সঙ্গীতের গণধারা গণসঙ্গীত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
প্রদীপ ঘোষ : লোকসমাজ থেকে উঠে আসা লোকায়ত ভাষায় লোককবিদের রচিত ও গীত সঙ্গীতকেই বলে লোকসঙ্গীত। লোক মানুষের নিজস্ব ভাষায় যার উপস্থাপন। প্রান্তীয় মানুষের প্রেম ভালবাসা, সমস্যা সংকটের প্রতিকারের তাগিদে সহস্র বছর ধরে সৃষ্টি হয়েছে এই গান। লোকগানের স্রষ্টা যারা তারা আমাদের গ্রামীণ জীবনের খেটে খাওয়া শেকড়ের মানুষ। ধান কাটতে কাটতে, নৌকা বাইতে বাইতে, হাল চষতে চষতে অথবা মাছ ধরতে ধরতে শ্রমমুখর মানুষেরা সৃষ্টি করেছেন এই গান হাজার বছর ধরে। উৎস সন্ধানে লোক কবিদের গভীরে রয়েছে কঠিন শ্রমকে সহজতর করা ও আনন্দ লাভের মধ্য দিয়ে শ্রমকে উপভোগ করার আকাক্সক্ষা। লোকায়ত মানুষের হৃদয়ের এই গীতকেই আমরা বলি লোকসঙ্গীত। প্রতিটি জনপদেই মানুষের আছে তার অঞ্চলভিত্তিক ভাষায় রচিত এবং অঞ্চলিক আঙ্গিকে গীত সংগীত। পৃথিবীর অন্য সকল জনপদের মত আমাদেরও আছে লোকগানের ভান্ডার। লোকসঙ্গীত সর্বতোভাবে আঞ্চলিক এবং শেকরমূলে বিন্যস্ত। শেকড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের দেশবন্দনার গান, যাকে আমরা বলি দেশাত্ববোধক সঙ্গীত। ব্রিটিশপূর্ব বাংলায় সামন্ত সামাজিক কাঠামোতে আমাদের দেশের মানুষ দেশ হিসেবে ভাবতো তার অঞ্চলকে। যেখানে তার বসবাস সেটাই তার চেতনায় দেশ। আজও খেটে খাওয়া মানুষ তার দেশ হিসেবে মনে করে তার জেলা এবং উপজেলাকেই; কেননা রাষ্ট্রীয় কাঠামোবদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত ছিলো না এই লোক মানুষেরা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার অবাঙালি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে চেতনা ফিরে এসেছিলো ভারতবাসীর। ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন বিস্তারের মধ্য দিয়ে দেশবাসী যখন বহুমাত্রিক নিয়মনীতি ও শোষণ-বঞ্চনার আবর্তে সেই সময় থেকেই জাতিবোধ ও জাতীয়তার চেতনার বিকাশ শুরু। জুলুম যন্ত্রণার বিরুদ্ধে লোকমানুষেরা যেমনি প্রতিবাদ গড়ে তুলেছে তাদের গানে তেমনি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপলব্ধিতে আসে জাতীয়তাবাদী চেতনার ভাবনা। রাজনৈতিক ভাবে সশস্ত্র ধারার আন্দোলন বিকশিত হতে থাকে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও ইউরোপিয়ান ক্লাবে হামলা সহ নানা সহিংস ও অহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি তথা ভারতের জনগণ সুদৃঢ় করে জাতীয়তাবাদী ধারাকে। কবি ও শিল্পীদের লেখনিতে মা, মাটি আর দেশ বন্দনায় ঐক্যবদ্ধ হয় মানুষ। বিদ্যাসাগর-মাইকেল-রবীন্দ্র-নজরুল সহ নানা সৃজনশীল মেধাবী সাহিত্যিকের মাধ্যমে প্রসারিত হয় দেশাত্ববোধের ধারা। দেশবন্ধনার সঙ্গীতের ভাণ্ডার হয় সমৃদ্ধ। পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে শুরু হয় বিপ্লবী চেতনার গান। অন্যদিকে বিশ্ব মানচিত্রে নানা ধরনের পট পরিবর্তনের মাঝে আবির্ভূত হয় শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা। পাশ্চত্যে প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দেলন ঘটে ১৮২০ সালে ইংল্যান্ড। এ আন্দোলন লাডাইট মুভমেন্ট নামে পরিচিত। একে মেশিন ভাঙা আন্দোলনও বলা হয়। এই আন্দেলন থেকে উদ্ভূত কোনও গানের সন্ধান পাওয়া যায়নি, তবে কবিতায় তার প্রতিফলন ঘটেছিল। কবি P.Mead লিখেছিলেন- ‘‘There is a king and a