুলোতে। এগুলোর সিংহভাগে ছিল ‘স্বাধীনতা এনেছি-সংস্কারও আনবো’ এবং মসজিদ-মন্দির-গীর্জা-প্যাগোডার ছবি এঁকে তার পাশে ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ উৎকীর্ণ স্লোগান। এমতাবস্থায় ক্ষমতাসীনরা অন্য ধরনের সুচতুর এক ষড়যন্ত্রের নাটক মঞ্চায়ন করতে নেমে পড়ে। তারা ‘সংস্কারের’ ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে এলো। সংস্কার ও জাতীয় ঐকমত্য- এই ইস্যুগুলোকে সামনে এনে বিদেশি নাগরিকত্ব ধারণকারী পশ্চিমা চিন্তার ‘প্রবর্তক কিছু বিশেষজ্ঞকে’ মাঠে নামানো হয়। সংস্কারের প্রকৃত ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়গুলোকে কার্যত: ফেলে রেখে সংবিধান ইস্যুতে শুরু করা হয় দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা সাংবিধানিক ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ঢাক-ঢোল পেটানো কার্যক্রম। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এর দ্বারা এক ঢিলে একাধিক পাখি মারার পরিকল্পনা নিলো। প্রথমত, এর দ্বারা বৈষম্যসহ অন্যান্য জনস্বার্থ সম্পর্কিত ইস্যুকে আড়াল করার ব্যবস্থা করলো। দ্বিতীয়ত, তারা এমনভাবে ‘ঐকমত্যের’ বিষয়টিকে সামনে আনলো যেন তা না করতে পারলে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা এই মর্মে জজবা তুললো যে–কোনো বিষয়ে মতের তারতম্য থাকলে তা হবে দেশের জন্য মহাবিপদের একটি স্থায়ী উৎস, তাই সবাইকে সব বিষয়ে বিশেষত সংবিধান সংস্কারের সব বিষয়ে একমত হওয়াটা অত্যাবশ্যক। কারো পক্ষে ঐকমত্যের বাইরে থাকাটা সে কারণে হবে একটা অপরাধ।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, তারা কি তবে বাকশালের দর্শনের অনুকরণে ‘এক মতের’ দেশ করার ধারাকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়? ‘ঐক্য (টহরঃু)’ এবং ‘সবাইকে একই চিন্তার ছাঁচে আবদ্ধ করা (Uniformity)’- এ দুটি বিষয় কি এক? একথা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে, এদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দৃঢ়, গভীর, কার্যকর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। তাই, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাথমিক কাজ তা হলো দেশকে মুক্তিযুদ্ধের কাছে ফিরিয়ে নেয়া। সরকার কি অনেক ক্ষেত্রেই তার বিপরীতমুখী কাজ করছে না? এসব কথার জবাব তাদের নেই।
তৃতীয়ত, সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে জড়িয়ে ফেলে ‘ঐকমত্য হতে বিলম্ব হচ্ছে’ অজুহাতে নির্বাচন বিলম্বিত করার মাধ্যমে ‘অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের’ অস্তিত্ব দীর্ঘায়িত করার চেষ্টায় তারা লিপ্ত থেকেছে। সংবিধানকে অধিকতর গণতান্ত্রিক-প্রগতিমুখীন করার জন্য সেটিকে উপযুক্তভাবে সংশোধনের বদলে সংবিধানের মর্মকথার ইতিবাচক উপাদানগুলি অবলুপ্ত করে তাতে সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক, প্রতিক্রিয়াশীল, মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার পশ্চাদমুখী উপাদান যুক্ত করার পাঁয়তারা শুরু হয়। ঐকমত্য কমিশন তার গোপন অভিসন্ধি কার্যকর করার জন্য নানা ধরনের অসৎ, জোচ্চুরি, ধান্দাবাজির পথ গ্রহণেও দ্বিধা করেনি। দীর্ঘ কয়েক মাসের আলোচনায় সব দলের ঐকমত্য হয়নি, অনেক বিষয়ে দ্বিমত হয়েছে। সেসব দ্বিমতগুলো লিপিবদ্ধ করা আছে। কিন্তু স্বাক্ষর করার জন্য প্রস্তুত করা ছাপানো নথিতে তার সবগুলো সঠিকভাবে ও পরিপূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দু’একটি ক্ষেত্রে দ্বিমত সম্পর্কে বিবরণ শুধু বদলে ফেলাই হয়নি, যে বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি, তা-ও সংগোপনে সেখানে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। দিনদুপুরে বাটপারি! তারপরে আরো কাণ্ড আছে। ‘জুলাই