ruthless king’’ ইত্যাদি কবিতা। ১৮৪৪ সালে সাইলেশিয়ার সুতাকল শ্রমিকের জঙ্গি আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা পাই জার্মান কবি হেনরি হাইনের রচিত গান ‘Song of the Silesian Weavers’. এরপর ১৮৩৬ সাল থেকে ১৮৪৮ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের চার্টিস্ট আন্দোলনের অনেক গান হারিয়ে গেছে। এর পর ক্রমবিকশিত শ্রমিক-আন্দোলনের মধ্যদিয়ে ১৮৭১ সালে দেখা দিল প্যারি কমিউনের শ্রমিক রাষ্ট্র। মাত্র তিন মাসের জন্য প্যারিতে শ্রমিকরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। তিনমাস পরে বুর্জোয়ারা রক্তস্রোতে সে রাষ্ট্রকে ভাসিয়ে দিয়েছিল। এই কমিউন যোদ্ধা শ্রমিক ইউজিন পতিয়ের একটি গীতরচনা করেন এবং পিয়ের দেগাতার নামে অন্য একজন কমিউন ‘যোদ্ধা’ এতে সুরারোপ করেন। এই গানই শ্রমিকের বিখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল সংগীত (Arise ye prisoners of starvation)। জাগো জাগো জাগো সর্বহারা, অনশন বন্দি ক্রীতদাস/ শ্রমিক দিয়াছে আজি সারা/ উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস। এই গানই বিশ্বের প্রথম প্রকৃত গণসংগীত হিসেবে স্বীকৃত। কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের অনুপ্রেরণায় ১৯২৬ সালে বাংলায় এই সংগীত সর্বপ্রথম অনুবাদ করেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি লিখলেন, ‘অনশন বন্দি ওঠোরে জাগো, জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যাহত, জাগো।” ১৯১৭ সালে লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত বিপ্লবের মাধ্যমে সৃষ্টি হলো শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো। জয়োল্লাসে গেয়ে উঠল বিজয়ী শ্রমিকরা। যদিও এ গানের রচয়িতার সন্ধান আমরা জানিনা তবে গানটি বিশ্বব্যাপী গীত হয়ে আসছে আজও। Through the winter’s cold and famine From the fields and from the towns At the call of Comrade Lenin... এ গানের সার্থক অনুবাদ করেছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস “ভেদী অনশন মৃত্যু তুষার তুফান/ প্রতি নগর হতে গ্রামাঞ্চল/কমরেড লেনিনের আহবান/ চলে মুক্তি সেনা দল।” ইত্যাদি। সোভিয়েত বিপ্লবের বার্তা ছড়িয়ে পড়ল বাংলায়। ১৯২০ সালে এখানেও শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন শুরু হল। সেই সঙ্গে গানের জগতেও নতুন হাওয়া বইতে লাগল। নজরুল লিখলেন- ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন উড়ে কাল বোশেখী ঝড়’ ইত্যাদি গান। এ গানগুলোই বাংলা গণসংগীতের পূর্বাভাস বলা যায়। মূলত পাশ্চাত্যভূমিতে শ্রমিক আন্দোলনের পাশাপাশি বিকাশ ঘটেছে ‘Mass Song’ এর। গণসংগীতের মূল চরিত্র আন্তর্জাতিক। এই আন্তর্জাতিকতার ধারা বেয়েই বাংলা গণসংগীতের উদ্ভব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ঝড় ওঠালো। আর তাতে ম্যাক্সিম গোর্কি, রমা রোলা, বারবুস, আঁন্দ্রে জিদ সহ নানা প্রতিভাবান সাহিত্যিক ও শিল্পীসমাজ সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিলেন। গড়ে তুললো ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিশ্ব আন্দোলন। নাম দেয়া হলো League Against Fascism and War. ভারতে গঠিত হলো এর শাখা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে এসে দাঁড়ালেন। League Against Fascism and War. এর সভাপতির হাল ধরলেন। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত পৃথিবীতে দেশে দেশে সংস্কৃতি হত্যার যে চক্রান্ত ফ্যাসিস্টরা করেছিলো তার বিরুদ্ধে ১৯৪৩ সালে জন্ম নিলো ভারতীয় গণনাট্য সংঘ। ভারতব্যাপী গণসঙ্গীতের ধারা সূচিত হলো। কণ্ঠে গান নিয়ে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়লেন বিনয় রায়, সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নিবারণ পণ্ডিত, সাধন দাশগুপ্ত গুরুদাশ পাল প্রমুখ। বাংলার সঙ্গীতে যুক্ত হলো গণমানুষের বিশ্বসঙ্গীতের গণধারা। যাকে আমরা গণসঙ্গীত বলে জানি। বস্তুত চল্লিশের দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কেবল ভারতীয় গণনাট্য সংঘই বাংলা গণসঙ্গীতে যুক্ত করেছে প্রায় চার শতাধিক গান। গ্রন্থিত হয়েছে ৩৪৯টি। এর মধ্যে হিন্দি, উর্দূ ভাষাতেও রয়েছে অনেক গান। বাংলা ও সহোদর ভাষায় রয়েছে অগণিত অগ্রন্থিত সঙ্গীত ভাণ্ডার। আমাদের বাংলাদেশের মাটিতেও গণের গানের নির্মাণ কম নয়। যদিও ষাটের দশকে বাংলার পূর্ব ভূমিতে কৃষক নেতা সত্যেন সেন কবিগানের দল গড়ে তোমার মাধ্যমে দরজা খুলে দেন গণসঙ্গীতের। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এদেশে গণসঙ্গীতের ধারা উন্মোচিত হয়। শিল্পী সংগ্রামী সত্যেন সেন কলম ধরলেন মানুষের গান লিখতে। তাঁর গানে লোকধারা আবার কখনো নাগরিক ধারায় ধ্বনিত হতে থাকলো গণমানুষের আন্তর্জাতিকতার বার্তা। যেমন ‘ওরে ও বঞ্চিত সর্বহারা দল/ শোষণের দিন হয়ে এলে ক্ষীণ/ নবযুগ আসে চঞ্চল..” আবার অন্যদিকে ‘খেটে খেটে মরলি খালি/ অভাবেই দিন কাটালি/ দিনে দিনে সব খোয়ালি/ এমনি কপাল পোড়া।’ ইত্যাদি। গণসঙ্গীত নিয়ে নানা সঙ্গীত রচয়িতা ও সুরকারের রয়েছে নানা ব্যাখ্যা। কেউ দেশাত্ববোধক এসব গানকে গণসঙ্গীতের কাতারে ফেলতে চেয়েছেন আবার কেউবা অন্যায়ের বিরুদ্বে যে গান তাকেই গণসঙ্গীত হিসেবে অবিহিত করেছেন। গণসঙ্গীতের স্বরুপ নির্ধারণ করতে গিয়ে যথার্থ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় গণসঙ্গীতের সার্থক স্রষ্টা হেমাঙ্গ বিশ্বাস এর কাছে। তিনি বলেছেন, ‘স্বদেশ চেতনা যেখানে গণচেতনায় মিলিত হয়ে শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিকতার ভাবাদর্শের সাগরে মিশেল সেই মোহনাতেই গণসঙ্গীতের জন্ম।’ (গণনাট্য আন্দোলন ও লোকসঙ্গীত প্রবন্ধ) আরও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে হ্যানস আইসলারের কাছ থেকে। তিনি একজন জার্মান মিউজিক কম্পোজার হিসেবে খ্যাতিমান ব্যক্তি। যাকে ‘Rebel in Music' ’ আখ্যা দেয়া হয়েছে। তাঁর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হচ্ছে তিনি ছিলেন মুক্ত জার্মানির জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টা এবং নাট্যকার ব্রেখটের প্রধান মিউজিক কম্পোজার। গণসঙ্গীতের স্বরূপ নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছেন- Mass song is the fighting song of the modern working class and to a certain degree Folksong at a higher stage than before, because it is international. এই বক্তব্যের অর্থই হলো গণসঙ্গীত আধুনিক কালের শ্রমজীবী মানুষের গান। যা ধারণ করে শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিকতাকে এবং তা হলো লোকসঙ্গীতের উচ্চতর বিকাশমান রূপ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..