সনদ’ নামে যে দলিল গণভোটের জন্য থাকবে তাতে অতিরিক্ত আরও কিছু কথা যুক্ত করা হয়েছে। ফলে বলা যায় যে, গণভোটের জন্য ঐকমত্যের দলিলের নাম করে আসলে একটি ‘জাল-দলিল’ হাজির হতে যাচ্ছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ স্থানে ভোট দেয়াও হবে ভোটারদের জন্য বিড়ম্বনাপূর্ণ ও এক ধরনের অসৎ পন্থায় জোর করে মানুষকে মতামত প্রদানে বাধ্য করার একটি প্রক্রিয়া। কারণ ব্যালেটে থাকবে ৪৩টি প্রসঙ্গ। একজন ভোটার তার একটির সঙ্গে একমত হলেও অন্য একটির সাথে তার দ্বিমত কিংবা এমনকি শর্তসাপেক্ষে সহমত বা দ্বিমত থাকতে পারে। এমতাবস্থায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে গেলে উভয় ক্ষেত্রে তাকে আংশিক মিথ্যাচার করতে হবে। কাজটি সংবিধানসম্মত হবে না এবং আইনে তার কোনো বৈধতা থাকবে না জেনেও প্রতিক্রিয়াপন্থিরা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে মধ্য ফেব্রুয়ারির প্রতিশ্রুত জাতীয় নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদের ওপর গণভোট নিয়ে তা কার্যকর করার ‘আবদার’ করেছে। অন্যথায় নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে হুমকিও দেয়া হয়েছে। গণতন্ত্রের অন্যতম উপাদান, নির্বাচন অনুষ্ঠানকে এভাবে অনিশ্চিত করে ‘অনির্বাচিত সরকারের অধীনে দেশ পরচালনার’ দীর্ঘ প্রক্রিয়া ঘটিয়ে ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন আজ নস্যাৎ করার চেষ্টা হচ্ছে। এ কাজ হবে গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের রক্তের সাথে, লক্ষ-কোটি জনগণের রক্তঝরা সংগ্রামের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। সমাজে শোষণ-বৈষম্য টিকিয়ে রাখতে হলে এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। এভাবে এবারের অভিজ্ঞতা আবার প্রমাণ করলো যে, ‘রাজনীতি হলো অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশ’। গরিবের সম্পদ অল্প কিছু ধনী ব্যক্তির পকেটস্থ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে শাসনব্যবস্থায় গণতন্ত্রের বিলাসিতা অসম্ভব, তার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে।
তাই বলবো–মুক্তিযুদ্ধসহ জাতির ঐতিহাসিক অর্জনগুলো নস্যাৎ করার জন্য চরম ডানপন্থি ও উগ্র সাম্প্রদায়িক কালো শক্তির ‘পশ্চাদপসারণের’ পাঁয়তারা পরাজিত করতে হলে বিগত ফ্যাসিস্ট-স্বৈরাচারী দুঃশাসনের ‘নবসংস্করণ’ নয়–দেশে বামপন্থিদের নেতৃত্বে নয়া যুক্তফ্রন্টের প্রগতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠা করে ‘প্রকৃত বিকল্পের’ প্রতিষ্ঠা আজ অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে উঠেছে। মনে রাখতে হবে–দেশে বর্তমানে ‘বিকল্পের কোনো বিকল্প নেই’।
প্রথম পাতা
পীর-ফকির-বাউলদের ওপর হামলায় পুলিশকে সন্ত্রাসের পক্ষে ব্যবহার করছে সরকার
পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে নিবর্তনমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি
লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে চা-শ্রমিকদের অধিকার আদায় করে নিতে হবে
বন্দর ইজারার সিদ্ধান্ত না পাল্টালে ৪ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন অভিমুখে বিক্ষোভ
দেশের সংকট-নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান
সংশোধনী
আরপিও’র অগণতান্ত্রিক সংশোধনী এবং নির্বাচনী ব্যয় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল কর
শোষণ-বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান
‘রাষ্ট্রের চরিত্র বদল না হওয়ায় শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে না’
অগ্নিকাণ্ডের কারণ উদঘাটন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করুন
‘মেহেরবানি’
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন